অশ্লীলতা

তারা যখন কোন অশ্লীল কাজ করে তখন তারা বলে- ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এ কাজই করতে দেখেছি, আর আল্লাহ আমাদেরকে এসব কাজ করার আদেশ দিয়েছেন।’ বল, ‘আল্লাহ অশ্লীলতার নির্দেশ দেন না, আল্লাহর সম্বন্ধে তোমরা কি এমন কথা বলছ যা তোমরা জান না?’ -আল-আ'রাফ ৭:২৮
.
যারা পছন্দ করে যে, মু’মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তৃতি ঘটুক তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাতে। আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না। -আন-নূর ২৪:১৯
.
রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কোন আমল দ্বারা মানুষ বেশী জান্নাতে প্রবেশ করবে? তিনি বললেন, আল্লাহর ভীতি ও সদ্বাচারের কারণে। জিজ্ঞাসা করা হল, কোন কাজের দরুন মানুষ বেশী জাহান্নামে যাবে? তিনি বললেনঃ মুখ ও লজ্জাস্থানের কারণে। -তিরমিজী ২০১০
.
নাবী ﷺ বলেছেনঃ যে কেউ আমার জন্য তার দু'পা ও দু'চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থানের দায়িত্ব নেবে আমি তার জন্য বেহেশতের দায়িত্ব নেব। -বুখারী ৬৩৫১
.
আর যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অতি জঘন্য পথ। -আল-ইসরা ১৭:৩২
.
আদম সন্তানের উপর যিনার যে অংশ লিপিবদ্ধ আছে তা অবশ্যই সে প্রাপ্ত হবে। দু'চোখের যিনা হল দৃষ্টিপাত করা, দু’কানের যিনা হল শ্রবণ করা, জিহ্বার যিনা হল কথোপকথন করা, হাতের যিনা হল স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হল হেঁটে যাওযা, অন্তরের যিনা হল আকৃষ্ট ও বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা বাস্তবায়িত করে এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। -মুসলিম ৬৫১৩
.
যখন কেউ যিনা করে, তখন তার থেকে ঈমান বেরিয়ে যায় এবং তা তার মাথার উপর মেঘের ন্যায় অবস্থান করে। আর যখন সে তা থেকে বিরত হয়, তখন ঈমান তার কাছে পুনরায় ফিরে আসে। -আবু দাউদ ৪৬১৭
.
কিয়ামতের পূর্ব নিদর্শনসমুহের মধ্যে হল এই যে, ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে, মূর্খতার প্রসার ঘটবে, মদ পান করা হবে, ব্যাপকভাবে ব্যাভিচার-হবে, পুরুষের সংখ্যা কমবে, নারীর সংখ্যা এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে যে, পঞ্চাশ জন নারীর তত্ত্বাবধায়ক হবে একজন পুরুষ। -বুখারী ৬৩৫২
.
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের নীতি-পদ্ধতি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করবে, বিঘতে বিঘতে ও হাতে হাতে, এমনকি তারা যদি গোসাপের গর্তে প্রবেশ করে থাকে তাহলেও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! পূর্ববর্তী উম্মাত বলতে তো ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরাই উদ্দেশ্য? তিনি বললেন, তবে আর কারা? -মুসলিম ৬৫৩৯
.
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেনঃ বনু ইসরাঈলের যে অবস্থা এসেছিল আমার উম্মতরাও ঠিক তাদেরই অবস্থায় পতিত হবে। এমনকি তাদের কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে থাকে তবে আমার উম্মতেরও কেউ তাতে লিপ্ত হবে। বনূ ইসরাঈলরা তো বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে আর আমার উম্মতরা বিভক্ত হবে তিহাত্তর দলে। এদের একটি দল ছাড়া সব দলই হবে জাহান্নামী। সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! এরা কোন দল? তিনি বললেনঃ আমি এবং আমার সাহাবীরা যার উপর প্রতিষ্ঠিত। -তিরমিজী ২৬৪২
.
আর (স্মরণ করো) লূতের কথা, যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই তোমরা এমন এক অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি। -আল আনকাবুত ২৯:২৮
আমি তাদের চোখগুলোকে অন্ধ করে দিলাম। -আল-কামার ৫৪:৩৭
সূর্যোদয়ের সময়ে এক প্রচন্ড ধ্বনি তাদের উপর আঘাত হানল। -আল-হিজর ১৫:৭৩
আমি জনপদের উপরকে নীচে উল্টে দিলাম এবং ক্রমাগত পোড়ামাটির পাথর বর্ষণ করলাম। -হূদ ১১:৮২
.
আমি আমার উম্মাতের ব্যাপারে লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সর্বাধিক আশঙ্কা করি। -ইবনে মাজাহ ২৫৬৩, তিরমিজী ১৪৬৩
যে মানুষ লুত সম্প্রদায়ের কুকর্ম করে সে অভিশপ্ত। -আত তিরমিজী ১৪৫৬
তোমরা যখন কাউকে লূতের কাওমের মত কাজে লিপ্ত দেখবে, তখন এর কর্তা এবং যার সাথে এরূপ করা হবে, উভয়কে হত্যা করবে। -আবু দাউদ ৪৪০৩, তিরমিজী ১৪৬২
.
যে লোক কোন পুরুষ বা স্ত্রীলোকের মলদ্বারে সংগম করে (কিয়ামাতের দিন) আল্লাহ তা'আলা তার দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না। -আত তিরমিজী ১১৬৫
.
ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত কর। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক তবে আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। -আন নূর ২৪:২
ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকে ছাড়া বিয়ে করবে না এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া বিয়ে করবে না। আর মুমিনদের উপর এটা হারাম করা হয়েছে। -আন নূর ২৪:৩
আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক। -আন নূর ২৪:৪
তবে যারা এরপরে তাওবা করে এবং নিজদের সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -আন নূর ২৪:৫
এবং যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের কোন সাক্ষী নেই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে আল্লাহর নামে চার বার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী। -আন নূর ২৪:৬
আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। -আন নূর ২৪:৭
আর স্ত্রীর শাস্তি রহিত হবে যদি সে চার বার আল্লাহর নামে শপথ করে সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামীই মিথ্যাবাদী। -আন নূর ২৪:৮
আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। -আন নূর ২৪:৯

আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী তলব করবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে ঘরে অবরুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় বা আল্লাহ্‌ তাদের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা করেন। -আন নিসা ৪:১৫
.
আর তোমাদের মধ্যে যে দুজন এতে লিপ্ত হবে তাদেরকে শাস্তি দেবে। যদি তারা তাওবাহ্‌ করে এবং নিজেদেরকে সংশোধণ করে নেয় তবে তাদের থেকে বিরত থাকবে। নিশ্চয় আল্লাহ পরম তাওবাহ্‌ কবুলকারী, পরম দয়ালু। -আন নিসা ৪:১৬
.
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা আমার কাছ থেকে গ্রহণ কর, তোমরা আমার কাছ থেকে গ্রহণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মহিলাদের জন্য একটি পথ বের করে দিয়েছেন। অবিবাহিত অবিবাহিতার সাথে ব্যভিচার করে একশ বেত্রাঘাত কর এবং এ বছরের জন্য নির্বাসন দাও। আর বিবাহিত বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে ব্যভিচার করেলে একশ বেত্রাঘাত এবং পাথর নিক্ষেপ (করে হত্যা করবে)। -মুসলিম ৪২৬৭
.
তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকবেন না (রহমতের দৃষ্টিতে দেখবেন না)। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষের বেশধারী নারী এবং দায়ুছ (পাপাচারী কাজে পরিবারকে বাধা দেয় না)। আর তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, মাদকাসক্ত ব্যক্তি (যে মদ্যপ তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে) এবং দানকৃত বস্তুর খোঁটা দানকারী ব্যক্তি (দান করার পর যে দানের উল্লেখ করে গঞ্জনা দেয়)। -নাসাঈ ২৫৬৪
.
সামুরা ইবনু জুনদাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? রাবী বলেন, যাদের বেলায় আল্লাহর ইচ্ছা, তারা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত।
তিনি একদিন সকালে আমাদেরকে বললেনঃ গত রাতে আমার কাছে দু'জন আগন্তুক আসল। তারা আমাকে উঠাল। আর আমাকে বলল, চলুন। আমি তাদের সাথে চলতে লাগলাম। আমরা কাত হয়ে শায়িত এক ব্যাক্তির কাছে পৌছলাম। দেখলাম, অপর এক ব্যাক্তি তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে ফলে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নিচে গিয়ে পতিত হচ্ছে। এরপর অবার সে পাথরটি অনুসরণ করে তা পুনরায় নিয়ে আসছে। তিনি আসতে না আসতেই লোকটির মাথা পুর্বের ন্যায় পুনরায় ভাল হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার অনুরূপ আচরণ করে, যা পূর্বে প্রথমবার করেছিল। তিনি বলেনঃ আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম, সুবহান্নাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেনঃ তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন।
তিনি বলেনঃ আমরা চললাম, এরপর আমরা চিৎ হয়ে শায়িত এক ব্যাক্তির কাছে পৌছলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক ব্যাক্তি লোহার আকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমন্ডলের একদিক মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্দ্র, চোখ ও মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। আওফ (রহঃ) বলেন, আবূ রাজা (রহঃ) কোন কোন সময় 'ইয়ুশারশিরু' শব্দের পরিবর্তে 'ইয়াশুককু' শব্দ বলতেন। এরপর ঐ লোকটি শায়িত ব্যাক্তির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সাথে যেরূপ আচরণ করেছে অনুরূপ আচরণই অপরদিকের সাথেও করে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি পুর্বের ন্যায় ভাল হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের ন্যায় আচরণ করে। তিনি বলেনঃ আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বলেনঃ তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন।
আমরা চললাম এবং চুনা সদৃশ একটি গর্তের কাছে পৌছলাম। রাবী বলেন, আমার মনে হয় যেন তিনি বলেছিলেন, আর তথায় শোরগোলের শব্দ হচ্ছিল। তিনি বলেনঃ আমরা তাতে উঁকি মারলাম, দেখলাম তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে নির্গত আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে। তিনি বলেনঃ আমি তাদেরকে বললাম, এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন , চলুন।
তিনি বলেনঃ আমরা চললাম এবং একটি নদীর (তীরে) গিয়ে পৌছলাম। রাবী বলেনঃ আমার যতদূর মনে পড়ে বলেছিলেন, নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, এই নদীতে এক ব্যাক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর পানিতে অপর এক ব্যাক্তি রয়েছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাতারকারী ব্যাক্তি বেশ কিছুক্ষন সাঁতার কাটার পর সে ব্যাক্তির কাছে এসে পৌছে, যে নিজের নিকট পাথর একত্রিত করে রেখেছে। তথায় এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ ব্যাক্তিতার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে। আবার তার কাছে ফিরে আসে, যখনই সে তার কাছে ফিরে আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যাক্তি তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। তিনি বলেনঃ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তারা বলল, চলুন, চলুন।
তিনি বলেনঃ আমরা চললাম এবং এমন একজন- কুশ্রী ব্যাক্তির কাছে এসে পৌছলাম, যা তোমার দুটিতে সর্বাধীক কুশ্রী বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চতূর্দিকে দৌড়াচ্ছে। তিনি বলেনঃ আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ঐ লোকটি কে? তারা বলল, চলুন, চলুন।
আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে উপনীত হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চতুষ্পার্শ্বে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত বেশি আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি কে? এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন।
আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌছলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি আর কখনো দেখিনি। তিনি বলেনঃ তারা আমাকে বলল, এর ওপরে চড়। আমরা ওপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রুপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা উপনীত হলাম। আমরা শহরের দরজায় পৌছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল, আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন তথায় আমাদের সাথে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সর্বাধিক সুন্দর মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক এমনই কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সর্বাধিক কুশ্রী মনে হয়। তিনি বলেনঃ সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়। আর সেটা ছিল সুপ্রশস্ত প্রবাহমান নদী, যার পানি ছিল দুধের মত সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর এরা আমাদের কাছে ফিরে এল, দেখা গেল তাদের এ কুশ্রীতা হয়ে গিয়েছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেনঃ তারা আমাকে বলল, এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান।
তিনি বলেনঃ আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের ন্যায় একটি প্রাসাদ রয়েছে। তিনি বলেনঃ তারা আমাকে বলল, এটা আপনার বাসগূহ। তিনি বলেনঃ আমি তাদেরকে বললাম, আল্লাহ তোমাদের মাঝে বরকত দিন! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এতে প্রবেশ করি। তারা বলল, আপনি অবশ্য এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়। তিনি বলেন আমি এ রাতে অনেক বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেলাম- এগুলোর তাৎপর্য কি?
তারা আমাকে বলল- আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যাক্তিকে যার কাছে আপনি পৌছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চুর্ন-বিচুর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যাক্তি যে কুরআন গ্রহন করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরয সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে।
আর ঐ ব্যাক্তি যার কাছে গিয়ে দেখেছেন যে, তার মুখের এক ভাগ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত এমনিভাবে নাসারন্ধ্রে ও চোখ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল। সে হল ঐ ব্যাক্তি, যে সকালে আপন ঘর থেকে বের হয়ে এমন কোন মিথ্যা বলে যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
আর এ সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা চুলা সদৃশ গর্তের অভ্যন্তরে রয়েছে তারা হল ব্যাভিচারী ও ব্যাভিচারিনার দল।
আর ঐ ব্যাক্তি, যার কাছে পৌছে দেখেছিলেন যে, সে নদীতে সাতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছিল সে হল সুদখোর।
আর ঐ কুশ্রী ব্যাক্তি, যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর সে এর চতূর্পার্শে দৌড়াচ্ছিল, সে হল জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশতা।
আর ঐ দীর্ঘকায় ব্যাক্তি যিনি বাগানে ছিলেন, তিনি হলেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আর তার আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিৎরাত (স্বভাবধর্মের) ওপর মৃত্যু বরন করেছে।
তিনি বলেনঃ তখন কিছু সংখ্যক মুসলমান জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও কি? তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও। আর ঐসব লোক যাদের অর্ধেকাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধেকাংশ অতি কুশ্রী। তারা হল ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় প্রকারের কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
-বুখারী ৬৫৭১

মুসলিম নারী

মুসলিম, মু’মিন, অনুগত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, বিনয়ী, দানশীল, সিয়াম পালনকারী, লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী [আল-আহযাব ৩৩:৩৫]

সহজ-সরল [আন-নূর ২৪:২৩]

.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কোনো মহিলা যদি পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে, রমাযানের সিয়াম পালন করে, গুপ্তাঙ্গের হিফাযাত করে, স্বামীর একান্ত অনুগত হয়। তার জন্য জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশের সুযোগ থাকবে। -মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩২৫৪

.

তোমরা এমন স্ত্রীলোকদের বিবাহ করবে, যারা স্বামীদের অধিক মহাব্বাত করে এবং অধিক সন্তান প্রসব করে। কেননা আমি (কিয়ামতের দিন) তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে (পূর্ববর্তী উম্মতের উপর) গর্ব প্রকাশ করব। -আবু দাউদ ২০৪৬

.

উষ্ট্রারোহী মহিলাদের মধ্যে কুরাইশ বংশীয় মহিলারা সর্বোত্তম। তারা শিশুদের প্রতি স্নেহশীলা এবং স্বামীর মর্যাদা রক্ষার্থে উত্তম হেফাজতকারিণী। -বুখারী ৪৭১১

.

পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে মর্যাদা দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী স্ত্রীরা অনুগতা থাকে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তারা তা (নিজের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ) হিফাযত করে; যা আল্লাহ হিফাযত করতে আদেশ দিয়েছেন। -আন নিসা ৪:৩৪

.

মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সাজদাহ করেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু‘আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সাজদাহ করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সাজদাহ করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সাজদাহ করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত। -ইবনে মাজাহ ১৮৫৩

.

স্বামী যদি মনোবাসনা পূরণের জন্য তার স্ত্রীকে ডাকে তবে সে যদি চুলার কাছেও থাকে তবুও যেন অবশ্যই সাড়া দেয়। -তিরমিজী ১১৬১

.

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক মহিলাকে দেখে ফেলেন। তারপর তিনি (তার স্ত্রী যায়নাবের কাছে যান এবং মনোবাসনা পূর্ণ করে বেরিয়ে আসেন। পরে বললেন, মহিলারা যখন সামনে আসে তখন শয়তানের সূরতে আসে। তোমাদের কেউ যদি কোন মহিলাকে দেখে ফেলে আর তাকে পছন্দনীয় মনে হয় তবে সে যেন তার স্ত্রীর কাছে চলে আসে। কেননা স্ত্রীরও তা আছে যা এ মহিলার আছে। -তিরমিজী ১১৫৯

.

কোন স্ত্রী স্বামীর উপস্থিতিতে তাঁর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা রাখবে না। -বুখারী ৪৮১৩

.

যদি কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে তার সাথে একই বিছানায় শোয়ার জন্য ডাকে, আর তার স্ত্রী অস্বীকার করে, তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা ঐ মহিলার ওপর লা’নত বর্ষণ করতে থাকে। -বুখারী ৪৮১৪

.

তিন ব্যক্তি এমন যাদের সালাত তাদের কানও অতিক্রম করে না, পলাতক গোলাম যতক্ষণ না সে (মালিকের কাছে) ফিরে আসে, এমন মহিলা যে তার স্বামীর অসন্তুষ্টিতে রাত্রি যাপন করে, এমন ইমাম মুসল্লিরা যাকে অপছন্দ করে। -তিরমিজী ৩৬০

.

বলা হয়, সবচেয়ে কঠিন আযাব হবে দুই ব্যক্তির, স্বামীর অবাধ্যা স্ত্রীর এবং এমন ইমামের যাকে মুসল্লিরা অপছন্দ করে। -তিরমিজী ৩৫৯

.

যখন কোন নারী দুনিয়ায় তার স্বামীকে কষ্ট দেয় তখন জান্নাতের আয়াতলোচনা হুরগণ (এই নারীকে লক্ষ্য করে) বলে, আল্লাহ্ তোমার ধ্বংস করুন, তুমি তাঁকে কষ্ট দিওনা। ইনি তো তোমার কাছে অতিথি। অচিরেই তিনি তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের কাছে চলে আসবেন। -তিরমিজী ১১৭৫

.

একবার ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমরা সা’দকা করতে থাক। কারন আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা আরয করলেনঃ কী কারনে, ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমাণে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর না-শোকরী করে থাক। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যাক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চাইতে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তাঁরা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষের অর্ধেক নয়? তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়য অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম থেকে বিরত থাকে না? তাঁরা বললেন, ‘হাঁ’। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। -বুখারী ২৯৮

মুসলিম পুরুষ

মুসলিম, মু’মিন, অনুগত, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, বিনয়ী, দানশীল, সিয়াম পালনকারী, লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী [আল-আহযাব ৩৩:৩৫]

...নারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করবে না, যদি না তারা সুস্পষ্ট ব্যভিচার করে। তাদের সাথে দয়া ও সততার সঙ্গে জীবন যাপন কর। [আন-নিসা ৪:১৯]

মুসলিম

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। -সহীহ বুখারী: ১
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজনের ইসলামী গুনের অন্যতম হল অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করা। -সূনান তিরমিজী ২৩২১, সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৯৭৬
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে। -সহীহ বুখারী ১২
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট, উভয়ের মাঝে বহু অস্পষ্ট বিষয় রয়েছে। যে ব্যাক্তি গুনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ পরিত্যাগ করে, সে ব্যাক্তি যে বিষয়ে গুনাহ হওয়া সুস্পষ্ট, সে বিষয়ে অধিকতর পরিত্যাগকারী হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যাক্তি গুনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ করতে দুঃসাহস করে, সে ব্যাক্তির সুস্পষ্ট গুনাহের কাজে পতিত হবার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। গুনাহসমূহ মহান আল্লাহ্ তা’আলার সংরক্ষিত এলাকা, যে জানোয়ার সংরক্ষিত এলাকার চার পাশে চরতে থাকে, তার ঐ সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। -সহীহ বুখারী ১৯২৩
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে এবং প্রকৃত মুহাজির সে-ই, যে আল্লাহ্ তা’আলার নিষিদ্ধ কাজ ত্যাগ করে। -সহীহ বুখারী ৯
.
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেয দিনে ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। আর যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান রাখে সে যেন মেহমানের সাম্মান করে। আর যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে, অথবা যেন চুপ থাকে।
-সহীহ বুখারী ৫৭০৬
.
হে মু’মিনগণ! কোন সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরা যেন অন্য নারীদেরক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারিণীদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অন্যের নিন্দা করো না, একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর (ঈমানের আগে কৃত অপরাধকে যা মনে করিয়ে দেয় সেই) মন্দ নাম কতই না মন্দ! (এ সব হতে) যারা তাওবাহ না করে তারাই যালিম।
মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
-আল হুজুরাত (৪৯:১১-১২)
.
প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ।
-আল হুমাযাহ (১০৪:১)
.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মদিনা বা মক্কার কোন এক বাগানের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এমন দু’ব্যাক্তির আওয়াজ পেলেন, যাদের কবরে আযাব হচ্ছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এদের দু’জনকে আযাব দেওয়া হচ্ছে, অথচ কোন বড় গুনাহের জন্য এদের আযাব দেওয়া হচ্ছে না। তারপর তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, এদের একজন তার পেশাবের নাপাকি থেকে সতর্কতা অবলম্বন করত না। আর একজন চোগলখুরী করত। তারপর তিনি একটি খেজুরের ডাল আনালেন এবং তা ভেঙ্গে দু’খন্ড করে প্রত্যেকের কবরের উপর একখন্ড রাখলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! এরূপ কেন করলেন?’ তিনি বললেনঃ হয়ত তাদের আযাব কিছুটা লাঘব করা হবে, যতদিন পর্যন্ত এ দু’টি না শুকায়।
-সহীহ বুখারী ২১৬
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কি জান, গীবত কী জিনিস? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, (গীবত হল) তোমার ভাই এর সম্পর্কে এমন কিছু আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। প্রশ্ন করা হল, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাই এর মধ্যে থেকে থাকে তবে আপনি কি বলেন? তিনি বললেন, তুমি তার সম্পর্কে যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলেই তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে তা হলে তো তুমি তার প্রতি অপবাদ আরোপ করলে।
-সহীহ মুসলিম ৬৩৫৭
.
তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কারো প্রতি ধারণা পোষন করা সবচেয়ে বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ অন্বেষন করো না, গোয়েন্দাগিরী করো না, গরস্পর হিংসা করো না একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষন করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে থেকেো।
-সহীহ বুখারী ৫৬৩৮
.
যে ব্যক্তি মিথ্যা পরিত্যাগ করে আর মিথ্যা তো বাতিলই হয়ে থাকে-তার জন্য জান্নাতের পার্শ্বে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে; হক থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বিবাদ-বিসম্বাদ পরিত্যাগ করে তার জন্য জান্নাতের মাঝে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে; আর যে ব্যক্তি তার চরিত্র সুন্দর করে তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে।
-সূনান তিরমিজী ১৯৯৯ (যঈফ)
.
তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের রোগ তোমাদের মাঝেও সংক্রমিত হবে। তা হল হিংসা ও বিদ্বেষ। এ হল মুন্ডনকারী। আমি বলি না যে, তা চুল মুন্ডন করে বরং তা দ্বীনকে মুন্ডন (ধ্বংস) করে দেয়। যাঁর হাতে প্রাণ সে সত্তার কসম, তোমরা মু‘মিন না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে দাখেল হতে পারবে না। আর তোমরা মু‘মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালবেসেছ। এই ভালবাসা কেমন করে সুদৃঢ় হয় তা তোমাদের বলব কি? তা হল পরস্পর সালামের প্রসার ঘটাও।
-সূনান তিরমিজী ২৫১২
.
...যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন।
-আলে ইমরান (৩:১৩৪)
.
আল্লাহ বলেন, ‘‘অহংকার আমার চাদর এবং শ্রেষ্ঠত্ব আমার লুঙ্গী স্বরূপ। তাই, যে ব্যক্তি এ দু’টি জিনিসে আমার শরীক হতে চায়, আমি তাকে দোজখে নিক্ষেপ করবো।’’
-সূনান আবু দাউদ ৪০৪৬
.
তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্নসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কতৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না। যাতে মানুষের সম্পদের কোন অংশ পাপের মাধ্যমে জেনে বুঝে খেয়ে ফেলতে পার।
-আল-বাক্বারাহ (২:১৮৮)
.
ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।
-সুনানে ইবনে মাজাহ ২৩১৩
.
যে ব্যক্তি কোনো শাসক বা বিচারকের নিকট সুপারিশ করে, আর সে সুপারিশ স্বরূপ তার নিকট কোনো হাদিয়া (উপহার) পাঠায় এবং তিনি তা গ্রহণ করেন। তাহলে সে সুদের দরজাসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি বিরাট দরজায় প্রবেশ করল।
-মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৩৭৫৭
.
কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না। কোন মদ্যপায়ী মু'মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু'মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। -বুখারী ২৩১৩
.
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও ‘সুকুরজা’ অর্থাৎ ছোট ছোট পাত্রে আহার করেছেন, তার জন্য কোন নরম রুটি তৈরি করা হয়েছে কিংবা তিনি কখনো টেবিলের উপর খাবার খেয়েছেন বলে আমি জানি না। কাতাদাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তাহলে তাঁরা কিসের উপর আহার করতেন। তিনি বললেনঃ দস্তরখানের উপর।
-সহীহ বুখারী ৪৯৯৪
.
পেটের চেয়ে মন্দ কোন পাত্র মানুষ ভরাট করে না। পিঠের দাঁড়া সোজা রাখার মত কয়েক লোকমা খানাই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আরো বেশী ছাড়া যদি তা সম্ভব না হয় তবে পেটের এক তৃতীয়াংশ খানার জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য আরেক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।
-সূনান তিরমিজী ২৩৮৩
.
যে ব্যাক্তি এইসব রসুনের তরকারী খাবে (কখনও বলেছেন) যে ব্যাক্তি পিঁয়াজ, রসুন ও কুরগাছ (গন্ধে ও স্বাদে পিয়াজের মত সবজি বিশেষ) খাবে, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে। কেননা আদম সন্তান যাতে কষ্ট পায়, ফেরেশতাগনও তাতে কষ্ট পান।
-সহীহ মুসলিম ১১৩৬
.
যার সাথে ভালো ব্যবহার করা হয় সে যেন তাকে তার অনুরূপ বিনিময় দান করে। যদি বিনিময় দান করার সামথ্য না থাকে তাহলে সে তার প্রশংসা করবে। কেননা সে যখন তার প্রশংসা করলো তখন সে যেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। যে ব্যক্তি তা (ভালো ব্যবহার) গোপন রাখলে সে যেন তার প্রতি অকৃজ্ঞতা প্রকাশ করলো। যে ব্যক্তি কোন কিছু না পেয়েও বলে, পেয়েছি, সে দ্বিগুণ মিথ্যাবাদী।
-আল-আদাবুল মুফরাদ ২১৪
.
যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া করেনা সে আল্লাহরও শুকরিয়া করেনা।
-সূনান তিরমিজী ১৯৬০
.
কোন মুসলিম যদি কোন মুসলিম রোগীকে দেখতে যায় তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা দু’আ করেন। আর যদি সন্ধ্যার সময় কোন মুসলিম রোগীকে দেখতে যায় তবে তার জন্য ভোর পর্যন্ত সত্তর হাজার ফিরিশতা দু’আ করেন। আর তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান হবে।
-সূনান তিরমিজী ৯৭২
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্বীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন (নায়মূক ও মেহেরজান) খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, এই দুইটি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুইটি উত্তম দিন দান করেছেন এবং তা হল: কোরবানীর ঈদ এবং রোযার ঈদ।
-সূনান আবু দাউদ ১১৩৪
(নায়মূক মানে নববর্ষ এবং মেহেরজান মানে জাতীয় দিবস)
.
জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয।
-সুনানে ইবনে মাজাহ ২২৪
.
পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামতের দিন প্রভুর নিকট থেকে আদম সন্তানের পা সরবে নাঃ জিজ্ঞাসা করা হবে তার বয়স সম্পর্কে, কি কাজে সে তা অতিবাহিত করেছে, তার যৌবন সম্পর্কে কি কাজে সে তা বিনাশ করেছে; তার সম্পদ সম্পর্কে, কোথা থেকে সে তা অর্জন করেছে আর কি কাজে সে তা ব্যয় করেছে এবং সে যা শিখেছিল তদনুযায়ী কি আমল সে করেছে?
-সূনান তিরমিজী ২৪১৯
.
বান্দার পা (কিয়ামতের দিন) নড়বে না যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে তার বয়স সম্পর্কে যে, কি কাজে সে তা শেষ করেছে; তার ইলম সম্পর্কে তদনুযায়ী কি আমল করেছে সে; তার সম্পদ সম্পর্কে কোথা সে তা অর্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে; তার শরীর সম্পর্কে সে কিসে তা বিনাশ করেছে।
-সূনান তিরমিজী ২৪২০
.
ঈমানদার ব্যাক্তির মৃত্যুর পর তার যেসব কাজ ও তার যেসব পুণ্য তার সাথে যুক্ত হয় তা হলঃ যে জ্ঞান সে অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং তার প্রচার করেছে, তার রেখে যাওয়া সৎকর্মপরায়ণ সন্তান, কুরআন যা সে ওয়ারিসী সূত্রে রেখে গেছে অথবা মাসজিদ যা সে নির্মাণ করিয়েছে অথবা পথিক-মূসা ফিরদের জন্য যে সরাইখানা নির্মাণ করেছে অথবা পানির নহর যা সে খনন করেছে অথবা তার জীবদ্দশায় ও সুস্থাবস্থায় তার মাল থেকে যে দান-খয়রাত করেছে তা তার মৃত্যুর পরও তার সাথে (তার আমালনামায়) যুক্ত হবে।
-সুনানে ইবনে মাজাহ ২৪২
.
দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফিরের জন্য জান্নাত (স্বরূপ)।
-সহীহ মুসলিম ৭১৪৯
.
জাহান্নাম প্রবৃত্তি দিয়ে বেষ্টিত। আর জান্নাত বেষ্টিত দুঃখ-ক্লেশ দিয়ে।
-সহীহ বুখারী ৬০৪৩
.
আল্লাহ্ তা’আলা যখন জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করলেন তখন জিবরীল (আঃ) কে জান্নাতে পাঠালেন এবং বললেনঃ যাও তা এবং তার অধিবাসীদের জন্য তাতে যা প্রস্তুত করে রেখেছি তা পরিদর্শন করে এস।
এরপর তিনি জান্নাতে গেলেন। তা এবং তাতে এর অধিবাসীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা যা প্রস্তুত করে রেখেছেন তা পরিদর্শন করে তাঁর কাছে ফিরে এসে বললেনঃ আপনার ইযযত ও সম্মানের কসম, যে কেউ এর কথা শুনবে তাতে দাখিল হওয়ার প্রয়াস পাবে।
এরপর আল্লাহ্ তা’আলা নির্দেশ দিলেন। ফলে জান্নাতকে কষ্টকর জিনিস দ্বারা বেষ্টন করে দেওয়া হল। পরে তিনি তাকে বললেনঃ আবার সেখানে ফিরে যাও এবং জান্নাত ও তাতে এর অধিবাসীদের জন্য কি (নিয়ামত) প্রস্তুত করে রেখেছি তা পরিদর্শন করে এস।
জিবরীল (আঃ) সেখানে ফিরে গেলেন, দেখলেন যে, কষ্টকর বিষয় দ্বারা তা বেষ্টিত। তিনি আবার আল্লাহর কাছে ফিরে আসলেন এবং বললেনঃ আপনার ইযযতের কসম, আমার আশংকা হয় যে, কেউ এতে প্রবেশ করতে পারবে না।
আল্লাহ্ তা’আলা বলবেনঃ জাহান্নামের দিকে যাও। তা এবং তার অধিবাসীর জন্য এতে কি (ভীষণ শাস্তি) তৈরী করে রেখেছি তা দেখে আস। তিনি গিয়ে দেখেন যে, এর এক অংশ অপর অংশের উপর চড়াও হচ্ছে। তিনি আল্লাহর কাছে ফিরে আসলেন। বললেনঃ আপনার ইযযতের কসম, এর কথা শুনলে তাতে প্রবেশ করবে এমন কেউ হবে না।
অনন্তর তিনি নির্দেশ দিলেন ফলে জাহান্নামকে প্রবৃত্তির খাহিশাত দ্বারা বেষ্টন করে দেওয়া হল। এরপর আল্লাহ্ তা’আলা জিবরীল (আঃ)-কে বললেনঃ আবার সেখানে ফিরে যাও। তিনি আবার সেখানে ফিরে গেলেন (এবং তা দেখে এসে) বললেনঃ আপনার ইযযতের কসম, আমার আশঙ্কা হয় যে, কেউ এ থেকে বাঁচতে পারবে না, বরং সবাই এতে দাখিল হয়ে পড়বে।
-সূনান তিরমিজী ২৫৬২
.
যদি কিয়ামত এসে যায় এবং তখন তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে কিয়ামত হওয়ার আগেই তার পক্ষে সম্ভব হলে যেন চারাটি রোপন করে।
-আল-আদাবুল মুফরাদ ৪৮১

শরীয়ত, তরীকত ও হাকীকত

তাসাউফের আশগাল (কার্যাদি) ও তরীকতের আমল শুধুমাত্র পরিপূর্ণ শরীয়ত পালন ও ইখলাস অর্জনের মাধ্যম। এছাড়া যতকিছু কলবী হালত, কাশফ, নূর, দর্শন, গায়েবী জগত অবলোকন সবই অর্থহীন। এগুলো তাসাউফের উদ্দেশ্য নয় । উপরন্তু এগুলোর অর্জন আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার কোনোরূপ আলামত নয়। কোনো ফাসেক, এমনকি কাফের মুশরিকও তাসাউফের আশগাল পালন করে বিভিন্ন হালত, তাজাল্লী, কাশফ ও দর্শন লাভ করতে পারে। এগুলো কখনো কামালাতের বা সঠিকত্বের প্রমাণ নয় ৷
-এহইয়াস সুনান ৪৮৪

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ১৪, মাকতুব ৭]
[সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী; সেরাতে মুস্তাকীম পৃ ৫১]
.
মুস্তাহাবের প্রতি লক্ষ রাখা এবং মাকরূহ যদিও উহা ‘তানজিহী' হয় তাহা হইতে বিরত থাকা যিক্র মোরাকাবা ইত্যাদি হইতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৪

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৫৭-৫৮, মাকতুব ২৯]
.
ইহকালের ও পরকালের যাবতীয় সৌভাগ্যের দায়িত্ব শরীয়তের প্রতিই ন্যস্ত। এরূপ কোনো সৌভাগ্য নাই যে, তাহার জন্য শরীয়ত ব্যতীত অন্য কাহারও শরণাপন্ন হইতে হয়। তরীকত ও হাকীকত যাহা সূফীগণের একচেটিয়া, তাহা শরীয়তের তৃতীয় অংশ ইখলাছের পূর্ণতার সাহায্যকারী খাদেমস্বরূপ । উহাদের দ্বারা শরীয়ত পূর্ণ করাই উদ্দেশ্য, অন্য কিছু নহে ৷
ইতর দৃষ্টিধারী ব্যক্তিগণ লম্ফঝম্পের হালত এবং তাজাল্লী ও আত্মীক দর্শন ইত্যাদিকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করিয়া থাকে।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৩

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৭৯, মাকতুব ৩৬]
.
শরীয়ত তিন ভাগে বিভক্ত। “ইলম’-জানা, ‘আমল’-কার্য করা, 'ইখলাছ' উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা সাধন করা। অতএব, ইখলাছ পূর্ণ করণার্থে তরীকত ও হকীকতদ্বয় শরীয়তের খাদেম তুল্য।
-এহইয়াস সুনান ৪৮১

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৮৫, মাকতুব ৪০]
.
অন্তর্জগত কর্তৃক বহির্জগত পূর্ণ হইয়া থাকে, ইহাদের উভয়ের মধ্যে চুল পরিমাণ ব্যতিক্রম নাই। যথা মুখে মিথ্যা না বলা শরীয়ত এবং অন্তঃকরণ হইতে মিথ্যা বলার কুমন্ত্রণা বিদূরীত করা তরীকত ও হকীকত। উক্ত নিবারণ যদি কৃচ্ছ্রসাধ্য হয়, তবে তাহা ‘তরীকত' এবং যদি সহজসাধ্য ও স্বাভাবিকভাবে হয়, তাহা হকীকত। বস্তুত অন্তর্জগতে যাহা তরীকত ও হকীকত, তাহা বহির্জগত বা শরীয়তের পূর্ণতাকারী।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৩

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৮৬, মাকতুব ৪১]
.
রোজ কেয়ামতে শরীয়তের প্রশ্ন উত্থিত হইবে; তাসাউফের প্রশ্ন উত্থিত হইবে না। বেহেশতে প্রবেশ এবং দোজখ হইতে রক্ষা পাওয়া শরীয়তের প্রতিই নির্ভরশীল।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৫

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী, মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ১০২-১০৩, মাকতুব ৪৮]
.
জুনাইদ বাগদাদীর মৃত্যুর পর তাঁহাকে কেহ স্বপ্নে দেখিয়া তাঁহার অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলেন। তদুত্তরে তিনি বলিলেন ঃ ‘আত্মিক বর্ণনাসমূহ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে এবং ইশারা ইঙ্গিতাদি বিলুপ্ত হইয়াছে। মধ্য রাত্রিতে দুই এক রাক'আত নামায যাহা পাঠ করিতাম, তাহা ব্যতীত আর কিছুই উপকারে আসিল না।'
-এহইয়াস সুনান ৪৮৬

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/২/পৃষ্ঠা ৬০-৬১, মাকতুব ১৪৮]
.
চন্দ্র, সুর্যের নূর বা আলো দৃশ্য জগতের বস্তু। তাহা আলমে মেসাল বা আধ্যাত্মিক উপমার জগতে যে নূর পরিদর্শিত হয় তাহা হইতে বহু গুণে শ্রেষ্ঠ।
-এহইয়াস সুনান ৪৮২

[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী, মাকতুবাত শরীফ ১/২/পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫, মাকতুব ২১০ ও পৃষ্ঠা ২০১-২০২, মাকতুব ২৩৭]
.
সুলুকের রাস্তায় চলার পথে আমার পথপ্রদর্শক হলো আল্লাহর কালাম। এই দৃষ্টিতে আমার পীর বা মোর্শেদ হলো কুরআন মজীদ। সকলের হাকীকি পীর তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৯

[মুজাদ্দিদে আলফে সানী, মাবাদ ওয়াল মা'আদ]
.
৩. মূলত তাসাউফের আশগাল পালনের ফলে যে সকল কলবী অনুভূতি, কাশফ, দর্শন ইত্যাদি লাভ হয় সে বিষয়ে কথাবার্তা বলা বিদ'আত। রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবীগণ কখনো এ ধরনের কলবী অনুভূতি ও হালত নিয়ে কিছু বলতেন না। তবে ক্বলবের মধ্যে শয়তানের ওয়াসওয়াসা, হিংসা, অহংকার, রিয়া ইত্যাদি পাপের প্রবেশের বিষয়ে তাঁরা কথা বলতেন। এ বিষয়ে কথা বলা যায়।
৫. কখনই শরীয়ত বা সুন্নাতের ব্যতিক্রম কোনো বিষয়ে পীরের কথা মানবে না । পীরের মহব্বত যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর বিরোধিতায় নিপতিত করে তাহলে তা ধ্বংসের কারণ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর হক ও মহব্বতের সামনে বাকি সকল কিছুই অস্তিত্বহীন ও মূল্যহীন। পীর থেকে কোনো সুন্নাত বা শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখলে তার প্রতিবাদ করতে হবে ও তাঁকে সংশোধন করতে হবে। তিনি যদি সংশোধিত না হন তাহলে দেখতে হবে যে, তার অন্যায়টি আকীদাগত না কর্মগত। আকীদাগত হলে তাঁকে পরিত্যাগ করতে হবে। কর্মর্গত হলে তাঁকে পরিত্যাগ করা জরুরি নয়, তবে তাঁকে বিপদ বা বালাগ্রস্ত মনে করে তার জন্য দোয়া করতে হবে। ঐ বিষয়ে তার অনুসরণ হারাম জেনে তাকে বিপদমুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে চেষ্টা করতে হবে।
-এহইয়াস সুনান ৪৯৬

[সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী; সেরাতে মুস্তাকীম পৃ ৫১-৬৬]

সুপারিশ

তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুযী দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?
-ইউনুস ১০:৩১
.
বল, আছে কি কেউ তোমাদের শরীকদের মাঝে যে সৃষ্টি কে পয়দা করতে পারে এবং আবার জীবিত করতে পারে? বল, আল্লাহই প্রথমবার সৃষ্টি করেন এবং অতঃপর তার পুনরুদ্ভব করবেন। অতএব, কোথায় ঘুরপাক খাচ্ছে?
-ইউনুস ১০:৩৪
.
বলুন পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কার? যদি তোমরা জান, তবে বল।
এখন তারা বলবেঃ সবই আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না?
বলুনঃ সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে?
এখন তারা বলবেঃ আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না?
বলুনঃ তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না ?
এখন তারা বলবেঃ আল্লাহর। বলুনঃ তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে জাদু করা হচ্ছে?
-আল মুমিনূন ২৩:৮৪-৮৯
.
যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে কর্মে নিয়োজিত করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। তাহলে তারা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে?
-আল আনকাবুত ২৯:৬১
.
যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে, অতঃপর তা দ্বারা মৃত্তিকাকে উহার মৃত হওয়ার পর সঞ্জীবিত করে? তবে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝে না।
-আল আনকাবুত ২৯:৬৩
.
আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সকল প্রশংসাই আল্লাহর। বরং তাদের অধিকাংশই জ্ঞান রাখে না।
-লোকমান ৩১:২৫
.
যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে- আল্লাহ। বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁরই উপর নির্ভর করে।
-আয্‌-যুমার ৩৯:৩৮
.
আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।
-আয্‌-যুখরুফ ৪৩:৯
.
.
.
আপনি বলুনঃ কে তোমাদেরকে স্থল ও জলের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেন, যখন তোমরা তাঁকে বিনীতভাবে ও গোপনে আহবান কর যে, যদি আপনি আমাদের কে এ থেকে উদ্ধার করে নেন, তবে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
-আল আনআম/৬:৬৩
.
আল্লাহ যেসব শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো থেকে তারা এক অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে অতঃপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এটা আল্লাহর এবং এটা আমাদের অংশীদারদের। অতঃপর যে অংশ তাদের অংশীদারদের, তা তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর তা তাদের উপাস্যদের দিকে পৌছে যায়। তাদের বিচার কতই না মন্দ।
-আল আনআম/৬:১৩৬
.
তারা বলেঃ এসব চতুষ্পদ জন্তু ও শস্যক্ষেত্র নিষিদ্ধ। আমরা যাকে ইচছা করি, সে ছাড়া এগুলো কেউ খেতে পারবে না, তাদের ধারণা অনুসারে। আর কিছুসংখ্যক চতুষ্পদ জন্তুর পিঠে আরোহন হারাম করা হয়েছে এবং কিছু সংখ্যক চতুষ্পদ জন্তুর উপর তারা ভ্রান্ত ধারনা বশতঃ আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না, তাদের মনগড়া বুলির কারণে, অচিরেই তিনি তাদের কে শাস্তি দিবেন।
-আল আনআম/৬:১৩৮
.
তিনিই তোমাদের ভ্রমন করান স্থলে ও সাগরে। এমনকি যখন তোমরা নৌকাসমূহে আরোহণ করলে আর তা লোকজনকে অনুকূল হাওয়ায় বয়ে নিয়ে চলল এবং তাতে তারা আনন্দিত হল, নৌকাগুলোর উপর এল তীব্র বাতাস, আর সর্বদিক থেকে সেগুলোর উপর ঢেউ আসতে লাগল এবং তারা জানতে পারল যে, তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, তখন ডাকতে লাগল আল্লাহকে তাঁর এবাদতে নিঃস্বার্থ হয়ে যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করে তোল, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।
-ইউনুস/১০:২২
.
যখন সমুদ্রে তোমাদের উপর বিপদ আসে, তখন শুধু আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমরা আহবান করে থাক তাদেরকে তোমরা বিস্মৃত হয়ে যাও। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে স্থলে ভিড়িয়ে উদ্ধার করে নেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।
-বনী-ইসরাঈল/১৭:৬৭
.
তারা যখন জলযানে আরোহণ করে তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা শরীক করতে থাকে।
-আল আনকাবুত/২৯:৬৫
.
যখন তাদেরকে মেঘমালা সদৃশ তরংগ আচ্ছাদিত করে নেয়, তখন তারা খাঁটি মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে স্থলভাগের দিকে উদ্ধার করে আনেন, তখন তাদের কেউ কেউ সরল পথে চলে। কেবল মিথ্যাচারী, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে।
-লোকমান/৩১:৩২
.
.
.
জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের এবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
-আয্‌-যুমার/৩৯:৩
.
.
.
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।
-আল বাকারা ২:২৫৫
.
নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ যিনি তৈরী করেছেন আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পাবে না তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া ইনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তোমরা কি কিছুই চিন্তা কর না ?
-ইউনুস ১০:৩
.
যে দয়াময় আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে, সে ব্যতীত আর কেউ সুপারিশ করার অধিকারী হবে না।
-মারইয়াম ১৯:৮৭
.
দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারে আসবে না।
-ত্বোয়াহ ২০:১০৯
.
তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা আছে, তা তিনি জানেন। তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত।
-আল আম্বিয়া ২১:২৮
.
যার জন্যে অনুমতি দেয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পরে বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার উপরে মহান।
-সাবা ৩৪:২৩
.
তিনি ব্যতীত তারা যাদের পুজা করে, তারা সুপারিশের অধিকারী হবে না, তবে যারা সত্য স্বীকার করত ও বিশ্বাস করত।
-আয্‌-যুখরুফ ৪৩:৮৬
.
আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে। তাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন।
-আন-নাজম ৫৩:২৬
.
.
.
আর সে দিনের ভয় কর, যখন কেউ কারও সামান্য উপকারে আসবে না এবং তার পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না; কারও কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও নেয়া হবে না এবং তারা কোন রকম সাহায্যও পাবে না।
-আল বাকারা ২:৪৮
.
হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, সেদিন আসার পূর্বেই তোমরা তা থেকে ব্যয় কর, যাতে না আছে বেচা-কেনা, না আছে সুপারিশ কিংবা বন্ধুত্ব। আর কাফেররাই হলো প্রকৃত যালেম।
-আল বাকারা ২:২৫৪
.
আপনি এ কোরআন দ্বারা তাদেরকে ভয়-প্রদর্শন করুন, যারা আশঙ্কা করে স্বীয় পালনকর্তার কাছে এমতাবস্থায় একত্রিত হওয়ার যে, তাদের কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী হবে না-যাতে তারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে।
-আল আনআম ৬:৫১
.
তাদেরকে পরিত্যাগ করুন, যারা নিজেদের ধর্মকে ক্রীড়া ও কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। কোরআন দ্বারা তাদেরকে উপদেশ দিন, যাতে কেউ স্বীয় কর্মে এমন ভাবে গ্রেফতার না হয়ে যায় যে, আল্লাহ ব্যতীত তার কোন সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী নেই এবং যদি তারা জগতের বিনিময়ও প্রদান কবে, তবু তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না। একাই স্বীয় কর্মে জড়িত হয়ে পড়েছে। তাদের জন্যে উত্তপ্ত পানি এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে-কুফরের কারণে।
-আল আনআম ৬:৭০
.
তোমরা আমার কাছে নিঃসঙ্গ হয়ে এসেছ, আমি প্রথমবার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম। আমি তোদেরকে যা দিয়েছিলাম, তা পশ্চাতেই রেখে এসেছ। আমি তো তোমাদের সাথে তোমাদের সুপারিশকারীদের কে দেখছি না। যাদের সম্পর্কে তোমাদের দাবী ছিল যে, তারা তোমাদের ব্যাপারে অংশীদার। বাস্তুবিকই তোমাদের পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমাদের দাবী উধাও হয়ে গেছে।
-আল আনআম ৬:৯৪
.
তারা কি এখন এ অপেক্ষায়ই আছে যে, এর বিষয়বস্তু প্রকাশিত হোক? যেদিন এর বিষয়বস্তু প্রকাশিত হবে, সেদিন পূর্বে যারা একে ভূলে গিয়েছিল, তারা বলবেঃ বাস্তবিকই আমাদের প্রতিপালকের পয়গম্বরগণ সত্যসহ আগমন করেছিলেন। অতএব, আমাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী আছে কি যে, সুপারিশ করবে অথবা আমাদেরকে পুনঃ প্রেরণ করা হলে আমরা পূর্বে যা করতাম তার বিপরীত কাজ করে আসতাম। নিশ্চয় তারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারা মনগড়া যা বলত, তা উধাও হয়ে যাবে।
-আল আরাফ ৭:৫৩
.
আর উপাসনা করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন বস্তুর, যা না তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে, না লাভ এবং বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বল, তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ে অবহিত করছ, যে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন আসমান ও যমীনের মাঝে ? তিনি পুতঃপবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরীক করছ।
-ইউনুস ১০:১৮
.
অতএব আমাদের কোন সুপারিশকারী নেই।
-আশ শুআরা ২৬:১০০
.
তাদের দেবতা গুলোর মধ্যে কেউ তাদের সুপারিশ করবে না। এবং তারা তাদের দেবতাকে অস্বীকার করবে।
-আর রুম ৩০:১৩
.
আল্লাহ যিনি নভোমন্ডল, ভুমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে বিরাজমান হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক ও সুপারিশকারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?
-আস সেজদাহ্‌ ৩২:৪
.
আমি কি তাঁর পরিবর্তে অন্যান্যদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করব? করুণাময় যদি আমাকে কষ্টে নিপতিত করতে চান, তবে তাদের সুপারিশ আমার কোনই কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না।
-ইয়াসীন ৩৬:২৩
.
তারা কি আল্লাহ ব্যতীত সুপারিশকারী গ্রহণ করেছে? বলুন, তাদের কোন এখতিয়ার না থাকলেও এবং তারা না বুঝলেও?
বলুন, সমস্ত সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমতাধীন, আসমান ও যমীনে তাঁরই সাম্রাজ্য। অতঃপর তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।
-আয্‌-যুমার ৩৯:৪৩-৪৪
.
অতএব, সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন উপকারে আসবে না।
-আল মুদ্দাস্‌সির ৭৪:৪৮
.
.
.
এখন মুশরেকরা বলবেঃ যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে না আমরা শিরক করতাম, না আমাদের বাপ দাদারা এবং না আমরা কোন বস্তুকে হারাম করতাম। এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছে, এমন কি তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছে। আপনি বলুনঃ তোমাদের কাছে কি কোন প্রমাণ আছে যা আমাদেরকে দেখাতে পার। তোমরা শুধুমাত্র আন্দাজের অনুসরণ কর এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বল।
-আল আনআম ৬:১৪৮
.
তারা যখন কোন মন্দ কাজ করে, তখন বলে আমরা বাপ-দাদাকে এমনি করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এ নির্দেশই দিয়েছেন। আল্লাহ মন্দকাজের আদেশ দেন না। এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জান না।
-আল আরাফ ৭:২৮
.
মুশরিকরা বললঃ যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে আমরা তাঁকে ছাড়া কারও এবাদত করতাম না এবং আমাদের পিতৃপুরুষেরাও করত না এবং তাঁর নির্দেশ ছাড়া কোন বস্তুই আমরা হারাম করতাম না। তাদের পূর্ববর্তীরা এমনই করেছে। রাসূলের দায়িত্ব তো শুধুমাত্র সুস্পষ্ট বাণী পৌছিয়ে দেয়া।
-আন নাহল ১৬:৩৫

সিজদা

যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। তখন তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল এবং অহঙ্কার করল। আর সে হল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত। -আল বাকারা ২:৩৪

আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদের আকৃতি দিয়েছি। তারপর ফেরেশতাদেরকে বলেছি, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। অতঃপর তারা সিজদা করেছে, ইবলীস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। -আল আরাফ ৭:১১

স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি শুকনো ঠনঠনে কালচে মাটি থেকে’। ‘অতএব যখন আমি তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেব এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার জন্য সিজদাবনত হও’। অতঃপর, ফেরেশতারা সকলেই সিজদা করল। ইবলীস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের সঙ্গী হতে অস্বীকার করল। তিনি বললেন, ‘হে ইবলীস, তোমার কী হল যে, তুমি সিজদাকারীদের সঙ্গী হলে না’? সে বলল, ‘আমি তো এমন নই যে, একজন মানুষকে আমি সিজদা করব, যাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন শুকনো ঠনঠনে কালচে মাটি থেকে’।
-আল হিজর ১৫:২৮-১৫:৩৩

স্মরণ কর, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘আদমকে সিজদা কর’, তখন ইবলীস ছাড়া সকলে সিজদা করল। সে বলল, ‘আমি কি এমন ব্যক্তিকে সিজদা করব যাকে আপনি কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন’?- বনী-ইসরাঈল ১৭:৬১

স্মরণ করুন, যখন ‘ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিলেন, ‘ হে আমার পিতা ! আমি তো দেখেছি এগার নক্ষত্র , সূর্য এবং চাঁদকে, দেখেছি তাদেরকে আমার প্রতি সিজ্দাবনত অবস্থায়। -ইউসুফ ১২:৪

ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে উঁচু আসনে বসালেন এবং তারা সবাই তার সম্মানে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। তিনি বললেন, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার আগেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার রব এটা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।’ -ইউসুফ ১২:১০০

মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু‘আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। -সুনানে ইবনে মাজাহ ৯/১৮৫৩

আল আক্বীদাহ আত-ত্বহাবীয়া

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আক্বীদাহ (আল আক্বীদাহ আত-ত্বহাবীয়া)

নিশ্চয়ই আল্লাহ এক, যার কোনো শরীক নেই।

তার সদৃশ কোন কিছুই নেই।

কোন কিছুই তাকে অক্ষম করতে পারে না।

তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই।

তিনি আল আউয়াল (সর্ব প্রথম), যার কোনো শুরু নেই। তিনি অনন্ত-চিরন্তন, যার কোনো অন্ত নেই।

তার ধ্বংস নেই, তিনি ক্ষয়প্রাপ্তও হবেন না।

আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া অন্য কিছু হয় না।

কল্পনা ও ধারণাসমূহ তার ধারে কাছে পৌঁছুতে পারে না। জ্ঞান-বোধশক্তি তাকে উপলব্ধি ও আয়ত্ত করতে পারে না।

সৃষ্টির কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়।

তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মারা যাবেন না। চির জাগ্রত, কখনো নিদ্রা যান না।

তিনিই সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টির প্রতি তার কোনো প্রয়োজন ছাড়াই তিনি সৃষ্টি করেছেন। কোনো প্রকার ক্লান্তি ছাড়াই তিনি রিযিকদাতা।

তিনি নির্ভয়ে প্রাণ হরণকারী, তিনি বিনা ক্লেশে পুনরুত্থানকারী।

সৃষ্টি করার বহু পূর্ব থেকেই তিনি তার অনাদি গুণাবলিসহ শ্বাশ্বত সত্তা হিসাবে বিদ্যমান রয়েছেন। আর সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার কারণে তার এমন কোনো নতুন গুণের সংযোজন ঘটেনি, যা সৃষ্টি করার পূর্বে ছিল না। তিনি তার গুণাবলিসহ যেমন অনাদি ছিলেন, তেমনি তিনি স্বীয় গুণাবলিসহ অনন্ত, চিরন্তন ও চিরঞ্জীব থাকবেন।

সৃষ্টি করার পর তার গুণবাচক নাম খালেক (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি। আর সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার কারণে তার গুণবাচক নাম বারী (উদ্ভাবক) হয়নি।

আল্লাহ তা'আলা প্রতিপালন করার বৈশিষ্ট্য ও বিশেষণে বিশেষিত, কিন্তু তিনি কারো দ্বারা প্রতিপালিত নন। তিনি সৃষ্টি করার বৈশিষ্ট্য ও বিশেষণে বিশেষিত, কিন্তু তিনি কারো দ্বারা সৃষ্ট নন। আর মাখলুক সৃষ্টির পূর্বেও তিনি ছিলেন খালেক বা সৃষ্টিকর্তা।

মৃতদেরকে জীবন দান করার পর যেমন তিনি জীবনদানকারী নাম ও বিশেষণে বিশেষিত ঠিক তেমনি তাদেরকে জীবনদান করার পূর্বেও তিনি এই নামের অধিকারী ছিলেন। অনুরূপ তিনি সৃষ্টিকুলের সৃজনের পূর্বেই স্রষ্টা নাম ও গুণের অধিকারী ছিলেন।

এটা এ জন্য যে, তিনি সবকিছুর উপর সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান। প্রত্যেক সৃষ্টিই তার মুখাপেক্ষী এবং সব কিছুই তার জন্য সহজ। তিনি কোনো কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। তার মত কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

তিনি স্বীয় জ্ঞানে সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন

তিনি তাদের জন্য তাক্বদীর (সব কিছুরই পরিমাণ) নির্ধারণ করেছেন।

তিনি তাদের মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করেছেন।

সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টির পূর্বে কোনো কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। এমনিভাবে সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টির পূর্বেই তাদের সৃষ্টির পরবর্তীকালের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন।

তিনি তাদেরকে তার আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন এবং তার অবাধ্যাচরণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

সবকিছু তার নির্ধারণ এবং ইচ্ছা অনুসারে পরিচালিত হয়। তার ইচ্ছাই কার্যকর হয়, তার ইচ্ছা ব্যতীত বান্দার কোনো ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হয় না। অতএব তিনি বান্দাদের জন্য যা চান তাই হয়, আর যা চান না তা হয় না।

আল্লাহ অনুগ্রহ করে যাকে ইচ্ছা, তাকে হেদায়াত, আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। আর যাকে ইচ্ছা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পথভ্রষ্ট করেন, অপমানিত করেন ও বিপদগ্রস্ত করেন।

আর সকলেই আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে এবং সবাই তারই অনুগ্রহ ও ন্যায়বিচারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

তিনি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমকক্ষ হওয়ার বহু উর্ধ্বে।

তার ফয়সালার কোনো প্রতিহতকারী নেই। তার হুকুমকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করার কেউ নেই এবং তার নির্দেশকে পরাভূত করারও কেউ নেই।

উপরে উল্লিখিত সব কিছুর উপরই আমরা ঈমান এনেছি এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করছি যে, সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে আগত।

নিশ্চয়ই মুহাম্মদ ﷺ তার নির্বাচিত বান্দা, মনোনীত নাবী এবং পছন্দনীয় রসূল।

তিনি নাবীগণের মধ্যে সর্বশেষ নাবী, মুত্তাকীদের ইমাম, রসূলগণের নেতা এবং সৃষ্টিকুলের রবের হাবীব-বন্ধু।

তার পরে যেসব লোক নবুওয়াতের দাবি করবে, তাদের প্রত্যেকের দাবিই ভ্রষ্টতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

তিনি সত্য, হিদায়াত, নূর ও জ্যোতি সহকারে সকল জিন ও সমস্ত মানুষের প্রতি প্রেরিত।

নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহর কালাম। যা আল্লাহর নিকট থেকে কথা হিসেবে শুরু হয়ে এসেছে, তবে এর কোনো ধরণ নির্ধারণ করা যাবে না। এ কালামকে তিনি তার রসূল ﷺ এর প্রতি ওহী হিসাবে নাযিল করেছেন। আর ঈমানদারগণ তাকে এ ব্যাপারে সত্যবাদী বলে মেনে নিয়েছেন। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছেন যে, এটি সত্যিই আল্লাহর কালাম। কোনো সৃষ্টির কথার মত সৃষ্টি নয়। অতএব, যে ব্যক্তি কুরআন শুনে তাকে মানুষের কালাম বলে ধারণা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তার নিন্দা করেছেন, তাকে দোষারোপ করেছেন এবং তাকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের এ ভীতি তা তাকে প্রদর্শন করিয়েছেন যে বলে,
“এটাতো মানুষের কথা বৈ আর কিছুই নয়” (সূরা আল মুদ্দাস্সির ৭৪:২৫)।
অতএব, আমরা জেনে নিলাম ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলাম যে, এ কুরআন মানুষের সৃষ্টিকর্তারই কালাম। আর তা কোনো মানুষের কথার সাথে সাদৃশ্য রাখে না।

যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে মানবীয় কোনো গুণে বিশেষিত করবে, সে কাফির হবে। অতএব, যে ব্যক্তি অন্তরের চোখ দিয়ে এতে গভীর দৃষ্টি প্রদান করবে সে সঠিক শিক্ষা নিতে সক্ষম হবে। আর কাফিরদের মত কুরআনকে মানুষের কথা বলা হতে বিরত থাকবে। আর সে জানতে সক্ষম হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার গুণাবলিতে মানুষের মত নন।

আর জান্নাতীদের জন্য আল্লাহকে দেখার বিষয়টি সত্য। তবে সেই দেখা সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করে নয়, তার পদ্ধতিও আমাদের অজানা। যেমনটি আমাদের রব কুরআন ঘোষণা করেছে, “সেদিন অনেক মুখমণ্ডল আনন্দোজ্জল হবে, সেগুলো তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে” (সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:২২-২৩)। এ দেখার ব্যাখ্যা হলো, একমাত্র আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা করেন এবং যেভাবে তিনি জানেন সেভাবেই এটি অর্জিত হবে। আর এ সম্পর্কে যা কিছু ছহীহ হাদীছে রসূলুল্লাহ ﷺ হতে বর্ণিত হয়েছে, তা যেভাবে তিনি বলেছেন সেভাবেই গৃহীত হবে। তিনি যা উদ্দেশ্য করেছেন সেটিই ধর্তব্য হবে। এতে আমরা আমাদের নিজস্ব মতের উপর নির্ভর করে কোনো অপব্যাখ্যা করবো না এবং আমাদের প্রবৃত্তির প্ররোচনায় তাড়িত হয়ে কোনো অযাচিত ধারণার বশবর্তী হবো না। কারণ কোনো ব্যক্তি কেবল তখনই তার দীনকে ভ্রষ্টতা ও বক্রতা থেকে নিরাপদ রাখতে পারে, যখন সে মহান আল্লাহ এবং তার রসূল ﷺ এর নির্দেশনার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পন করবে। আর সংশয়ের ব্যাপারসমূহকে আল্লাহর দিকেই ফিরিয়ে দিবে।

পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার করা ব্যতীত কারও পা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা করবে যা তার জ্ঞানের নাগালের বাইরে এবং যার বুঝ বশ্যতা স্বীকারে সন্তুষ্ট হবে না, তার সেই ইচ্ছা তাকে নির্ভেজাল তাওহীদ, স্বচ্ছ মারেফত ও বিশুদ্ধ ঈমান হতে বঞ্চিত রাখবে। ফলে সে কুফরী ও ঈমান, সত্যায়ন ও মিথ্যায়ন, স্বীকৃতি প্রদান ও অস্বীকৃতি, সন্দেহ-পেরেশান এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অনিশ্চয়তার বেড়াজালে ঘুরপাক খেতে থাকবে। সে না সত্যবাদী মুমিন হবে, আর না অস্বীকারকারী মিথ্যাবাদী হবে।

জান্নাতীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার দিদার-সাক্ষাৎ লাভের উপর ঐ ব্যক্তির ঈমান আনয়ন বিশুদ্ধ হবে না, যে কোনো ধারণার বশবর্তী হবে, অথবা নিজের বুঝ অনুসারে সেই দিদারের তাবীল করবে বা ভুল ব্যাখ্যা দিবে। কারণ আল্লাহকে দেখার বিষয়টি এবং রবের অন্যান্য গুণাবলির বিষয়ের ব্যাপারে প্রকৃত কথা হচ্ছে ঐগুলোর কোনোরূপ তাবীল করার অপচেষ্টা না করে যেভাবে এসেছে সেভাবেই অবিকৃতভাবে গ্রহণ করা। এটাই হচ্ছে মুসলিমদের দীন। যে ব্যক্তি রবের জন্য সুসাব্যস্ত গুণাবলিকে অস্বীকার করা এবং সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তার সাদৃশ্য বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকবে না, তার নিশ্চিত পদস্খলন ঘটবে ও সে সঠিকভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণায় ব্যর্থ হবে। আমাদের মহান রব একক ও নজীরবিহীন হওয়ার গুণে গুণান্বিত। মাখলুকের মধ্যে কেউ তার গুণে ভূষিত নয় ৷

আর আল্লাহ তা'আলা সীমা, পরিধি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সাজ-সরঞ্জাম, উপাদান-উপকরণ ও যন্ত্রপাতির সাহায্য নেয়ার অনেক উর্ধ্বে। সকল সৃষ্ট বস্তুকে যেমন ছয়টি দিক পরিবেষ্টন করে রাখে, দিকসমূহ তাকে সেভাবে পরিবেষ্টন করতে পারে না।

আর মিরাজ সত্য, নাবী ﷺ কে রাতের বেলা আকসায় ভ্রমণ করানো হয়েছিল। অতঃপর তাকে জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে ঊর্ধ্ব আকাশে উত্থিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে আরো ঊর্ধ্বে নেয়া হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাকে যা প্রত্যাদেশ করার ছিল তা করেছেন। তিনি যা দেখেছেন তার অন্তর তা মিথ্যা বলেনি। সুতরাং আল্লাহ তার উপর আখেরাতে এবং দুনিয়ার জগতে দরুদ ও সালাম পেশ করুন।

আর হাউয যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তার নাবী ﷺ কে তার উম্মতের পিপাসা নিবারণার্থে প্রদান করে সম্মানিত করেছেন, তা অবশ্যই সত্য।

আর নাবী ﷺ এর শাফা'আত সত্য। যা তিনি উম্মতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। যেমনটি বিভিন্ন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা আদম এবং তার সন্তানদের কাছ থেকে যেই অঙ্গীকার (মী-ছাক) গ্রহণ করেছেন তা সত্য।

মহান আল্লাহ আদি থেকেই জানেন, সর্বমোট কত সংখ্যক লোক জান্নাতে যাবে আর কত সংখ্যক লোক জাহান্নামে যাবে। এ সংখ্যায় কোনো কমবেশী হবে না। অর্থাৎ এ সংখ্যা কমবেও না, বাড়বেও না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা মানুষের কৃতকর্ম সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবহিত।

যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজসাধ্য করে দেওয়া হয়েছে।

শেষ কর্ম দ্বারা মানুষের কৃতকার্যতা বিবেচিত হবে এবং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়ছালায় ভাগ্যবান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর হতভাগা সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়ছালায় হতভাগা বলে নির্ধারিত হয়েছে।

তাক্বদীর সম্পর্কে আসল কথা হলো, এটা সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর একটি রহস্য; যা নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত কোনো নাবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া ব্যর্থ হওয়ার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমালংঘনের ধাপ। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা হতে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাক্বদীর সম্পর্কিত জ্ঞান তার সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন এবং তাদেরকে এর উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, “তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং তারা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা আল আম্বিয়া ২১:২৩)।" অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞেস করবে তিনি কেন এ কাজ করলেন? সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।

তাক্বদীর বিষয়ে যা জানা ও যার উপর ঈমান আনয়ন করা প্রয়োজন উপরোক্ত আলোচনায় সংক্ষিপ্তভাবে তা বিধৃত হয়েছে। আল্লাহর ওলীদের মধ্যে যার অন্তর জ্যোতিদীপ্ত তার জন্য এতটুকু জানাই প্রয়োজন। আর এটিই হচ্ছে জ্ঞানে সুগভীর প্রজ্ঞাবানদের স্তর। ইলম দুই প্রকার। (১) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান। (২) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান নয়। বিদ্যমান ইলমকে অস্বীকার করা যেমন কুফরী, অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবী করাও তেমনি কুফরী। বিদ্যমান ইলম কবুল করা, আর অবিদ্যমান জ্ঞানের অন্বেষণ করা হতে বিরত থাকা ব্যতীত কারো ঈমান সুদৃঢ় বিশুদ্ধ হবে না।


আর আমরা লাওহে মাহফুযে ঈমান রাখি, আরও ঈমান রাখি কলমের উপর। আর যা আল্লাহ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তার সবকিছুতে। যা সংঘটিত হবে বলে আল্লাহ এ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তা যদি সকল সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও রোধ করতে চায় তারা সেটা করতে সক্ষম হবে না। পক্ষান্তরে, তাতে যে বিষয় সংঘটিত হবার কথা তিনি লিখেননি, সমস্ত সৃষ্টজীব একত্রিত হয়েও তা ঘটাতে পারবে না। ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত যা ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। যা বান্দার নসীবে লিখা হয়নি, তা সে কখনই পাবে না আর যা বান্দার নসীবে লেখা আছে, তা কখনই বাদ পড়বে না।

বান্দার একথা জেনে রাখা উচিত যে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যাবতীয় ঘটনাবলী সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ব হতে অবহিত। অতএব, তিনি সেটাকে অকাট্য ও অবিচল তাক্বদীর হিসাবে নির্ধারিত করেছেন। আসমান ও যমীনের কোনো মাখলুক এটাকে বানচালকারী অথবা এর বিরোধিতাকারী নেই, অনুরূপ একে কেউ অপসারণ অথবা পরিবর্তন করতে পারবে না, একে সংকোচন কিংবা পরিবর্ধনও করতে পারবে না। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা, মারেফাতের মূলবস্তু এবং আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও রুবুবিয়াত সম্পর্কে স্বীকৃতি দান। যেমন আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যথাযথ অনুপাত অনুসারে পরিমিতি প্রদান করেছেন (সূরা আল ফুরকান ২৫:৩)। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেন: আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত (সূরা আল আহযাব ৩৩:৩৮)। অতএব, ঐ ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য যে ব্যক্তি তাক্বদীর সম্পর্কে আল্লাহর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে এবং রোগক্রান্ত অন্তর নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই সে স্বীয় ধারণা অনুসারে গায়েবের একটি গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে এবং এ সম্পর্কে সে যা মন্তব্য করেছে তার ফলে সে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীতে পরিণত হয়েছে।

আর আরশ এবং কুরসী সত্য।

আর আল্লাহ তা'আলা আরশ এবং অন্যান্য বস্তু থেকে অমুখাপেক্ষী।

তিনি সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সব কিছুরই উর্ধ্বে। সৃষ্টিজগত তাকে পূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে অক্ষম।

আমরা আরও বলি যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কথোপকথন করেছেন, এর প্রতি পূর্ণ ঈমান রেখে, এর সত্যতা স্বীকার করে এবং তাকে পরিপূর্ণভাবে মেনে নিয়ে।

আর আমরা মালাঈকা বা ফেরেশতা ও নাবীগণের উপর বিশ্বাস করি এবং রসূলগণের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের উপরও বিশ্বাস করি। আমরা সাক্ষ্য দেই যে, তারা সুস্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

আমাদের কিবলার যে সমস্ত লোক নাবী ﷺ যেই দীন নিয়ে এসেছেন তার স্বীকৃতি দেয় এবং তার সকল কথা ও খবরকে সত্য বলে বিশ্বাস করে আমরা তাদেরকে মুসলিম ও মুমিন মনে করি।

আমরা আল্লাহর ব্যাপারে অযথা তর্ক করি না এবং আল্লাহর দীন নিয়ে ঝগড়া করি না।

আমরা কুরআন নিয়ে বিতর্ক করি না। আমরা সাক্ষ্য দেই যে, কুরআন আল্লাহর কালাম। জিবরীল আমীন তা নিয়ে অবতরণ করেছেন এবং সায়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ ﷺ কে তা শিক্ষা দিয়েছেন। কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম। মাখলুকের কোন কালাম এর সমান হতে পারে না। আমরা বলি না যে কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি। আর আমরা মুসলিম জামা'আতের বিরুদ্ধাচরণ করি না।

আহলে কিবলার কেউ কোন গুনাহ করলেই আমরা তাকে কাফির বলি না। যতক্ষণ না সে হালাল মনে করে সে গুনাহয় লিপ্ত হয়।

আর এ কথাও বলি না যে, ঈমান আনয়নের পর কেউ গুনাহ করলে তাতে ঈমানের কোন ক্ষতি হয় না।

মুমিনদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদের জন্য আমরা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ কামনা করি এবং তার রহমতে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর আশা করি। তবে তাদেরকে সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত মনে করি না এবং তাদের জন্য নিশ্চিতরূপে জান্নাতের সাক্ষ্যও প্রদান করি না। আর মুমিনদের মধ্যে যারা গুনাহগার, তাদের জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করি, তাদের উপর আযাবের আশঙ্কা করি। তবে তাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করি না।

আল্লাহর আযাব থেকে নিরাপদ মনে করা এবং তার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া বান্দাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। মুসলিমদের জন্য উভয়ের মাঝখানে অর্থাৎ আল্লাহর আযাবের ভয় এবং তার রহমতের আশা করার মধ্যেই সঠিক পথ।

বান্দাকে যে বিষয় ঈমানে দাখিল করেছে, তা অস্বীকার ব্যতীত সে ঈমান থেকে খারিজ-বের হবে না।

জবানের স্বীকারোক্তি, অন্তরের বিশ্বাস এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আমল করার নাম ঈমান।

শরী'আতের যত বিষয় রসূল ﷺ হতে ছহীহ- বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে তার সবই সত্য।

ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস হয়। আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, কুপ্রবৃত্তি দমন এবং উত্তম আমলের মাধ্যমে মুমিনদের মর্যাদার পার্থক্য হয়।

সকল মুমিনই আল্লাহর ওলী (বন্ধু)। মুমিনদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত হচ্ছে ঐ মুমিন, যে সর্বাধিক অনুগত এবং কুরআনের অনুসরণে সর্বাধিক অগ্রগামী

ঈমান হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, তার রসূলদের প্রতি ঈমান, আখেরাতের প্রতি ঈমান এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ও মিষ্টতা-তিক্ততার প্রতি ঈমান আনয়ন করা।

আমরা ঈমানের সকল বিষয়ের প্রতিই বিশ্বাস করি। রসূলদের মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য করি না। তারা যা নিয়ে এসেছেন, তাতে তাদের সকলকেই বিশ্বাস করি।

উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্য হতে তাওহীদে বিশ্বাসী যেসব লোক কবীরা গুনাহ্য় লিপ্ত হবে, তারা মৃত্যুর পর চিরকাল জাহান্নামে থাকবে না। যদিও তারা তাওবা না করেই মৃত্যুবরণ করে। বিশেষ করে যখন তারা আল্লাহর মারেফাতসহ তার সাথে সাক্ষাত করবে (মৃত্যু বরণ করবে)। তাদের ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুমের আওতায়। তিনি ইচ্ছা করলে তাদের গুনাহসমূহ ঢেকে রাখবেন এবং স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে বলেন: এ ছাড়া অন্যান্য যত গুনাহ হোক না কেন তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন (সূরা আন নিসা ৪:৪৮)। আর তিনি যদি চান, স্বীয় ইনসাফে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে তাকে শাস্তি দিবেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমতে এবং তার অনুগত বান্দাদের শাফা'আতের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। অতঃপর জান্নাতে পাঠাবেন। এটি এ জন্য যে, আল্লাহ তা'আলা তার মারেফতের অধিকারীদের অভিভাবক হয়েছেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদেরকে ঐ সব লোকের মত করেননি, যারা তাকে চিনতে (তার মারেফত হাসিল করতে না পেরে হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং তারা আল্লাহর বেলায়াত অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। হে আল্লাহ! হে ইসলাম ও মুসলিমদের অভিভাবক! তোমার সাথে সাক্ষাত করা পর্যন্ত আমাদেরকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো।

আমরা আহলে কিবলার প্রত্যেক নেককার ও বদকারের পিছনে ছলাত আদায় করা জায়েয মনে করি এবং তাদের মৃতদের উপর জানাযা জ্বলাত পড়া ও তাদের জন্য দু'আ করাকেও বৈধ জানি।

আমরা কোন মানুষের জন্য অকাট্যভাবে জান্নাতের কিংবা জাহান্নামের ফয়সালা প্রদান করি না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কোন মুসলিম থেকে কুফরী, শির্ক কিংবা নিফাকী প্রকাশিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদেরকে কাফির, মুশরিক এবং মুনাফিক বলি না। আর মুসলিমদের অন্তরের গোপন বিষয়কে আল্লাহ তা'আলার কাছেই সোপর্দ করি।

যার উপর অস্ত্র ধরা আবশ্যক হয়েছে, সে ব্যতীত উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্য কোন লোকের উপর আমরা অস্ত্র ধরা বৈধ মনে করি না।

আমরা আমাদের ইমাম ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ও অস্ত্র ধারণ করা বৈধ মনে করি না, যদিও তারা যুলুম করে। তাদের উপর বদদু'আও করি না। তাদের থেকে আমরা আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নেই না। তাদের আনুগত্য করাকে আমরা আল্লাহর আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত ও ফরয মনে করি। যতক্ষণ না তারা পাপ কাজের আদেশ করে। আমরা তাদের সংশোধন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করি।

আমরা সুন্নাহ ও জামা'আতের অনুসরণ করি। জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, দলাদলি করা ও ফির্কাবন্দী হওয়া থেকে দূরে থাকি।

আমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী ও আমানতদারগণকে ভালোবাসি এবং যালেম ও খেয়ানতকারীদেরকে ঘৃণা করি।

যে বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট, সে বিষয়ে আমরা বলি: আল্লাহই এ ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত।

হাদীছের বর্ণনা অনুযায়ী আমরা সফরে বা গৃহে অবস্থানকালে মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ মনে করি।

ভালো-মন্দ সকল মুসলিম শাসকের অধীনে হজ্জ করা ও জিহাদ করা ক্বিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। কোন কিছুই এ দু'টি কাজকে বাতিল বা রহিত করতে পারবে না।

আমরা কিরামুন-কাতিবীন (সম্মানতি লেখকবৃন্দ) ফেরেশতাদ্বয়ের উপর ঈমান রাখি। আল্লাহ তা'আলা তাদরেকে আমাদরে উপর পর্যবেক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করেছেন।

আমরা সৃষ্টিকুলের রূহসমূহ কবয করার দায়িত্বে নিয়োজিত মালাকুল মাউত এর উপরও ঈমান রাখি।

আমরা কবরের আযাবের প্রতিও ঈমান রাখি। আরো বিশ্বাস করি যারা এই আযাবের যোগ্য কেবল তাদেরকেই এই শাস্তি দেয়া হবে। নাকীর-মুনকার ফেরেশতাদ্বয় কবরে যে প্রশ্ন করবেন, তার প্রতিও আমরা ঈমান রাখি। তারা প্রশ্ন করবেন বান্দার রব সম্পর্কে, দীন সম্পর্কে এবং তার নাবী সম্পর্কে। এ বিষয়গুলো রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ওয়াসাল্লাম এবং ছাহাবায়ে কেরাম ( ) হতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে আমরা ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করি।

কবর জান্নাতের বাগিচাসমূহের অন্যতম একটি বাগিচা অথবা তা জাহান্নামের গর্তসমূহের অন্যতম একটি গর্ত।

আমরা পুনরুত্থান, ক্বিয়ামাত দিবসে আমলের প্রতিফল, আল্লাহর সমীপে বান্দার আমলনামা পেশ করা, হিসাব নিকাশ, আমলনামা পাঠ করা, বান্দার আমলের ছাওয়াব ও শাস্তি, পুলছিরাত এবং মীযান- এ সবের উপর ঈমান রাখি।

আমরা আরো ঈমান রাখি যে, জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্বেই সৃষ্ট করা হয়েছে। এ দু'টি কোনো দিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না এবং ক্ষয়প্রাপ্তও হবে না। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত ও জাহান্নামকে অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করার পূর্বে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের জন্য বাসিন্দা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং যাকে ইচ্ছা তার পক্ষ হতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। প্রত্যেকেই সেই কাজ করবে যা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেই সে যাবে।

ভালো ও মন্দ উভয়ই বান্দার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেই শক্তি দ্বারা বান্দা কর্ম সম্পাদন করে এবং যেটি আল্লাহর তাওফীকের অন্তর্ভুক্ত, তা কোন বান্দার গুণ হতে পারে না। সেটি কর্ম বাস্তবায়িত করার সময় বিদ্যমান থাকে। এ প্রকার শক্তি (তাওফীক) কেবল আল্লাহরই গুণ (এটি আল্লাহ তার আনুগত্যশীল বান্দাকেই দিয়ে থাকেন)।
আর যে প্রকার শক্তি ও সামর্থ্য বলতে বান্দার সুস্থতা, কাজ করার শক্তি, সক্ষমতা, আমল করার জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকা বুঝায়, তা কর্ম শুরু করার পূর্বেই বিদ্যমান থাকা জরুরী। এটা বান্দার মধ্যে বিদ্যমান থাকলেই বান্দাকে তাকলীফ করা হয় অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ তার উপর প্রযোজ্য হয়, নতুবা নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“তিনি কারো উপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না” (সূরা আল বাকারা ২:২৮৬)।

আল্লাহর বান্দারা যে সমস্ত কাজ-কর্ম সম্পাদন করে, সেগুলোর স্রষ্টাও আল্লাহ। বান্দা শুধু তা অর্জন করে।

আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের উপর তাদের সামর্থ্যের অধিক দায়িত্বভার ন্যস্ত করেননি। আর আল্লাহ তাদেরকে যা করার শক্তি দিয়েছেন, তারা কেবল তাই করতে সক্ষম। আর এটিই হচ্ছে এর ব্যাখ্যা। অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউ কোনো অন্যায় কর্ম করা হতে বিরত থাকতে পারে না এবং আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউ সৎ কাজ করারও ক্ষমতা রাখে না। তাই আমরা বলি যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সাহায্য ছাড়া আল্লাহর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকার কারো কোন কৌশল, কোন শক্তি এবং কোন ক্রিয়া ফলপ্রসু হয় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার তাওফীক ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করার এবং তার উপর দৃঢ় থাকার কারো কোন সাধ্য নেই।

সৃষ্টির প্রত্যেক জিনিস আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা, তার জ্ঞান, তার ফায়ছালা এবং তার তাক্বদীর অনুসারেই সংঘটিত হয়। তার ইচ্ছা সমস্ত ইচ্ছার উপর জয়লাভ করে এবং তার অভিপ্রায় সমস্ত অভিপ্রায়ের উপর জয়যুক্ত হয়। তার ফয়সালা সৃষ্টির সকল কলা-কৌশলকে পরাভূত করে। আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা তাই করেন। তিনি কখনো কারো উপর অত্যাচার করেন না। তিনি সর্ব প্রকার কলুষতা ও কালিমা হতে পবিত্র এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত। তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। পক্ষান্তরে, বান্দাদের সকলেই তাদের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা আল আম্বিয়া ২১:২৩)।

জীবিত ব্যক্তিদের দু'আ এবং দান খয়রাত দ্বারা মৃত বক্তিরা উপকৃত হয়।

আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের দু'আ কবুল করেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করেন।

আল্লাহ তা'আলা সব কিছুরই মালিক এবং তার মালিক কেউ নয়। মুহূর্তের জন্যও কারো পক্ষে আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি মুহূর্তের জন্য আল্লাহর অমুখাপেক্ষী মনে করবে, সে কাফির হয়ে যাবে এবং লাঞ্ছিত হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রাগান্বিত হন এবং সন্তুষ্ট হন, তবে তার রাগান্বিত হওয়া ও সন্তুষ্ট হওয়া কোনো মাখলুকের রাগান্বিত হওয়া ও সন্তুষ্ট হওয়ার মত নয়।

আর আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর ছাহাবীদেরকে ভালোবাসি। আমরা তাদের কারো ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি করি না এবং তাদের কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি না। যারা ছাহাবীদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদের সমালোচনা করে আমরাও তাদেরকে ঘৃণা করি। আমরা তাদের ভালো কর্মগুলো বর্ণনা করি। ছাহাবীদেরকে ভালোবাসা হচ্ছে দীন, ঈমান ও ইহসান এবং তাদেরকে ঘৃণা করা কুফরী, মুনাফিকী এবং যুলুম ও সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ভুক্ত।

আমরা রসূল ﷺ এর পর সর্বপ্রথম আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের স্বীকৃতি দেই, তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করি এবং তাকে উম্মতের সমস্ত মুসলিমের উপর প্রাধান্য দেই। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খেলাফত সাব্যস্ত করি। অতঃপর উছমান বিন আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খেলাফত সাব্যস্ত করি। অতঃপর আলী বিন আবূ তালেব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খেলাফত সাব্যস্ত করি। তারাই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সুপথগামী খলীফা এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম।

রসূল ﷺ যে দশ জন ছাহাবীর নাম উল্লেখ করে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, তার সাক্ষ্য দেয়ার কারণেই আমরা তাদের জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য প্রদান করি। কারণ তার কথা সত্য ও সঠিক। তারা হলেন: আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী, তালহা, জুবাইর, সা'দ, সাঈদ, আব্দুর রাহমান ইবনে আওফ এবং এ উম্মতের আমানতদার আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।

মুহাম্মাদ ﷺ এর ছাহাবী, কলঙ্ক হতে পূত- পবিত্র তার স্ত্রীগণ, প্রত্যেক কদর্যতা হতে পবিত্র তার সন্তান সন্ততিগণ সম্পর্কে যে ব্যক্তি সর্বোত্তম কথা বলবে, সেই কেবল মুনাফিকী হতে নিষ্কৃতি পাবে।

পূর্বে গত হওয়া পূর্বসুরী সালাফদের মধ্যকার আলেম, তাদের পথ অনুসরণকারী সৎকর্মশীল মুহাদ্দিছ এবং জ্ঞানী, গবেষক ফক্বীহদের যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি। যারা অসম্মানের সাথে তাদেরকে স্মরণ করে, তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত ও বিপথগামী।

আমরা কোনো ওলীকে কোন নাবী আলাইহিমুস সালাম এর উপর প্রাধান্য দেই না; আমরা বলি: মাত্র একজন নাবী সমস্ত ওলী থেকে শ্রেষ্ঠ।

ওলীদের কারামত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের কারামত সম্পর্কে বিশ্বস্ত লোকদের থেকে ছুহীহ সূত্রে বর্ণিত বিষয়ের উপরও আমরা ঈমান রাখি।

আমরা কিয়ামাতের আলামতসমূহ : যেমন দাজ্জালের আবির্ভাব, আসমান হতে ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর অবতরণ, পশ্চিম গগনে সূর্যোদয় এবং দাব্বাতুল আরদ নামক প্রাণীর স্বীয় স্থান হতে বের হওয়া ইত্যাদির প্রতি ঈমান রাখি।

আমরা কোনো গণক ও জ্যোতিষীকে সত্য বলে বিশ্বাস করি না এবং ঐ ব্যক্তিকেও সত্য বলে মনে করি না, যে আল্লাহর কিতাব, নাবী ﷺ এর সুন্নাত ও উম্মতের ইজমার বিপরীত কিছু দাবী করে।

আমরা মুসলিমদের জামা'আতবদ্ধ থাকাকে সত্য ও সঠিক বলে বিশ্বাস করি এবং জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে গোমরাহী ও আযাবের কারণ মনে করি।

নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে আল্লাহর দীন এক ও অভিন্ন। তা হলো ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হচ্ছে ইসলাম (সুরা আলে-ইমরান ৩:১৯)। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, “এবং আমি ইসলামকে তোমাদের দীন হিসাবে মনোনীত করলাম (সূরা আল মায়িদা ৫:৩)।

ইসলামের অবস্থান হলো বাড়াবাড়ি ও বিয়োজনের মাঝখানে, (আল্লাহ তা'আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলি সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে) তাশবীহ তথা সাদৃশ্য স্থাপন ও তাতীল তথা অর্থহীন করার মাঝে তার অবস্থান। (তাক্বদীর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে) জাবর তথা ক্ষমতাহীন বাধ্য কিংবা কাদর তথা তা অস্বীকার করার মাঝে তার অবস্থান। অনুরূপ আল্লাহর রহমতের উপর সম্পূর্ণরূপে ভরসা কিংবা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম মধ্যম পন্থার নীতি অবলম্বন করেছে।

এগুলোই হচ্ছে আমাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য দীন-জীবন ব্যবস্থা ও আক্বীদাহ বা বিশ্বাস। অন্তরে বা প্রকাশ্যে আমরা উপরোক্ত বিষয়গুলোকেই দীন হিসাবে গ্রহণ করি। উপরে যা আমরা উল্লেখ করলাম এবং বর্ণনা করলাম, যারাই তার কোনো কিছুর বিরোধিতা করে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোই সম্পর্ক নেই।
আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল আল্লাহর দিকেই ফিরে যাই। আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং ঈমানের সাথে আমাদের মৃত্যুদান করেন।
আমরা আরো প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে রক্ষা করেন বিভিন্ন প্রকার বিদ'আত, প্রবৃত্তির অনুসরণ, নানা রকম বাতিল মতবাদসমূহ থেকে, যারা সুন্নাত ও জামা'আতের বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং বিভ্রান্তদের পক্ষ নিয়েছে। আমরা তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করছি। আল্লাহর নিকটেই যাবতীয় বিভ্রান্তি হতে নিরাপত্তা এবং সৎপথে চলার তাওফীক কামনা করছি।

Al-Aqsa, Al-Quds, Palestine

Al-Aqsa, Al-Quds, Palestine

আমি তাঁকে ও লূতকে উদ্ধার করে সেই দেশে পৌঁছিয়ে দিলাম, যেখানে আমি বিশ্বের জন্যে কল্যাণ রেখেছি। -আল আম্বিয়া ২১:৭১
.
সুলায়মানের অধীন করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে; তা তাঁর আদেশে প্রবাহিত হত ঐ দেশের দিকে, যেখানে আমি কল্যাণ দান করেছি। আমি সব বিষয়েই সম্যক অবগত রয়েছি। -আল আম্বিয়া ২১:৮১
.
তাদের এবং যেসব জনপদের লোকদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলম সেগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে অনেক দৃশ্যমান জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং সেগুলোতে ভ্রমণ নির্ধারিত করেছিলাম। তোমরা এসব জনপদে রাত্রে ও দিনে নিরাপদে ভ্রমণ কর। -সাবা ৩৪:১৮
.
আর যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকেও আমি উত্তরাধিকার দান করেছি এ ভুখন্ডের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের যাতে আমি বরকত সন্নিহিত রেখেছি এবং পরিপূর্ণ হয়ে গেছে তোমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুত কল্যাণ বনী-ইসরাঈলদের জন্য তাদের ধৈর্য্যধারণের দরুন। আর ধ্বংস করে দিয়েছে সে সবকিছু যা তৈরী করেছিল ফেরাউন ও তার সম্প্রদায় এবং ধ্বংস করেছি যা কিছু তারা সুউচ্চ নির্মাণ করেছিল। -আল আরাফ ৭:১৩৭
.
হে আমার সম্প্রদায়, পবিত্র ভুমিতে প্রবেশ কর, যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্ধারিত করে দিয়েছেন এবং পেছন দিকে প্রত্যাবর্তন করো না। অন্যথায় তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। -আল মায়িদাহ ৫:২১
.
পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। -বনী-ইসরাঈল ১৭:১
.
হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা বা বায়তুল মাকদিস। আমি বললাম, উভয় মসজিদের (তৈরীর) মাঝে কত ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। -বুখারী ৩৩৬৬
.
মসজিদে হারাম (কা‘বা), আমার মাসজিদ (মসজিদে নাববী) এবং মসজিদে আকসা (বাইতুল মাকদিস)- এ তিন মাসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের জন্য সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে না। -বুখারী ১৮৬৪
.
Support Al-Aqsa & Palestine. Stand against Islamophobia & operation against Muslim.

কটূক্তি

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ কোন বান্দা/ ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার নিকট তার পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ ও অন্যান্য লোকদের চাইতে অধিকতর প্রিয় না হবে।
-মুসলিম ৭২
.
(একদা রাসুলুল্লাহ ﷺ) বললেন, কা‘ব ইবনু আশরাফের হত্যা করার জন্য প্রস্তুত আছ কে? কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা (রাঃ) দাঁড়ালেন, এবং বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি চান যে আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হাঁ। তখন মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা (রাঃ) বললেন, তাহলে আমাকে কিছু (কৃত্রিম) কথা বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হ্যাঁ বল। এরপর মুহাম্মদ ইবনু মাসলাম (রাঃ) কা‘ব ইবনু আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) আমাদের কাছে সা’দ্‌কা চায়। এবং আমাদেরকে বহু কষ্টে ফেলেছে। তাই (বাধ্য হয়ে) আমি আপনার নিকট কিছু ঋণের জন্য এসেছি।
কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, আল্লাহর কসম পরে সে তোমাদেরকে আরো বিরক্ত করবে এবং আরো অতিষ্ট করে তুলবে। মুহাম্মদ ইবনু মাসলাম (রাঃ) বললেন, আমরা তো তাঁকে অনুসরণ করছি। পরিণাম ফল কি দাঁড়ায় তা না দেখে এখনই তাঁর সঙ্গ পরিত্যাগ করা ভাল মনে করছিনা। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই।
কা‘ব ইবনু আশবাফ বলল, ধারতো পেয়ে যাবে তবে কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মদ ইবনু মাসলাম (রাঃ) বললেন, কি জিনিস আপনি বন্ধক চান। সে বলল, তোমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখ। মুহাম্মদ ইবনু মাসলাম (রাঃ) বললেন, আপনি আরবের অন্যতম সুশ্রী ব্যাক্তি, আপনার নিকট কি করে, আমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখব আমরা? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের পুত্র সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে আপনার নিকট কি করে বন্ধক রাখি? (কেননা তা যদি করি তাহলে) তাদেরকে এ বলে সমালোচনা করা হবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছে। এটাতো আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর বিষয়। তবে আমরা আপনার নিকট অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি।
অবশেষে তিনি (মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা) তাকে (কা’ব ইবনু আশরাফকে) পুনরায় যাওয়ার ওয়াদা করে চলে আসলেন। এরপর তিনি কা’ব ইবনু আশরাফের দুধ ভাই আবূ নাইলাকে সঙ্গে করে রাতের বেলা তার নিকট গেলেন। কা’ব তাদেরকে দুর্গের মধ্যে ডেকে নিল এবং সে নিজে (উপর তলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হল। এ সময় তার স্ত্রী বলল, এ সময় তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, এইতো মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা এবং আমার ভাই আবূ নাইলা এসেছে (তাদের কাছে যাচ্ছি)। কা’বের স্ত্রী বলল, আমি তো এমনই একটি ডাক শুনতে পাচ্ছি যার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝড়ছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কা’ব ইবনু আশরাফ বলল, মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা এবং দুধ ভাই আবূ নাইলা, (অপরিচিত কোন লোক তো নয়) ভদ্র মানুষকে রাতের বেলা বর্শা বিদ্ধ করার জন্য ডাকলে তার যাওয়া উচিৎ। মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা (রাঃ) সঙ্গে আরো দুই ব্যাক্তি নিয়ে (তথায়) গিয়েছিলেন। (তারা হলেন) আবূ আবস ইবনু জাব্‌র হারীস ইবনু আওস এবং আব্বাদ ইবনু বিশ্‌র। এবং তিনি বলেছিলেন, যখন সে (কা’ব ইবনু আশরাফ) আসবে তখন আমি (কোন বাহানায়) তার চুল ধরে শুঁকতে থাকব। যখন তোমরা আমাকে দেখবে যে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা আঁকড়িয়ে ধরেছি, তখন তোমরা তরবারী দিয়ে তাকে আঘাত করবে। তিনি (মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা) একবার বলেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকেও শুকাব। সে (কা’ব) চাঁদর নিয়ে নিচে নেমে আসলে তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল।
তখন (মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা (রাঃ) বললেন, আজকের মত এতো উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি। কা’ব বলল, আমার নিকট আরবের সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধী ব্যবহারকারী মহিলা আছে। মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা (রাঃ) বললেন, আমাকে আপনার মাথা শুকতে অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হাঁ এরপর তিনি মাথা শুঁকলেন এবং এরপর তার সাথীদেরকে শুঁকালেন। তারপর তিনি পুনরায় বললেন, আমাকে (আরেকবার শুঁকাবার জন্য) অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হাঁ। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা কর। তাঁরা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নাবী ﷺ এর নিকট এসে এ সংবাদ জানালেন।
-বুখারী ৩৭৪২
.
রাসূলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ‌ ইবনু আতীককে আমীর বানিয়ে তার নেতৃত্বে আনসারদের কপিতয় সাহাবীকে ইয়াহুদী আবূ রাফির (হত্যার) উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। আবূ রাফি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে কষ্ট দিত এবং এ ব্যাপারে লোকদের সাহায্য করত। হিজায ভূমিতে তার একটি দুর্গ ছিল। (সে সেখানে বসবাস করত) তারা যখন তার দুর্গের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন তখন সূর্য ডুবে গিয়েছে এবং লোকজন নিজেদের পশু পাল নিয়ে রওয়ানা হয়েছে (নিজ নিজ বাড়ীর দিকে) আবদুল্লাহ (ইবনু আতীক) তার সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের স্থানে বসে থাক। আমি চললাম ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দ্বার রক্ষীর সাথে আমি (কিছু) কৌশল প্রদর্শন করব। এরপর তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছলেন এবং কাপড় দ্বারা নিজেকে এমনভাবে ঢাকলেন যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে রত আছেন। তখন সবাই ভিতরে প্রবেশ করলে দ্বাররক্ষী তাকে ডেকে বলল, হে আবদুল্লাহ‌ ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রবেশ কর। আমি এখনই দরজা বন্ধ করে দেব।
আমি তখন ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং আত্মগোপন করে রইলাম। সকলে ভিতরে প্রবেশ করার পর সে দরজা বন্ধ করে দিল এবং একটি পেরেকের সাথে চাবিটা লটকিয়ে রাখল। (আবদুল্লাহ‌ ইবনুু্‌ আতীক (রাঃ) বলেন) এরপর আমি চাবিটার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং চাবিটা নিয়ে দরজা খুললাম। আবূ রাফির নিকট রাতের বেলা গল্পের আসর জমতো, এ সময় সে তার উপর তলায় কামরায় অবস্থান করছিল। গল্পের আসরে আগত লোকজন চলে গেলে, আমি সিঁড়ি বেয়ে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। এসময় আমি একটি করে দরজা খুলছিলাম এবং ভিতর থেকে তা আবার বন্ধ করে দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাতে লোকজন আমার (আগমন) সম্বন্ধে জানতে পারলেও হত্যা না করা পর্যন্ত আমার নিকট পৌছতে না পারে। আমি তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। এ সময় সে একটি অন্ধকার কক্ষে ছেলেমেয়েদের মাঝে শুয়েছিল। কক্ষের কোন্‌ অংশে সে শুয়ে আছে আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। তাই আবূ রাফি‘ বলে ডাক দিলাম। সে বলল, কে আমাকে ডাকছ? আমি তখন আওয়াজটি লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে তরবারী দ্বারা প্রচন্ড জোরে আঘাত করলাম।
আমি তখন কাঁপছিলাম এ আঘাতে আমি তাকে কিছুই করতে পারলাম না। সে চীৎকার করে উঠলে আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে চলে আসলাম। এরপর পুনরায় ঘরে প্রবেশ করে (কন্ঠস্বর পরিবর্তন করতঃ তার আপন লোকের ন্যায়) জিজ্ঞেস করলাম, আবূ রাফি’ এ আওয়াজ হল কিসের? সে বলল, তোমার মায়ের সর্বনাশ হোক। কিছুক্ষণ পূর্বে ঘরের ভিতর কে যেন আমাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করেছে। আবদুল্লাহ‌ ইবনু ‘আতীক বলেন, তখন আমি আবার তাকে ভীষণ আঘাত করলাম এবং মারাত্মকভাবে ক্ষত বিক্ষত করে ফেললাম। কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারিনি। তাই তরবারির ধারালো দিকটি তার পেটের উপর চেপে ধরলাম এবং পিঠ পার করে দিলাম। এবার আমি নিশ্চিতরূপে অনুভব করলাম যে, এখন আমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছি। এরপর আমি এক এক দরজা খুলে নিচে নামতে শুরু করলাম নামতে নামতে সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলাম। পূর্ণিমার রাত্র ছিল। (চাঁদের আলোতে তাড়াহুড়ার মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পেরে) আমি মনে করলাম, (সিঁড়ির সকল ধাপ অতিক্রম করে) আমি মাটির নিকটে এসে পড়েছি। (কিন্তু তখনও একটি ধাপ অবশিষ্ট ছিল) তাই নিচে পা রাখতেই আমি (আঁছাড় খেয়ে) পড়ে গেলাম। অমনই আমার পায়ের গোছার হাড় ভেঙ্গে গেল।
(তাড়াহুড়া করে) আমি আমার মাথার পাগড়ী দ্বারা পা খানা বেঁধে নিলাম এবং একটু হেঁটে গিয়ে দরজা সোজা বসে রইলাম মনে মনে সিদ্ধান্ত করলাম, তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত অবগত না হয়ে আজ রাতে আমি এখান থেকে যাব না। ভোর রাতে মোরগের ডাক আরম্ভ হলে মৃত্যু ঘোষণাকারী প্রাচীরে উপর উঠে ঘোষণা করল, হিজায অধিবাসীদের অন্যতম ব্যবসায়ী আবূ রাফীর মৃত্যু সংবাদ গ্রহণ কর। তখন আমি আমার সাথীদের নিকট গিয়ে বললাম, দ্রুত চল, আল্লাহ আবূ রাফিকে হত্যা করেছেন। এরপর নাবী ﷺ এর নিকট গেলাম এবং সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, তোমার পা টি লম্বা করে দাও। আমি আমার পা টি লম্বা করে দিলে তিনি উহার উপর স্বীয় হাত বুলিয়ে দিলেন। (এতে আমার পা এমন সুস্থ হয়ে গেল) যেন তাতে কোন আঘাতই পায়নি।
-বুখারী ৩৭৪৪
.
কোন এক অন্ধ ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে নবী করীম ﷺ এর শানে বেয়াদবিসূচক কথাবার্তা বলতো। সে অন্ধ ব্যক্তি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতো, কিন্তু সে তা মানতো না। সে ব্যক্তি তাকে ধমকাতো, তবু সে তা থেকে বিরত হতো না। এমতাবস্থায় এক রাতে যখন সে দাসী নবী ﷺ এর শানে অমর্যাদাকর কথাবার্তা বলতে থাকে, তখন ঐ অন্ধ ব্যক্তি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে, যার ফলে সে দাসী মারা যায়। এ সময় তার এক ছেলে তার পায়ের উপর এসে পড়ে, আর সে যেখানে বসে ছিল, সে স্থানটি রক্তাপ্লুত হয়ে যায়।
পরদিন সকালে এ ব্যাপারে যখন রাসূলুল্লাহ্‌ ﷺ এর নিকট আলোচনা হয়, তখন তিনি সকলকে একত্রিত করে বলেনঃ আমি আল্লাহ্‌র নামে শপথ করে এ ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাই এবং ইহা তার জন্য আমার হক স্বরূপ। তাই, যে ব্যক্তি তাকে হত্যা করেছে, সে যেন দাঁড়িয়ে যায়। সে সময় অন্ধ লোকটি লোকদের সারি ভেদ করে প্রকম্পিত অবস্থায় নবী করীম ﷺ এর সামনে গিয়ে বসে পড়ে এবং বলেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌! আমি তার হন্তা।
সে আপনার সম্পর্কে কটুক্তি ও গালি-গালাজ করতো। আমি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করতাম ও ধমকাতাম। কিন্তু সে তার প্রতি কর্ণপাত করতো না। ঐ দাসী থেকে আমার দু’টি সন্তান আছে, যারা মনি-মুক্তা সদৃশ এবং সেও আমার প্রিয় ছিল। কিন্তু গত রাতে সে যখন পুনরায় আপনার সম্পর্কে কটুক্তি গাল-মন্দ করতে থাকে, তখন আমি আমার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি এবং ছোরা দিয়ে তার পেটে প্রচন্ড আঘাত করে তাকে হত্যা করি। তখন নবী করীম ﷺ বলেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক যে, ঐ দাসীর রক্ত ক্ষতিপূরণের অযোগ্য বা মূল্যহীন।
-আবু দাউদ ৪৩১০
.

মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই অন্য এক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে গেল। একজন মুসলিম- মক্কায় যার উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছিল- কোন ভাবে মুক্ত হয়ে মদীনায় এসে উপস্থিত হল। তাঁর নাম ছিল আবূ বাসীর। তিনি সাক্বীফ গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কুরাইশদের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁকে ফেরত নেয়ার জন্য কুরাইশগণ দু’ ব্যক্তিকে মদীনায় প্রেরণ করে। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলল, ‘আমাদের ও আপনার মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে তা কার্যকর করে আবূ বাসীরকে ফেরত দিন।’

তাদের এ কথার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আবূ বাসীরকে তাদের হস্তে সমর্পণ করে দিলেন। তারা দুজন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করল। পথ চলার এক পর্যায়ে তারা যুল হোলাইফা নামক স্থানে অবতরণ করে খেজুর খেতে লাগল। খাওয়া দাওয়া চলাকালীন অন্তরঙ্গ পরিবেশে আবূ বাসীর একজনকে বলল, ‘ওগো ভাই! আল্লাহর শপথ! তোমার তরবারীখানা আমার নিকট খুবই উকৃষ্ট মনে হচ্ছে। সে ব্যক্তি কোষ থেকে তরবারী খানা বের করে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এ হচ্ছে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একে বার বার পরীক্ষা করে দেখেছি।’

আবূ বাসীর বলল, ‘তরবারীখানা আমার হাতে একবার দাও ভাই, আমিও দেখি।’

সে তার কথা মতো তরবারীখানা তার হাতে দিল। এদিকে তরবারী হাতে পাওয়া মাত্রই আবূ বাসীর তাকে আক্রমণ করে স্ত্তপে পরিণত করে দিল।

দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রাণভয়ে পলায়ন করে মদীনায় এসে উপস্থিত হল এবং দৌঁড় দিয়ে মসজিদে নাবাবীতে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে দেখে বললেন, ‘কী হয়েছে একে এত ভীত দেখাচ্ছে কেন?’

লোকটি নাবী ﷺ এর নিকট অগ্রসর হয়ে বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমাকেও হত্যা করা হবে।’ এ সময় আবূ বাসির সেখানে এসে উপস্থিত হল এবং বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আল্লাহ আপনার অঙ্গীকার পূরণ করে দিয়েছেন। আপনি আমাকে তাদের হস্তে সমর্পণ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ আমাকে তাঁদের নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘তার মাতা ধ্বংস হোক , এ কোন সঙ্গী পেলে যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করবে।’

নাবী কারীম ﷺ এর এ কথা শুনে আবূ বাসীর বুঝে নিলেন যে, পুনরায় তাকে কাফিরদের হস্তেই সমর্পণ করা হবে। কাজেই , কালবিলম্ব না করে তিনি মদীনা থেকে বের হয়ে সমুদ্রোপকূল অভিমুখে অগ্রসর হলেন।

এদিকে আবূ জান্দাল বিন সোহাইলও কোন ভাবে মুক্ত হয়ে মক্কা হতে পলায়ন করেন এবং আবূ বাসীরের সঙ্গে মিলিত হন। এরপর থেকে কুরাইশদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে মক্কা থেকে পলায়ন করে গিয়ে আবূ বাসীরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হতেন। এভাবে একত্রিত হয়ে তারা একটি সুসংগঠিত দলে পরিণত হয়ে যান।

এরপর থেকে শাম দেশে গমনাগমনকারী কোন কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলার খোঁজ খবর পেলেই তাঁরা তাদের উপর চড়াও হয়ে লোকজনদের মারধোর করতেন এবং ধনমাল যা পেতেন তা লুটপাট করে নিয়ে যেতেন। বার বার প্রহৃত এবং লুণ্ঠিত হওয়ার ফলে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে অবশেষে কুরাইশগণ নাবী কারীম ﷺ এর নিকট এসে আল্লাহ এবং আত্মীয়তার মধ্যস্থতার বরাত দিয়ে এ প্রস্তাব পেশ করেন যে তিনি যেন তাঁদেরকে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে নিয়ে আসেন। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম ﷺ তাঁদেরকে মদীনায় আগমনের জন্য আহবান জানালে তাঁরা মদীনায় চলে আসেন। কুরাইশরা আরও প্রস্তাব করে যে, যে সকল মুসলিম মক্কা থেকে মদীনা চলে যাবে তাদের আর ফেরত চাওয়া হবে না।’’

আর-রাহীকুল মাখতূম

.

আলকাউসার