শবে বরাত

লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান বা মধ্য শা'বানের রজনীর তাৎপর্য বিবেচনায় আলিমরা একে শবে বারাআহ বা মুক্তির রজনী বলে নামকরন করেছেন। আমাদের কাছে এটি শবে বরাত নামে পরিচিত। এ রাতে নির্দিষ্ট কিছু পাপে লিপ্ত না এমন অসংখ্য মুসলিমকে আল্লাহ ক্ষমা করেন। বিভিন্ন বর্ণনায় কিছু অপরাধীর নাম পাওয়া যায় যারা এই ক্ষমার রাতেও ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে না। তারা হলো:

বিশুদ্ধ বর্ণনায়:
১. শিরকে জড়িত,
২. হিংসা-বিদ্বেষ বা পরশ্রীকাতরতায় জড়িত;

দুর্বল বর্ণনায়:
৩. ব্যাভিচারিনী,
৪. আত্মহত্যাকারী;

মারাত্মক দুর্বল বর্ণনায়:
৫. পিতামাতার অবাধ্য সন্তান,
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী,
৭. মদ্যপায়ী বা নেশাগ্রস্ত,
৮. টাখনু আবৃতকারে কাপড় পরিধানকারী (পুরুষ),
৯. প্রাণীর ছবি অংকনকারী,
১০. যে ব্যক্তি একের কথা অপরের কাছে লাগায়।

প্রত্যেক মুমিনের উচিৎ এই সকল অপরাধ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
.
শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস:

আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে আত্নপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। -সুনানে ইবনে মাজাহ ১৩৯০
.
আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, এক রাতে আমি নাবী ﷺ কে (বিছানায়) না পেয়ে তাঁর খোঁজে বের হলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি বাকির কবরস্থানে, তাঁর মাথা আকাশের দিকে তুলে আছেন। তিনি বলেন: হে আয়িশাহ! তুমি কি আশঙ্কা করেছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তা নয়, বরং আমি ভাবলাম যে, আপনি হয়তো আপনার কোন স্ত্রীর কাছে গেছেন। তিনি বলেনঃ মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চাইতেও অধিক সংখ্যক লোকের গুনাহ মাফ করেন। -সুনানে ইবনে মাজাহ ১৩৮৯; সূনান তিরমিজী ৭৩৭
হাদিসটিকে আলবানী (রহ.) যঈফ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
.
যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে সালাত পড়ো এবং এর দিনে সওম রাখো। কেননা এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ কে আছো আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছো রিযিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দান করবো। কে আছো রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছো এই প্রার্থনাকারী। ফজরের সময় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (তিনি এভাবে আহবান করেন)। -ইবনে মাজাহ ১৩৮৮
হাদিসটিকে আলবানী (রহ.) যঈফ জিদ্দান অথবা মাওযু এবং আব্দুল মালেক (হাফি.) জয়ীফ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
.
আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একাধারে সাওম পালন করে যেতেন এমনকি আমরা বলতাম তিনি সাওম পালন করেছেন (আর কখনও ভংগ করবেন না)। আবার কখনও তিনি সাওম ছেড়ে দিতেন, এমনকি আমরা বলতাম, তিনি সাওম ছেড়ে দিয়েছেন (আর কখনো সাওম পালন করবেন না)। আমি তাঁকে শাবান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে এত অধিক (নফল) সাওম পালন করতে দেখিনি। তিনি যেন গোটা শাবান মাসই সাওম পালন করতেন। তিনি সামান্য (কয়টি দিন) ব্যতীত গোটা শাবান মাস সাওম পালন করতেন। -মুসলিম ২৫৯৩
.
প্রতি মাসে তিন দিন এবং গোটা রমযান মাস সাওম পালন করাই হল সারা বছর সাওম পালনের সমতুল্য। -মুসলিম ২৬১৮
.
মানুষের আমল (সপ্তাহে দু’বার) সোমবার ও বৃহস্পতিবার (আল্লাহর দরবারে) উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে ক্ষমা করা হয়। তবে সে ব্যক্তিকে নয়, যার ভাই এর সাথে তার দুশমনি রয়েছে। তখন বলা হবে, এ দু’জনকে বর্জন করো অথবা অবকাশ দাও যতক্ষণ না তারা মীমাংসার প্রতি প্রত্যাবর্তন করে। -মুসলিম ৬৪৪১
.
মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। -বুখারী ১১৪৫
.
হে আল্লাহ! আমি সজ্ঞানে তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই এবং যা আমার অজ্ঞাত তা থেকেও তোমার কাছে ক্ষমা চাই। -আল-আদাবুল মুফরাদ ৭২১
.
হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অগ্রবর্তী হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং মু’মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। -সূরা আল-হাশর ৫৯:১০
.

বিস্তারিত পড়তে পারেন খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহিমাহুল্লাহ) এর কুরআন সুন্নাহর আলোকে শবে বরাত ফযিলত ও আমল বই থেকে।

বিস্তারিত আলোচনা শুনতে পারেন ইউটিউবে

লাইলাতুল কদর

নিশ্চয়ই আমি এ (গ্রন্থ)-টি নাযিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে। তুমি কি জানো সেই (মহিমান্বিত) রাতটি কি? মর্যাদাপূর্ণ এ রাতটি হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম; এ রাতে (ফেরেশতা ও তাদের সর্দার) 'রূহ' তাদের মালিকের সব ধরনের আদেশ নিয়ে (যমীনে) অবতরণ করে। (সে আদেশ বার্তাটি হচ্ছে চিরন্তন) প্রশান্তি, তা ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত (অব্যাহত) থাকে। -আল-ক্বাদর ৯৭: ১-৫
.
হা-মীম। সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ। আমি ইহা একটি মুবারাক রাতে অবতীর্ণ করেছি , অবশ্যই আমি হচ্ছি (জাহান্নাম থেকে) সতর্ককারী! এ রাতে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফয়সালা (স্থিরীকৃত) হয়। (তা স্থিরীকৃত হয়) আমারই আদেশক্রমে, (কাজ সম্পাদনের জন্যে) আমি নিসন্দেহে (আমার) দূত পাঠিয়ে থাকি। (এটা সম্পন্ন হয়) তোমার মালিকের একান্ত অনুগ্রহে; অবশ্যই তিনি (সবকিছু) শোনেন, (সবকিছু) জানেন। তিনি আসমানসমূহ, যমীন এবং এদের উভয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে তার সব কিছুর মালিক। যদি তোমরা ঈমানদার হও (তাহলে তোমরা অযথা বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না। -আদ-দুখান ৪৪: ১-৭
.
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। -বুখারী ২০১৪
.
আল্লাহর রাসূল ﷺ রমাযানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন এবং বলতেনঃ তোমরা রমাযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর। -বুখারী ২০২০
.
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেনঃ তোমরা রমাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান কর। -বুখারী ২০১৭
.
আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ রমাযান মাসের মাঝের দশকে ই‘তিকাফ করেন। বিশ তারিখ অতীত হওয়ার সন্ধ্যায় এবং একুশ তারিখের শুরুতে তিনি এবং তাঁর সংগে যাঁরা ই‘তিকাফ করেছিলেন সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে প্রস্থান করেন এবং তিনি যে মাসে ই‘তিকাফ করেন ঐ মাসের যে রাতে ফিরে যান সে রাতে লোকদের সামনে ভাষণ দেন। আর তাতে মাশাআল্লাহ, তাদেরকে বহু নির্দেশ দান করেন, অতঃপর বলেন যে, আমি এই দশকে ই‘তিকাফ করেছিলাম। এরপর আমি সিদ্ধান্ত করেছি যে, শেষ দশকে ই‘তিকাফ করব। যে আমার সংগে ই‘তিকাফ করেছিল সে যেন তার ই‘তিকাফস্থলে থেকে যায়। আমাকে সে রাত দেখানো হয়েছিল, পরে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। শেষ দশকে ঐ রাতের তালাশ কর এবং প্রত্যেক বেজোড় রাতে তা তালাশ কর। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, ঐ রাতে আমি কাদা-পানিতে সিজদা করছি। ঐ রাতে আকাশে প্রচুর মেঘের সঞ্চার হয় এবং বৃষ্টি হয়। মসজিদে আল্লাহর রাসূল ﷺ এর সালাতের স্থানেও বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। এটা ছিল একুশ তারিখের রাত। যখন তিনি ফজরের সালাত শেষে ফিরে বসেন তখন আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই যে, তাঁর মুখমন্ডল কাদা-পানি মাখা। -বুখারী ২০১৮
.
রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমাকে কদরের রাত দেখানো হয়েছিল। অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে ঐ রাতের ভোর সম্পর্কে স্বপ্নে আরও দেখানো হয়েছে যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সাজদাহ করছি। রাবী বলেন, অতএব ২৩ তম রাতে বৃষ্টি হল এবং রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সাথে (ফজরের) সলাত আদায় করে যখন ফিরলেন, তখন আমরা তার কপাল ও নাকের ডগায় কাদা ও পানির চিহ্ন দেখতে পেলাম। -মুসলিম ২৬৬৫
.
নাবী ﷺ এর কতিপয় সহাবীকে স্বপ্নের মাধ্যমে রমাযানের শেষের সাত রাত্রে লাইলাতুল ক্বদর দেখানো হয়। (এ শুনে) আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেনঃ আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব যে ব্যক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে। -বুখারী ২০১৫
.
উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) বলেন, একদা নাবী ﷺ আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলমান ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবতঃ এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর। -বুখারী ২০২৩
.
যির ইবনু হুবায়শ (রাযিঃ) বলেন, আমি উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) কে বললাম, আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, যে ব্যক্তি গোটা বছর রাত জাগরণ করে- সে কদরের রাতের সন্ধান পাবে। তিনি (উবাই) বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন, এর দ্বারা তিনি এ কথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, লোকেরা যেন কেবল একটি রাতের উপর ভরসা করে বসে না থাকে। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, তা রমযান মাসে শেষের দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭তম রজনী। অতঃপর তিনি দৃঢ় শপথ করে বললেন, তা ২৭তম রজনী। আমি (যির) বললাম, হে আবূল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামাত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে- যে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উদয় হবে কিন্তু তাতে (তীব্র) আলোকরশ্মি থাকবে না। -মুসলিম ২৬৬৭
.
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেনঃ তা শেষ দশকে, তা অতিবাহিত নবম রাতে অথবা অবশিষ্ট সপ্তম রাতে অর্থাৎ লাইলাতুল কদর। -বুখারী ২০২২
.
রমাযানের শেষ দশক শুরু হবার সাথে সাথে রসূলুল্লাহ ﷺ সারা রাত জেগে থাকতেন ও নিজ পরিবারের সদস্যদের ঘুম থেকে জাগাতেন এবং তিনি নিজেও ইবাদাতের জন্য জোর প্রস্তুতি নিতেন। -মুসলিম ২৬৭৭
.
আইশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন রাতটি লায়লাতুল ক্বাদর, এ কথা যদি আমি জানতে পারি তবে সে রাতে কি দু-আ করব? তিনি বললেন, বলবে:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
হে আল্লাহ! তুমি তো খুবই ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাই তুমি ভালবাস। সুতরাং ক্ষমা করে দাও আমাকে। -তিরমিজী ৩৫১৩

চাঁদ

তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম আরম্ভ করবে এবং চাঁদ দেখে ইফতার করবে। আকাশ যদি মেঘে ঢাকা থাকে তাহলে শাবানের গননা ত্রিশ পুরা করবে।
.
একদা সাহাবীগণ রমাযানের চাঁদ দেখা নিয়ে সন্দিহান হলে তারা তারাবীহ না পড়া ও সওম না রাখার ইচ্ছা করেন। এমন সময় হাররাহ এলাকা থেকে এক বেদুঈন এসে সাক্ষ্য দিলো যে, সে চাঁদ দেখেছে। তাকে নবী ﷺ এর নিকট উপস্থিত করা হলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এবং আমি আল্লাহর রাসূল? সে বললো, হ্যাঁ, এবং সে সাক্ষ্য দিলো যে, সে চাঁদ দেখেছে। অতঃপর তিনি বিলাল (রাযি.)-কে নির্দেশ দিলেনঃ লোকদের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, তারা যেন কিয়াম করে এবং সওম রাখে।
-সুনান আবূ দাউদ ২৩৪১
.
রমাযানের শেষদিন সম্পর্কে লোকদের মধ্যে মত পার্থক্য দেখা দিলো, এমতাবস্থায় দু‘জন বেদুঈন এসে নবী ﷺ এর কাছে আল্লাহর নামে শপথ করে সাক্ষ্য দিলেন যে, তারা উভয়ে গতকাল সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছেন। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে সওম ভঙ্গ করার নির্দেশ দিলেন।
তিনি ﷺ তাদেরকে সকালে তাদের ঈদগাহে গমনের নির্দেশ দিয়েছেন।
-সুনান আবূ দাউদ ২৩৩৯
.
যেদিন তোমরা সবাই রোযা পালন কর সে দিন হল রোযা। যেদিন তোমরা সবাই রোযা ভঙ্গ কর সে দিন হল ঈদুল ফিতর। আর যেদিন তোমরা সবাই কুরবানী কর সে দিন হল ঈদুল আযহা।
.
কুরায়ব (রহঃ) থেকে বর্ণিত। হারিসের কন্যা উম্মুল ফাযল তাকে সিরিয়ায় মুআবিয়াহ (রাযিঃ) এর নিকট পাঠালেন। কুরায়ব বলেন, অতঃপর আমি সিরিয়া পৌছে তার প্রয়োজনীয় কাজ সমাপন করলাম। আমি সিরিয়ায় থাকতেই রমযান এসে গেল। আমি জুমুআর রাতে রমযানের চাঁদ দেখতে পেলাম। অতঃপর মাসের শেষদিকে আমি মাদীনায় ফিরে এলাম। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) সিয়াম সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কখন চাঁদ দেখেছ? আমি বললাম, আমি তো জুমুআর রাতেই চাঁদ দেখেছি। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নিজেই কি তা দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ, অন্যান্য লোকেরাও দেখেছে এবং তারা সিয়াম পালন করেছে। এমনকি মু'আবিয়াহ্ (রাযিঃ)-ও সিয়াম পালন করছেন। তিনি বলেন, আমরা তো শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি, আমরা পূর্ণ ত্রিশটি রোযা রাখব অথবা এর আগে যদি চাঁদ দেখতে পাই তাহলে তখন ইফত্বার করব। আমি বললাম, আপনি কি মু'আবিয়াহ (রাযিঃ) এর চাঁদ দেখা ও সিয়াম পালন করাকে (রমাযান মাস শুরু হওয়ার জন্য) যথেষ্ট মনে করেন না? তিনি বললেনঃ না, রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের এভাবেই (চাঁদ দেখে সিয়াম পালন করা ও ইফতার করার জন্য) নির্দেশ দিয়েছেন।
.
আবূল বাখতারী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা উমরাহ করার জন্য বের হলাম। যখন আমরা (মাক্কাহ ও ত্বায়িফের মাঝামাঝি অবস্থিত) “বাত্বনে নাখলাহ" নামক স্থানে অবতরণ করলাম সকলে মিলে চাঁদ দেখতে লাগলাম। লোকেদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, এ তো তিনদিনের চাঁদ, আবার কেউ বলল দু'দিনের। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আমরা ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, আমরা চাঁদ দেখেছি। কিন্তু লোকেদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছে, এতো দু'দিনের চাঁদ আবার কেউ কেউ বলেছে এতো তিন দিনের চাঁদ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোন রাতে চাঁদ দেখেছে? আমরা বললাম, অমুক দিন, অমুক রাতে। তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ ﷺ যেদিন রাতে চাঁদ দেখতেন ঐ দিনেরই তারিখ ধরতেন। সুতরাং চাঁদ সে রাতেই উঠেছে যে রাতে তোমরা দেখেছো।
.
যে ব্যক্তি সন্দেহজনক দিনে সওম রেখেছে, সে আবুল কাসিম ﷺ এর নাফরমানী করেছে।
.

বাইতুল্লাহর মুসাফির

ওমরা 
দু’হাত উঁচিয়ে বাইতুল্লাহর দুয়ারের চৌকাঠ ধরলাম । মুলতাযামে বুক লাগালাম। 
আল্লাহর পেয়ারা হাবীব (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইবরাহীমের নিকটে দু’রাকাত নামায পড়েছেন। এ দু’রাকাত উম্মতের উপর ওয়াজিব করা হয়েছে!
.
আমি সিঁড়ি বেয়ে নামলাম যামযামের কূপ দেখলাম এবং পান করলাম। হে আল্লাহ, তোমার হাবীব বলেছেন, যে মাকছুদে এবং যে উদ্দেশ্যে যামযামের পানি পান করা হবে তুমি তা পূর্ণ করবে। 
.
আমি দাঁড়ালাম ছাফা পাহাড়ে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে। দেখতে পেলাম কালো গিলাফের সামান্য আভাস। এখন দু’আ কবুলের মুহূর্ত, এখন তুমি যা চাবে তাই পাবে!
.
মারওয়ায় এসে সাঈ শেষ হলো। 
.
আলহামদু লিল্লাহ! তাওয়াফ ও সাঈর মাধ্যমে আমার ওমরা সম্পূর্ণ হলো। 
মারওয়ার পিছনে আল্লাহর বান্দারা দাঁড়িয়ে ছিলো ক্ষুর-কাঁচি হাতে ছেঁটে বা কামিয়ে দেবার জন্য। 
.
.
.
হজ্ব
আমার ঘরের এবং মিম্বরের মাঝে যা, তা জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচা। 
.
মদীনা শরীফ থেকে কোবার মসজিদে যেতে পায়ে হেঁটে চল্লিশ মিনিট লাগে। কোবা হচ্ছে নবীজীর মক্কা হতে মদীনায় হিজরতের প্রবেশপথ। মদীনায় প্রবেশ করার পূর্বে তিনি চৌদ্দ দিন কোবায় অবস্থান করেছিলেন। কোবার মসজিদই হলো আল্লাহর নবীর হাতে তৈরী প্রথম মসজিদ। কোবার মসজিদ ও তার জনপদের সঙ্গে আমাদের নবীজীর ছিলো অত্যন্ত মুহাব্বাতের সম্পর্ক। মাঝে মাঝে তিনি মদীনা থেকে কোবায় আসতেন, কখনো সওয়ারিতে, কখনো পায়দাল। এ কারণেই আল্লাহর বান্দাগণ মদীনা যিয়ারাতের সময় কোবার মসজিদে হাযির হন এবং দু’রাকাত নফল আদায় করেন। 
.
এরপর দুই কিবলার মসজিদ। এখানে দু’রাকাত নামায পড়ার আগে হযরত কিছু কথা বললেন। খোলাছা হলো
‘এখানে আসা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে নিষেধও নয়। কিন্তু উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে যে, কেন আমরা এই মসিজদে আসি? কী শিক্ষা এখান থেকে আমরা নিতে চাই? প্রথম কেবলার চিহ্নিত স্থানটি দেখিয়ে হযরত বললেন, ‘তখন বাইতুল মুকাদ্দাস ছিলো মুসলমানদের কিবলা । ছাহাবা কেরাম এখানে ইমামের পিছনে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে নামায আদায় করছিলেন। সে অবস্থায় কিবলা পরিবর্তনের আয়াত নাযিল হওয়ার খবর এসে পৌঁছলো। বলা হলো, বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে বাইতুল্লাহকে কিবলারূপে গ্রহণ করো। এরপর কোন প্রশ্ন নয়, নয় কোন দ্বিধা-সংশয়। নামাযের মাঝেই তাঁরা কিবলা পরিবর্তন করলেন এবং বাকি নামায কাবামুখী হয়ে আদায় করলেন। আর কিছু নয়, শুধু আল্লাহর নবীর দূত এসে খবর দিয়েছেন। এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের সামনে পূর্ণ তাসলীম, সেই স্মৃতিকে স্মরণ করার জন্যই এখানে আমাদের আসা। যিন্দেগির সকল ক্ষেত্রে ইতা’আত ও আনুগত্যের এই জায়বা এখান থেকে আমরা নিতে চাই। ’
মোটামুটি এই ছিলো হযরতের বক্তব্য। এরপর আমরা দু’রাকাত নামায পড়লাম, মুনাজাত করলাম এবং নতুন এক প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে অহুদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। 
এখানে এবং কোবার মসজিদে বিশাল খেজুর বাগান ছিলো, ছায়াঘেরা বড় শান্ত পরিবেশ ছিলো। মদীনার খেজুর বাগানের প্রতি কবির কবিতায় উচ্ছ্বাস দেখেছি। সেই কবিতা আবৃত্তি করে নিজেও উচ্ছ্বসিত হয়েছি, কিন্তু ছায়াঘেরা খেজুর বাগান যে মনকে এমনভাবে টানে, হৃদয়কে এভাবে বিগলিত করে তা আমার জানা ছিলো না! মন চাইছিলো, খেজুর বাগানের শীতল ছায়ায় কিছুক্ষণ বসি। কে জানে, আর কখনো আসা হবে কি না এখানে, এই খেজুর বাগানের সান্নিধ্যে! কিন্তু সময় ও সুযোগ ছিলো নিয়ন্ত্রিত, তাই মনের ইচ্ছাকে মনেই ‘কবর’ দিয়ে রওয়ানা হলাম হযরতের সঙ্গে। এরকম অনেক কবর আছে আমার মনের মাটিতে। 

অহুদ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গাড়ী থামলো। হযরত গাড়ী থেকে নামলেন। এখন এখানে জনপদ গড়ে উঠেছে; তখন জনবসতি ছিলো না। ছিলো শুধু অহুদ পর্বত এবং অহুদ প্রান্তর; সেই প্রান্তর, যেখানে যুদ্ধের সাজে আল্লাহর নবী হাযির হয়েছিলেন সাতশ জানবাষ ছাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে। কেন? শিরক ও কুফুরির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, দুনিয়াতে আল্লাহর দ্বীনকে কেয়ামত পর্যন্ত যিন্দা রাখার জন্য। আজ চৌদ্দশ
.
অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য রকম এক মানুষ হয়ে অহুদের ময়দান থেকে আমরা রওয়ানা হলাম হযরতের সঙ্গে। সাত মসজিদের সামনে গাড়ী থামলো কিছু সময়ের জন্য। গাযওয়াতুল খান্দাকের স্মৃতি বিজড়িত এসকল মসজিদ! কঠিন এক দুর্যোগ নেমে এসেছিলো তখন মদীনায় আল্লাহর নবী ও তাঁর ছাহাবাদের উপর। আরবের গোত্রসকল একত্র হয়েছিলো এবং দশ হাজারের বিশাল বাহিনী মদীনা ঘেরাও
.
পরিখাখননকালে ছাহাবা কেরামের বিভিন্ন অবস্থানের স্মৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে এ মসজিদগুলো তৈরী হয়েছিলো। একটু উঁচু স্থানে ছোট ছোট মসজিদ, যেন নূরের আলাদা আলাদা টুকরো! হৃদয় এক অপার্থিব অনুভূতিতে সিক্ত হলো। এখানে অল্প
কিছুক্ষণ অবস্থান করে হযরতের সঙ্গে আমরা মদীনায় ফিরে এলাম। 
.
এই অনুরাগ-অনুভূতি। হযরতের অনুমতি নিয়ে বের হলাম। শহর পার হয়ে সুপ্রশস্ত সড়কে গাড়ী যেন হাওয়ায় ভেসে চললো। এটা ছিলো মদীনার নিম্ন এলাকা। কিছু দূর পরপর বড় বড় খেজুর বাগান। অল্প কিছু তাঁবু, খেজুর পাতার ছাউনী, দু’চারটে কাঁচা ঘর; এই হলো মদীনার গ্রাম। পরিবেশের এই শান্ত নির্জনতা এবং জীবনের এই অনাড়ম্বর ছবিই বলে দেয়, এখানে যারা বাস করে তারা কত সহজ সরল হতে পারে! ত্রিশ চল্লিশ কিলোমিটার দূরে একটি বড় গ্রামে গাড়ী থামলো। সফরসঙ্গী বললেন, এ গ্রামে আমার পরিচিত একটি পরিবার আছে। এদের আন্তরিকতা মনে রাখার মত। মরুভূমির মুক্ত নির্মল আবহাওয়া। মূল সড়ক থেকে বেশ কিছু দূর বালুর উপর দিয়ে এসেছে আমাদের গাড়ী। নরম বালুর উপর গাড়ীর চলা বড় অদ্ভুত! চাকা দেবে দেবে যায়, আগে যেন বাড়তেই চায় না। সেখান থেকে মূল সড়কের ধাবমান গাড়ীগুলো শুধু দেখা যায়; আসছে, যাচ্ছে। এখান থেকে আওয়ায শোনা যায় না। আধুনিক জীবনের সঙ্গে সংযোগ বলতে ঐ অতটুকুই। দূর থেকে গাড়ীর নিঃশব্দ ছুটে চলা দেখতে পাওয়া! দূর অতীতের একটুকরো জীবন যেন তুলে এনে রাখা হয়েছে আমার চোখের সামনে! খেজুরবাগানের শান্ত-শীতল ছায়া আমাকে যেন সেই দূর অতীতেরই ছায়া দান করলো! একটা কূপ দেখলাম; সামান্য সামান্য পানি তোলা যায় তা থেকে। 
.
রাওযাতুল জান্নায় বসার নছীব আবার হয় কি না হয়, যিয়ারাতের পর তাই রাওযাতুল জান্নায় প্রবেশ করলাম। তাহাজ্জুদ আদায় করে কিছুক্ষণ তিলাওয়াত করলাম। তারপর প্রাণভরে সবকিছু দেখলাম। উসতুওয়ানা আয়েশা, উসতুওয়ানা আবু লোবাবা উসতুওয়ানা হান্নানা এবং উসতুওয়ানাতুল অফুদ, একে একে প্রতিটির উপর কোমল
.
আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মাঝখানে যা আছে তা জান্নাতের বাগান!
রাহমানের রাহীমানা শান ভেবে কূলকিনারা পাই না। দুনিয়াতেই জান্নাতের বাগিচা কেন সাজালেন তিনি! বান্দার প্রতি এত দয়া! এত মায়া! বিশাল কোন আয়তন নয় জান্নাতের এ বাগিচা! মাত্র কয়েক গজের ছোট্ট একটি খণ্ড! কিন্তু আল্লাহর এমন একজন বান্দা তুমি খুঁজে পাবে না, যিনি দরবারে মদীনায় এসেছেন, অথচ জান্নাতের বাগিচায় প্রবেশের এবং অন্তত দু’রাকাত নামায আদায়ের সৌভাগ্য তার জুটেনি! লক্ষ লক্ষ আশিক বান্দা আসেন এবং ঐ একটুকরো জান্নাতের বাগিচায় প্রবেশ করেন। 
.
মদীনার পথে যারা হজ্বের সফর করেন তাদের মীকাত হলো যুলহোলায়ফা। মদীনা থেকে এর দূরত্ব সাত আট মাইল। আল্লাহর পেয়ারা হাবীব ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবা কেরামকে নিয়ে বিদায় হজ্বের ইহরাম যুলহোলায়ফা থেকেই করেছিলেন। 
.
দেখতে দেখতে যুলহোলায়ফার মীকাত এসে গেলো। এখন এটি বীরে আলী নামে পরিচিত। বাংলাদেশের হাজীদের ধারণা, এটি হযরত আলী (রা)-এর কূপ। এখানে এসে তারা সেই কুয়া তালাশ করে এবং না পেয়ে হতাশ হয়। প্রথম কথা, এখানে একসময় যে কুয়াটি ছিলো এখন তার অস্তিত্ব নেই। কালের করাল গ্রাসে অনেক কিছু হারিয়ে যায়; সময়ের স্রোতে অনেক কিছু ভেসে যায়। মদীনা শরীফে পূর্বযুগের অনেক কুয়া এখন নেই; নেই অনেক প্রসিদ্ধ খেজুরবাগানের অস্তিত্ব। তের শতকের বিখ্যাত কিতাব ‘আখবারুল ওয়াফা’-এর পাতায় পাতায় মদীনার যে চিত্র পাওয়া যায়, যে চিহ্ন ও স্মৃতিচিহ্নের উল্লেখ দেখা যায় তার কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। সেই নুরানি যুগের সাক্ষী হয়ে অটল অবিচল আছে শুধু পাহাড়-পর্বতগুলো। তাও বা সময়ের থাবা থেকে রক্ষা পেলো কোথায়! প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এখানেও সমানে চলছে পাহাড় কর্তন। 
তো বলছিলাম, বীরে আলীর কোন অস্তিত্ব এখন এখানে নেই। দ্বিতীয়ত যা ছিলো সেটি হযরত আলী (রা)-এর কুয়া নয়, বরং অনেক পরের যুগে আলী নামের অন্য কোন ব্যক্তির কুয়া। 
.
ইহরামের লিবাস পরা দ্বারাই মানুষ মুহরিম হয়ে যায় না। ইহরাম শুরু হয় দু’রাকাত নামাযের পর ইহরামের নিয়তে তালবিয়া পড়া দ্বারা। 
.
ছয় সাত ঘন্টায় ইনশাআল্লাহ আমরা পৌঁছাব মক্কা শরীফে। দুদিনের বেশি লেগে যেতো বাসের সফরে, আর উটের সফর ছিল নয় দশ দিনের। 
.
হযরত বললেন, ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুল হোলায়ফা থেকে রওয়ানা হয়ে রওহা নামক স্থানে মনযিল করলেন। মদীনা থেকে রওহা দুই রাত্রির দূরত্ব। এখনো তা রওহা নামেই পরিচিত। আমার প্রথম সফরের সময়ও উটের কাফেলা রওহায় মনযিল করতো। পরে আর সেখানে মনযিল হতো না। 
মদীনা থেকে রওয়ানা হওয়ার পর এটা ছিলো নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় মনযিল । ’
আমি আরয করলাম, হযরত! নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পথে সফর করেছেন এবং যেখানে যেখানে মানযিল করেছেন, এখনো যদি সে পথেই সফর হতো এবং মানযিলে মানযিলে কিছুক্ষণ গাড়ী থামতো তাহলে কি ভালো হতো না? এযুগের মুরদা সফরগুলো সেই সফরের অনুকরণের বরকতে কিছুটা কি জানদার হতো না?
তিনি বললেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং তাতেই কল্যাণ। তারপর তিনি বললেন, রওহা উপত্যকায় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়েছেন এবং ইরশাদ করেছেন, আমার আগে সত্তরজন নবী এখানে নামায পড়েছেন। 
স্থূল চোখে যদিও রওহার সেই পবিত্র উপত্যকা আমার দেখা হলো না, কিন্তু কল্পনার দৃষ্টিকে বাধা দেবে কে? কল্পনার চোখে তো আমি দেখতে পেলাম সেই উপত্যকায় সেই নূরানী কাফেলার মানযিল এবং আমার হৃদয়-মন আপ্লুত হলো অভূতপূর্ব এক অনুভবে!
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৃতীয় মানযিল ছিলো আলআছায়া। মদীনা থেকে এর দূরত্ব সাতাত্তর মাইল। চতুর্থ মানযিল ছিলো আলআরজ। এর দূরত্ব নব্বই মাইলের কিছু বেশী। হযরত বললেন, প্রত্যেক মানযিলে অবতরণের পর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
কাফেলার সকলের খোঁজ-খবর নিতেন এবং বিভিন্ন কাজ সকলের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। তিনি নিজেও ছাহাবা কেরামের সঙ্গে কাজে শরীক হতেন। এটা ছিলো তাঁর সারা জীবনের আদত শরীফ। 
.
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের পঞ্চম মানবিল ছিলো আবওয়া। যত দিন উটের সফর ছিলো তত দিন আবওয়া ছিলো হজ্বের কাফেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মানযিল। 
এবারও আমি কল্পনার চোখে দেখতে পেলাম আবওয়ার উপত্যকা এবং সেই নূরানী কাফেলার রাতের মানযিল। আমি দেখতে পেলাম আকাশে তারাদের ঝিলিমিলি, মরুপ্রান্তরে শত শত মশালের আলোকসজ্জা। আকাশ ও পৃথিবী সেখানে যেন একসাথে আলোকিত হয়েছিলো। আর
আমাদের নবীজী শৈশবে মা আমেনার সঙ্গে মদীনায় এসেছিলেন। মদীনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে আবওয়ার বালুভূমিতেই মা আমেনা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এখানে এই বালুভূমিতেই তাঁর কবর হয়েছিলো। পরে একসফরে আবওয়ার বালুভূমি অতিক্রমকালে পেয়ারা নবী মা আমেনার কবর যিয়ারত করেছিলেন। তাঁর চোখের পানিতে সিক্ত হয়েছিলো মায়ের কবর। 
বিদায় হজ্বের সফরেও হয়ত নবীজী মা আমেনার কবর যিয়ারত করেছিলেন, কিতাবের বর্ণনায় যদিও তার উল্লেখ নেই। হযরতকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার প্রথম হজ্বের সফরে কি আবওয়ায় মা আমেনার কবরের চিত্র ছিলো? হযরত বললেন, না, কোন চিহ্ন ছিলো না। 
হযরত বললেন, হাফিয ইবনুল কাইয়িম (রহ)-এর বর্ণনামতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ষষ্ঠ মানযিল ছিলো ওয়াদি উসফান, আর বুখারীর বর্ণনামতে মাররুয্
যাহরান। 
উসফান উপত্যকা অতিক্রমকালে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর (রা)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু বকর! এটি কোন্ উপত্যকা? তিনি আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি উসফান উপত্যকা। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর নবী হুদ ও ছালিহ আলাইহিমাস সালাম দু’টি লাল উটে সওয়ার হয়ে এ উপত্যকা অতিক্রম করেছেন। তাঁরা বাইতুল্লাহর হজ্বের নিয়তে তালবিয়া পড়ছিলেন। 
হযরতের পাক যবানে এ বয়ান শুনে আমার অন্তরে অভূতপূর্ব এক ভাবের উদয় হলো। উসফান উপত্যকা কত দূর কে জানে? হে ওয়াদি উসফান! তোমাকে সালাম! আমার পেয়ারা নবীর সেই পবিত্র সফরের প্রতিটি মানযিলকে সালাম!
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরবর্তী মানযিল ছিলো সারিফ। মক্কা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ছয় মাইল। সারিফের বিস্ময়কর ঘটনা এই যে, ওমরাতুল কাযা-এর সফরে এখানেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মায়মূনা (রা)-কে বিবাহ করেছেন এবং ওমরা শেষে ফেরার পথে এখানেই একটি গাছের নীচে তাবুতে হযরত মায়মূনা (রা)-এর সঙ্গে বাসর যাপন করেছেন। বহু বছর পর সারিফেই হযরত মায়মুনা রাঃ মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং সেই গাছের নিচেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিলো। ৫১ হিজরীতে উম্মুল মুমিনীনদের মাঝে তিনিই সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করেছেন। 
হযরত বললেন, প্রথম হজ্বের সফরে আমি সারিফে এসেছিলাম। সেখানে তখন ছোট একটি মসজিদ ছিলো এবং লোকেরা বলতো, মসজিদটির অবস্থান হযরত মায়মূনা (রা) এর কবরের পাশেই; তবে কবরের কোন আলামত তখন সেখানে ছিলো না। 
আমাদের গাড়া ছুটে চলেছে মক্কার পথে। কত দূরত্ব দু’টি কাফেলার মাঝে! কত ভিন্নতা দু’টি সফরের মাঝে! দূরত্ব সময়ের এবং সম্পর্কের! ভিন্নতা পবিত্রতার এবং শুভ্রতার! তবু তো আছে একটি নৈকট্য! একটি অভিন্নতা! লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের নৈকট্য এবং লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকের অভিন্নতা! এটা ভাবলে অন্তরের গভীরে কিছুটা তো সান্ত্বনা আসে! আশা ও আশ্বাসের একটুখানি পরশ তো লাগে!
হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ মানযিল ছিলো মক্কার নিম্নভূমিতে, মক্কা ও তানঈমের মধ্যবর্তী স্থান যী-তোয়ায়। নবীজী এখানে রাত্রিযাপন করেছেন, ফজর আদায় করেছেন এবং গোসল করেছেন। 
হযরত বললেন, মক্কায় প্রবেশ করার আগে গোসল করা মুস্তাহাব, যদি সম্ভব না হয় তাহলে অযু করে নেয়াও যথেষ্ট। 
হযরত বললেন, সেদিন ছিলো রোববার। আল-আযরাক উপত্যকা হয়ে মক্কার ঊর্ধ্বভূমির দিক দিয়ে দিনের বেলা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা শরীফে প্রবেশ করেছিলেন। আল-আযরাক উপত্যকা অতিক্রম করার সময় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি মূসাকে দেখতে পাচ্ছি যে, তিনি উচ্চ স্বরে তালবিয়া পড়ে চলেছেন। 
বুখারী শরীফে এ হাদীছ পড়েছি,
.
সওয়ারু থেকে নামার সময় এবং সওয়ারিতে ওঠার সময় উচ্চ স্বরে তালবিয়া পড়া সুন্নত!
.
হে আল্লাহ! তুমি এই ঘরের মর্যাদা ও মহিমা এবং সম্মান ও সমীহ বৃদ্ধি করে দাও। যারা হজ্ব করে, ওমরা করে এবং এই ঘরকে তা’যীম ও সম্মান করে তাদেরও ইয্যত, সম্মান, মর্যাদা ও ছাওয়াব বাড়িয়ে দাও। হে আল্লাহ তুমিই তো ‘সালাম’; শান্তি তো তোমারই পক্ষ হতে বর্ষিত। সুতরাং হে আমাদের রাব্ব! আমাদেরকে সুখে-শান্তিতে জীবিত রাখুন। 
কা’বা শরীফ দেখার সময় এই দু’আ পড়া সুন্নত! আল্লাহর ঘরের ইয্যত ও মর্যাদা তো আমার-তোমার দু’আর মুহতাজ নয়; এ তো শুধু বান্দাকে নতুন কিছু দান করার বাহানা! এ সময় দু’আ কবুল হওয়ার খোশখবরি এসেছে ছহীহ হাদীছে। আমি প্রাণভরে দু’আ করলাম ঘরের মালিকের দরবারে। দু’আর সঙ্গে কবুলিয়াতের আশাও হলো অন্তরে। হযরত হাকীমুল উম্মত থানবী (রহ) লিখেছেন, দু’আ করার সময় কবুলিয়াতের আশা হওয়া দু’আ কবুল হওয়ারই আলামত। 
হযরত ধীরে ধীরে নেমে এলেন তাওয়াফের চত্বরে। 
.
হযরতকে অনুসরণ করে আমরা নেমে এলাম মাতাফে। পুরো মাতাফ তখন তরঙ্গময় এক জনসমুদ্র! বাইতুল্লাহর কাছে গিয়ে হাজারে আসওয়াদ চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করার কথা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। হযরত তাই হাজারে আসওয়াদের বরাবর হয়ে সেদিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তারপর দু’হাত তুলে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তালু দ্বারা হাজারে আসওয়াদের দিকে ইশারা করলেন এবং হাতের তালুতে চুমু খেলেন। তারপর তাওয়াফ শুরু করলেন। 
.
হযরতকে অনুসরণ করে আমরাও তাওয়াফ শুরু করলাম। বাইতুল্লাহর দিকে না তাকিয়ে নযর নীচে রাখা হলো তাওয়াফের আদব। 
.
হযরত ইফরাদ হজ্বের ইহরাম করেছেন, আমরাও। সে হিসাবে এটা ছিলো শুধু তাওয়াফে কুদূম, যার পরে সা’ঈ নেই। সুতরাং এর শুরুতে রামাল ও ইযতিবা নেই। তবে তাওয়াফে যিয়ারাতের পরবর্তী সা’ঈ যদি এখন করে নেয়া হয় তাহলে এখানে রামাল ও ইযতিবা করতে হবে। আমরা তাওয়াফে যিয়ারাতের পরবর্তী সা’ঈ এখনই করে ফেলবো, তাই তাওয়াফের প্রথম তিনচক্করে রামাল ও ইযতিবা করলাম। তাওয়াফে যিয়ারাতের সময় যে প্রচণ্ড ভিড় হয় সেদিক থেকে এখন সা’ঈ করে নেয়া তুলনামূলক সহজ, বিশেষত মাযূর ও দুর্বলদের জন্য। 
.
নয় তারিখের রাত মিনায় যাপন করা সুন্নত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের আট তারিখ বৃহস্পতিবার ফজরের নামায মক্কায় পড়ে এশরাকের পর মিনায় রওয়ানা হয়েছেন এবং মিনায় রাত যাপন করেছেন। আর আরাফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন শুক্রবার ফজরের নামায আদায় করে সূর্যোদয়ের পর। সুতরাং মিনায় পাঁচওয়াক্ত নামায আদায় করা হলো সুন্নত। 
.
নয় তারিখের ফজর থেকে তালবিয়ার সঙ্গে শুরু হয়েছে তাকবীরে তাশরীক। এটা চলবে তের তারিখের আছর পর্যন্ত। 
.
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিলো মসজিদে নামিরার তিনি সেখানে গোছল করেছিলেন এবং … !
.
যিলহজ্বের নয় তারিখে যাওয়ালের পর মুহরিম অবস্থায় আরাফার হাযিরি হলো হজ্বের মূল রোকন। কোন কারণে এটা যদি ফণ্ডত হয়ে যায় তাহলে হজ্বই ফণ্ডত হয়ে গেলো। 
.
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, আরাফার ময়দানে তিনি দু’আ করছেন. উভয় হাত বুক পর্যন্ত তলে রেখেছেন যেন এক ভখা মিসকীন! 
.
জাবালে রাহমাত পাহাড়ের পাদদেশেই আজকের এই দিনে ছাহাবা কেরাম জমায়েত হয়েছিলেন এবং আল্লাহর নবী বিদায় হজ্বের অকূফ করেছিলেন। 
.
যখন সূর্য ঢলে পড়লো তখন তিনি রওয়ানা হলেন। বাতনুল ওয়াদিতে উপস্থিত হয়ে। উটনীর উপর সওয়ার অবস্থায় লোকদের উদ্দেশ্যে এক মহান খোতবা দান করলেন। তারপর বিলালকে আদেশ করলেন, আর বিলাল আযান দিলেন। অনন্তর তিনি দু’রাকাত যোহর এবং দু’রাকাত আছর আদায় করলেন। একত্রিত উভয় নামায থেকে ফারিগ হয়ে তিনি কাছওয়া উটনীতে আরোহণ করলেন এবং মাওকিফে তাশরীফ আনলেন কিবলামুখী হয়ে অকূফ করলেন। তাঁর মাওকিফ বা অবস্থানক্ষেত্র ছিলো জাবালে রাহমাতের পাদদেশে প্রস্তরখন্ডগুলোর নিকটে। অকূফের সময় তিনি দু’আ- মুনাজাতে ও রোনাযারিতে নিমগ্ন ছিলেন। 
.
আল্লাহর নবী সেদিন তাঁর উম্মতের সমস্ত গোনাহের জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাতের দু’আ করেছেন এবং তা কবুল করেছেন, কিন্তু যালিমের জন্য মাগফিরাতের দু’আ কবুল করেননি। কেউ যদি কারো উপর যুলুম করে, কেউ যদি কারো হক নষ্ট করে, তা মাফ হবে না যতক্ষণ না মাযলূম নিজে তা মাফ করে দেয়। 
.
মুযদালিফার রাতে আল্লাহর নবী আবার দু’আ করলেন। আল্লাহর কাছে তিনি এই বলে আব্দার জানালেন, আয় রাব্ব, আপনি তো মাযলূমকে আপনার পক্ষ হতে খুশী করে যালিমকে মাফ করে দিতে পারেন! উম্মতের জন্য পেয়ারা হাবীবের কত পেয়ারা আবদার! এমনকি যালিম উম্মতির জন্যও ছিলো তাঁর কত দরদ-ব্যথা!
অবশেষে আল্লাহ তা’আলা তাঁর পেয়ারা হাবীবের এ দু’আও কবুল করলেন এবং বললেন, আপনি শান্ত হোন হে নবী! আপনি আনন্দিত হোন হে রাসূল! আপনার উম্মতের যালিমকেও আমি মাফ করে দেবো (যদি সে অনুতপ্ত হয়ে মাফ চায়), আর মাযলূমকে আমি নিজের পক্ষ হতে খুশী করে দেবো। 
.
সূর্য যখন পূর্ণ অস্ত গেলো, হযরত তখন গাড়ীতে আরোহণ করলেন। যদিও গাড়ীর চালক তাড়াহুড়া করছিলো, কিন্তু হযরত সূর্যাস্তের পর রওয়ানা দেয়ার বিষয়ে অবিচল। 
.
একসময় বাস যেখানে এসে আটকা পড়লো তার একটু সামনে মসজিদে নামিরা। এর কিছু অংশ মাওকিফের অন্তর্ভুক্ত, আর কিছু অংশ বাতনে ওরায়নার অন্তর্ভুক্ত, যা মাওকিফ নয়। শুনেছি মসজিদের ভিতরে মেঝেতে লাল দাগ দিয়ে মাওকিফবহির্ভূত অংশকে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। দুপুরে দূর থেকে মসজিদের মিনার দেখেছি, জামাতে শরীক হওয়ার তাওফীক হয়নি। হজ্বের ইমাম এই মসজিদে যোহরের সময় যোহর ও আছর একত্রে পড়ান, তারপর হজ্বের গুরুত্বপূর্ণ খোতবা দান করেন। এখানেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাদিবসের ঐতিহাসিক খোতবা দান করেছেন, যা বিদায় হজ্বের ভাষণ নামে পরিচিত। 
.
মিনা থেকে মুযদালিফা হয়ে আরাফায় যেতে হয়। আরাফা থেকে ফেরার পথে মুযদালিফায় রাত যাপন করে ভোরে মিনায় ফিরে আসতে হয়। মক্কা থেকে যিনা এবং (মুযদালিফা পার হয়ে) আরাফা; আবার আরাফা থেকে মুযদালিফা, মিনা ও মক্কা; এই হলো হজ্বের সফর। মক্কা থেকে মিনা তিন মাইল, মিনা থেকে আরাফা ছয় মাইল। সুতরাং মক্কা থেকে আরাফার দূরত্ব নয় মাইল। 
আবু হানীফা (রহ)-এর মাযহাবে মুযদালিফায় রাত যাপন করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ, পক্ষান্তরে ফজরের পরে এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে অবস্থান করা হলো ওয়াজিব। অর্থাৎ মুযদালিফায় রাত যাপন এবং ফজরের পর অবস্থান গ্রহণ, দু’টো সম্পূর্ণ আলাদা আমল। যারা ফজরের আগেই মুযদালিফা থেকে বের হয়ে যায় তারা হজ্বের একটি ওয়াজিব তরক করে, সুতরাং তাদেরকে ওয়াজিব তরকের ক্ষতিপূরণরূপে দম দিতে হবে। 
আরেকটি বিষয়, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের ‘দুর্বলদের’কে চাঁদ অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিনায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তারা ভিড়ের কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে এবং আগেভাগে রামী করে ফেলতে পারে। তবে তিনি তাদেরকে সূর্যোদয়ের পরে রামী করার আদেশ করেছিলেন। এদের মাঝে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা, উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা (রা) এবং বালক আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)। 
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাসকে বললেন, ‘আপনি আমাদের দুর্বলদের এবং আমাদের নারীদের নিয়ে চলে যান; তারা যেন মিনায় ফজর পড়ে। 
নারী, বালক ও অক্ষম বৃদ্ধরাই হলো ‘দুর্বল’; অসুস্থরাও এর অন্তর্ভুক্ত, এমনকি যারা এদের নিয়ে যাবে তারাও। সুতরাং এদের উপর কোন দম ওয়াজিব হবে না এবং গোনাহও হবে না, বরং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত এই ‘অবকাশ’ গ্রহণ করাই উত্তম। শরী’আতের প্রতিটি বিধানেই এভাবে বান্দার প্রতি রয়েছে অশেষ দয়া ও করুণা। 
মুযদালিফায় পৌঁছার পর হযরত জামাতের সাথে মাগরিব ও এশা আদায় করলেন, যেমন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। 
.
মুযদালিফার রাতে তিনি ফজর পর্যন্ত বিশ্রাম করেছেন। তারপর আগে আগে ফজর আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত অকৃষ্ণ করেছেন। এমনকি এই রাতে তিনি তাহাজ্জুদও পড়েননি! উম্মতের আরামের কথা চিন্তা করে তিনি এই সুন্নত জারি করেছেন। কারণ যোহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত কেটেছে আরাফায় দু’আ-মুনাজাত ও রোনাযারিতে। আবার পরদিন মিনায় রয়েছে রামী ও কোরবানির কঠিন আমল, তারপর মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে যিয়ারাত। সুতরাং আজকের রাতে বিশ্রাম করাই উত্তম। 
.
মুজদালিফার অকূফ। খুব অল্প সময়, কিন্তু খুব মূল্যবান সময়। 
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার সন্ধ্যায় তাঁর উম্মতের জন্য মাগফিরাতের দু’আ করেছেন। তখন তাঁর দু’আ (এভাবে) কবুল করা হলো (যে, আল্লাহ বললেন,) আমি উম্মতকে মাফ করে দিলাম, তবে যালিমকে নয়, বরং যালিম থেকে আমি মাযলূমের পক্ষে (বদলা) নেবো। 
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরয করলেন, আয় রাব্ব! আপনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলে মযলূমকে জান্নাত থেকে দান করে যালিমকে মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু আরাফার সন্ধ্যায় তাঁর এ আব্দার কবুল হয়নি। যখন মুযদালিফায় ‘ছোবাহ’ যাপন করলেন তখন তিনি সেই দু’আর পুনরাবৃত্তি করলেন এবং একসময় হেসে দিলেন! আবু বকর এবং ওমর (রা) তা দেখে আরয করলেন, আপনার প্রতি আমাদের আব্বা-আম্মা কোরবান, এ তো এমন মুহূর্ত যখন আপনার হাসবার কথা নয়! তাহলে আপনার হাসির রহস্য কী! আপনার দন্তকে আল্লাহ হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। 
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর দুশমন (শয়তান) যখন জানতে পারলো যে, আল্লাহ আমার দু’আ কবুল করেছেন এবং আমার উম্মতকে মাফ করে দিয়েছেন তখন সে মাথায় মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলো এবং নিজের মওত ও বরবাদি চাইতে লাগলো, আর তার বিলাপ দেখে আমার হাসি পেয়ে গেলো। 
.
আল্লাহর রহমতে আমাদের সঙ্গে রাবেতার গাড়ী ছিলো তাই সুন্নত সময়ে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা দেয়া সহজ হয়েছিলো। অনেকে শুধু গাড়ীসমস্যার কারণে সূর্যোদয়ের অনেক পরে মুযদালিফার সীমানা অতিক্রম করেছেন। মজবূরির বিষয় তো আলাদা, অন্যথায় যাদের হাঁটার সুযোগ আছে তাদের অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত সূর্যোদয়ের পূর্বেই মুযদালিফার সীমানা পার হয়ে মিনায় প্রবেশ করা। এটা সুন্নত। 
জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হতো না। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে সূর্যোদয়ের পূর্বে রওয়ানা হয়েছিলেন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হলো কাফির-মুশরিকদের আচার আচরণের বিরোধিতা করা। না হলে বুঝতে হবে, হজ্বের মূল শিক্ষা হতেই সে বঞ্চিত হয়েছে। 
মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে গাড়ী থামিয়ে আমরা রামীর কংকর সংগ্রহ করেছিলাম। কারণ হযরত বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে (ইবনে আব্বাস, মতান্তরে ফযল বিন আব্বাস)-কে কংকর কুড়িয়ে নেয়ার আদেশ করেছিলেন। 
.
কংকর অবশ্য মুযদালিফা থেকেই রাত্রে সংগ্রহ করে নেয়া যায় এবং সেটাই ভালো। কারণ পথে তো আর গাড়ী থামে না! এমনকি মিনা থেকে নিলেও সমস্যা নেই, তবে রামীর স্থান থেকে কংকর নেয়া মাকরূহ। 
মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়ার পথে পড়ে একটি উপত্যকা, যার নাম ওয়াদি মুহাচ্ছাব। এর গভীর অংশটাকে বলে বাতনে মুহাচ্ছাব। এটি মূলত মিনা ও মুযদালিফার মধ্যবর্তী একটি স্থান। মিনার অংশ নয়, আবার মুযদালিফারও অংশ নয়। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে মিনার পথে বাতনে মুহাচ্ছাবে এসে সওয়ারিকে তাড়া দিয়েছিলেন এবং গতি দ্রুত করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো আযাবের স্থান তাড়াতাড়ি পার হওয়া। 
.
মুহাচ্ছাব মানে অবরুদ্ধ। ইয়ামানের আবরাহা যে হস্তিবাহিনী নিয়ে বাইতুল্লাহ ধ্বংসস্ করার মতলবে এসেছিলো সে এখানেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। এখানেই আল্লাহ
.
তিনি সা. মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে জামরাতুল আকাবায় উপস্থিত হলেন এবং সূর্যোদয়ের পর সওয়ার অবস্থায় জামরাতুল আকাবায় রামী করলেন। একটির পর একটি (এভাবে সাতটি) কংকর তিনি নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তিনি তাকবীর বললেন। আর প্রথম কংকরটি নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তালবিয়া অব্যাহত রাখলেন। 
.
জামারাহ মোট তিনটি। মক্কা থেকে মিনার দিকে আসার সময় প্রথম যে জামারাহ্, সেটি হলো জামরাতুল আকাবাহ। দশ তারিখে রামী হলো শুধু জামরাতুল আকাবায়। সেখান থেকে সোজা মিনার দিকে কিছু সরে এলে দ্বিতীয় জামরাহ। মিনার দিকে আরেকটু সরে হলো তৃতীয় জামরাহ। এগারো ও বারো তারিখে তিনটি জামারায় রামী করতে হয়; প্রথমে তৃতীয়টি, তারপর দ্বিতীয়টি, তারপর প্রথমটি। কারণ মিনার দিক থেকে তৃতীয়টি হয়ে যায় প্রথম। 
.
হযরত বললেন, নীচে দিয়ে চলো। 
.
হযরত হাফেজ্জী হুযূর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলের মাথায় কংকর রেখে আল্লাহু আকবার বলে শাহাদত আঙ্গুলের সাহায্যে রামী করছেন। 
.
ইফরাদ হজ্বে কোরবানি ওয়াজিব নয়। সুতরাং এখন মাথা মুড়ালেই মোটামুটি হজ্বের ইহরাম থেকে মুক্ত। 
.
কোরবানি করার পর তিনি সা. মাথা মুড়িয়ে ইহরাম থেকে বের হলেন এবং লিবাস পরার পর খোশবু ইস্তিমাল করলেন। 
.
এগার তারিখ যোহরের পর হযরতের সঙ্গে রামী করতে বের হলাম। 
.
সত্তরজন নবীর মাযারধন্য মসজিদে খায়েফ। মিনার দিনগুলোতে আমাদের পেয়ারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানেই অবস্থান করেছেন এবং জামাতে নামায পড়িয়েছেন। তাই মিনায় অবস্থানকালে এই মসজিদের জামাতে নামায পড়া অতি উত্তম, তবে তাঁবু যাদের দূরে এবং যাদের পথ হারিয়ে ফেলার আশংকা তাদের জন্য নয়। তারা নিজ নিজ তাঁবুতে নামায পড়লেই
.
ছোট জামরার রামী সম্পন্ন করলেন। মসজিদে খায়ফের দিক থেকে যেটি প্রথম, তাকেই বলা হয় ছোট জামরা। 
.
ছোট জামরা থেকে ফারিগ হয়ে একটু সরে এসে খালি জায়গা দেখে হযরত দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ দু’আ করলেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই জামরার মাঝে দু’আ করেছেন। সুতরাং এখানে দু’আ করা সুন্নত এবং এটা দু’আ কবুল হওয়ার স্থান। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সঙ্গত তাগাদার কারণে এখানে বেশীক্ষণ দাঁড়াবার
.
এরপর হযরত মধ্যবর্তী জামরার রামী সম্পন্ন করলেন এবং কিছুটা সরে এসে এখানেও দু’আ করলেন। এটাও সুন্নত। আমরা পরম সৌভাগ্য ভেবে সেই দু’আ
.
ধীরে ধীরে তিনি তৃতীয় জামারার দিকে অগ্রসর হলেন। এটি বড় জামরা বলে পরিচিত। গতকাল শুধু এই জামরায় রামী করা হয়েছে। 
.
আজকের তাওয়াফ হলো হজ্বের ফরয তাওয়াফ। এই ফরয তাওয়াফ গতকালই অনেকে আদায় করেছেন। অনেকে আগামীকাল আদায় করবেন। 
.
আল্লাহর নবী মিনা থেকে মক্কায় এসেছেন দশ তারিখে যোহরের আগে এবং তাওয়াফে যিয়ারাত করেছেন অগণিত ছাহাবাকে
.
রাত যাপনের জন্য হযরতের সঙ্গে আমরা আবার ফিরে এলাম মিনায়। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাতের পর রাত যাপনের জন্য মিনায় ফিরে এসেছিলেন। 
যাদের ওযর আছে তাদের কথা ভিন্ন, কিন্তু অনেকেই বিনা ওযরে শুধু আরাম ও অলসতার কারণে মক্কায় রাত যাপন করে, আর দিনে গিয়ে রামী করে আসে। এটা বড় অন্যায়। 
.
বার তারিখে দুপুরের পর হযরতের সঙ্গে রওয়ানা হলাম রামী জামারার উদ্দেশ্যে। এগার ও বার তারীখের রামী হলো বাধ্যতামূলক, ওয়াজিব। পক্ষান্তরে তের তারিখের বামী হলো ঐচ্ছিক (এবং সুন্নত)। তবে প্রায় সকল হাজী বার তারিখের রামী করেই মক্কায় চলে যান। বার তারিখের সন্ধ্যায় মিনা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। অথচ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তের তারিখে মিনায় রাত যাপন করেছেন এবং পরবর্তী দিন রামী করে মক্কায় ফিরেছেন। (মাযূর ব্যক্তি ছাড়া) ছাহাবা কেরাম সকলেই তাঁর সঙ্গে মিনায় অবস্থান করেছেন।

হজ ওমরা

মদীনা
মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ ও দরূদ পড়ুন। নবীর রাওযা জিয়ারতের সময় সালাম দিতে হবে। (আস সালামু আলাইকা আয়হান নাবিয়া ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু)।
.
মক্কা
মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ ও দরূদ পড়ুন। কা'বা শরীফ প্রথমে নজরে আসলেই তিনবার পড়ুন (আল্লাহু আকবার, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ)। এরপর দাঁড়িয়ে বুক পর্যন্ত হাত তুলে আপনার আবেগ থেকে যে দুআ আসে আল্লাহর কাছে তা প্রার্থনা করুন। এটি দুআ কবূল হওয়ার একটি বিশেষ মুহূর্ত।
.
উমরার কাজ ৪ টি
১. মীকাত থেকে শুধু উমরার ইহরাম করুন (ফরয)। নিয়ত করুন। (হে আল্লাহ, আমি উমরা করতে চাই, তুমি আমার জন্য তা সহজ করে দাও এবং কবুল কর।) তালবিয়া পড়ুন। (লাব বাইকা আল্লা-হুম্মা লাববাইক; লাব বাইকা লা- শারীকা লাকা লাব বাইক; ইন নাল হামদা; ওয়ান নিয় মাতা; লাকা ওয়াল মুলক; লা- শারীকা লাকা)। দুরূদ শরীফ পড়ুন।
২. বায়তুল্লায় প্রবেশ করে উমরার তওয়াফ করুন (ফরয)। দুই রাকাত নামায পড়ুন। জমজমের পানি পান করুন।
৩. সাফা-মারওয়ার মাঝে উমরার সাঈ করুন (ওয়াজিব)। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে উঠে দরুদ পড়ুন ও দোয়া করুন।
৪. মাথা মুণ্ডান।(ওয়াজিব)
.
ওমরার পর
৮ যিলহজ পর্যন্ত হজের অপেক্ষায় থাকুন। বেশি বেশি নফল তাওয়াফ ও অন্যান্য নফল ইবাদতে মশগুল থাকুন। যিলহজের চাঁদ উঠার আগেই নখ কাটুন, বগল ও নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করুন।
.
৮ যিলহজ
১. গোসল-উযূ করে ভালভাবে শরীরের ময়লা দূর করুন। চুল আঁচড়িয়ে নিন। মক্কার হোটেল থেকে এহরামের পোশাক পরিধান করুন। মসজিদে হারাম থেকে হজের নিয়তে ইহরাম করুন (ফরয)। দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। 'লাব্বাইকা হাজ্জান' বলে হজের নিয়ত করুন। (হে আল্লাহ, আমি হজ্জ করতে চাই, তুমি আমার জন্য তা সহজ করে দাও এবং আমার থেকে তা কবুল কর।) তালবিয়া পাঠ করুন।
২. ইশরাকের পর মিনায় রওনা করুন। সেখানে যোহর, আসর, মাগরীব, ইশা ও পরবর্তী দিনের ফজরের নামায ওয়াক্তমত আদায় করুন এবং পুরো সময় মিনায় অবস্থান করুন। ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত সব ফরজ সালাত শেষে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে হবে।
.
৯ যিলহজ (আরাফার দিবস)
১. ৯ যিলহজ সূর্যোদয়ের পর তালবিয়া ও তাকবির বলতে বলতে আরাফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করুন। সেখানে মসজিদে নামিরার জামাতে শরীক হতে পারলে যোহরের ওয়াক্তে যোহর ও আসর উভয় নামায এক আযান ও দুই ইকামতে একত্রে আদায় করুন। জামাতে অংশগ্রহণ সম্ভব না হলে যোহরের ওয়াক্তে যোহর ও আসরের ওয়াক্তে আসর পড়ুন। নামায শেষ করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুআ ও যিকিরে মশগুল থাকুন। আরাফায় উকূফ করা (ফরয)। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা (ওয়াজিব)। আরাফার দিনের সর্বোত্তম দোয়া হলো: (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু, লা-শারীকা লাহূ, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া, 'আলা কুল্লি শায়ইন কাদীর)।
২. বাথরুমের প্রয়োজন সেরে সূর্যাস্তের পর ধীরে-সুস্থে শান্তভাবে মুযদালিফা অভিমুখে রওয়ানা করুন।
৩. মুযদালিফায় পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক আযান ও ইকামতে মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করুন।
৪. রাতে মুযদালিফা থেকে ৪৯টি কংকর সংগ্রহ করা যেতে পারে। মুযদালিফায় কঙ্কর সহজে পাওয়া যায়।
৫. ইশার নামায পড়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন। মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করুন।(ওয়াজিব)
.
১০ যিলহজ (ঈদের দিন)
১. সুবহে সাদিক হবার পর বিলম্ব না করে ফজরের নামায আদায় করুন। তালবিয়া ও তাকবীর বলুন। চারদিক আলোকিত হওয়া পর্যন্ত যিকির ও দুআতে মশগুল থাকুন।
২. সূর্যোদয়ের আগে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করুন। কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করুন।
৩. সূর্যোদয়ের পর জোহরের আগে শুধু বড় জামারায় বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন (ওয়াজিব)। ভিড় বেশি হয় ১ম তলায়।
৪. হজের শোকর আদায় সরূপ কুরবানী করুন। (ওয়াজিব)
৫. কুরবানী সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত হলে মাথা কামাবেন। নারীরা পুরো মাথার চুলের কমপক্ষে আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ কাটবেন (ওয়াজিব)। এখন স্ত্রী সহবাস ছাড়া ইহরামের অন্যসব নিষিদ্ধ বিষয় বৈধ।
৬. তাওয়াফে যিয়ারত আদায় করা (ফরয)। ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত করা যেতে পারে। পরদিন ১১ তারিখে ভিড় কম থাকে। তাওয়াফে যিয়ারতের পর স্ত্রী সহবাসও বৈধ হয়ে যাবে।
৭. ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ুন। জমজমের পানি পান করুন।
৮. সাফা-মারওয়ার মাঝে হজের সাঈ করুন।(ফরজ)
৯. মিনায় ফিরে গিয়ে দিবাগত রাত মিনায় যাপন করুন।
.
১১ যিলহজ
১. ১০ তারিখে তাওয়াফ-সাঈ না করে থাকলে আজ হারামে গিয়ে তা সম্পন্ন করুন।
২. যোহরের ওয়াক্ত হবার পর তিন জামরার প্রত্যেকটিতে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করুন (ওয়াজিব)। ছোট জামরা থেকে শুরু করে বড় জামরায় শেষ করুন। শুধু ছোট ও মধ্য জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর দাঁড়িয়ে দুআ করুন।
৩. দিবাগত রাত মিনায় যাপন করুন।
.
১২ যিলহজ
১. যোহরের ওয়াক্ত হবার পর তিন জামরার প্রত্যেকটিতে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করা (ওয়াজিব)। ছোট জামরা থেকে শুরু করে বড় জামরায় শেষ করুন। শুধু ছোট ও মধ্য জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর দাঁড়িয়ে দুআ করুন।
২. ১২ তারিখে সূর্যাস্তের আগেই কংকর নিক্ষেপের কাজ শেষ করে ফেললে ভালো। যদি ভিড় বা অন্য কোনো ওজরের কারণে সূর্যাস্তের আগে কংকর নিক্ষেপ করা সম্ভব না হয় তবে আগত দিনের সুবহে সাদিকের আগে কংকর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করতে পারবেন।
.
বিদায়ী তাওয়াফ
মক্কা ত্যাগের আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা (ওয়াজিব)। জমজমের পানি পান করুন। এই তাওয়াফের পর সাঈ করতে হবে না। বিদায়ী তাওয়াফের পরও নফল তাওয়াফ করা যায়।

ঈদুল আযহা ও কুরবানী

যে ব্যক্তির নিকট কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জ এর নতুন চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে। -সহীহ মুসলিম ৪৯৫৯ 
.
শপথ দশ রাত্রির। -আল ফাজর ৮৯:২
.
আর স্মরণ কর আল্লাহকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি দিনে। -আল বাকারা ২:২০৩
.
নবী ﷺ বলেছেনঃ যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল, অনান্য দিনের আমলের তুলনায় উত্তম। তারা জিজ্ঞাসা করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী ﷺ বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যাক্তির কথা স্বতন্ত্র, যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদ করে এবং কিছু্ই নিয়ে আসে না। -সহীহ বুখারী ৯১৮
.
এমন কোন দিন নেই যে দিনগুলোর (নফল) ইবাদাত আল্লাহ্ তা'আলার নিকট যিলহাজ্জ মাসের দশ দিনের ইবাদাত হতে বেশী প্রিয়। এই দশ দিনের প্রতিটি রোযা এক বছরের রোযার সমকক্ষ এবং এর প্রতিটি রাতের ইবাদাত কাদরের রাতের ইবাদাতের সমকক্ষ। -আত তিরমিজী ৭৫৮; ইবনে মাজাহ ১৭২৮ (যইফ)
.
আরাফাত দিবসের সাওম, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। -সহীহ মুসলিম ২৬১৮
.
উম্মে আতিয়্যা (রাঃ) বলেন, ঈদের দিন আমাদের বের হওয়ার আদেশ দেওয়া হত। এমন কি আমরা কুমারী মেয়েদেরকেও অন্দর মহল থেকে বের করতাম এবং ঋতুমতী মেয়েদেরকেও। তারা পুরুষদের পিছনে থাকতো এবং তাদের তাকবীরের সাথে তাকবীর বলতো এবং তাদের দু’আর সাথে দু’আ করত-তারা আশা করত সে দিনের বরকত এবং পবিত্রতা। -সহীহ বুখারী ৯২০
.
দিনগুলোর মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হল, নাহরের (কুরবানীর) দিন। এরপর এর পরবর্তী দিন (মেহেমানদারীর দিন)। -সূনান আবু দাউদ ১৭৬৫
.
অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানী করুন। -আল কাওসার ১০৮:২
.
যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে। -ইবনে মাজাহ ৩১২৩
.
নবী ﷺ বলেছেনঃ আমাদের এ দিনে আমরা সর্ব প্রথম যে কাজটি করবো তা হল সালাত আদায় করবো। এরপর ফিরে এসে আমরা কুরবানী করবো। যে ব্যাক্তি এভাবে তা আদায় করল সে আমাদের নীতি অনুসরণ করল। আর যে ব্যাক্তি আগেই যবাহ করল, তা এমন গোশতরুপে গন্য যা সে তার পরিবার পরিজনের জন্য আগাম ব্যবস্থা করল। এটা কিছুতেই কুরবানী বলে গন্য নয়। -সহীহ বুখারী ৫১৪৭
.
রাসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় দশ বছর থেকেছেন এবং বরাবর (প্রতি বছর) কুরবানী করেছেন। -আত তিরমিজী ১৫০৭
.
রসূলুল্লাহ ﷺ দু' শিংযুক্ত সাদা-কালো বর্ণের দুটি দুম্বা কুরবানী করেন। আমি-তাকে দুম্বা দুটি স্বহস্তে যাবাহ করতে দেখেছি। তিনি ও দু'টির ঘাড়ের পাশে নিজ পা দিয়ে চেপে রাখেন এবং বিসমিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ বলেন। -মুসলিম ৪৯৮২
.
রাসুলুল্লাহ ﷺ কুরবানীর দিন আয়িশা (রাঃ) এর পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করেন। -মুসলিম ৩০৬১
.
নাবী ﷺ এর নিকট কিছু গরুর গোশত আসল। তখন তাকে বলা হল, এগুলো বারীরা (রাঃ) কে সাদাকা দেওয়া হয়েছে। তখন তিনি বললেন, ইহা বারীরার জন্য সাদাকা, আর আমর জন্য হাদিয়া। -মুসলিম ২৩৫৭
.
আমার নামায, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। -আল আনআম ৬:১৬২
.
তোমরা তা হতে খাও। যে অভাবী, মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায়-তাদেরকে খেতে দাও। -সূরা আল-হজ্জ ২২:৩৬
.
নাবী ﷺ বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি কুরবানী করেছে, সে যেন তৃতীয় দিবসে এমতাবস্থায় সকাল অতিবাহিত না করে যে, তার ঘরে কুরবানীর গোশত কিছু পরিমান অবশ্যই থাকে। এরপর যখন পরবর্তী বছর আসল, তখন সাহাবীগন বললেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি সে রূপ করবো যে রূপ গত বছর করেছিলাম? তখন তিনি বললেনঃ তোমরা নিজেরা খাও অন্যকে খাওয়াও এবং সঞ্চয় করে রাখ কেননা, গত বছর তো মানুষের মধ্যে ছিল অভাব অনটন। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, তোমরা তাতে সাহায্য কর। -বুখারী ৫১৭১
.
সে ব্যক্তি পূর্ণ মু’মিন নয়, যে উদরপূর্তি করে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। -মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৪৯৯১
.
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ হে আবূ যার! যখন তুমি (তরকারী) রান্না করবে তখন তাতে পানি বেশী দিবে যাতে ঝোলের পরিমাণ অধিক হয় এবং তোমরা তোমাদের প্রতিবেশীর প্রতি লক্ষ্য রেখো। -মুসলিম ৬৪৪৯
.
যদি আকিল, বালিগ, মুকীম ব্যক্তি ১০ই যিলহাজ্জ ফজর হতে ১২ই যিলহাজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ (৫২.৫ ভরি =৬১২.৩৬ গ্রাম রূপার সমমূল্য) সম্পদের মালিক হয়; তবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
.
রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ নিজের পরিবারের সদস্যদেরকে খাওয়াতেন, এক-তৃতীয়াংশ গরীব প্রতিবেশীদেরকে খাওয়াতেন এবং একতৃতীয়াংশ প্রার্থনাকারীকে দান করতেন।

কুরবানির গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের সদাকা করা এবং এক ভাগ আত্মীয়, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের হাদিয়া করা উত্তম।
এক তৃতীয়াংশ সদকা করতে হবে এমনটি জরুরি নয়। যার সামর্থ্য আছে তিনি এর চেয়ে বেশিও সদকা করতে পারেন। আর যার ঘরে প্রয়োজন রয়েছে তিনি এর চেয়ে কমও সদকা করতে পারেন। মোটকথা, কুরবানীদাতা তার কুরবানীর গোশত কী পরিমাণ নিজে রাখবে, কী পরিমাণ অন্যকে খাওয়াবে, কী পরিমাণ সদকা করবে এবং কী পরিমাণ আগামীর জন্য সংরক্ষণ করবে এগুলো সম্পূর্ণ তার ইচ্ছার ব্যাপার। এই বিষয়টি শরীয়ত কুরবানীদাতার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছে। এখানে অন্য কারো অনুপ্রবেশ অনুমোদিত নয়। শরীয়তের শিক্ষা মোতাবেক প্রত্যেককে তার কুরবানীর বিষয়ে স্বাধীন রাখতে হবে।
https://www.alkawsar.com/bn/article/3401

কুরবানীর জন্য কত মূল্যের পশু কিনবে, সে পশু কোথায় জবাই করবে, গোশত কীভাবে বণ্টন করবে—এ বিষয়গুলো কুরবানীদাতার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কুরবানীদাতা কী পরিমাণ গোশত নিজে রাখবে, কী পরিমাণ সদকা করবে এবং কাকে কাকে বিলি করবে আর কী পরিমাণ আগামীর জন্য সংরক্ষণ করবে— এগুলো কুরবানীদাতার একান্তই নিজস্ব ব্যাপার।
https://www.alkawsar.com/bn/qa/answers/detail/4828

প্রত্যেক কুরবানীর একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে বিতরণের জন্য নিয়ে নেয়া। এরপর সেগুলোকে একত্র করে সমানভাবে ভাগ করে সমাজের প্রত্যেককে অর্থাৎ যারা কুরবানী করেছে আর যারা করেনি সবাইকে একেক অংশ দিয়ে দেওয়া। এটা গলদ তরিকা। যা অবশ্যই সংশোধনযোগ্য।https://www.alkawsar.com/bn/article/2430
.
تَقَبَّلَ اللّٰهُ مِنَّا وَ مِنۡكَ
আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ হ’তে (সৎকর্মগুলো) কবুল করুন।

تَقَبَّلَ اللّٰهُ مِنَّا وَ مِنۡكُمۡ
আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ হ’তে (সৎকর্মগুলো) কবুল করুন।

ঈদুল ফিতর ও সাদাকাতুল ফিতর

আল্লাহর রাসূল ﷺ ‘ঈদুল ফিত্রের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। তিনি তা বিজোড় সংখ্যায় খেতেন। -বুখারী ৯৫৩

নাবী ﷺ বিলাল (রাযি.)-কে সঙ্গে নিয়ে ‘ঈদুল ফিত্রের দিন বের হয়ে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করেন। তিনি এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। -বুখারী ৯৮৯

নাবী ﷺ ‘ঈদের দিন (বাড়ী ফেরার পথে) ভিন্ন পথে আসতেন। -বুখারী ৯৮৬

উম্মু আতিয়্যাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (ঈদের দিন) আমাদেরকে বের হবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তাই আমরা ঋতুমতী, যুবতী এবং তাঁবুতে অবস্থানকারিণী নারীদেরকে নিয়ে বের হতাম। অতঃপর ঋতুমতী মহিলাগণ মুসলমানদের জামা‘আত এবং তাদের দু‘আয় অংশগ্রহণ করতেন। তবে ‘ঈদমাঠে পৃথকভাবে অবস্থান করতেন। -বুখারী ৯৮১

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন আমাদের মধ্যে ছিলেন, তখন আমরা ছোট ও বড় স্বাধীন ও ক্রীতদাস প্রত্যেকের পক্ষ হতে সাদাকাতুল ফিতর বাবদ এক সা' পরিমাণ খাদ্য অথবা এক সা' পনির অথবা এক সা' যব অথবা এক সা' খেজুর অথবা এক সা' কিশমিশ প্রদান করতাম। এভাবেই আমরা তা আদায় করতে থাকি। পরে মুআবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) হাজ্জ অথবা উমরার উদ্দেশ্যে যখন আমাদের নিকট আসলেন তখন তিনি মিম্বরে আরোহণ করে উপস্থিত লোকদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমার মতে সিরিয়ার দু’মুদ গম এক সা' খেজুরের সামান। লোকেরা তা গ্রহণ করে নিলেন। আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি তো যত দিন জীবিত থাকব ঐভাবেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করব, যেভাবে আমি (পূর্বে) আদায় করতাম। -মুসলিম ২১৫৬
.
জনপ্রতি ফিতরা:
এক সা (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) যব/ খেজুর/ কিসমিস/ পনির বা গম/ আটা অথবা সমমূল্য।
.
ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিক হওয়ার পর মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ (৫২.৫ ভরি =595g =৬১২.৩৬ গ্রাম রূপার সমমূল্য) সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। -দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম ৩১৪
.
নিজের এবং নিজের নাবালিগ সন্তানের পক্ষ হতে সাদাকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। বালিগ সন্তানদের ফিতরা পিতার উপর ওয়াজিব নয়। কোন নাবালিগ মেয়েকেও যদি বিবাহ দিয়ে দেওয়া হয় আর সে তার স্বামীর খিদমত করার যোগ্য হয় তাহলে তার ফিতরা পিতার উপর ওয়াজিব হবে না। -ফাতাওয়ায়ে রাহমানিয়া ২:৫৮
.
تَقَبَّلَ اللّٰهُ مِنَّا وَ مِنۡكَ
আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ হ’তে (সৎকর্মগুলো) কবুল করুন।

تَقَبَّلَ اللّٰهُ مِنَّا وَ مِنۡكُمۡ
আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ হ’তে (সৎকর্মগুলো) কবুল করুন।
.

সুদ

যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচা-কেনা সুদের মতই। অথচ আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওলায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। -আল-বাকারা ২:২৭৫
আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদাকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোন অতি কুফরকারী পাপীকে ভালবাসেন না। -আল-বাকারা ২:২৭৬

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও। -আল-বাকারা ২:২৭৮
কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না। -আল-বাকারা ২:২৭৯
আর যদি সে অসচ্ছল হয়, তাহলে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তার অবকাশ রয়েছে। আর সদাকা করে দেয়া তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে। -আল-বাকারা ২:২৮০

হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পর ঋণের লেন-দেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। আর তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে রাখে এবং কোন লেখক আল্লাহ তাকে যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন, তা লিখতে অস্বীকার করবে না। সুতরাং সে যেন লিখে রাখে এবং যার উপর পাওনা সে (ঋণ গ্রহীতা) যেন তা লিখিয়ে রাখে। আর সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং পাওনা থেকে যেন সামান্যও কম না দেয়। অতঃপর যার উপর পাওনা রয়েছে সে (ঋণ গ্রহীতা) যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্তু বলতে না পারে, তাহলে যেন তার অভিভাবক ন্যায়ের সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়। আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী- যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। আর তা ছোট হোক কিংবা বড় তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। এটি আল্লাহর নিকট অধিক ইনসাফপূর্ণ এবং সাক্ষ্য দানের জন্য যথাযথ। আর তোমরা সন্দিহান না হওয়ার অধিক নিকটবর্তী। তবে যদি নগদ ব্যবসা হয় যা তোমরা হাতে হাতে লেনদেন কর, তাহলে তা না লিখলে তোমাদের কোন দোষ নেই। আর তোমরা সাক্ষী রাখ, যখন তোমরা বেচা-কেনা করবে এবং কোন লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা কর, তাহলে নিশ্চয় তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেবেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক জ্ঞানী। -আল-বাকারা ২:২৮২
আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও, তাহলে হস্তান্তরিত বন্ধক রাখবে। আর যদি তোমরা একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে কর, তবে যাকে বিশ্বস্ত মনে করা হয়, সে যেন স্বীয় আমানত আদায় করে এবং নিজ রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না এবং যে কেউ তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা আমল কর, আল্লাহ সে ব্যাপারে সবিশেষ অবহিত। -আল-বাকারা ২:২৮৩

হে মুমিনগণ, তোমরা সুদ খাবে না বহুগুণ বৃদ্ধি করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। -আলে ইমরান ৩:১৩০

আর তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত। -আর-রুম ৩০:৩৯

রাসুলুল্লাহ ﷺ লানত করেছেন, সুদ গ্রহীতার উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও উহার সাক্ষীদ্বয়ের উপর এবং বলেছেন এরা সকলেই সমান। -মুসলিম ৩৯৪৮

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ সুদের গুনাহর সত্তরটি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্তর হলো আপন মাকে বিবাহ (যেনা) করা। -ইবনে মাজাহ ২২৭৪

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জেনে শুনে সুদের কেবলমাত্র একটি রোপ্যমুদ্রা খায়, তার গুনাহ ছত্রিশবার যিনার চেয়ে বেশি হয়। -মিশকাত ২৮২৫

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ যে দেহ হারাম খাদ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়েছে, সে দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। -মিশকাত ২৭৮৭

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, হে লোক সকল! আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করে না।... নাবী ﷺ এক ব্যাক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে, দীর্ঘ সফর করে, যার এলোমেলো চুল ধুলায় ধুসরিত সে আকাশের দিকে দু'হাত তুলে বলে, হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোষাক-পরিচ্ছদ হারাম এবং তাঁর শরীর গঠিত হয়েছে হারামে। অতএব, তাঁর দু’আ কিভাবে কবুল করা হবে? -মুসলিম ২২১৮

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আজ রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, দু’ব্যাক্তি আমার নিকট এসে আমাকে এক পবিত্র ভূমিতে নিয়ে গেল। আমরা চলতে চলতে এক রক্তের নদীর কাছে পৌঁছলাম। নদীর মধ্যস্থলে এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে আছে এবং আরেক ব্যাক্তি নদীর তীরে, তার সামনে পাথর পড়ে রয়েছে। নদীর মাঝখানের লোকটি যখন বের হয়ে আসতে চায়, তখন তীরের লোকটি তার মুখে পাথর খন্ড নিক্ষেপ করে তাকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এভাবে যতবার সে বেরিয়ে আসতে চায় ততবারই তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করছে আর সে স্বস্থানে ফিরে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ কে? সে বলল, যাকে আপনি নদীতে (রক্তের) দেখেছেন, সে হল সুদখোর। -বুখারী ১৯৫৫

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ মিরাজের রাতে আমাকে একদল লোকের নিকট নিয়ে আসা হলো। তাদের পেট ছিল ঘরের মত বিশাল, তার মধ্যে সাপ ভর্তি ছিলো, যা বাইরে থেকে দেখা যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! এরা কারা? তিনি বলেনঃ এরা সুদখোর। -ইবনে মাজাহ ২২৭৩

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, সবশেষে সুদের আয়াত নাযিল হয়। কিন্তু আমাদেরকে বিস্তারিত ব্যাখ্যাদানের আগেই রাসূলুল্লাহ ﷺ ইনতিকাল করেন। অতএব সূদ এবং (সূদের) সন্দেহ সৃষ্টিকারী জিনিস পরিহার করো। -ইবনে মাজাহ ২২৭৬

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মানুষের উপর এমন এক যুগ অবশ্যই আসবে যখন মানুষ পরোয়া করবেনা যে কিভাবে সে মাল অর্জন করল, হালাল থেকে নাকি হারাম থেকে। -বুখারী ১৯৫৩

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ অবশ্যই মানুষ এমন এক যুগের সম্মুখীন হবে যখন তাদের মধ্যে এমন একজনও পাওয়া যাবে না যে সূদখোর নয়। সে সূদ না খেলেও তার ধুলোবালি (মলিনতা) তাকে স্পর্শ করবে। -ইবনে মাজাহ ২২৭৮

আবূ বুরদা (রহঃ) বলেন, আমি মদিনায় গেলাম; আবদুল্লাহ ইবনু সালামের সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। তিনি আমাকে বললেন, তুমি আমাদের এখানে আসবে না? তোমাকে আমি খেজুর ও ছাতু খেতে দেব এবং একটি (মর্যাদাপূর্ণ) ঘরে থাকতে দেব। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি এমন স্থানে (ইরাক) বসবাস কর, যেখানে সুদের কারবার অত্যন্ত ব্যাপক। যখন কোন মানুষের নিকট তোমার কোন প্রাপ্য থাকে আর সেই মানুষটি যদি তোমাকে কিছু ঘাস, খড় অথবা খড়ের ন্যায় নগণ্যবস্তুও হাদীয়া পেশ করে তা গ্রহণ করো না, যেহেতু তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। -বুখারী ৩৫৪২

রাসুলুল্লাহ ﷺ খায়বরে আবস্থানকালে তাঁর নিকট গনীমতের একটা হার উপস্থিত করা হয়। উহাতে পূতি ও স্বর্ন লাগানো ছিলো। হারটি বিক্রি হচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ হারের সাথে লাগানো স্বর্ণের ব্যাপারে আদেশ দান করেন। অতঃপর তা তুলে আলাদা করা হয়। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে বললেন, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ সমান ওযনে বিক্রি করতে হবে। -মুসলিম ৩৯৩০

'বারনী' জাতীয় খেজুর নিয়ে বিলাল (রাঃ) আগমন করলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ কোথেকে এনেছ? বিলাল (রাঃ) বলল, আমাদের নিকট নিম্ন শ্রেনীর খেজুর ছিল আমি তা থেকে দু'সা' এক সা' এর বিনিময়ে বিক্রি করেছি, নাবী ﷺ কে খাওয়ানোর জন্য। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন বললেনঃ হায় আফসোস! এভো প্রত্যক্ষ সুদ, এরূপ করো না, বরং যখন তুমি খেজুর ক্রয় করতে চাও, তখন এটাকে বিক্রি কর, তারপর এর মূল্য দ্বারা খরিদ করো। -মুসলিম ৩৯৩৮

স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, বৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর ও লবনের বিনিময়ে লবন সমান সমান ও নগদ নগদ হতে হবে। এরপর কেউ যদি তা প্রদান করে বা গ্রহণ করে তবে তা সুদে পরিণত হবে গ্রহণকারী ও প্রদানকারী এতে সমপর্যায়ভূক্ত হবে। -মুসলিম ৩৯১৯

কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) বলেনঃ আমি আবদুল্লাহ ইবন আবাস (রাঃ)-কে বলিতে শুনিয়াছি, তাহাকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করিতেছে এমন এক ব্যক্তি সম্বন্ধে যে ব্যক্তি কতিপয় কাতানের পাগড়ী সলফে ক্রয় করিয়াছে। সে সেইগুলিকে কজা করার পূর্বে বিক্রয় করিতে ইচ্ছা করিল তবে ইহা জায়েব কি? ইবন আব্বাস (রাঃ) বলিলেন-ইহা চাঁদির বিনিময়ে চাঁদি ক্রয় করার অনুরূপ। তিনি ইহাকে মাকরূহ বলিলেন।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞাত। আমাদের মতে ক্রেতা যেই মূল্যে উহা ক্রয় করিয়াছে সেই মূল্যের অধিক মূল্যে যাহার নিকট হইতে ক্রয় করিয়াছে তাহারই নিকট উহা বিক্রি করিতে ইচ্ছা করিলে তবে এই বিক্রয় মাকরূহ হইবে। আর যদি যে ব্যক্তির নিকট হইতে উহা ক্রয় করিয়াছে সেই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করে তবে ইহাতে কোন দোষ নাই।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট সর্বসম্মত মাসআলা এই, যে ব্যক্তি সলফে ক্রয় করিয়াছে দাস অথবা জানোয়ার কিংবা পণ্য দ্রব্য। ইহাদের প্রত্যেকটির সঠিক গুণ বর্ণনা করা হইয়াছে, এইসব বস্তুতে সলফ করা হইয়াছে মেয়াদ পর্যন্ত। অতঃপর (সেই) মেয়াদ উপস্থিত হইল, তবে যেই বস্তুতে সলফ করিয়াছে সেই বস্তু কব্জা করার পূর্বে, যেই মূল্যে সলফ করা হইয়াছে সেই মূল্যের অধিক মূল্যে সেই বস্তু যাহার নিকট হইতে (পূর্বে) ক্রয় করিয়াছিল তাহার নিকট ক্রেতা পুনরায় বিক্রয় করিবে না। কারণ যদি এইরূপ করা হয় তবে ইহা সুদ [যাহা হারাম]। ইহা যেন এইরূপ করা হইল; যেমন ক্রেতা বিক্রেতাকে দিরহাম বা দীনার দিল, বিক্রেতা উহা দ্বারা উপকৃতও হইল। তারপর যখন পণ্য ক্রেতার নিকট সোপর্দ করার সময় উপস্থিত হইয়াছে তখন ক্রেতা সেই পণ্য কব্জা করিল না। বরং সে উহাকে পণ্যের মালিকের নিকট যেই মূল্যে সলফ নির্ধারিত হইয়াছিল সেই মূল্যের অধিক মূল্যে বিক্রয় করিল। ফল এই দাঁড়াইল যে, যে বস্তুকে সলফে ক্রয় করিয়াছিল সেই বস্তু মালিকের নিকট ফেরত দিল এবং নিজের পক্ষ হইতে (আরও কিছু) অতিরিক্ত প্রদান করিল।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি পশু কিংবা পণ্যের ব্যাপারে যাহার গুণাগুণ বর্ণনা করা হইয়াছে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য স্বর্ণ কিংবা চাঁদির সলম করিয়াছে। অতঃপর মেয়াদ উপস্থিত হইয়াছে, তবে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কিংবা মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরে ক্রেতার জন্য সেই সামগ্রীকে যেকোন পণ্যের বিনিময়ে বিক্রেতার নিকট বিক্রয় করাতে কোন দোষ নাই। কিন্তু সেই পণ্য যেই পরিমাণই হউক না কেন উহা নগদ প্রদান করিবে; মূল্য বা বিনিময়ে প্রদানে বিলম্ব করিবে না। কিন্তু খাদ্যদ্রব্য হইলে তবে উহাকে কব্জা করার পূর্বে বিক্রয় করা হালাল হইবে না। আর সেই সামগ্ৰী [পশু কিংবা অন্য কোন পণ্য]-কে যাহার নিকট হইতে উহা ক্রয় করিয়াছে সেই লোক ব্যতীত অন্য কাহারো নিকট স্বর্ণ বা চাঁদির কিংবা অন্য কোন পণ্যের বিনিময়ে বিক্রয় করা ক্রেতার জন্য জায়েয হইবে উহাকে (সেই মুহূর্তে) কব্জা করিবে। উহা কব্জা করিতে বিলম্ব করিবে না। কারণ বিলম্ব করিলে খারাপ হইবে এবং উহাতে মাকরূহ হইবে। ইহা হইবে যেন ধারকে ধারে বিক্রয় করা। ধারকে ধারে বিক্রয় করার অর্থ হইতেছে কোন ব্যক্তি তাহার ঋণ যাহা অন্য ব্যক্তির জিম্মায় রহিয়াছে তাহা বিক্রয় করিতেছে, যেই ঋণ সে অন্য লোকের নিকট প্রাপ্য সেই ঋণের বিনিময়ে।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন বস্তুতে সলম করিয়াছে, নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত আর সেই বস্তু খাদ্য বা পানীয় দ্রব্য নহে। তবে ক্রেতা উহাকে যাহার নিকট ইচ্ছা মুদ্রা কিংবা পণ্যের বিনিময়ে উহাকে পূর্ণ কব্জা করার পূর্বে যাহার নিকট হইতে উক্ত বস্তু ক্রয় করিয়াছে সে ব্যতীত অন্য লোকের নিকট বিক্রয় করিতে পারবে। কিন্তু যে ব্যক্তির নিকট হইতে ক্রয় করিয়াছে সে ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করা জায়েয হইবে না। তবে (জায়েয হইবে) এমন পণ্যের বিনিময়ে (বিক্রয় করা) যাহাকে (নগদ) কব্জা করিবে, উহা কব্জা করিতে বিলম্ব করিবে না, (অর্থাৎ) ধারে বিক্রয় করিবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যদি সেই (সলমকৃত) দ্রব্য ক্রেতার কব্জায় দেওয়ার সময় উপস্থিত হয় নাই, তবে উহাকে মালিক বিক্রেতা-এর নিকট ভিন্ন জাতের পণ্য যাহার পার্থক্য সুস্পষ্ট এইরূপ পণ্যের বিনিময়ে বিক্রয় করাতে কোন দোষ নাই, উহাকে সঙ্গে সঙ্গে কব্জা করিবে। ইহাতে বিলম্ব করিবে না।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি দীনার কিংবা দিরহাম দ্বারা চারিটি গুণ ও পরিচয় বর্ণিত বস্ত্রের ব্যাপারে সলম্ করিয়াছে-নির্দিষ্ট মেয়াদে, যখন মেয়াদ-এর (শেষ) সময় উপস্থিত হইল তখন উহার মালিক ক্রেতা উহা তলব করিল, তাহার নিকট সেই বস্ত্র পাওয়া গেল না। বরং (তদস্থলে) পাওয়া গেল সেই জাতীয় বস্ত্র হইতে নিকৃষ্ট রকমের বস্ত্র। বস্ত্র আদায় করা যাহার জিম্মায় সে ক্রেতাকে বলিল, “আপনাকে চার বস্ত্রের পরিবর্তে আমার এই বস্ত্র হইতে আটটি বস্ত্র প্রদান করিব।” ইহাতে কোন দোষ নাই যদি তাহারা উভয়ে পরস্পর পৃথক হওয়ার পূর্বে সেই সব বস্ত্র কব্জা করে। মালিক (রহঃ) বলেন, যদি ইহাতে মেয়াদ প্রবেশ করে (অর্থাৎ নগদ আদান-প্রদান না করিয়া ধারে বিক্রয় হয়)। তবে উহা জায়েয হইবে না। আর যদি মেয়াদ (এর শেষ সময়) আসার পূর্বে এইরূপ (চার বস্ত্রের পরিবর্তে আটটি বস্ত্র গ্রহণ করা) হয়, তবে ইহাও জায়েয হইবে না। কিন্তু যদি যেই বস্ত্রে সলম করা হইয়াছে সেই জাতের বস্ত্র হইতে ভিন্ন জাতের বস্ত্র ক্রেতার নিকট বিক্রয় করা হয় তবে জায়েয হইবে। -মুয়াত্তা মালিক ১৩৫৫
.

ক্রয় বিক্রয়

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন- ‘কোন প্রকারের জীবিকা উত্তম?’ উত্তরে তিনি বললেন— নিজ হাতের কামাই এবং সৎ ব্যবসায়।
-বুলুগুল মারাম ৭৮২
.
নিজ হাতে উপার্জিত জীবিকার খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায়না। আল্লাহর নাবী দাউদ (আলাইহিস সালাম) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।
-সহীহ বুখারী ১৯৪২
.
সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নাবী, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে।
-সূনান তিরমিজী ১২১২ (যঈফ)
.
বনূ আনমারের মাতা কাইলা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন উমরা আদায়কালে মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একজন ব্যবসায়ী নারী। আমি কোন জিনিস কিনতে চাইলে আমার ইপ্সিত মূল্যের চেয়ে কম দাম বলি। এরপর দাম বাড়িয়ে বলতে বলতে আমার ইপ্সিত মূল্যে গিয়ে পৌঁছি। আবার আমি কোন জিনিস বিক্রয় করতে চাইলে ইপ্সিত মূল্যের চাইতে বেশি মূল্য চাই। এরপর দাম কমাতে কমাতে অবশেষে আমার ইপ্সিত মূল্যে নেমে আসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে কাইলা! এরূপ করো না। তুমি কিছু কিনতে চাইলে তোমার ইপ্সিত মূল্যই বলো, হয় তোমাকে দেয়া হবে নয় দেয়া হবে না। তিনি আরো বলেনঃ তুমি কোন কিছু বিক্রয় করতে চাইলে তোমার ইপ্সিত দামই চাও, হয় তুমি দিলে অথবা না দিলে।
-সুনানে ইবনে মাজাহ ২২০৪ (যঈফ)
.
এক সঙ্গে ঋণ ও বিক্রি হালাল নয়। এক বিক্রিতে দুই ধরণের শর্ত করা এবং যিমান’ বা লোকসানের দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত লাভ জাইয নয়। আর তোমার হাতে যা নেই তা বিক্রি করাও বৈধ নয়।
-সূনান তিরমিজী ১২৩৭; ইবনু মাজাহ ২১৮৮
.
তোমরা অগ্রগামী হয়ে কাফেলার সাথে মিলিত হয়ো না। যদি কেউ এরূপ অনুগামী হয়ে সাক্ষাত করে এবং তার থেকে (কোন বস্তু) খরিদ করে তবে মালিক (বিক্রিতা) বাজারে পৌঁছার পর (বিক্রয় বহাল রাখা বা বাতিল করার ব্যাপারে) তার ইখতিয়ার থাকবে।
-সহীহ মুসলিম ৩৬৮১
.
শহরের লোক গ্রামের লোকের পক্ষ হয়ে বিক্রয় করতে পারবে না। লোকেদের একজনের দ্বারা অপরজনের রিযকের যে সুবিধা আল্লাহ সৃষ্টি করে রেখেছেন সে ব্যবস্থা চালু থাকতে দাও।
-সহীহ মুসলিম ৩৬৮৪
.
কোন ভাইয়ের দরদাম করার সময় কেউ যেন দরদাম না করে।
-সহীহ মুসলিম ৩৬৭২
.
খরিদ করার ইচ্ছা ব্যতীত মুল্য বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে দাম বলতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।
-সহীহ মুসলিম ৩৬৭৬
.
যে ব্যক্তি ওলান ফুলান বকরী ক্রয় করবে, তিন দিন পর্যন্ত তার জন্য অবকাশ থাকবে। ইচ্ছা করলে রাখতে পারে, আর যদি ফেরত দেয় তবে সে সাথে এক সা' খেজুরও দিবে।
-সহীহ মুসলিম ৩৬৮৯

হাদিয়া দাওয়াত

শরীয়তের দৃষ্টিতে হাদিয়া বলা হয়, কোনো বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছুর মালিক বানিয়ে দেওয়া। -বারো মাসের করণীয় বর্জনীয় ২৩৩
.
উসমান রা.-কে একব্যক্তি খতনা অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে। তিনি অস্বীকার করে বলেন, 'আমরা রাসুলের যুগে খতনা অনুষ্ঠানে যেতাম না এবং দাওয়াতও করা হতো না। -মুসনাদু আহমাদ ১৭৯০৮
-বারো মাসের করণীয় বর্জনীয় ১১৬
.
হাদিয়া বলা হয় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আন্তরিক প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ যা অন্যকে দেয়া হয়।
যেসব ক্ষেত্রে কিছু দেয়ার জন্য আল্লাহ বা তাঁর রসূলের (সাঃ) তরফ থেকে নির্দেশ বা উৎসাহ রয়েছে এবং সওয়াবের নিয়তে দেওয়া হয়, সেগুলোকে সদকা বলা হয়। ফরয যাকাতও সদকার অন্তর্ভুক্ত।
-দান-সদকা ৮৩:২০৮
.
মৃতব্যক্তির রুহের মাগফেরাতের নিয়তে কোন খানার ব্যবস্থা করা হলে সেটা একান্তভাবেই গরীবের হক হয়ে যায়। যারা সদকা-ফেতরা খাওয়ার যোগ্য তাঁরাই কেবলমাত্র সেই খানা খেতে পারেন। ধনীদের পক্ষে এ খানা খাওয়া জায়েয হবে না।
যদি এই খানা মৃতব্যক্তির রুহের মাগফেরাত নিয়তে না হয়ে নিতান্তই দেশাচার পালনের নিয়তে হয় তবে অবশ্য অন্য কথা।
কিন্তু তার মধ্যে প্রশ্ন থেকে যায় যে, মৃত ব্যক্তিকে উসিলা করে এরূপ একটি খানা কেন তৈরী করা হলো? কারো মৃত্যুর ঘটনাটা কি আনন্দের – যে এজন্য আত্মীয়-স্বজন, পাড়া পড়শী নিয়ে ভোজ উৎসব করতে হবে?
মৃত ব্যক্তির জন্য ইসালে সওয়াব এবং রুহের মাগফেরাত কামনার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে মিসকীনকে খানা খাওয়ানো, এতীম-অসহায়দের পুনর্বাসনে অর্থদান এবং দ্বীনি এলেমের প্রচার-প্রসারে সহায়তা করা।
-দান-সদকা ৮৬:২২০

মুহিউদ্দীন খান; রোযা, যাকাত ও অন্যান্য প্রসঙ্গ; মদীনা পাবলিকেশান্স
mashikmadina.files.wordpress.com/2014/10/5-daan-sadka.pdf