ওমরা
দু’হাত উঁচিয়ে বাইতুল্লাহর দুয়ারের চৌকাঠ ধরলাম । মুলতাযামে বুক লাগালাম।
আল্লাহর পেয়ারা হাবীব (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইবরাহীমের নিকটে দু’রাকাত নামায পড়েছেন। এ দু’রাকাত উম্মতের উপর ওয়াজিব করা হয়েছে!
.
আমি সিঁড়ি বেয়ে নামলাম যামযামের কূপ দেখলাম এবং পান করলাম। হে আল্লাহ, তোমার হাবীব বলেছেন, যে মাকছুদে এবং যে উদ্দেশ্যে যামযামের পানি পান করা হবে তুমি তা পূর্ণ করবে।
.
আমি দাঁড়ালাম ছাফা পাহাড়ে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে। দেখতে পেলাম কালো গিলাফের সামান্য আভাস। এখন দু’আ কবুলের মুহূর্ত, এখন তুমি যা চাবে তাই পাবে!
.
মারওয়ায় এসে সাঈ শেষ হলো।
.
আলহামদু লিল্লাহ! তাওয়াফ ও সাঈর মাধ্যমে আমার ওমরা সম্পূর্ণ হলো।
মারওয়ার পিছনে আল্লাহর বান্দারা দাঁড়িয়ে ছিলো ক্ষুর-কাঁচি হাতে ছেঁটে বা কামিয়ে দেবার জন্য।
.
.
.
হজ্ব
আমার ঘরের এবং মিম্বরের মাঝে যা, তা জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচা।
.
মদীনা শরীফ থেকে কোবার মসজিদে যেতে পায়ে হেঁটে চল্লিশ মিনিট লাগে। কোবা হচ্ছে নবীজীর মক্কা হতে মদীনায় হিজরতের প্রবেশপথ। মদীনায় প্রবেশ করার পূর্বে তিনি চৌদ্দ দিন কোবায় অবস্থান করেছিলেন। কোবার মসজিদই হলো আল্লাহর নবীর হাতে তৈরী প্রথম মসজিদ। কোবার মসজিদ ও তার জনপদের সঙ্গে আমাদের নবীজীর ছিলো অত্যন্ত মুহাব্বাতের সম্পর্ক। মাঝে মাঝে তিনি মদীনা থেকে কোবায় আসতেন, কখনো সওয়ারিতে, কখনো পায়দাল। এ কারণেই আল্লাহর বান্দাগণ মদীনা যিয়ারাতের সময় কোবার মসজিদে হাযির হন এবং দু’রাকাত নফল আদায় করেন।
.
এরপর দুই কিবলার মসজিদ। এখানে দু’রাকাত নামায পড়ার আগে হযরত কিছু কথা বললেন। খোলাছা হলো
‘এখানে আসা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে নিষেধও নয়। কিন্তু উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে যে, কেন আমরা এই মসিজদে আসি? কী শিক্ষা এখান থেকে আমরা নিতে চাই? প্রথম কেবলার চিহ্নিত স্থানটি দেখিয়ে হযরত বললেন, ‘তখন বাইতুল মুকাদ্দাস ছিলো মুসলমানদের কিবলা । ছাহাবা কেরাম এখানে ইমামের পিছনে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে নামায আদায় করছিলেন। সে অবস্থায় কিবলা পরিবর্তনের আয়াত নাযিল হওয়ার খবর এসে পৌঁছলো। বলা হলো, বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে বাইতুল্লাহকে কিবলারূপে গ্রহণ করো। এরপর কোন প্রশ্ন নয়, নয় কোন দ্বিধা-সংশয়। নামাযের মাঝেই তাঁরা কিবলা পরিবর্তন করলেন এবং বাকি নামায কাবামুখী হয়ে আদায় করলেন। আর কিছু নয়, শুধু আল্লাহর নবীর দূত এসে খবর দিয়েছেন। এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের সামনে পূর্ণ তাসলীম, সেই স্মৃতিকে স্মরণ করার জন্যই এখানে আমাদের আসা। যিন্দেগির সকল ক্ষেত্রে ইতা’আত ও আনুগত্যের এই জায়বা এখান থেকে আমরা নিতে চাই। ’
মোটামুটি এই ছিলো হযরতের বক্তব্য। এরপর আমরা দু’রাকাত নামায পড়লাম, মুনাজাত করলাম এবং নতুন এক প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে অহুদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
এখানে এবং কোবার মসজিদে বিশাল খেজুর বাগান ছিলো, ছায়াঘেরা বড় শান্ত পরিবেশ ছিলো। মদীনার খেজুর বাগানের প্রতি কবির কবিতায় উচ্ছ্বাস দেখেছি। সেই কবিতা আবৃত্তি করে নিজেও উচ্ছ্বসিত হয়েছি, কিন্তু ছায়াঘেরা খেজুর বাগান যে মনকে এমনভাবে টানে, হৃদয়কে এভাবে বিগলিত করে তা আমার জানা ছিলো না! মন চাইছিলো, খেজুর বাগানের শীতল ছায়ায় কিছুক্ষণ বসি। কে জানে, আর কখনো আসা হবে কি না এখানে, এই খেজুর বাগানের সান্নিধ্যে! কিন্তু সময় ও সুযোগ ছিলো নিয়ন্ত্রিত, তাই মনের ইচ্ছাকে মনেই ‘কবর’ দিয়ে রওয়ানা হলাম হযরতের সঙ্গে। এরকম অনেক কবর আছে আমার মনের মাটিতে।
অহুদ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গাড়ী থামলো। হযরত গাড়ী থেকে নামলেন। এখন এখানে জনপদ গড়ে উঠেছে; তখন জনবসতি ছিলো না। ছিলো শুধু অহুদ পর্বত এবং অহুদ প্রান্তর; সেই প্রান্তর, যেখানে যুদ্ধের সাজে আল্লাহর নবী হাযির হয়েছিলেন সাতশ জানবাষ ছাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে। কেন? শিরক ও কুফুরির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, দুনিয়াতে আল্লাহর দ্বীনকে কেয়ামত পর্যন্ত যিন্দা রাখার জন্য। আজ চৌদ্দশ
.
অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য রকম এক মানুষ হয়ে অহুদের ময়দান থেকে আমরা রওয়ানা হলাম হযরতের সঙ্গে। সাত মসজিদের সামনে গাড়ী থামলো কিছু সময়ের জন্য। গাযওয়াতুল খান্দাকের স্মৃতি বিজড়িত এসকল মসজিদ! কঠিন এক দুর্যোগ নেমে এসেছিলো তখন মদীনায় আল্লাহর নবী ও তাঁর ছাহাবাদের উপর। আরবের গোত্রসকল একত্র হয়েছিলো এবং দশ হাজারের বিশাল বাহিনী মদীনা ঘেরাও
.
পরিখাখননকালে ছাহাবা কেরামের বিভিন্ন অবস্থানের স্মৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে এ মসজিদগুলো তৈরী হয়েছিলো। একটু উঁচু স্থানে ছোট ছোট মসজিদ, যেন নূরের আলাদা আলাদা টুকরো! হৃদয় এক অপার্থিব অনুভূতিতে সিক্ত হলো। এখানে অল্প
কিছুক্ষণ অবস্থান করে হযরতের সঙ্গে আমরা মদীনায় ফিরে এলাম।
.
এই অনুরাগ-অনুভূতি। হযরতের অনুমতি নিয়ে বের হলাম। শহর পার হয়ে সুপ্রশস্ত সড়কে গাড়ী যেন হাওয়ায় ভেসে চললো। এটা ছিলো মদীনার নিম্ন এলাকা। কিছু দূর পরপর বড় বড় খেজুর বাগান। অল্প কিছু তাঁবু, খেজুর পাতার ছাউনী, দু’চারটে কাঁচা ঘর; এই হলো মদীনার গ্রাম। পরিবেশের এই শান্ত নির্জনতা এবং জীবনের এই অনাড়ম্বর ছবিই বলে দেয়, এখানে যারা বাস করে তারা কত সহজ সরল হতে পারে! ত্রিশ চল্লিশ কিলোমিটার দূরে একটি বড় গ্রামে গাড়ী থামলো। সফরসঙ্গী বললেন, এ গ্রামে আমার পরিচিত একটি পরিবার আছে। এদের আন্তরিকতা মনে রাখার মত। মরুভূমির মুক্ত নির্মল আবহাওয়া। মূল সড়ক থেকে বেশ কিছু দূর বালুর উপর দিয়ে এসেছে আমাদের গাড়ী। নরম বালুর উপর গাড়ীর চলা বড় অদ্ভুত! চাকা দেবে দেবে যায়, আগে যেন বাড়তেই চায় না। সেখান থেকে মূল সড়কের ধাবমান গাড়ীগুলো শুধু দেখা যায়; আসছে, যাচ্ছে। এখান থেকে আওয়ায শোনা যায় না। আধুনিক জীবনের সঙ্গে সংযোগ বলতে ঐ অতটুকুই। দূর থেকে গাড়ীর নিঃশব্দ ছুটে চলা দেখতে পাওয়া! দূর অতীতের একটুকরো জীবন যেন তুলে এনে রাখা হয়েছে আমার চোখের সামনে! খেজুরবাগানের শান্ত-শীতল ছায়া আমাকে যেন সেই দূর অতীতেরই ছায়া দান করলো! একটা কূপ দেখলাম; সামান্য সামান্য পানি তোলা যায় তা থেকে।
.
রাওযাতুল জান্নায় বসার নছীব আবার হয় কি না হয়, যিয়ারাতের পর তাই রাওযাতুল জান্নায় প্রবেশ করলাম। তাহাজ্জুদ আদায় করে কিছুক্ষণ তিলাওয়াত করলাম। তারপর প্রাণভরে সবকিছু দেখলাম। উসতুওয়ানা আয়েশা, উসতুওয়ানা আবু লোবাবা উসতুওয়ানা হান্নানা এবং উসতুওয়ানাতুল অফুদ, একে একে প্রতিটির উপর কোমল
.
আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মাঝখানে যা আছে তা জান্নাতের বাগান!
রাহমানের রাহীমানা শান ভেবে কূলকিনারা পাই না। দুনিয়াতেই জান্নাতের বাগিচা কেন সাজালেন তিনি! বান্দার প্রতি এত দয়া! এত মায়া! বিশাল কোন আয়তন নয় জান্নাতের এ বাগিচা! মাত্র কয়েক গজের ছোট্ট একটি খণ্ড! কিন্তু আল্লাহর এমন একজন বান্দা তুমি খুঁজে পাবে না, যিনি দরবারে মদীনায় এসেছেন, অথচ জান্নাতের বাগিচায় প্রবেশের এবং অন্তত দু’রাকাত নামায আদায়ের সৌভাগ্য তার জুটেনি! লক্ষ লক্ষ আশিক বান্দা আসেন এবং ঐ একটুকরো জান্নাতের বাগিচায় প্রবেশ করেন।
.
মদীনার পথে যারা হজ্বের সফর করেন তাদের মীকাত হলো যুলহোলায়ফা। মদীনা থেকে এর দূরত্ব সাত আট মাইল। আল্লাহর পেয়ারা হাবীব ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবা কেরামকে নিয়ে বিদায় হজ্বের ইহরাম যুলহোলায়ফা থেকেই করেছিলেন।
.
দেখতে দেখতে যুলহোলায়ফার মীকাত এসে গেলো। এখন এটি বীরে আলী নামে পরিচিত। বাংলাদেশের হাজীদের ধারণা, এটি হযরত আলী (রা)-এর কূপ। এখানে এসে তারা সেই কুয়া তালাশ করে এবং না পেয়ে হতাশ হয়। প্রথম কথা, এখানে একসময় যে কুয়াটি ছিলো এখন তার অস্তিত্ব নেই। কালের করাল গ্রাসে অনেক কিছু হারিয়ে যায়; সময়ের স্রোতে অনেক কিছু ভেসে যায়। মদীনা শরীফে পূর্বযুগের অনেক কুয়া এখন নেই; নেই অনেক প্রসিদ্ধ খেজুরবাগানের অস্তিত্ব। তের শতকের বিখ্যাত কিতাব ‘আখবারুল ওয়াফা’-এর পাতায় পাতায় মদীনার যে চিত্র পাওয়া যায়, যে চিহ্ন ও স্মৃতিচিহ্নের উল্লেখ দেখা যায় তার কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। সেই নুরানি যুগের সাক্ষী হয়ে অটল অবিচল আছে শুধু পাহাড়-পর্বতগুলো। তাও বা সময়ের থাবা থেকে রক্ষা পেলো কোথায়! প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এখানেও সমানে চলছে পাহাড় কর্তন।
তো বলছিলাম, বীরে আলীর কোন অস্তিত্ব এখন এখানে নেই। দ্বিতীয়ত যা ছিলো সেটি হযরত আলী (রা)-এর কুয়া নয়, বরং অনেক পরের যুগে আলী নামের অন্য কোন ব্যক্তির কুয়া।
.
ইহরামের লিবাস পরা দ্বারাই মানুষ মুহরিম হয়ে যায় না। ইহরাম শুরু হয় দু’রাকাত নামাযের পর ইহরামের নিয়তে তালবিয়া পড়া দ্বারা।
.
ছয় সাত ঘন্টায় ইনশাআল্লাহ আমরা পৌঁছাব মক্কা শরীফে। দুদিনের বেশি লেগে যেতো বাসের সফরে, আর উটের সফর ছিল নয় দশ দিনের।
.
হযরত বললেন, ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুল হোলায়ফা থেকে রওয়ানা হয়ে রওহা নামক স্থানে মনযিল করলেন। মদীনা থেকে রওহা দুই রাত্রির দূরত্ব। এখনো তা রওহা নামেই পরিচিত। আমার প্রথম সফরের সময়ও উটের কাফেলা রওহায় মনযিল করতো। পরে আর সেখানে মনযিল হতো না।
মদীনা থেকে রওয়ানা হওয়ার পর এটা ছিলো নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় মনযিল । ’
আমি আরয করলাম, হযরত! নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পথে সফর করেছেন এবং যেখানে যেখানে মানযিল করেছেন, এখনো যদি সে পথেই সফর হতো এবং মানযিলে মানযিলে কিছুক্ষণ গাড়ী থামতো তাহলে কি ভালো হতো না? এযুগের মুরদা সফরগুলো সেই সফরের অনুকরণের বরকতে কিছুটা কি জানদার হতো না?
তিনি বললেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং তাতেই কল্যাণ। তারপর তিনি বললেন, রওহা উপত্যকায় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়েছেন এবং ইরশাদ করেছেন, আমার আগে সত্তরজন নবী এখানে নামায পড়েছেন।
স্থূল চোখে যদিও রওহার সেই পবিত্র উপত্যকা আমার দেখা হলো না, কিন্তু কল্পনার দৃষ্টিকে বাধা দেবে কে? কল্পনার চোখে তো আমি দেখতে পেলাম সেই উপত্যকায় সেই নূরানী কাফেলার মানযিল এবং আমার হৃদয়-মন আপ্লুত হলো অভূতপূর্ব এক অনুভবে!
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৃতীয় মানযিল ছিলো আলআছায়া। মদীনা থেকে এর দূরত্ব সাতাত্তর মাইল। চতুর্থ মানযিল ছিলো আলআরজ। এর দূরত্ব নব্বই মাইলের কিছু বেশী। হযরত বললেন, প্রত্যেক মানযিলে অবতরণের পর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
কাফেলার সকলের খোঁজ-খবর নিতেন এবং বিভিন্ন কাজ সকলের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। তিনি নিজেও ছাহাবা কেরামের সঙ্গে কাজে শরীক হতেন। এটা ছিলো তাঁর সারা জীবনের আদত শরীফ।
.
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের পঞ্চম মানবিল ছিলো আবওয়া। যত দিন উটের সফর ছিলো তত দিন আবওয়া ছিলো হজ্বের কাফেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মানযিল।
এবারও আমি কল্পনার চোখে দেখতে পেলাম আবওয়ার উপত্যকা এবং সেই নূরানী কাফেলার রাতের মানযিল। আমি দেখতে পেলাম আকাশে তারাদের ঝিলিমিলি, মরুপ্রান্তরে শত শত মশালের আলোকসজ্জা। আকাশ ও পৃথিবী সেখানে যেন একসাথে আলোকিত হয়েছিলো। আর
আমাদের নবীজী শৈশবে মা আমেনার সঙ্গে মদীনায় এসেছিলেন। মদীনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে আবওয়ার বালুভূমিতেই মা আমেনা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এখানে এই বালুভূমিতেই তাঁর কবর হয়েছিলো। পরে একসফরে আবওয়ার বালুভূমি অতিক্রমকালে পেয়ারা নবী মা আমেনার কবর যিয়ারত করেছিলেন। তাঁর চোখের পানিতে সিক্ত হয়েছিলো মায়ের কবর।
বিদায় হজ্বের সফরেও হয়ত নবীজী মা আমেনার কবর যিয়ারত করেছিলেন, কিতাবের বর্ণনায় যদিও তার উল্লেখ নেই। হযরতকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার প্রথম হজ্বের সফরে কি আবওয়ায় মা আমেনার কবরের চিত্র ছিলো? হযরত বললেন, না, কোন চিহ্ন ছিলো না।
হযরত বললেন, হাফিয ইবনুল কাইয়িম (রহ)-এর বর্ণনামতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ষষ্ঠ মানযিল ছিলো ওয়াদি উসফান, আর বুখারীর বর্ণনামতে মাররুয্
যাহরান।
উসফান উপত্যকা অতিক্রমকালে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর (রা)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু বকর! এটি কোন্ উপত্যকা? তিনি আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি উসফান উপত্যকা। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর নবী হুদ ও ছালিহ আলাইহিমাস সালাম দু’টি লাল উটে সওয়ার হয়ে এ উপত্যকা অতিক্রম করেছেন। তাঁরা বাইতুল্লাহর হজ্বের নিয়তে তালবিয়া পড়ছিলেন।
হযরতের পাক যবানে এ বয়ান শুনে আমার অন্তরে অভূতপূর্ব এক ভাবের উদয় হলো। উসফান উপত্যকা কত দূর কে জানে? হে ওয়াদি উসফান! তোমাকে সালাম! আমার পেয়ারা নবীর সেই পবিত্র সফরের প্রতিটি মানযিলকে সালাম!
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরবর্তী মানযিল ছিলো সারিফ। মক্কা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ছয় মাইল। সারিফের বিস্ময়কর ঘটনা এই যে, ওমরাতুল কাযা-এর সফরে এখানেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মায়মূনা (রা)-কে বিবাহ করেছেন এবং ওমরা শেষে ফেরার পথে এখানেই একটি গাছের নীচে তাবুতে হযরত মায়মূনা (রা)-এর সঙ্গে বাসর যাপন করেছেন। বহু বছর পর সারিফেই হযরত মায়মুনা রাঃ মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং সেই গাছের নিচেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিলো। ৫১ হিজরীতে উম্মুল মুমিনীনদের মাঝে তিনিই সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করেছেন।
হযরত বললেন, প্রথম হজ্বের সফরে আমি সারিফে এসেছিলাম। সেখানে তখন ছোট একটি মসজিদ ছিলো এবং লোকেরা বলতো, মসজিদটির অবস্থান হযরত মায়মূনা (রা) এর কবরের পাশেই; তবে কবরের কোন আলামত তখন সেখানে ছিলো না।
আমাদের গাড়া ছুটে চলেছে মক্কার পথে। কত দূরত্ব দু’টি কাফেলার মাঝে! কত ভিন্নতা দু’টি সফরের মাঝে! দূরত্ব সময়ের এবং সম্পর্কের! ভিন্নতা পবিত্রতার এবং শুভ্রতার! তবু তো আছে একটি নৈকট্য! একটি অভিন্নতা! লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের নৈকট্য এবং লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকের অভিন্নতা! এটা ভাবলে অন্তরের গভীরে কিছুটা তো সান্ত্বনা আসে! আশা ও আশ্বাসের একটুখানি পরশ তো লাগে!
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ মানযিল ছিলো মক্কার নিম্নভূমিতে, মক্কা ও তানঈমের মধ্যবর্তী স্থান যী-তোয়ায়। নবীজী এখানে রাত্রিযাপন করেছেন, ফজর আদায় করেছেন এবং গোসল করেছেন।
হযরত বললেন, মক্কায় প্রবেশ করার আগে গোসল করা মুস্তাহাব, যদি সম্ভব না হয় তাহলে অযু করে নেয়াও যথেষ্ট।
হযরত বললেন, সেদিন ছিলো রোববার। আল-আযরাক উপত্যকা হয়ে মক্কার ঊর্ধ্বভূমির দিক দিয়ে দিনের বেলা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা শরীফে প্রবেশ করেছিলেন। আল-আযরাক উপত্যকা অতিক্রম করার সময় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি মূসাকে দেখতে পাচ্ছি যে, তিনি উচ্চ স্বরে তালবিয়া পড়ে চলেছেন।
বুখারী শরীফে এ হাদীছ পড়েছি,
.
সওয়ারু থেকে নামার সময় এবং সওয়ারিতে ওঠার সময় উচ্চ স্বরে তালবিয়া পড়া সুন্নত!
.
হে আল্লাহ! তুমি এই ঘরের মর্যাদা ও মহিমা এবং সম্মান ও সমীহ বৃদ্ধি করে দাও। যারা হজ্ব করে, ওমরা করে এবং এই ঘরকে তা’যীম ও সম্মান করে তাদেরও ইয্যত, সম্মান, মর্যাদা ও ছাওয়াব বাড়িয়ে দাও। হে আল্লাহ তুমিই তো ‘সালাম’; শান্তি তো তোমারই পক্ষ হতে বর্ষিত। সুতরাং হে আমাদের রাব্ব! আমাদেরকে সুখে-শান্তিতে জীবিত রাখুন।
কা’বা শরীফ দেখার সময় এই দু’আ পড়া সুন্নত! আল্লাহর ঘরের ইয্যত ও মর্যাদা তো আমার-তোমার দু’আর মুহতাজ নয়; এ তো শুধু বান্দাকে নতুন কিছু দান করার বাহানা! এ সময় দু’আ কবুল হওয়ার খোশখবরি এসেছে ছহীহ হাদীছে। আমি প্রাণভরে দু’আ করলাম ঘরের মালিকের দরবারে। দু’আর সঙ্গে কবুলিয়াতের আশাও হলো অন্তরে। হযরত হাকীমুল উম্মত থানবী (রহ) লিখেছেন, দু’আ করার সময় কবুলিয়াতের আশা হওয়া দু’আ কবুল হওয়ারই আলামত।
হযরত ধীরে ধীরে নেমে এলেন তাওয়াফের চত্বরে।
.
হযরতকে অনুসরণ করে আমরা নেমে এলাম মাতাফে। পুরো মাতাফ তখন তরঙ্গময় এক জনসমুদ্র! বাইতুল্লাহর কাছে গিয়ে হাজারে আসওয়াদ চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করার কথা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। হযরত তাই হাজারে আসওয়াদের বরাবর হয়ে সেদিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তারপর দু’হাত তুলে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তালু দ্বারা হাজারে আসওয়াদের দিকে ইশারা করলেন এবং হাতের তালুতে চুমু খেলেন। তারপর তাওয়াফ শুরু করলেন।
.
হযরতকে অনুসরণ করে আমরাও তাওয়াফ শুরু করলাম। বাইতুল্লাহর দিকে না তাকিয়ে নযর নীচে রাখা হলো তাওয়াফের আদব।
.
হযরত ইফরাদ হজ্বের ইহরাম করেছেন, আমরাও। সে হিসাবে এটা ছিলো শুধু তাওয়াফে কুদূম, যার পরে সা’ঈ নেই। সুতরাং এর শুরুতে রামাল ও ইযতিবা নেই। তবে তাওয়াফে যিয়ারাতের পরবর্তী সা’ঈ যদি এখন করে নেয়া হয় তাহলে এখানে রামাল ও ইযতিবা করতে হবে। আমরা তাওয়াফে যিয়ারাতের পরবর্তী সা’ঈ এখনই করে ফেলবো, তাই তাওয়াফের প্রথম তিনচক্করে রামাল ও ইযতিবা করলাম। তাওয়াফে যিয়ারাতের সময় যে প্রচণ্ড ভিড় হয় সেদিক থেকে এখন সা’ঈ করে নেয়া তুলনামূলক সহজ, বিশেষত মাযূর ও দুর্বলদের জন্য।
.
নয় তারিখের রাত মিনায় যাপন করা সুন্নত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের আট তারিখ বৃহস্পতিবার ফজরের নামায মক্কায় পড়ে এশরাকের পর মিনায় রওয়ানা হয়েছেন এবং মিনায় রাত যাপন করেছেন। আর আরাফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন শুক্রবার ফজরের নামায আদায় করে সূর্যোদয়ের পর। সুতরাং মিনায় পাঁচওয়াক্ত নামায আদায় করা হলো সুন্নত।
.
নয় তারিখের ফজর থেকে তালবিয়ার সঙ্গে শুরু হয়েছে তাকবীরে তাশরীক। এটা চলবে তের তারিখের আছর পর্যন্ত।
.
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিলো মসজিদে নামিরার তিনি সেখানে গোছল করেছিলেন এবং … !
.
যিলহজ্বের নয় তারিখে যাওয়ালের পর মুহরিম অবস্থায় আরাফার হাযিরি হলো হজ্বের মূল রোকন। কোন কারণে এটা যদি ফণ্ডত হয়ে যায় তাহলে হজ্বই ফণ্ডত হয়ে গেলো।
.
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, আরাফার ময়দানে তিনি দু’আ করছেন. উভয় হাত বুক পর্যন্ত তলে রেখেছেন যেন এক ভখা মিসকীন!
.
জাবালে রাহমাত পাহাড়ের পাদদেশেই আজকের এই দিনে ছাহাবা কেরাম জমায়েত হয়েছিলেন এবং আল্লাহর নবী বিদায় হজ্বের অকূফ করেছিলেন।
.
যখন সূর্য ঢলে পড়লো তখন তিনি রওয়ানা হলেন। বাতনুল ওয়াদিতে উপস্থিত হয়ে। উটনীর উপর সওয়ার অবস্থায় লোকদের উদ্দেশ্যে এক মহান খোতবা দান করলেন। তারপর বিলালকে আদেশ করলেন, আর বিলাল আযান দিলেন। অনন্তর তিনি দু’রাকাত যোহর এবং দু’রাকাত আছর আদায় করলেন। একত্রিত উভয় নামায থেকে ফারিগ হয়ে তিনি কাছওয়া উটনীতে আরোহণ করলেন এবং মাওকিফে তাশরীফ আনলেন কিবলামুখী হয়ে অকূফ করলেন। তাঁর মাওকিফ বা অবস্থানক্ষেত্র ছিলো জাবালে রাহমাতের পাদদেশে প্রস্তরখন্ডগুলোর নিকটে। অকূফের সময় তিনি দু’আ- মুনাজাতে ও রোনাযারিতে নিমগ্ন ছিলেন।
.
আল্লাহর নবী সেদিন তাঁর উম্মতের সমস্ত গোনাহের জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাতের দু’আ করেছেন এবং তা কবুল করেছেন, কিন্তু যালিমের জন্য মাগফিরাতের দু’আ কবুল করেননি। কেউ যদি কারো উপর যুলুম করে, কেউ যদি কারো হক নষ্ট করে, তা মাফ হবে না যতক্ষণ না মাযলূম নিজে তা মাফ করে দেয়।
.
মুযদালিফার রাতে আল্লাহর নবী আবার দু’আ করলেন। আল্লাহর কাছে তিনি এই বলে আব্দার জানালেন, আয় রাব্ব, আপনি তো মাযলূমকে আপনার পক্ষ হতে খুশী করে যালিমকে মাফ করে দিতে পারেন! উম্মতের জন্য পেয়ারা হাবীবের কত পেয়ারা আবদার! এমনকি যালিম উম্মতির জন্যও ছিলো তাঁর কত দরদ-ব্যথা!
অবশেষে আল্লাহ তা’আলা তাঁর পেয়ারা হাবীবের এ দু’আও কবুল করলেন এবং বললেন, আপনি শান্ত হোন হে নবী! আপনি আনন্দিত হোন হে রাসূল! আপনার উম্মতের যালিমকেও আমি মাফ করে দেবো (যদি সে অনুতপ্ত হয়ে মাফ চায়), আর মাযলূমকে আমি নিজের পক্ষ হতে খুশী করে দেবো।
.
সূর্য যখন পূর্ণ অস্ত গেলো, হযরত তখন গাড়ীতে আরোহণ করলেন। যদিও গাড়ীর চালক তাড়াহুড়া করছিলো, কিন্তু হযরত সূর্যাস্তের পর রওয়ানা দেয়ার বিষয়ে অবিচল।
.
একসময় বাস যেখানে এসে আটকা পড়লো তার একটু সামনে মসজিদে নামিরা। এর কিছু অংশ মাওকিফের অন্তর্ভুক্ত, আর কিছু অংশ বাতনে ওরায়নার অন্তর্ভুক্ত, যা মাওকিফ নয়। শুনেছি মসজিদের ভিতরে মেঝেতে লাল দাগ দিয়ে মাওকিফবহির্ভূত অংশকে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। দুপুরে দূর থেকে মসজিদের মিনার দেখেছি, জামাতে শরীক হওয়ার তাওফীক হয়নি। হজ্বের ইমাম এই মসজিদে যোহরের সময় যোহর ও আছর একত্রে পড়ান, তারপর হজ্বের গুরুত্বপূর্ণ খোতবা দান করেন। এখানেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাদিবসের ঐতিহাসিক খোতবা দান করেছেন, যা বিদায় হজ্বের ভাষণ নামে পরিচিত।
.
মিনা থেকে মুযদালিফা হয়ে আরাফায় যেতে হয়। আরাফা থেকে ফেরার পথে মুযদালিফায় রাত যাপন করে ভোরে মিনায় ফিরে আসতে হয়। মক্কা থেকে যিনা এবং (মুযদালিফা পার হয়ে) আরাফা; আবার আরাফা থেকে মুযদালিফা, মিনা ও মক্কা; এই হলো হজ্বের সফর। মক্কা থেকে মিনা তিন মাইল, মিনা থেকে আরাফা ছয় মাইল। সুতরাং মক্কা থেকে আরাফার দূরত্ব নয় মাইল।
আবু হানীফা (রহ)-এর মাযহাবে মুযদালিফায় রাত যাপন করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ, পক্ষান্তরে ফজরের পরে এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে অবস্থান করা হলো ওয়াজিব। অর্থাৎ মুযদালিফায় রাত যাপন এবং ফজরের পর অবস্থান গ্রহণ, দু’টো সম্পূর্ণ আলাদা আমল। যারা ফজরের আগেই মুযদালিফা থেকে বের হয়ে যায় তারা হজ্বের একটি ওয়াজিব তরক করে, সুতরাং তাদেরকে ওয়াজিব তরকের ক্ষতিপূরণরূপে দম দিতে হবে।
আরেকটি বিষয়, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের ‘দুর্বলদের’কে চাঁদ অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিনায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তারা ভিড়ের কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে এবং আগেভাগে রামী করে ফেলতে পারে। তবে তিনি তাদেরকে সূর্যোদয়ের পরে রামী করার আদেশ করেছিলেন। এদের মাঝে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা, উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা (রা) এবং বালক আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)।
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাসকে বললেন, ‘আপনি আমাদের দুর্বলদের এবং আমাদের নারীদের নিয়ে চলে যান; তারা যেন মিনায় ফজর পড়ে।
নারী, বালক ও অক্ষম বৃদ্ধরাই হলো ‘দুর্বল’; অসুস্থরাও এর অন্তর্ভুক্ত, এমনকি যারা এদের নিয়ে যাবে তারাও। সুতরাং এদের উপর কোন দম ওয়াজিব হবে না এবং গোনাহও হবে না, বরং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত এই ‘অবকাশ’ গ্রহণ করাই উত্তম। শরী’আতের প্রতিটি বিধানেই এভাবে বান্দার প্রতি রয়েছে অশেষ দয়া ও করুণা।
মুযদালিফায় পৌঁছার পর হযরত জামাতের সাথে মাগরিব ও এশা আদায় করলেন, যেমন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন।
.
মুযদালিফার রাতে তিনি ফজর পর্যন্ত বিশ্রাম করেছেন। তারপর আগে আগে ফজর আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত অকৃষ্ণ করেছেন। এমনকি এই রাতে তিনি তাহাজ্জুদও পড়েননি! উম্মতের আরামের কথা চিন্তা করে তিনি এই সুন্নত জারি করেছেন। কারণ যোহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত কেটেছে আরাফায় দু’আ-মুনাজাত ও রোনাযারিতে। আবার পরদিন মিনায় রয়েছে রামী ও কোরবানির কঠিন আমল, তারপর মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে যিয়ারাত। সুতরাং আজকের রাতে বিশ্রাম করাই উত্তম।
.
মুজদালিফার অকূফ। খুব অল্প সময়, কিন্তু খুব মূল্যবান সময়।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার সন্ধ্যায় তাঁর উম্মতের জন্য মাগফিরাতের দু’আ করেছেন। তখন তাঁর দু’আ (এভাবে) কবুল করা হলো (যে, আল্লাহ বললেন,) আমি উম্মতকে মাফ করে দিলাম, তবে যালিমকে নয়, বরং যালিম থেকে আমি মাযলূমের পক্ষে (বদলা) নেবো।
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরয করলেন, আয় রাব্ব! আপনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলে মযলূমকে জান্নাত থেকে দান করে যালিমকে মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু আরাফার সন্ধ্যায় তাঁর এ আব্দার কবুল হয়নি। যখন মুযদালিফায় ‘ছোবাহ’ যাপন করলেন তখন তিনি সেই দু’আর পুনরাবৃত্তি করলেন এবং একসময় হেসে দিলেন! আবু বকর এবং ওমর (রা) তা দেখে আরয করলেন, আপনার প্রতি আমাদের আব্বা-আম্মা কোরবান, এ তো এমন মুহূর্ত যখন আপনার হাসবার কথা নয়! তাহলে আপনার হাসির রহস্য কী! আপনার দন্তকে আল্লাহ হাস্যোজ্জ্বল রাখুন।
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর দুশমন (শয়তান) যখন জানতে পারলো যে, আল্লাহ আমার দু’আ কবুল করেছেন এবং আমার উম্মতকে মাফ করে দিয়েছেন তখন সে মাথায় মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলো এবং নিজের মওত ও বরবাদি চাইতে লাগলো, আর তার বিলাপ দেখে আমার হাসি পেয়ে গেলো।
.
আল্লাহর রহমতে আমাদের সঙ্গে রাবেতার গাড়ী ছিলো তাই সুন্নত সময়ে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা দেয়া সহজ হয়েছিলো। অনেকে শুধু গাড়ীসমস্যার কারণে সূর্যোদয়ের অনেক পরে মুযদালিফার সীমানা অতিক্রম করেছেন। মজবূরির বিষয় তো আলাদা, অন্যথায় যাদের হাঁটার সুযোগ আছে তাদের অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত সূর্যোদয়ের পূর্বেই মুযদালিফার সীমানা পার হয়ে মিনায় প্রবেশ করা। এটা সুন্নত।
জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হতো না। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে সূর্যোদয়ের পূর্বে রওয়ানা হয়েছিলেন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হলো কাফির-মুশরিকদের আচার আচরণের বিরোধিতা করা। না হলে বুঝতে হবে, হজ্বের মূল শিক্ষা হতেই সে বঞ্চিত হয়েছে।
মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে গাড়ী থামিয়ে আমরা রামীর কংকর সংগ্রহ করেছিলাম। কারণ হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে (ইবনে আব্বাস, মতান্তরে ফযল বিন আব্বাস)-কে কংকর কুড়িয়ে নেয়ার আদেশ করেছিলেন।
.
কংকর অবশ্য মুযদালিফা থেকেই রাত্রে সংগ্রহ করে নেয়া যায় এবং সেটাই ভালো। কারণ পথে তো আর গাড়ী থামে না! এমনকি মিনা থেকে নিলেও সমস্যা নেই, তবে রামীর স্থান থেকে কংকর নেয়া মাকরূহ।
মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে পড়ে একটি উপত্যকা, যার নাম ওয়াদি মুহাচ্ছাব। এর গভীর অংশটাকে বলে বাতনে মুহাচ্ছাব। এটি মূলত মিনা ও মুযদালিফার মধ্যবর্তী একটি স্থান। মিনার অংশ নয়, আবার মুযদালিফারও অংশ নয়। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে মিনার পথে বাতনে মুহাচ্ছাবে এসে সওয়ারিকে তাড়া দিয়েছিলেন এবং গতি দ্রুত করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো আযাবের স্থান তাড়াতাড়ি পার হওয়া।
.
মুহাচ্ছাব মানে অবরুদ্ধ। ইয়ামানের আবরাহা যে হস্তিবাহিনী নিয়ে বাইতুল্লাহ ধ্বংসস্ করার মতলবে এসেছিলো সে এখানেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। এখানেই আল্লাহ
.
তিনি সা. মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে জামরাতুল আকাবায় উপস্থিত হলেন এবং সূর্যোদয়ের পর সওয়ার অবস্থায় জামরাতুল আকাবায় রামী করলেন। একটির পর একটি (এভাবে সাতটি) কংকর তিনি নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তিনি তাকবীর বললেন। আর প্রথম কংকরটি নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তালবিয়া অব্যাহত রাখলেন।
.
জামারাহ মোট তিনটি। মক্কা থেকে মিনার দিকে আসার সময় প্রথম যে জামারাহ্, সেটি হলো জামরাতুল আকাবাহ। দশ তারিখে রামী হলো শুধু জামরাতুল আকাবায়। সেখান থেকে সোজা মিনার দিকে কিছু সরে এলে দ্বিতীয় জামরাহ। মিনার দিকে আরেকটু সরে হলো তৃতীয় জামরাহ। এগারো ও বারো তারিখে তিনটি জামারায় রামী করতে হয়; প্রথমে তৃতীয়টি, তারপর দ্বিতীয়টি, তারপর প্রথমটি। কারণ মিনার দিক থেকে তৃতীয়টি হয়ে যায় প্রথম।
.
হযরত বললেন, নীচে দিয়ে চলো।
.
হযরত হাফেজ্জী হুযূর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলের মাথায় কংকর রেখে আল্লাহু আকবার বলে শাহাদত আঙ্গুলের সাহায্যে রামী করছেন।
.
ইফরাদ হজ্বে কোরবানি ওয়াজিব নয়। সুতরাং এখন মাথা মুড়ালেই মোটামুটি হজ্বের ইহরাম থেকে মুক্ত।
.
কোরবানি করার পর তিনি সা. মাথা মুড়িয়ে ইহরাম থেকে বের হলেন এবং লিবাস পরার পর খোশবু ইস্তিমাল করলেন।
.
এগার তারিখ যোহরের পর হযরতের সঙ্গে রামী করতে বের হলাম।
.
সত্তরজন নবীর মাযারধন্য মসজিদে খায়েফ। মিনার দিনগুলোতে আমাদের পেয়ারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেই অবস্থান করেছেন এবং জামাতে নামায পড়িয়েছেন। তাই মিনায় অবস্থানকালে এই মসজিদের জামাতে নামায পড়া অতি উত্তম, তবে তাঁবু যাদের দূরে এবং যাদের পথ হারিয়ে ফেলার আশংকা তাদের জন্য নয়। তারা নিজ নিজ তাঁবুতে নামায পড়লেই
.
ছোট জামরার রামী সম্পন্ন করলেন। মসজিদে খায়ফের দিক থেকে যেটি প্রথম, তাকেই বলা হয় ছোট জামরা।
.
ছোট জামরা থেকে ফারিগ হয়ে একটু সরে এসে খালি জায়গা দেখে হযরত দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ দু’আ করলেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই জামরার মাঝে দু’আ করেছেন। সুতরাং এখানে দু’আ করা সুন্নত এবং এটা দু’আ কবুল হওয়ার স্থান। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সঙ্গত তাগাদার কারণে এখানে বেশীক্ষণ দাঁড়াবার
.
এরপর হযরত মধ্যবর্তী জামরার রামী সম্পন্ন করলেন এবং কিছুটা সরে এসে এখানেও দু’আ করলেন। এটাও সুন্নত। আমরা পরম সৌভাগ্য ভেবে সেই দু’আ
.
ধীরে ধীরে তিনি তৃতীয় জামারার দিকে অগ্রসর হলেন। এটি বড় জামরা বলে পরিচিত। গতকাল শুধু এই জামরায় রামী করা হয়েছে।
.
আজকের তাওয়াফ হলো হজ্বের ফরয তাওয়াফ। এই ফরয তাওয়াফ গতকালই অনেকে আদায় করেছেন। অনেকে আগামীকাল আদায় করবেন।
.
আল্লাহর নবী মিনা থেকে মক্কায় এসেছেন দশ তারিখে যোহরের আগে এবং তাওয়াফে যিয়ারাত করেছেন অগণিত ছাহাবাকে
.
রাত যাপনের জন্য হযরতের সঙ্গে আমরা আবার ফিরে এলাম মিনায়। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাতের পর রাত যাপনের জন্য মিনায় ফিরে এসেছিলেন।
যাদের ওযর আছে তাদের কথা ভিন্ন, কিন্তু অনেকেই বিনা ওযরে শুধু আরাম ও অলসতার কারণে মক্কায় রাত যাপন করে, আর দিনে গিয়ে রামী করে আসে। এটা বড় অন্যায়।
.
বার তারিখে দুপুরের পর হযরতের সঙ্গে রওয়ানা হলাম রামী জামারার উদ্দেশ্যে। এগার ও বার তারীখের রামী হলো বাধ্যতামূলক, ওয়াজিব। পক্ষান্তরে তের তারিখের বামী হলো ঐচ্ছিক (এবং সুন্নত)। তবে প্রায় সকল হাজী বার তারিখের রামী করেই মক্কায় চলে যান। বার তারিখের সন্ধ্যায় মিনা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। অথচ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তের তারিখে মিনায় রাত যাপন করেছেন এবং পরবর্তী দিন রামী করে মক্কায় ফিরেছেন। (মাযূর ব্যক্তি ছাড়া) ছাহাবা কেরাম সকলেই তাঁর সঙ্গে মিনায় অবস্থান করেছেন।