উম্মুহাতুল মু'মিনীন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীগণ ‎(رضى الله عنهن)

রাসূলুল্লাহ ﷺ মোট তের জনকে বিয়ে করেছিলেন।
এগারো জন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী, যাদের সাথে তিনি দাম্পত্য জীবন যাপন করেছিলেন।
দুই জনের সাথে নামমাত্র বিয়ে হয়েছিলো। দাম্পত্য জীবন যাপন করা সম্ভব হয়নি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ইনতিকালের পূর্বে দুই জন মারা যান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ইনতিকালের সময় নয় জন জীবিত ছিলেন।
.
১. খাদীজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (কুরাইশ বংশীয়)
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রথমা স্ত্রী। ২৫ বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ৫০০ দিরহাম মতান্তরে বিশটি বকনা উষ্ট্রী  মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেন। ইব্রাহীম ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব কয়টি সস্তান তাঁর গর্ভেই জন্মে। তাঁর পূর্ব স্বামী ছিলেন আবু হালা ইবনে মালিক। তিনি ছিলেন বনু আবদুদ দার গোত্রের মিত্র বনু উসাইদের লোক। আবু হালার স্ত্রী থাকাকালে তাঁর গর্ভে হিন্দ নামে একটি ছেলে ও যয়নাব নামে একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। আবু হালার পূর্বে তাঁর বিয়ে হয় আতীক ইবনে আবিদের সাথে। সেখানেও তাঁর আবদুল্লাহ নামে একটি ছেলে ও জারিয়া নামে একটা মেয়ে জন্মে। নবুয়তের দশম বছরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
.
২. সাওদাহ বিনতে যামআহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (কুরাইশ বংশীয়)
নবুয়তের দশম বছরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে  ৪০০ দিরহাম মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেন। তাঁর পূর্ব স্বামীর নাম সাকরান ইবনে আমর।  ৪৫ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
.
৩. আয়িশাহ বিনতে আবূ বাকর সিদ্দীক (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (কুরাইশ বংশীয়)
দশম নবুওয়াত বর্ষের শাওয়াল মাসে ছয় বছর বয়সে মক্কায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। মদীনায় হিজরাতের পর নয় বৎসর বয়সে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করেন। তিনি ﷺ আয়িশা (রা) ছাড়া আর কোন কুমারী মেয়েকে বিয়ে করেননি। তাঁর পিতা আবু বাকর সিদ্দীক (রা) তাঁকে বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মোহরানা স্বরূপ ৪০০ দিরহাম প্রদান করেন। ৫৭/৫৮ হিজরীর ১৮ রামাযানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
.
৪. হাফসাহ বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (কুরাইশ বংশীয়)
তৃতীয় হিজরীর শাবান মাসে পিতা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে ৪০০ দিরহাম মোহরানায় বিয়ে দেন। পূর্বে তাঁর বিয়ে হয়েছিল খুনাইস ইবনে হুযাফা সাহমীর সাথে। ৪৫ হিজরের শাবান মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
.
৫. যায়নাব বিনতে খুযায়মাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (আরবের বনু খাযায়া গোত্র)
প্রথমে চাচাতো ভাই যাহাম ইবনে আমরের সাথে বিয়ে হয়। পরে উবাইদা ইবনুল হারিসের সাথে বিয়ে হয়। চতুর্থ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে  ৪০০ দিরহাম মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেন। তিন মাস পর রবিউল আখির মাসে মৃত্যুবরণ করেন। ফকীর মিসকীন ও দরিদ্রের প্রতি তাঁর অত্যধিক দয়া ও মমত্ববোধের কারণে তাঁকে উম্মুল মাসাকীন বলা হতো।
.
৬. উম্মে সালামাহ হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (কুরাইশ বংশীয়)
চতুর্থ হিজরীর ২৯ শাওয়ালে তাঁর বিয়ে দেন তাঁরই পুত্র সালামা। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে ১০ দিরহাম ও কিছু সামগ্রী (খেজুরের ছালভর্তি একটি গদি, একটি পেয়ালা, একটি প্লেট ও একটি যাঁতাকল) মোহরানা দেন। তাঁর পূর্ব স্বামীর নাম আবদুল্লাহ আবু সালামা। সেখানে তাঁর চারটি সন্তান জন্মে। যথা : সালামা, উমার, যায়নাব ও রুকাইয়া। ৫৯/৬২ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
.
৭. যায়নাব বিনতে জাহশ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (আরবের বনু আসাদ গোত্র)
পঞ্চম হিজরীর যুল কাদাহ/ চতুর্থ হিজরীতে বিয়ে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মোহরানা দেন ৪০০ দিরহাম। তাঁর পূর্ব স্বামী ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আজাদ করা গোলাম যায়িদ ইবনে হারিসা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)। যায়নাব সম্পর্কেই কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়: “যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে। -আল-আহযাব ৩৩:৩৭।” ২০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ  এর মৃত্যুর পর স্ত্রীদের মধ্যে সর্বপ্রথম মৃত।
.
৮. জুওয়াইরিয়াহ বিনতে হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (বনী মুসতালিক গোত্র) (পঞ্চম/ ষষ্ঠ হিজরীর শাবান মাসে ৪০০০ দিরহাম মোহরে বিয়ে - ৫৫/৫৬ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে মৃত্যু)
.
৯. উম্মে হাবীবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (কুরাইশ বংশীয়)
তাঁর প্রকৃত নাম রমলা। আবিসিনিয়ায় প্রবাসী জীবন যাপন করা অবস্থায় তাঁর পূর্বের স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আসাদী মৃত্যুবরণ করে। সপ্তম হিজরীর মুহাররম মাসে খোদ নাজাশী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পক্ষ থেকে তাঁকে ৪০০ দিনার মোহরানা দিয়ে বিয়ে দেন। ৪২/ ৪৪/ ৫০ হিজরীতে মৃত্যু বরণ করেণ।
.
১০. সাফিয়্যাহ বিনতে হুওয়াই (বনু নাজীর গোত্রের)
৭ম হিজরীতে ইহুদী নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবের কন্যা সাফিয়াকে রাসূলুল্লাহ ﷺ খাইবার থেকে যুদ্ধবন্দিনী হিসেবে আনেন এবং দাসত্ব থেকে মুক্তিকে মোহর নির্ধকরণ করে স্ত্রীর মর্যাদা দান করেন। এই বিয়েতে তিনি এক অনাড়ম্বর ওলীমার আয়োজন করেন যাতে চর্বি বা গোশতের পরিবর্তে শুধু খোরমা ও ছাতু দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। তাঁর পূর্ব স্বামীর নাম কিনানা ইবনে রাবী ইবনে আবুল হুকায়েক। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি সফিয়্যার মত ভাল খানা তৈরি করতে পারে এরকম কাউকে দেখি নি। -সূনান নাসাঈ ৩৯৫৯। ৩৬/ ৫০/ ৫২ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
.
১১. মায়মুনাহ বিনতে হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহা)
সপ্তম হিজরীর যুল কাদাহ মাসে কাযা ওমরা শেষে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে তাঁর বিয়ের আয়োজন করেন। এবং তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পক্ষ থেকে ৪০০ দিরহাম মোহরানা প্রদান করেন। ৬১/ ৩৮/ ৬৩ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন)
 (আরবের বনু আমের গোত্র)
.
কৃতদাসী:
.
মারিয়া ক্বিবত্বীয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা)
মহানবী ﷺ এর ছেলে হযরত ইব্রাহীম তাঁর থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। ইসকান্দারিয়ার রাজা মুকাওকাশ হাদিয়া স্বরূপ মারিয়াকে দান করেছিলেন। তিনি হিজরী ১৬ সনে হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতকালে ইন্তিকাল করেন। বাকী গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
.
রায়হানাহ বিনতে শামউন (রাদিয়াল্লাহু আনহা)
রায়হানা  (রা) বনী নযীর অথবা বনী কুরায়যা গোত্রের ছিলেন। যুদ্ধবন্দীনী হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ দরবারে উপস্থিত হন এবং দাসী হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সংসারে ছিলেন। ১০ম হিজরীতে বিদায় হজ্জের পর ইন্তিকাল করেন। বাকীতে দাফন করা হয়। এক বর্ণনায় আছে তাঁকে মুক্ত করে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিবাহ করেছিলেন । (আল্লাহ্ ভাল জানেন)
.
নাফীসা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)
নাফীসা  (রা) যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা) এর দাসী ছিলেন। যায়নাব (রা) খুশি হয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দান করে দেন।
.
এছাড়া আরও একজন দাসী ছিলেন যার বিস্তারিত নাম ধাম জানা যায় না।
.
দুই জনের সাথে নামমাত্র বিয়ে হয়েছিলো। দাম্পত্য জীবন যাপন করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা হলেন:
.
আসমা বিনতে নুমান জাওনিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (আরব বংশোদ্ভূত কিন্দা গোত্র)
বিয়ের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে শ্বেত বা কুষ্ঠ আক্রান্ত পান । তাই তাকে উপঢৌকন দিয়ে তার পরিবার-পরিজনের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন।
.
আমরা বিনতে ইয়াযীদ কিলাবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা) (আরবের বনু কিলাব গোত্র)
তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসেই তাঁর কাছ থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছে এবং আল্লাহর কাছে পানাহ চাইছে।” অতঃপর তাকে তিনি তার পরিবার-পরিজনের কাছে ফেরত পাঠান। কেউ কেউ বলেন, যে মহিলা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে পানাহ চেয়েছিল অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করতে অস্বীকার করেছিল সে হলো আসমা বিনতে নু'মান কিন্দিয়ার চাচাতো বোন। কারো কারো মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে কাছে ডাকলে সে (গর্বভরে) বলে, “আমরা অভিজাত গোত্রের মানুষ। লোকেরা আমাদের কাছে আসে। আমরা কারো কাছে যাই না।” একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে তার পরিবারের কাছে ফেরত দেন।
.
.
.
উম্মে সালামা (রাঃ) একবার থালায় করে কিছু খানা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এবং তাঁর সাহাবায়ে কিরামের কাছে পেশ করলেন। ইত্যবসরে আয়েশা (রাঃ) চাদর জড়িয়ে আসলেন। তার হাতে একটি পাথর ছিল। পাথরটি দিয়ে থালাটি ভেঙ্গে দিলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ থালার ভাঙ্গা টুকরো দু'টি একত্র করলেন এবং বললেন, তোমরা খাও। তোমাদের মাতার আত্মমর্যাদাবোধে লেগেছে। এ কথাটি দু’বার বললেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আয়েশা (রাঃ)-এর থালা নিয়ে উম্মে সালামা (রাঃ)-এর নিকট পাঠালেন। উম্মে সালামা (রাঃ)-এর (ভাঙা) থালাটি আয়েশা (রাঃ)-কে দিয়ে দিলেন। -সূনান নাসাঈ ৩৯৫৮