তাসাউফের আশগাল (কার্যাদি) ও তরীকতের আমল শুধুমাত্র পরিপূর্ণ শরীয়ত পালন ও ইখলাস অর্জনের মাধ্যম। এছাড়া যতকিছু কলবী হালত, কাশফ, নূর, দর্শন, গায়েবী জগত অবলোকন সবই অর্থহীন। এগুলো তাসাউফের উদ্দেশ্য নয় । উপরন্তু এগুলোর অর্জন আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার কোনোরূপ আলামত নয়। কোনো ফাসেক, এমনকি কাফের মুশরিকও তাসাউফের আশগাল পালন করে বিভিন্ন হালত, তাজাল্লী, কাশফ ও দর্শন লাভ করতে পারে। এগুলো কখনো কামালাতের বা সঠিকত্বের প্রমাণ নয় ৷
-এহইয়াস সুনান ৪৮৪
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ১৪, মাকতুব ৭]
[সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী; সেরাতে মুস্তাকীম পৃ ৫১]
.
মুস্তাহাবের প্রতি লক্ষ রাখা এবং মাকরূহ যদিও উহা ‘তানজিহী' হয় তাহা হইতে বিরত থাকা যিক্র মোরাকাবা ইত্যাদি হইতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৪
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৫৭-৫৮, মাকতুব ২৯]
.
ইহকালের ও পরকালের যাবতীয় সৌভাগ্যের দায়িত্ব শরীয়তের প্রতিই ন্যস্ত। এরূপ কোনো সৌভাগ্য নাই যে, তাহার জন্য শরীয়ত ব্যতীত অন্য কাহারও শরণাপন্ন হইতে হয়। তরীকত ও হাকীকত যাহা সূফীগণের একচেটিয়া, তাহা শরীয়তের তৃতীয় অংশ ইখলাছের পূর্ণতার সাহায্যকারী খাদেমস্বরূপ । উহাদের দ্বারা শরীয়ত পূর্ণ করাই উদ্দেশ্য, অন্য কিছু নহে ৷
ইতর দৃষ্টিধারী ব্যক্তিগণ লম্ফঝম্পের হালত এবং তাজাল্লী ও আত্মীক দর্শন ইত্যাদিকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করিয়া থাকে।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৩
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৭৯, মাকতুব ৩৬]
.
শরীয়ত তিন ভাগে বিভক্ত। “ইলম’-জানা, ‘আমল’-কার্য করা, 'ইখলাছ' উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা সাধন করা। অতএব, ইখলাছ পূর্ণ করণার্থে তরীকত ও হকীকতদ্বয় শরীয়তের খাদেম তুল্য।
-এহইয়াস সুনান ৪৮১
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৮৫, মাকতুব ৪০]
.
অন্তর্জগত কর্তৃক বহির্জগত পূর্ণ হইয়া থাকে, ইহাদের উভয়ের মধ্যে চুল পরিমাণ ব্যতিক্রম নাই। যথা মুখে মিথ্যা না বলা শরীয়ত এবং অন্তঃকরণ হইতে মিথ্যা বলার কুমন্ত্রণা বিদূরীত করা তরীকত ও হকীকত। উক্ত নিবারণ যদি কৃচ্ছ্রসাধ্য হয়, তবে তাহা ‘তরীকত' এবং যদি সহজসাধ্য ও স্বাভাবিকভাবে হয়, তাহা হকীকত। বস্তুত অন্তর্জগতে যাহা তরীকত ও হকীকত, তাহা বহির্জগত বা শরীয়তের পূর্ণতাকারী।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৩
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ৮৬, মাকতুব ৪১]
.
রোজ কেয়ামতে শরীয়তের প্রশ্ন উত্থিত হইবে; তাসাউফের প্রশ্ন উত্থিত হইবে না। বেহেশতে প্রবেশ এবং দোজখ হইতে রক্ষা পাওয়া শরীয়তের প্রতিই নির্ভরশীল।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৫
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী, মাকতুবাত শরীফ ১/১/পৃষ্ঠা ১০২-১০৩, মাকতুব ৪৮]
.
জুনাইদ বাগদাদীর মৃত্যুর পর তাঁহাকে কেহ স্বপ্নে দেখিয়া তাঁহার অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলেন। তদুত্তরে তিনি বলিলেন ঃ ‘আত্মিক বর্ণনাসমূহ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে এবং ইশারা ইঙ্গিতাদি বিলুপ্ত হইয়াছে। মধ্য রাত্রিতে দুই এক রাক'আত নামায যাহা পাঠ করিতাম, তাহা ব্যতীত আর কিছুই উপকারে আসিল না।'
-এহইয়াস সুনান ৪৮৬
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী; মাকতুবাত শরীফ ১/২/পৃষ্ঠা ৬০-৬১, মাকতুব ১৪৮]
.
চন্দ্র, সুর্যের নূর বা আলো দৃশ্য জগতের বস্তু। তাহা আলমে মেসাল বা আধ্যাত্মিক উপমার জগতে যে নূর পরিদর্শিত হয় তাহা হইতে বহু গুণে শ্রেষ্ঠ।
-এহইয়াস সুনান ৪৮২
[মুজাদ্দিদে আলফি-ই-সানী, মাকতুবাত শরীফ ১/২/পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫, মাকতুব ২১০ ও পৃষ্ঠা ২০১-২০২, মাকতুব ২৩৭]
.
সুলুকের রাস্তায় চলার পথে আমার পথপ্রদর্শক হলো আল্লাহর কালাম। এই দৃষ্টিতে আমার পীর বা মোর্শেদ হলো কুরআন মজীদ। সকলের হাকীকি পীর তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ।
-এহইয়াস সুনান ৪৮৯
[মুজাদ্দিদে আলফে সানী, মাবাদ ওয়াল মা'আদ]
.
৩. মূলত তাসাউফের আশগাল পালনের ফলে যে সকল কলবী অনুভূতি, কাশফ, দর্শন ইত্যাদি লাভ হয় সে বিষয়ে কথাবার্তা বলা বিদ'আত। রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবীগণ কখনো এ ধরনের কলবী অনুভূতি ও হালত নিয়ে কিছু বলতেন না। তবে ক্বলবের মধ্যে শয়তানের ওয়াসওয়াসা, হিংসা, অহংকার, রিয়া ইত্যাদি পাপের প্রবেশের বিষয়ে তাঁরা কথা বলতেন। এ বিষয়ে কথা বলা যায়।
৫. কখনই শরীয়ত বা সুন্নাতের ব্যতিক্রম কোনো বিষয়ে পীরের কথা মানবে না । পীরের মহব্বত যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর বিরোধিতায় নিপতিত করে তাহলে তা ধ্বংসের কারণ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর হক ও মহব্বতের সামনে বাকি সকল কিছুই অস্তিত্বহীন ও মূল্যহীন। পীর থেকে কোনো সুন্নাত বা শরীয়ত বিরোধী কাজ দেখলে তার প্রতিবাদ করতে হবে ও তাঁকে সংশোধন করতে হবে। তিনি যদি সংশোধিত না হন তাহলে দেখতে হবে যে, তার অন্যায়টি আকীদাগত না কর্মগত। আকীদাগত হলে তাঁকে পরিত্যাগ করতে হবে। কর্মর্গত হলে তাঁকে পরিত্যাগ করা জরুরি নয়, তবে তাঁকে বিপদ বা বালাগ্রস্ত মনে করে তার জন্য দোয়া করতে হবে। ঐ বিষয়ে তার অনুসরণ হারাম জেনে তাকে বিপদমুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে চেষ্টা করতে হবে।
-এহইয়াস সুনান ৪৯৬
[সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী; সেরাতে মুস্তাকীম পৃ ৫১-৬৬]