আল আক্বীদাহ আত-ত্বহাবীয়া

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আক্বীদাহ (আল আক্বীদাহ আত-ত্বহাবীয়া)

নিশ্চয়ই আল্লাহ এক, যার কোনো শরীক নেই।

তার সদৃশ কোন কিছুই নেই।

কোন কিছুই তাকে অক্ষম করতে পারে না।

তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই।

তিনি আল আউয়াল (সর্ব প্রথম), যার কোনো শুরু নেই। তিনি অনন্ত-চিরন্তন, যার কোনো অন্ত নেই।

তার ধ্বংস নেই, তিনি ক্ষয়প্রাপ্তও হবেন না।

আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া অন্য কিছু হয় না।

কল্পনা ও ধারণাসমূহ তার ধারে কাছে পৌঁছুতে পারে না। জ্ঞান-বোধশক্তি তাকে উপলব্ধি ও আয়ত্ত করতে পারে না।

সৃষ্টির কোনো কিছুই তার সদৃশ নয়।

তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মারা যাবেন না। চির জাগ্রত, কখনো নিদ্রা যান না।

তিনিই সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টির প্রতি তার কোনো প্রয়োজন ছাড়াই তিনি সৃষ্টি করেছেন। কোনো প্রকার ক্লান্তি ছাড়াই তিনি রিযিকদাতা।

তিনি নির্ভয়ে প্রাণ হরণকারী, তিনি বিনা ক্লেশে পুনরুত্থানকারী।

সৃষ্টি করার বহু পূর্ব থেকেই তিনি তার অনাদি গুণাবলিসহ শ্বাশ্বত সত্তা হিসাবে বিদ্যমান রয়েছেন। আর সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার কারণে তার এমন কোনো নতুন গুণের সংযোজন ঘটেনি, যা সৃষ্টি করার পূর্বে ছিল না। তিনি তার গুণাবলিসহ যেমন অনাদি ছিলেন, তেমনি তিনি স্বীয় গুণাবলিসহ অনন্ত, চিরন্তন ও চিরঞ্জীব থাকবেন।

সৃষ্টি করার পর তার গুণবাচক নাম খালেক (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি। আর সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার কারণে তার গুণবাচক নাম বারী (উদ্ভাবক) হয়নি।

আল্লাহ তা'আলা প্রতিপালন করার বৈশিষ্ট্য ও বিশেষণে বিশেষিত, কিন্তু তিনি কারো দ্বারা প্রতিপালিত নন। তিনি সৃষ্টি করার বৈশিষ্ট্য ও বিশেষণে বিশেষিত, কিন্তু তিনি কারো দ্বারা সৃষ্ট নন। আর মাখলুক সৃষ্টির পূর্বেও তিনি ছিলেন খালেক বা সৃষ্টিকর্তা।

মৃতদেরকে জীবন দান করার পর যেমন তিনি জীবনদানকারী নাম ও বিশেষণে বিশেষিত ঠিক তেমনি তাদেরকে জীবনদান করার পূর্বেও তিনি এই নামের অধিকারী ছিলেন। অনুরূপ তিনি সৃষ্টিকুলের সৃজনের পূর্বেই স্রষ্টা নাম ও গুণের অধিকারী ছিলেন।

এটা এ জন্য যে, তিনি সবকিছুর উপর সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান। প্রত্যেক সৃষ্টিই তার মুখাপেক্ষী এবং সব কিছুই তার জন্য সহজ। তিনি কোনো কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। তার মত কিছুই নেই; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

তিনি স্বীয় জ্ঞানে সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন

তিনি তাদের জন্য তাক্বদীর (সব কিছুরই পরিমাণ) নির্ধারণ করেছেন।

তিনি তাদের মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করেছেন।

সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টির পূর্বে কোনো কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না। এমনিভাবে সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টির পূর্বেই তাদের সৃষ্টির পরবর্তীকালের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন।

তিনি তাদেরকে তার আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন এবং তার অবাধ্যাচরণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

সবকিছু তার নির্ধারণ এবং ইচ্ছা অনুসারে পরিচালিত হয়। তার ইচ্ছাই কার্যকর হয়, তার ইচ্ছা ব্যতীত বান্দার কোনো ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হয় না। অতএব তিনি বান্দাদের জন্য যা চান তাই হয়, আর যা চান না তা হয় না।

আল্লাহ অনুগ্রহ করে যাকে ইচ্ছা, তাকে হেদায়াত, আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। আর যাকে ইচ্ছা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পথভ্রষ্ট করেন, অপমানিত করেন ও বিপদগ্রস্ত করেন।

আর সকলেই আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে এবং সবাই তারই অনুগ্রহ ও ন্যায়বিচারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

তিনি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমকক্ষ হওয়ার বহু উর্ধ্বে।

তার ফয়সালার কোনো প্রতিহতকারী নেই। তার হুকুমকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করার কেউ নেই এবং তার নির্দেশকে পরাভূত করারও কেউ নেই।

উপরে উল্লিখিত সব কিছুর উপরই আমরা ঈমান এনেছি এবং দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করছি যে, সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে আগত।

নিশ্চয়ই মুহাম্মদ ﷺ তার নির্বাচিত বান্দা, মনোনীত নাবী এবং পছন্দনীয় রসূল।

তিনি নাবীগণের মধ্যে সর্বশেষ নাবী, মুত্তাকীদের ইমাম, রসূলগণের নেতা এবং সৃষ্টিকুলের রবের হাবীব-বন্ধু।

তার পরে যেসব লোক নবুওয়াতের দাবি করবে, তাদের প্রত্যেকের দাবিই ভ্রষ্টতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

তিনি সত্য, হিদায়াত, নূর ও জ্যোতি সহকারে সকল জিন ও সমস্ত মানুষের প্রতি প্রেরিত।

নিশ্চয়ই কুরআন আল্লাহর কালাম। যা আল্লাহর নিকট থেকে কথা হিসেবে শুরু হয়ে এসেছে, তবে এর কোনো ধরণ নির্ধারণ করা যাবে না। এ কালামকে তিনি তার রসূল ﷺ এর প্রতি ওহী হিসাবে নাযিল করেছেন। আর ঈমানদারগণ তাকে এ ব্যাপারে সত্যবাদী বলে মেনে নিয়েছেন। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছেন যে, এটি সত্যিই আল্লাহর কালাম। কোনো সৃষ্টির কথার মত সৃষ্টি নয়। অতএব, যে ব্যক্তি কুরআন শুনে তাকে মানুষের কালাম বলে ধারণা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তার নিন্দা করেছেন, তাকে দোষারোপ করেছেন এবং তাকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের এ ভীতি তা তাকে প্রদর্শন করিয়েছেন যে বলে,
“এটাতো মানুষের কথা বৈ আর কিছুই নয়” (সূরা আল মুদ্দাস্সির ৭৪:২৫)।
অতএব, আমরা জেনে নিলাম ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলাম যে, এ কুরআন মানুষের সৃষ্টিকর্তারই কালাম। আর তা কোনো মানুষের কথার সাথে সাদৃশ্য রাখে না।

যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে মানবীয় কোনো গুণে বিশেষিত করবে, সে কাফির হবে। অতএব, যে ব্যক্তি অন্তরের চোখ দিয়ে এতে গভীর দৃষ্টি প্রদান করবে সে সঠিক শিক্ষা নিতে সক্ষম হবে। আর কাফিরদের মত কুরআনকে মানুষের কথা বলা হতে বিরত থাকবে। আর সে জানতে সক্ষম হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার গুণাবলিতে মানুষের মত নন।

আর জান্নাতীদের জন্য আল্লাহকে দেখার বিষয়টি সত্য। তবে সেই দেখা সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করে নয়, তার পদ্ধতিও আমাদের অজানা। যেমনটি আমাদের রব কুরআন ঘোষণা করেছে, “সেদিন অনেক মুখমণ্ডল আনন্দোজ্জল হবে, সেগুলো তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে” (সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:২২-২৩)। এ দেখার ব্যাখ্যা হলো, একমাত্র আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা করেন এবং যেভাবে তিনি জানেন সেভাবেই এটি অর্জিত হবে। আর এ সম্পর্কে যা কিছু ছহীহ হাদীছে রসূলুল্লাহ ﷺ হতে বর্ণিত হয়েছে, তা যেভাবে তিনি বলেছেন সেভাবেই গৃহীত হবে। তিনি যা উদ্দেশ্য করেছেন সেটিই ধর্তব্য হবে। এতে আমরা আমাদের নিজস্ব মতের উপর নির্ভর করে কোনো অপব্যাখ্যা করবো না এবং আমাদের প্রবৃত্তির প্ররোচনায় তাড়িত হয়ে কোনো অযাচিত ধারণার বশবর্তী হবো না। কারণ কোনো ব্যক্তি কেবল তখনই তার দীনকে ভ্রষ্টতা ও বক্রতা থেকে নিরাপদ রাখতে পারে, যখন সে মহান আল্লাহ এবং তার রসূল ﷺ এর নির্দেশনার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পন করবে। আর সংশয়ের ব্যাপারসমূহকে আল্লাহর দিকেই ফিরিয়ে দিবে।

পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার করা ব্যতীত কারও পা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা করবে যা তার জ্ঞানের নাগালের বাইরে এবং যার বুঝ বশ্যতা স্বীকারে সন্তুষ্ট হবে না, তার সেই ইচ্ছা তাকে নির্ভেজাল তাওহীদ, স্বচ্ছ মারেফত ও বিশুদ্ধ ঈমান হতে বঞ্চিত রাখবে। ফলে সে কুফরী ও ঈমান, সত্যায়ন ও মিথ্যায়ন, স্বীকৃতি প্রদান ও অস্বীকৃতি, সন্দেহ-পেরেশান এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অনিশ্চয়তার বেড়াজালে ঘুরপাক খেতে থাকবে। সে না সত্যবাদী মুমিন হবে, আর না অস্বীকারকারী মিথ্যাবাদী হবে।

জান্নাতীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার দিদার-সাক্ষাৎ লাভের উপর ঐ ব্যক্তির ঈমান আনয়ন বিশুদ্ধ হবে না, যে কোনো ধারণার বশবর্তী হবে, অথবা নিজের বুঝ অনুসারে সেই দিদারের তাবীল করবে বা ভুল ব্যাখ্যা দিবে। কারণ আল্লাহকে দেখার বিষয়টি এবং রবের অন্যান্য গুণাবলির বিষয়ের ব্যাপারে প্রকৃত কথা হচ্ছে ঐগুলোর কোনোরূপ তাবীল করার অপচেষ্টা না করে যেভাবে এসেছে সেভাবেই অবিকৃতভাবে গ্রহণ করা। এটাই হচ্ছে মুসলিমদের দীন। যে ব্যক্তি রবের জন্য সুসাব্যস্ত গুণাবলিকে অস্বীকার করা এবং সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তার সাদৃশ্য বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকবে না, তার নিশ্চিত পদস্খলন ঘটবে ও সে সঠিকভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণায় ব্যর্থ হবে। আমাদের মহান রব একক ও নজীরবিহীন হওয়ার গুণে গুণান্বিত। মাখলুকের মধ্যে কেউ তার গুণে ভূষিত নয় ৷

আর আল্লাহ তা'আলা সীমা, পরিধি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সাজ-সরঞ্জাম, উপাদান-উপকরণ ও যন্ত্রপাতির সাহায্য নেয়ার অনেক উর্ধ্বে। সকল সৃষ্ট বস্তুকে যেমন ছয়টি দিক পরিবেষ্টন করে রাখে, দিকসমূহ তাকে সেভাবে পরিবেষ্টন করতে পারে না।

আর মিরাজ সত্য, নাবী ﷺ কে রাতের বেলা আকসায় ভ্রমণ করানো হয়েছিল। অতঃপর তাকে জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে ঊর্ধ্ব আকাশে উত্থিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে আরো ঊর্ধ্বে নেয়া হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছা অনুসারে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং তাকে যা প্রত্যাদেশ করার ছিল তা করেছেন। তিনি যা দেখেছেন তার অন্তর তা মিথ্যা বলেনি। সুতরাং আল্লাহ তার উপর আখেরাতে এবং দুনিয়ার জগতে দরুদ ও সালাম পেশ করুন।

আর হাউয যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তার নাবী ﷺ কে তার উম্মতের পিপাসা নিবারণার্থে প্রদান করে সম্মানিত করেছেন, তা অবশ্যই সত্য।

আর নাবী ﷺ এর শাফা'আত সত্য। যা তিনি উম্মতের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। যেমনটি বিভিন্ন হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা আদম এবং তার সন্তানদের কাছ থেকে যেই অঙ্গীকার (মী-ছাক) গ্রহণ করেছেন তা সত্য।

মহান আল্লাহ আদি থেকেই জানেন, সর্বমোট কত সংখ্যক লোক জান্নাতে যাবে আর কত সংখ্যক লোক জাহান্নামে যাবে। এ সংখ্যায় কোনো কমবেশী হবে না। অর্থাৎ এ সংখ্যা কমবেও না, বাড়বেও না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা মানুষের কৃতকর্ম সম্পর্কে পূর্ব হতেই অবহিত।

যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার জন্য সহজসাধ্য করে দেওয়া হয়েছে।

শেষ কর্ম দ্বারা মানুষের কৃতকার্যতা বিবেচিত হবে এবং সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়ছালায় ভাগ্যবান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আর হতভাগা সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর ফায়ছালায় হতভাগা বলে নির্ধারিত হয়েছে।

তাক্বদীর সম্পর্কে আসল কথা হলো, এটা সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর একটি রহস্য; যা নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত কোনো নাবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া ব্যর্থ হওয়ার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমালংঘনের ধাপ। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা হতে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাক্বদীর সম্পর্কিত জ্ঞান তার সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন এবং তাদেরকে এর উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, “তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হবে না, বরং তারা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা আল আম্বিয়া ২১:২৩)।" অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞেস করবে তিনি কেন এ কাজ করলেন? সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।

তাক্বদীর বিষয়ে যা জানা ও যার উপর ঈমান আনয়ন করা প্রয়োজন উপরোক্ত আলোচনায় সংক্ষিপ্তভাবে তা বিধৃত হয়েছে। আল্লাহর ওলীদের মধ্যে যার অন্তর জ্যোতিদীপ্ত তার জন্য এতটুকু জানাই প্রয়োজন। আর এটিই হচ্ছে জ্ঞানে সুগভীর প্রজ্ঞাবানদের স্তর। ইলম দুই প্রকার। (১) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান। (২) যে জ্ঞান সৃষ্ট জীবের নিকট বিদ্যমান নয়। বিদ্যমান ইলমকে অস্বীকার করা যেমন কুফরী, অবিদ্যমান জ্ঞানের দাবী করাও তেমনি কুফরী। বিদ্যমান ইলম কবুল করা, আর অবিদ্যমান জ্ঞানের অন্বেষণ করা হতে বিরত থাকা ব্যতীত কারো ঈমান সুদৃঢ় বিশুদ্ধ হবে না।


আর আমরা লাওহে মাহফুযে ঈমান রাখি, আরও ঈমান রাখি কলমের উপর। আর যা আল্লাহ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তার সবকিছুতে। যা সংঘটিত হবে বলে আল্লাহ এ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন তা যদি সকল সৃষ্ট জীব একত্রিত হয়েও রোধ করতে চায় তারা সেটা করতে সক্ষম হবে না। পক্ষান্তরে, তাতে যে বিষয় সংঘটিত হবার কথা তিনি লিখেননি, সমস্ত সৃষ্টজীব একত্রিত হয়েও তা ঘটাতে পারবে না। ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত যা ঘটবে তা লিপিবদ্ধ হয়ে কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। যা বান্দার নসীবে লিখা হয়নি, তা সে কখনই পাবে না আর যা বান্দার নসীবে লেখা আছে, তা কখনই বাদ পড়বে না।

বান্দার একথা জেনে রাখা উচিত যে, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যাবতীয় ঘটনাবলী সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ব হতে অবহিত। অতএব, তিনি সেটাকে অকাট্য ও অবিচল তাক্বদীর হিসাবে নির্ধারিত করেছেন। আসমান ও যমীনের কোনো মাখলুক এটাকে বানচালকারী অথবা এর বিরোধিতাকারী নেই, অনুরূপ একে কেউ অপসারণ অথবা পরিবর্তন করতে পারবে না, একে সংকোচন কিংবা পরিবর্ধনও করতে পারবে না। আর এটাই হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা, মারেফাতের মূলবস্তু এবং আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও রুবুবিয়াত সম্পর্কে স্বীকৃতি দান। যেমন আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যথাযথ অনুপাত অনুসারে পরিমিতি প্রদান করেছেন (সূরা আল ফুরকান ২৫:৩)। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেছেন: আল্লাহর বিধান সুনির্ধারিত (সূরা আল আহযাব ৩৩:৩৮)। অতএব, ঐ ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য যে ব্যক্তি তাক্বদীর সম্পর্কে আল্লাহর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছে এবং রোগক্রান্ত অন্তর নিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই সে স্বীয় ধারণা অনুসারে গায়েবের একটি গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে এবং এ সম্পর্কে সে যা মন্তব্য করেছে তার ফলে সে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীতে পরিণত হয়েছে।

আর আরশ এবং কুরসী সত্য।

আর আল্লাহ তা'আলা আরশ এবং অন্যান্য বস্তু থেকে অমুখাপেক্ষী।

তিনি সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সব কিছুরই উর্ধ্বে। সৃষ্টিজগত তাকে পূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে অক্ষম।

আমরা আরও বলি যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কথোপকথন করেছেন, এর প্রতি পূর্ণ ঈমান রেখে, এর সত্যতা স্বীকার করে এবং তাকে পরিপূর্ণভাবে মেনে নিয়ে।

আর আমরা মালাঈকা বা ফেরেশতা ও নাবীগণের উপর বিশ্বাস করি এবং রসূলগণের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের উপরও বিশ্বাস করি। আমরা সাক্ষ্য দেই যে, তারা সুস্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

আমাদের কিবলার যে সমস্ত লোক নাবী ﷺ যেই দীন নিয়ে এসেছেন তার স্বীকৃতি দেয় এবং তার সকল কথা ও খবরকে সত্য বলে বিশ্বাস করে আমরা তাদেরকে মুসলিম ও মুমিন মনে করি।

আমরা আল্লাহর ব্যাপারে অযথা তর্ক করি না এবং আল্লাহর দীন নিয়ে ঝগড়া করি না।

আমরা কুরআন নিয়ে বিতর্ক করি না। আমরা সাক্ষ্য দেই যে, কুরআন আল্লাহর কালাম। জিবরীল আমীন তা নিয়ে অবতরণ করেছেন এবং সায়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ ﷺ কে তা শিক্ষা দিয়েছেন। কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম। মাখলুকের কোন কালাম এর সমান হতে পারে না। আমরা বলি না যে কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি। আর আমরা মুসলিম জামা'আতের বিরুদ্ধাচরণ করি না।

আহলে কিবলার কেউ কোন গুনাহ করলেই আমরা তাকে কাফির বলি না। যতক্ষণ না সে হালাল মনে করে সে গুনাহয় লিপ্ত হয়।

আর এ কথাও বলি না যে, ঈমান আনয়নের পর কেউ গুনাহ করলে তাতে ঈমানের কোন ক্ষতি হয় না।

মুমিনদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদের জন্য আমরা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ কামনা করি এবং তার রহমতে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর আশা করি। তবে তাদেরকে সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত মনে করি না এবং তাদের জন্য নিশ্চিতরূপে জান্নাতের সাক্ষ্যও প্রদান করি না। আর মুমিনদের মধ্যে যারা গুনাহগার, তাদের জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করি, তাদের উপর আযাবের আশঙ্কা করি। তবে তাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করি না।

আল্লাহর আযাব থেকে নিরাপদ মনে করা এবং তার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া বান্দাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। মুসলিমদের জন্য উভয়ের মাঝখানে অর্থাৎ আল্লাহর আযাবের ভয় এবং তার রহমতের আশা করার মধ্যেই সঠিক পথ।

বান্দাকে যে বিষয় ঈমানে দাখিল করেছে, তা অস্বীকার ব্যতীত সে ঈমান থেকে খারিজ-বের হবে না।

জবানের স্বীকারোক্তি, অন্তরের বিশ্বাস এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আমল করার নাম ঈমান।

শরী'আতের যত বিষয় রসূল ﷺ হতে ছহীহ- বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে তার সবই সত্য।

ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস হয়। আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, কুপ্রবৃত্তি দমন এবং উত্তম আমলের মাধ্যমে মুমিনদের মর্যাদার পার্থক্য হয়।

সকল মুমিনই আল্লাহর ওলী (বন্ধু)। মুমিনদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত হচ্ছে ঐ মুমিন, যে সর্বাধিক অনুগত এবং কুরআনের অনুসরণে সর্বাধিক অগ্রগামী

ঈমান হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান, ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, তার রসূলদের প্রতি ঈমান, আখেরাতের প্রতি ঈমান এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের ও মিষ্টতা-তিক্ততার প্রতি ঈমান আনয়ন করা।

আমরা ঈমানের সকল বিষয়ের প্রতিই বিশ্বাস করি। রসূলদের মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য করি না। তারা যা নিয়ে এসেছেন, তাতে তাদের সকলকেই বিশ্বাস করি।

উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্য হতে তাওহীদে বিশ্বাসী যেসব লোক কবীরা গুনাহ্য় লিপ্ত হবে, তারা মৃত্যুর পর চিরকাল জাহান্নামে থাকবে না। যদিও তারা তাওবা না করেই মৃত্যুবরণ করে। বিশেষ করে যখন তারা আল্লাহর মারেফাতসহ তার সাথে সাক্ষাত করবে (মৃত্যু বরণ করবে)। তাদের ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুমের আওতায়। তিনি ইচ্ছা করলে তাদের গুনাহসমূহ ঢেকে রাখবেন এবং স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তার কিতাবে বলেন: এ ছাড়া অন্যান্য যত গুনাহ হোক না কেন তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন (সূরা আন নিসা ৪:৪৮)। আর তিনি যদি চান, স্বীয় ইনসাফে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে তাকে শাস্তি দিবেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমতে এবং তার অনুগত বান্দাদের শাফা'আতের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। অতঃপর জান্নাতে পাঠাবেন। এটি এ জন্য যে, আল্লাহ তা'আলা তার মারেফতের অধিকারীদের অভিভাবক হয়েছেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদেরকে ঐ সব লোকের মত করেননি, যারা তাকে চিনতে (তার মারেফত হাসিল করতে না পেরে হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং তারা আল্লাহর বেলায়াত অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। হে আল্লাহ! হে ইসলাম ও মুসলিমদের অভিভাবক! তোমার সাথে সাক্ষাত করা পর্যন্ত আমাদেরকে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো।

আমরা আহলে কিবলার প্রত্যেক নেককার ও বদকারের পিছনে ছলাত আদায় করা জায়েয মনে করি এবং তাদের মৃতদের উপর জানাযা জ্বলাত পড়া ও তাদের জন্য দু'আ করাকেও বৈধ জানি।

আমরা কোন মানুষের জন্য অকাট্যভাবে জান্নাতের কিংবা জাহান্নামের ফয়সালা প্রদান করি না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কোন মুসলিম থেকে কুফরী, শির্ক কিংবা নিফাকী প্রকাশিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদেরকে কাফির, মুশরিক এবং মুনাফিক বলি না। আর মুসলিমদের অন্তরের গোপন বিষয়কে আল্লাহ তা'আলার কাছেই সোপর্দ করি।

যার উপর অস্ত্র ধরা আবশ্যক হয়েছে, সে ব্যতীত উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্য কোন লোকের উপর আমরা অস্ত্র ধরা বৈধ মনে করি না।

আমরা আমাদের ইমাম ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ও অস্ত্র ধারণ করা বৈধ মনে করি না, যদিও তারা যুলুম করে। তাদের উপর বদদু'আও করি না। তাদের থেকে আমরা আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নেই না। তাদের আনুগত্য করাকে আমরা আল্লাহর আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত ও ফরয মনে করি। যতক্ষণ না তারা পাপ কাজের আদেশ করে। আমরা তাদের সংশোধন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করি।

আমরা সুন্নাহ ও জামা'আতের অনুসরণ করি। জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, দলাদলি করা ও ফির্কাবন্দী হওয়া থেকে দূরে থাকি।

আমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী ও আমানতদারগণকে ভালোবাসি এবং যালেম ও খেয়ানতকারীদেরকে ঘৃণা করি।

যে বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট, সে বিষয়ে আমরা বলি: আল্লাহই এ ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত।

হাদীছের বর্ণনা অনুযায়ী আমরা সফরে বা গৃহে অবস্থানকালে মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ মনে করি।

ভালো-মন্দ সকল মুসলিম শাসকের অধীনে হজ্জ করা ও জিহাদ করা ক্বিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। কোন কিছুই এ দু'টি কাজকে বাতিল বা রহিত করতে পারবে না।

আমরা কিরামুন-কাতিবীন (সম্মানতি লেখকবৃন্দ) ফেরেশতাদ্বয়ের উপর ঈমান রাখি। আল্লাহ তা'আলা তাদরেকে আমাদরে উপর পর্যবেক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করেছেন।

আমরা সৃষ্টিকুলের রূহসমূহ কবয করার দায়িত্বে নিয়োজিত মালাকুল মাউত এর উপরও ঈমান রাখি।

আমরা কবরের আযাবের প্রতিও ঈমান রাখি। আরো বিশ্বাস করি যারা এই আযাবের যোগ্য কেবল তাদেরকেই এই শাস্তি দেয়া হবে। নাকীর-মুনকার ফেরেশতাদ্বয় কবরে যে প্রশ্ন করবেন, তার প্রতিও আমরা ঈমান রাখি। তারা প্রশ্ন করবেন বান্দার রব সম্পর্কে, দীন সম্পর্কে এবং তার নাবী সম্পর্কে। এ বিষয়গুলো রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ওয়াসাল্লাম এবং ছাহাবায়ে কেরাম ( ) হতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে আমরা ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করি।

কবর জান্নাতের বাগিচাসমূহের অন্যতম একটি বাগিচা অথবা তা জাহান্নামের গর্তসমূহের অন্যতম একটি গর্ত।

আমরা পুনরুত্থান, ক্বিয়ামাত দিবসে আমলের প্রতিফল, আল্লাহর সমীপে বান্দার আমলনামা পেশ করা, হিসাব নিকাশ, আমলনামা পাঠ করা, বান্দার আমলের ছাওয়াব ও শাস্তি, পুলছিরাত এবং মীযান- এ সবের উপর ঈমান রাখি।

আমরা আরো ঈমান রাখি যে, জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্বেই সৃষ্ট করা হয়েছে। এ দু'টি কোনো দিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না এবং ক্ষয়প্রাপ্তও হবে না। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত ও জাহান্নামকে অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করার পূর্বে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের জন্য বাসিন্দা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং যাকে ইচ্ছা তার পক্ষ হতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। প্রত্যেকেই সেই কাজ করবে যা তার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেই সে যাবে।

ভালো ও মন্দ উভয়ই বান্দার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেই শক্তি দ্বারা বান্দা কর্ম সম্পাদন করে এবং যেটি আল্লাহর তাওফীকের অন্তর্ভুক্ত, তা কোন বান্দার গুণ হতে পারে না। সেটি কর্ম বাস্তবায়িত করার সময় বিদ্যমান থাকে। এ প্রকার শক্তি (তাওফীক) কেবল আল্লাহরই গুণ (এটি আল্লাহ তার আনুগত্যশীল বান্দাকেই দিয়ে থাকেন)।
আর যে প্রকার শক্তি ও সামর্থ্য বলতে বান্দার সুস্থতা, কাজ করার শক্তি, সক্ষমতা, আমল করার জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঠিক থাকা বুঝায়, তা কর্ম শুরু করার পূর্বেই বিদ্যমান থাকা জরুরী। এটা বান্দার মধ্যে বিদ্যমান থাকলেই বান্দাকে তাকলীফ করা হয় অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ তার উপর প্রযোজ্য হয়, নতুবা নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“তিনি কারো উপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না” (সূরা আল বাকারা ২:২৮৬)।

আল্লাহর বান্দারা যে সমস্ত কাজ-কর্ম সম্পাদন করে, সেগুলোর স্রষ্টাও আল্লাহ। বান্দা শুধু তা অর্জন করে।

আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের উপর তাদের সামর্থ্যের অধিক দায়িত্বভার ন্যস্ত করেননি। আর আল্লাহ তাদেরকে যা করার শক্তি দিয়েছেন, তারা কেবল তাই করতে সক্ষম। আর এটিই হচ্ছে এর ব্যাখ্যা। অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউ কোনো অন্যায় কর্ম করা হতে বিরত থাকতে পারে না এবং আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউ সৎ কাজ করারও ক্ষমতা রাখে না। তাই আমরা বলি যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সাহায্য ছাড়া আল্লাহর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকার কারো কোন কৌশল, কোন শক্তি এবং কোন ক্রিয়া ফলপ্রসু হয় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার তাওফীক ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করার এবং তার উপর দৃঢ় থাকার কারো কোন সাধ্য নেই।

সৃষ্টির প্রত্যেক জিনিস আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা, তার জ্ঞান, তার ফায়ছালা এবং তার তাক্বদীর অনুসারেই সংঘটিত হয়। তার ইচ্ছা সমস্ত ইচ্ছার উপর জয়লাভ করে এবং তার অভিপ্রায় সমস্ত অভিপ্রায়ের উপর জয়যুক্ত হয়। তার ফয়সালা সৃষ্টির সকল কলা-কৌশলকে পরাভূত করে। আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা তাই করেন। তিনি কখনো কারো উপর অত্যাচার করেন না। তিনি সর্ব প্রকার কলুষতা ও কালিমা হতে পবিত্র এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত। তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। পক্ষান্তরে, বান্দাদের সকলেই তাদের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে (সূরা আল আম্বিয়া ২১:২৩)।

জীবিত ব্যক্তিদের দু'আ এবং দান খয়রাত দ্বারা মৃত বক্তিরা উপকৃত হয়।

আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের দু'আ কবুল করেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করেন।

আল্লাহ তা'আলা সব কিছুরই মালিক এবং তার মালিক কেউ নয়। মুহূর্তের জন্যও কারো পক্ষে আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি মুহূর্তের জন্য আল্লাহর অমুখাপেক্ষী মনে করবে, সে কাফির হয়ে যাবে এবং লাঞ্ছিত হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রাগান্বিত হন এবং সন্তুষ্ট হন, তবে তার রাগান্বিত হওয়া ও সন্তুষ্ট হওয়া কোনো মাখলুকের রাগান্বিত হওয়া ও সন্তুষ্ট হওয়ার মত নয়।

আর আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর ছাহাবীদেরকে ভালোবাসি। আমরা তাদের কারো ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি করি না এবং তাদের কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি না। যারা ছাহাবীদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদের সমালোচনা করে আমরাও তাদেরকে ঘৃণা করি। আমরা তাদের ভালো কর্মগুলো বর্ণনা করি। ছাহাবীদেরকে ভালোবাসা হচ্ছে দীন, ঈমান ও ইহসান এবং তাদেরকে ঘৃণা করা কুফরী, মুনাফিকী এবং যুলুম ও সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ভুক্ত।

আমরা রসূল ﷺ এর পর সর্বপ্রথম আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের স্বীকৃতি দেই, তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করি এবং তাকে উম্মতের সমস্ত মুসলিমের উপর প্রাধান্য দেই। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খেলাফত সাব্যস্ত করি। অতঃপর উছমান বিন আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খেলাফত সাব্যস্ত করি। অতঃপর আলী বিন আবূ তালেব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর জন্য খেলাফত সাব্যস্ত করি। তারাই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সুপথগামী খলীফা এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম।

রসূল ﷺ যে দশ জন ছাহাবীর নাম উল্লেখ করে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, তার সাক্ষ্য দেয়ার কারণেই আমরা তাদের জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য প্রদান করি। কারণ তার কথা সত্য ও সঠিক। তারা হলেন: আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী, তালহা, জুবাইর, সা'দ, সাঈদ, আব্দুর রাহমান ইবনে আওফ এবং এ উম্মতের আমানতদার আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।

মুহাম্মাদ ﷺ এর ছাহাবী, কলঙ্ক হতে পূত- পবিত্র তার স্ত্রীগণ, প্রত্যেক কদর্যতা হতে পবিত্র তার সন্তান সন্ততিগণ সম্পর্কে যে ব্যক্তি সর্বোত্তম কথা বলবে, সেই কেবল মুনাফিকী হতে নিষ্কৃতি পাবে।

পূর্বে গত হওয়া পূর্বসুরী সালাফদের মধ্যকার আলেম, তাদের পথ অনুসরণকারী সৎকর্মশীল মুহাদ্দিছ এবং জ্ঞানী, গবেষক ফক্বীহদের যথাযথ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি। যারা অসম্মানের সাথে তাদেরকে স্মরণ করে, তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত ও বিপথগামী।

আমরা কোনো ওলীকে কোন নাবী আলাইহিমুস সালাম এর উপর প্রাধান্য দেই না; আমরা বলি: মাত্র একজন নাবী সমস্ত ওলী থেকে শ্রেষ্ঠ।

ওলীদের কারামত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের কারামত সম্পর্কে বিশ্বস্ত লোকদের থেকে ছুহীহ সূত্রে বর্ণিত বিষয়ের উপরও আমরা ঈমান রাখি।

আমরা কিয়ামাতের আলামতসমূহ : যেমন দাজ্জালের আবির্ভাব, আসমান হতে ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর অবতরণ, পশ্চিম গগনে সূর্যোদয় এবং দাব্বাতুল আরদ নামক প্রাণীর স্বীয় স্থান হতে বের হওয়া ইত্যাদির প্রতি ঈমান রাখি।

আমরা কোনো গণক ও জ্যোতিষীকে সত্য বলে বিশ্বাস করি না এবং ঐ ব্যক্তিকেও সত্য বলে মনে করি না, যে আল্লাহর কিতাব, নাবী ﷺ এর সুন্নাত ও উম্মতের ইজমার বিপরীত কিছু দাবী করে।

আমরা মুসলিমদের জামা'আতবদ্ধ থাকাকে সত্য ও সঠিক বলে বিশ্বাস করি এবং জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে গোমরাহী ও আযাবের কারণ মনে করি।

নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে আল্লাহর দীন এক ও অভিন্ন। তা হলো ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন হচ্ছে ইসলাম (সুরা আলে-ইমরান ৩:১৯)। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, “এবং আমি ইসলামকে তোমাদের দীন হিসাবে মনোনীত করলাম (সূরা আল মায়িদা ৫:৩)।

ইসলামের অবস্থান হলো বাড়াবাড়ি ও বিয়োজনের মাঝখানে, (আল্লাহ তা'আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলি সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে) তাশবীহ তথা সাদৃশ্য স্থাপন ও তাতীল তথা অর্থহীন করার মাঝে তার অবস্থান। (তাক্বদীর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে) জাবর তথা ক্ষমতাহীন বাধ্য কিংবা কাদর তথা তা অস্বীকার করার মাঝে তার অবস্থান। অনুরূপ আল্লাহর রহমতের উপর সম্পূর্ণরূপে ভরসা কিংবা তা থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম মধ্যম পন্থার নীতি অবলম্বন করেছে।

এগুলোই হচ্ছে আমাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য দীন-জীবন ব্যবস্থা ও আক্বীদাহ বা বিশ্বাস। অন্তরে বা প্রকাশ্যে আমরা উপরোক্ত বিষয়গুলোকেই দীন হিসাবে গ্রহণ করি। উপরে যা আমরা উল্লেখ করলাম এবং বর্ণনা করলাম, যারাই তার কোনো কিছুর বিরোধিতা করে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনোই সম্পর্ক নেই।
আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল আল্লাহর দিকেই ফিরে যাই। আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং ঈমানের সাথে আমাদের মৃত্যুদান করেন।
আমরা আরো প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে রক্ষা করেন বিভিন্ন প্রকার বিদ'আত, প্রবৃত্তির অনুসরণ, নানা রকম বাতিল মতবাদসমূহ থেকে, যারা সুন্নাত ও জামা'আতের বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং বিভ্রান্তদের পক্ষ নিয়েছে। আমরা তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করছি। আল্লাহর নিকটেই যাবতীয় বিভ্রান্তি হতে নিরাপত্তা এবং সৎপথে চলার তাওফীক কামনা করছি।