যাদুল মাআদ

পুণ্যময়ী বিবিগণ
হযরত খাদীজা (রা:):হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথমা স্ত্রী হযরত খাদীজার (রা:) সাথে নবুওতের আগেই বিয়ে হয়েছিল। তখন হযরত খাদীজার (রা:) বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর জীবদ্দশায় হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কোন বিয়ে করেন নি। ইবরাহীম ভিন্ন সব সন্তান-সন্ততিই তাঁর গর্ভে' হয়েছিল। হযরতের এ স্ত্রীই তাঁর সাথে অশেষ নির্যাতন ও কষ্ট সয়েছেন এবং তাঁর প্রচার কার্যে' সাহায্য করতে গিয়ে ধনে ও প্রাণে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাই তাঁকে হযরত জিব্রাঈলের (আ:) মাধ্যমে সালাম পৌঁছিয়েছিলেন। এ মর্যাদা কেবল তাঁরই লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। হিজরতের তিন বছর আগে তিনি ইন্তিকাল করেন।
-যাদুল মাআদ ১:৬৫
.
হযরত সওদা (রা:):হযরত খাদীজার (রা:) ইন্তিকালের কিছুকাল পরে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সওদা বিন্তে যুমআ কর্শিয়াকে বিয়ে করেন। হযরত সওদা (রা:) পরে স্বামীর ওপরে নিজ অধিকার হযরত আয়েশাকে (রা:) দান করেছিলেন।
হযরত আয়েশা (রা:):তারপর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে আবদুল্লাহ হযরত আয়েশাকে (রা:) বিয়ে করলেন। তিনি হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব চাইতে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। তাঁর পবিত্রতা সম্পর্কে' আরশ থেকে আল্লাহ তা'আলা ওহী নাযিল করেছিলেন। আর বিয়ের আগেই রেশমের এক টুকরা কাপড়ে তাঁর ছবি অবতীর্ণ হয়েছিল। জানানো হয়েছিল:এ হচ্ছে আপনারই পুণ্যময়ী স্ত্রী। শওয়াল মাসে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর বয়স তখন ছ'বছর। হিজরতের পরে তাঁর রূখসতী হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল নয় বছর। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র তাঁকেই কুমারী অবস্থায় বিয়ে করেন। তিনি ছাড়া আর কারুর বিছানায় ওহী নাযিল হয়নি। যারা তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ তুলেছিল, তাঁরা যে কুফরী করেছিল এ ব্যাপারে সবাই একমত। হযরত আয়েশা (রা:) পবিত্র বিবিগণের ভেতরে সব চাইতে শিক্ষিতা ও ফিকাহ শাস্ত্রবিদ ছিলেন। দুনিয়ার মুসলিম নারীকুলের ভেতরে ফিকাহ শাস্ত্রে তিনি ছিলেন-অদ্বিতীয়া। যার ফলে বড় বড় সাহাবাগণ জটিল মাসআ'লা-মাসায়েলের ব্যাপারে তাঁর শরণাপন্ন হতেন। এক রিওয়ায়েতে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুদিনের জন্যে তাঁর সাথে সম্পর্ক' ছিন্ন করেছিলেন। কিন্তু, রিওয়ায়েতটিকে প্রামাণ্য দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
হযরত হাফসা (রা:):তারপর তিনি হযরত হাফসাকে (রা:) বিয়ে করেন। তিনি হযরত উমরের (রা:) কন্যা ছিলেন। আবু দাউদে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তালাক দিয়েছিলিন। কিন্তু, আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন।
হযরত যয়নব বিন্তে খুযায়মা (রা:):তার পরে বণু হিলাল বিন আমরের হযরত যয়নব বিন্তে খুযায়মা বিন হারিছ কায়সিয়াকে বিয়ে করেন। হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এসে তিনি মাত্র দু'মাস জীবিত ছিলেন।
হযরত উম্মে সালমা (রা:):তাঁর পরে তিনি হযরত উম্মে সালমা হিন্দ বিন্তে আবি উমাইয়া করশিয়াকে বিয়ে করেন। আবি উমাইয়ার আসল নাম হজায়ফা ইবনে মুগীরা। হযরত উম্মে সালমা (রা:) সবার শেষে ইন্তিকাল করেন। একদল বলেন:হযরত সফিয়াই (রা:) সবার শেষে মারা যান।
-যাদুল মাআদ ১:৬৬
.
যয়নব বিন্তে জাহাশ:তারপর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসাদ ইবনে খুযায়মার বংশের যয়নব বিন্তে জাহাশকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন হযরতের চাচী উমায়মার কন্যা। তাঁর সম্পর্কে' এ আয়াত নাযিল হল:"তার সাথে যায়েদের যখন পাট চুকে গেল, আমি তাকে আপনার সাথে বিয়ে দিলাম।” এ কারণেই হযরত যয়নব (রা:) অন্যান্য উম্মাহাতুল মু'মেনীনের কাছে অহংকার করে ফিরতেন যে, তোমাদের পরিবারের লোকজন তোমাদের বিয়ে পড়িয়েছে। আর আমার বিয়ে আল্লাহ তা'আলা সপ্ত আকাশের ওপরে থেকে পড়িয়েছেন। এটা অবশ্যই তাঁর বৈশিষ্ট্য যে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা উধ'লোকে থেকে তাঁর বিয়ে পড়িয়েছেন। আমীরুল মুমেনীন হযরত উমরের (রা:) খিলাফতের গোড়ার দিকেই তিনি পরলোক গমন করেন। প্রথমে তাঁর বিয়ে হয়েছিল হযরত যায়েদ ইবনে হারিছার সাথে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পালক পুত্র করেছিলেন। তিনি যখন তালাক দিলেন, তখন আল্লাহ তা'লা নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথেই যয়নবের (র:) বিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য হল, মুখ বোলা পুত্রের বধুকে বিয়ে করা বৈধ প্রমাণ করা।
-যাদুল মাআদ ১:৬৮
.
হযরত জুবায়রিয়া বিন্তে হারিছ:তা ছাড়া হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জুবায়রিয়া বিন্তে হারিছ ইবনে আবি যিরার মুস্তালাকিয়াকেও বিয়ে করেন। তিনি বর্ণী মুস্তালিকের বন্দীদের সাথে এসেছিলেন। হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে মুক্তি লাভের বিনিময় আদায়ে সাহায্য প্রার্থনার জন্যে তাঁর খিদমতে হাজির হয়েছিলেন। তিনি তাঁর দাসত্বের বন্ধন মুক্তির টাকা আদায় করে তাঁকে বিয়ে করে নিলেন।
হযরত উম্মে হাবীবা:তারপর তিনি উম্মে হাবীবাকে (রা:) বিয়ে করেন। তাঁর আসল নাম ছিল রিমলা বিন্তে আবি সুফিয়ান বিন সখর বিন হরব করশিয়া উমুবিয়া। এক রিওয়ায়েতে তাঁর হিন্দা নামেরও উল্লেখ রয়েছে। হিজরতের সময়ে যখন তিনি আবিসিনিয়ায় ছিলেন, তখনই তাঁর সাথে হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে হয়। সম্রাট নাজ্জাশী হযরতের পক্ষ থেকে চারশ দীনার দেন মহর আদায় করেন। সেখান থেকে তিনি মদীনায় চলে এলেন। তাঁর ভাই মু'আবিয়ার শাসনকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
-যাদুল মাআদ ১:৬৯
.
হযরত সফিয়া (রা:):তা ছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুসার (আ:) ভাই হারুনের (আ:) বংশধর বণী নজীরের অধিপতি হাই ইবনে আখতাবের কন্যা হযরত সফিয়াকে (রা:) বিয়ে করেন। এ মহিলা এক নবীর বংশধর ছিলেন এবং অন্য নবীর স্ত্রী হলেন। সমসাময়িক দুনিয়ায় তিনি আদ্বতীয়। সুন্দরী ছিলেন। দাসী, হয়ে তিনি এসেছিলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিনিময় দিয়ে মুক্ত করলেন এবং এই মুক্তির বিনিময়টুকুই মহর নির্ধারিত হল। এ ভাবে নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজটি উম্মতের জন্যে সুন্নাত হয়ে দাঁড়াল। যদি কেউ নিজ ক্রীতদাসী আযাদ করে দিয়ে পরে বিয়ে করতে চায়, তা হলে আযাদ করাটাই মহর হরে যায়। আযাদ করাতেই তার বিয়ে সিদ্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার বিয়ে পড়ার দরকার হয় না। ইমাম আহমাদ (রঃ) ও বিরাট একদল মুছান্দিছের এটাই মত যে, যদি কেউ বলে 'আমি আমার দাসীকে আযাদ করলাম এবং সেটাকেই তার মহর ঠিক করলাম' কিংবা 'আমি আমার দাসীর আযাদ করাটাকে তার বিয়ের মহর মনে করলাম' তা হলে আযাদ করা ও বিয়ে করা দুটোই সিদ্ধ হয়ে গেল। কোন ওলিরও প্রয়োজন হয় না। অবশ্য একদল আলিম বলেন, বিয়ের এ পদ্ধতিটি শুধু, রসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্যেই সিদ্ধ ছিল। অবশিষ্ট ইমামত্রয়ের মত এটাই। কিন্তু, পয়লা মতটিই বেশী সঠিক। কারণ, মাস'আলার ধরন দেখলে তাতে বিশেষত্ব খাঁজে পাওয়া যায় না।
-যাদুল মাআদ ১:৭১
.
হযরত মায়মুনা (রা:):হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মুনা বিন্তে হারিছ হিলালীকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন তাঁর শেষ স্ত্রী। সবার শেষে তিনি মক্কায় উমরা আদায় করা ও ইহরাম খুলে ফেলার পরে এ বিয়েটি করেন। এ নিকার মূল ঘটক আবু রাফে' (রা:)। হযরত আবু রাফে' বলেন:আমি তাঁদের দু'জনার মধ্যকার বাণী বাহক ছিলাম। হযরত মায়মুনা (রা:) হযরত মু'আবিয়ার শাসনকালে মারা যান। সরফ নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
হযরত রায়হানা বিন্তে যায়েদ নযরিয়া (রা:):এক বর্ণনা মতে তিনি হযরতের পবিত্র বিবিগণের অন্তভুক্ত ছিলেন। একটি মর্ত হল এই, তিনি করজী মহিলা ছিলেন। বণী কুরায়জার পরাজয়ের দিন তিনি বন্দী হয়ে আসেন এবং হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অংশে পড়েন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আযাদ করে নিকা করেন। তারপর এক তালাক দেন। পরে আবার তিনি ফিরিয়ে আনেন। মুহাদ্দিছদের একটি দল তাঁকে দাসী বলেছেন। তিনি হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযাদ করা ও 'মাওতুআ' (সহবাসকৃত) দাসী ছিলেন। তাই তাঁকে পবিত্র স্ত্রীদের দলে শামিল না করে দাসী ধরা হয়।
এ সব মহিলার সাথেই হযরতের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু, এমন কিছু, মহিলার কথাও কিতাবে রয়েছে যাঁদের কাছে তিনি কিংবা তাঁর কাছে তারা বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকার করায় অথবা তাদের কোন ওজর থাকায় বিয়ে হয়নি। তাদের সংখ্যা চার কিংবা পাঁচ হবে। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জওনিয়ার কাছে বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। তার বাড়ীতে তিনি তাশরীফও নিয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি ওজর পেশ করলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওজর কবুল করলেন। তেমনি ঘটেছিল কালবিয়ার ও যে মহিলার দেহে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্বেত রোগ দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর ঘটনাটি। তা ছাড়া এক মহিলা হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে বিয়ে বসার প্রস্তাব নিয়ে এলে তিনি তাকে এক সাহাবীর সাথে বিয়ে দেন এবং কুরআনের কয়েকটি সূরা শেখানোকে তার মহর নির্ধারিত করে দেন। এই হল আসল ঘটনা। আল্লাহই সব জানেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের সময়ে তাঁর ন'জন স্ত্রী বেঁচে ছিলেন। তাঁদের আটজনের দিনও বন্টিত ছিল। তাঁদের নাম এখানে দেয়। হল:হযরত আয়েশা (রা:), হযরত হাফসা (রা:), হযরত যয়নব বিন্তে জাহাশ (রা:), হযরত উম্মে সালমা (রা:), হযরত সফিয়া (রা:), হযরত উম্মে হাবীবা (রা:), হযরত মায়মুনা (রা:), হযরত সওদা (রা:) ও হযরত জুরায়রিয়া (রা:)। ৬২ হিজরীতে ইয়াযীদের রাজত্বকালে হযরত উম্মে সালমা (রা:) ইন্তিকাল করেন।
-যাদুল মাআদ ১:৭২-৭৩
.
হযরতের দাসীবৃন্দ:
হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন দাসী ছিলেন।
হযরত মারিয়া:ইনি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তনয় ইবরাহীমের (আ:) জননী ছিলেন।
হযরত রায়হানা ও হযরত জামীলা:এ'রাও দাসী ছিলেন। যুদ্ধ বন্দী হয়ে এসে হযরতের অংশে পড়েছিলেন।
হযরত যয়নব বিন্তে জাহাশও হযরতকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন দাসী দিয়েছিলেন।
-যাদুল মাআদ ১:৭৩.৩
.
হুযরতের দাসগণ
তাঁদের অন্যতম ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে হারছা ইবনে শুরাহবীল:নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তাঁকে তিনি আযাদ করে দিয়েছিলেন। তারপর উল্মে আয়মনের সাথে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঘরে উসামা (রা:) জন্ম নেন। তা ছাড়া হযরত আসলাম, আবু রাফে, ছওবান, আবু কাবশা সেলীম, সালেহ, রিবাহ নওবী, ইয়াছার নওবী (উরনায়েনের যুদ্ধে মারা যায়), মুদুআম ও নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরকালীন প্রহরী কিকারা নওবী। খায়বর যুদ্ধে সে হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের রশ ধারণ করেছিল।
বুখারীর রিওয়ায়েত অনুসারে নওবী সেই গোলাম, যে এক জিহাদের সময়ে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ষখন সে নিহত হল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই চাদর তার ওপরে আগুন হয়ে জুলছে। কিন্তু, মুআস্তার রিওয়ায়েতে চাদর লুকানো গোলামের নাম ছিল মুদুআম। আর এ দু'জনই খায়বার যুদ্ধে মারা যায়।
তা ছাড়া আঞ্জাশাহ, হাভী অন্যতম গোলাম ছিল। সফীনাহ ইবনে ফারুখ নামক অন্য এক গোলাম ছিল। তার আসল নাম মোহরান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সফীনা নাম এ জন্যে দিয়েছিলেন যে, সফরের সব জ্ঞিনিসপত্তর সে জাহাজের মতই বয়ে বেড়াত। তাই একবার তিনি বললেনঃ তুমি সফীনা।
আবু হাতিম রিওয়ায়েত করেন যে, হুম্বরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আযাদ করেছিলেন। অন্যান্যের মতে হযরত উস্মে সালমা (রা:) তাকে আয়াদ করেছিলেন।
তা ছাড়া ছিলেন উনায়সা ( যাঁর কুনিয়াত ছিল আব, মাশরুহ ), আফলাহ, উবায়দা, তুহমান, জাকোয়ান, মোহরান ও মারওয়ান। তুহমানের নাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তারপর হুনায়েন, সুন্দর, ফুযালা ইয়ামানী, মাবুরখসী, ওয়াকিদ, কাসসাম, আবু ওসায়িব এবং আব, মুওয়হিবাও তাঁর গোলাম ছিলেন। দাসীদের ভেতরে সালমা, উম্মে রাফে', মায়মনুনা বিন্তে সাদ, খুয়ায়রাহ, রিজবী, রীশাহ, উম্মে যুমায়ের, মায়মনুনা বিন্তে আবু উসায়িব, মারিয়া ও রায়হানার উল্লেখ রয়েছে।
.
হযরতের খাদেম:
তাঁদের ভেতরে হযরত আনাস ইবনে মালিকের ওপরে সাধারণ ব্যাপার সমূহের দায়িত্ব ছিল।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে রসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুতা ও মিসওয়াক থাকত।
উকবা ইবনে আমের জহনী সফরে হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খচ্চরের লাগাম ধরে থাকতেন।
আসলা' ইবনে শরীক হয়তের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের সহচর ছিলেন।
হযরত বিলাল ইবনে রিবাহ মুআজ্জিন ছিলেন।
হযরত সা'দ (রা:) অন্যতম খাদেম ছিলেন।
এ দু'জনই হযরত আবু বকরের গোলাম ছিলেন।
তা ছাড়া হযরত আবু জর গিফারী (রা:), আয়মন ইবনে আবীদ এবং তাঁর জননী হযরত উম্মে আয়মন প্রমুখও হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেবক-সেবিকা ছিলেন। হযরত আয়মন ইবনে আবীদ ও তাঁর জননী উম্মে আয়মন হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওজু ও ইস্তিঞ্জার ব্যবস্থা করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
যাদুল মাআদ ১:৭৪-৭৫
.
.
ওহু লিখকগণ
তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হল:
আব, বকর (রা:), উমর (রা:), উছমান (রা:), আলী (রা:), যুবায়ের (রা:), আমের বিন ফাহীরা (রা:), আমর ইবনুল আস (রা:), উবায় বিন কা’ব (রা:), আব্দুল্লাহ বিন আরকাম (রা:), ছাবিত বিন কায়েস (রা:), হাঞ্জালা বিন রবী’ আয়দী (রা:), মুগীরা বিন শোবা (রা:), আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা:), খালিদ বিন ওলীদ (রা:) ও খালিদ বিন সাঈদ ইবনুল আস (রা:)।
বর্ণিত আছে, হযরত মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা:) ও হযরত যায়েদ বিন ছাবিত (রা:) প্রথম থেকেই ওহী লিখক নিযুক্ত হন। এ দু’জন বিশেষ করে এ দায়িত্বেই নিয়োজিত ছিলেন।
যাদুল মাআদ ১:৭৫
.
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:"যে ব্যক্তি কোন মুসলমান পুরুষকে মুক্তি দিবে, এর বিনিময়ে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। মুক্ত ব্যক্তির প্রতিটি অংগ মুক্তিদাতার প্রত্যেক অংগের মুক্তিলাভের জিম্মাদার হবে।” [তিরমিজী]
পাঁচটি স্থানে নারীকে নরের অর্ধেক বলা হয়েছে।
১. একটি ক্রীতদাস দুটি ক্রীতদাসীর সমান।
২. আকীকা:মেয়ের আকীকায় একটি ছাগল ও ছেলের আকীকায় দুটি ছাগল দরকার হবে।
৩. সাক্ষ্য দান:দুটি নারীর সাক্ষ্যদান একটি পুরুষের সাক্ষ্যদানের সমান।
৪. উত্তরাধিকার প্রশ্ন।
৫. দিয়াত (ক্ষতিপুরণ-ব্যবস্থা)।
-যাদুল মাআদ ১:১০৩
.
হযরতের চলাফেরা:
যখন তিনি হাটতেন, বিনয়ের সাথে চলতেন। সবার চেয়ে দ্রুত চলতেন। তাঁর চলার ভংগিও ছিল সব চাইতে সুন্দর। শান্ত ও দৃঢ় ছিল তাঁর চলার গতি। আবু হুরায়রা (রা:) বলেন-আমি হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইতে সুন্দর পুরুষ আর দেখিনি। তাঁর চেহারায় যেন সূর্যের দ্যুতি জলত। তেমনি আমি তাঁর চাইতে দ্রুত চলার আর কাউকে দেখিনি। মাটি যেন তাঁর জন্যে বিছিয়ে যাচ্ছিল। আমি শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর নাগাল পেতামনা। হযরত আলী (রা:) বলেন:হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চলতেন, বিনয়ের সাথে চলতেন। যেন তিনি উঁচু স্থান থেকে নামছেন। আর 'তাকাল্লু,' করে চলতেন অর্থাৎ যেন উ'চু জমি থেকে নীচু জমীতে নেমে আসতেন। এ ধরনের চলায় ব্যক্তিত্ব, সাহস ও বীরত্ব প্রকাশ পায়। এ ধরনের চলা উপযোগী দেহের জন্যে বেশ আরামপ্রদ হয় এরং হয়রান হবার সম্ভাবনা থাকেনা। কারণ, হয়রান হবার চলা হয় থপ থপ করে চলা। যেন মাথায় একখন্ড গাছ নিয়ে চলছে। এ ধরনের চলা হাস্যকর ও নিন্দনীয়। কিংবা আহম্মক উটের চলা। তাই নিন্দনীয়। তা থেকে বুঝা যাবে, লোকটা নির্বোধ। বিশেষ করে চলতে চলতে যারা ডানে বামে দেখতে থাকে এবং আরামে স্থির শান্ত ভাবে চলে, সেটাই খোদার বান্দার চাল চলন হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন:“খোদার বান্দারা যখন যমীনের ওপরে চলে, নম্র ও শান্তভাবে চলে।” আগেকার এক বুযুর্গ বলেছেন:এর মানে হচ্ছে, তাঁরা নিরহংকার চালে স্থির ও শান্তভাবে চলতেন, দাপটে চলতেন না। এ ধরনের ব্যক্তিত্বপূর্ণ' চলাই চলতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর চলা দেখলে মনে হত যেন তিনি কোন উচু জায়গা থেকে নামছেন এবং মাটি যেন তার জন্যে ছুটে আসছে। কেউ আপ্রাণ চেষ্টা করেও হেটে তাঁর নাগাল পেতেন না। এ থেকে দুটো ব্যাপার জানা যায়। একটা 'হল এই, তাঁর চলার ধরণ নিরহংকার, সঠিক ও আরামদায়ক ছিল। চলা দশ প্রকারের হতে পারে। তিন প্রকার চলার কথা বলা হয়েছে।
-যাদুল মাআদ ১:১০৯
.
চতুর্থ, দৌড়ান।
পঞ্চম, ঊর্ধশ্বাসে দৌড়ান। এটাকে 'খাবাব' ও বলে। সহীহ হাদীছে হযরত ইবনে উমর থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফের সময়ে তিনবার ঊর্ধশ্বাসে দৌড়াতেন এবং চারবার আস্তে দৌড়াতেন।
ষষ্ঠ কুকুরে দৌড়। এ ধরনের দৌড়ে সহজে হয়রান হয় না আর তেমন কষ্টও হয়না। কোন কোন হাদীছ সংকলনে আছে, বিদায় হজ্জে কিছু লোক হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে ছুটতে গিয়ে কষ্ট অনুভব করছে বলে তাঁর কাছে জানালেন। তিনি বললেনঃ আরেকটু জোরে ছুটতে চেষ্টা কর।
সপ্তম, মেয়েদের মত ঝু'কে ঝুঁ'কে চলা। তাতে বিনয় নেই, আছে নারীসুলভ গতি।
অষ্টম, দৌড় ও হাটার মাঝামাঝি চলন।
নবম, কুদে কুদে চলা।
দশম, দাম্ভিকতার চলন। অহংকারী ও দাম্ভিকরা এভাবে চলে থাকে। আর এ ধরণের চলার জন্যেই এক বিরাট দাম্ভিককে আল্লাহ তা'আলা মাটিতে সোধিয়ে দিয়ে- ছেন। কিয়ামত পর্যন্ত সে এ ভাবেই সেধিয়ে যেতে থাকবে। সবচাইতে সঠিক চলন হল স্থির ও শান্তভাবে চলা।
-যাদুল মাআদ ১:১১০
.
হযরতের ওঠা বসা:তিনি মাটিতে, চাটাইয়ে, বিনাছায় যখন যেখানে স্থান পেতেন অবাধে বসে যেতেন। কাইলা বিন্তে মাখযামা বলেন:আমি একবার হযরতের খিদমতে হাজির হলাম। হযরত পায়ের ওপরে বসা ছিলেন। তাঁকে এরূপ অসহায় অবস্থায় বসা দেখে আমি ভয়ে কে'পে গেলাম। আদী বিন হাতিম যখন এল, হযরত তাকে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। তখন এক বাঁদী তাঁর কাছে একটা বিছানা দিয়ে গেলেন। এটিতে তিনি সাধারণত বসতেন। তিনি সেটাকে আদীর সামনে দিয়ে নিজে মাটিতেই বসে গেলেন। আদী বলেন:আমি বুঝে গেলাম যে, ইনি বাদশাহ নন।
কখনও তিনি চিত হয়ে আরাম নিতেন। কখনও তিনি একটি পা আরেকটি পায়ের ওপরে তুলে রাখতেন। কখনও ডান পাঁজরে ও কখনও বাম পাঁজরে ভর করে থাকতেন। যখন তিনি বাইরে বেরোবার প্রয়োজন বোধ করতেন, দুর্বলতার সময়ে সাহাবাদের কাউকে ভর করে বেরোতেন।
-যাদুল মাআদ ১:১১১
.
হযরত আয়েশা (রা:) বলেন:হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মত এত তাড়াতাড়ি একের পর এক করে বেশী কথা বলতেন না। ববং তিনি পৃথক পৃথকভাবে এরূপ সুস্পষ্ট ভাবে কথা বলতেন যেন শ্রোতা মনে গেথে নিতে পারে। এ জন্যে অধিকাংশ সময়ে তিনি একেকটি কথা তিন তিন বারও বলতেন। সালামও তিনবার উচ্চারণ করতেন। অধিকাংশ সময়ে তিনি চুপ থাকতেন। নিষ্প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথার শুরু ও শেষ সামঞ্জস্যপূর্ণ হত। তাঁর অল্প কথায় অনেক ভাবের প্রকাশ ঘটত। কল্যাণকর কথা ছাড়া বলতেন না। কোন কথা অপছন্দ হলে চেহারায় তা প্রকাশ পেত। অর্থহীন ও অশোভন কথা কখনও বলতেন না। দ্রুত কথা বলতেন না। তাঁর হাসি ছিল মুচকি হাসি। তাঁর হাসির শেষ সীমা ছিল দাড়ী নড়া। বিস্ময়কর দুর্লভ ঘটনা শুনলেই তিনি হাসতেন।
হাসির উদ্রেক কয়েকটি কারণে হয়। একটি তো বলা হল।
দ্বিতীয়, খুশীর দোলায় মনে যখন হিল্লোল সৃষ্টি হয়।
তৃতীয়, ক্রোধের হাসি। এটা কয়েক কারণে হয়।
বক্র বা বিষাক্ত হাসি:এটা প্রকাশ পায় যখন ক্রুদ্ধ ব্যক্তি ক্রোধের কারণ দেখে বিস্ময় বোধ করে অথবা বুঝতে পারে যে, শত্র, হাতের মুঠোয় এসে গেছে।
কৃত্রিম হাসি:মনের রাগটাকে চাপা দিয়ে ঘটনার স্রোত ঘুরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এ হাসি দেখা দেয়।
হাসির মত তাঁর কান্নাও সংযত ছিল। তাতে জোরে চীৎকার তো দূরের কথা, কোন শব্দই হতনা। হাসির মতই নিঃশব্দ ছিল তাঁর কান্না। কান্নার ক্ষেত্রে এতটুকু হত যে, চোখ বাষ্পাকুল হত ও অশ্রু ঝরে পড়ত। বুকের ভেতর থেকে ক্ষীণ কান্নার রোল ভেসে আসত। কখনও মৃতের ওপরে করুণাসিক্ত হয়ে, কখনও উম্মতের বিপদ ভেবে দয়াদ্র হয়ে, কখনও খোদার ভয়ে ও কখনও কুরআন শুনে তিনি কাঁদতেন। এ শেষোক্ত কান্না খোদার প্রেমে ও ভয়ে কাঁদতেন। যখন তাঁর সন্তান ইব্রাহীম (আ:) মারা গেলেন, তখন চোখে পানি এল এবং কোমল প্রাণের আবেগোচ্ছাসে কেদে ফেললেন। আর বললেন:চোখ কাঁদছে। অন্তর বিষাদে ভরে গেছে। অবশ্য আমি খোদা যাতে রাজী থাকেন তাই করি। হে ইব্রাহীম! তোমার জন্যে প্রাণে আমার অবশ্যই দুঃখ রয়েছে। তা ছাড়া একদিন এক বিলাপকারীর বিলাপ দেখেও তিনি কোঁদে ফেলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) একদিন তাঁর সামনে সূরা নিসা পড়ছিলেন। যখন এ আয়াত পড়লেন:সেদিন এক অবস্থা দাঁড়াবে যখন উম্মতদের থেকে লোক ডেকে তোমাদের কার্যের স্বাক্ষ্য নেব এবং তোমাকে ডেকে তাদের সবার কার্যের সাক্ষ্য নেব।”
যখন উছমান বিন মাজউন মারা গেল, তখনও তিনি কেঁদেছিলেন। একবার সূর্য গ্রহণ হল। তিনি 'কসুফ' নামায পড়তে গিয়ে কোঁদে ফেললেন এবং বললেনঃ প্রভু আমার! তুমি কি আমার সাথে এ ওয়াদা করনি যে, যতদিন আমি এদের ভেতরে থাকব ও যতদিন এরা সবাই ও আমি তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করে চলব, ততদিন কোন আজাব নাযিল করবে না। একবার তিনি তাঁর এক কন্যার কবরের কাছে গিয়ে কেদেছিলেন। কখনও তিনি তাহাজ্জুদের নামাযে কান্না কাটা করতেন। কান্না কয়েক কারণে হতে পারে। দয়ায় বিগলিত হয়ে কোমল প্রাণের কাঁদা। ভয়ে কাঁদা। ভালবাসায় কাঁদা। আনন্দদাতিশয্যে কাঁদা। অসহ্য আঘাতে কাঁদা ও মনোকষ্টে কাঁদা। কাঁদার পঞ্চম ও ষষ্ঠ কারণ দুটোর ভেতরে পার্থক্য এতটুকু যে, শেষটি কোন হারানো প্রিয় বস্তু বা অতীতের কোন দুঃখ-বিপদ মনে পড়ে দেখা দেয়।পঞ্চমটি অসহনীয় বিপদ ও যাতনা থেকে দেখা দেয়। আসন্ন বিপদ চিন্তা করে ভয়ের কান্না সৃষ্টি হয়। অনন্দাতিশয্যে কান্না হয় ঠান্ডা ও তাতে মন তৃপ্তিতে ভরে যায়। আর বিরহ-বেদনায় উতপ্ত কান্নার সৃষ্টি হয়। মন তাতে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তাই খুশীর কান্নাকে চোখ শীতলকারী বলা হয়। তার জন্যে প্রার্থনা করা হয়, খোদা যেন তার চোখ ঠান্ডা করে। এবং দুঃখের তপ্ত কান্নায় চোখ জ্বালা পোড়া করে বলে বলা হয়, খোদা তার চোখ উত্তপ্ত করুন। সপ্তম প্রকারের কান্না হল দুর্বলতা ও অক্ষমতার কান্না। অষ্টম, কুম্ভিরাশ্র, বা কপট কান্না। তাতে চোখে জল থাকে আর মন থাকে পাথরের মতই শক্ত। বাহ্যত তাকে দেখলে খুবই কোমল প্রাণের মনে হয়। নবম, পেশাগত বা মজুরী নিয়ে কাঁদা। ক্রন্দনকারী পারিশ্রমিক নিয়ে অভ্যাসগতভাবে কেদে থাকে। হযরত উমর ইবনে খাত্তাবের (রা:) মতে তারা কান্নার ব্যবসারী। পুরুষের দুখ নিয়ে নারীরা এ ব্যবসায়ের দ্বারা উপার্জ'ন করে থাকে। দশম, সহানুভূতির কান্না। কাউকে কাঁদতে দেখে কিংবা কারুর দুঃখ দেখে সহানুভূতিতে কেদে ফেলা। এরূপ ক্রন্দনকারী নিজেও বুঝতে পারেন। যে, কেন সে কাঁদছে। শুধু, একজনের করুন কান্না দেখে সেও কাঁদছে। আর যে কান্নায় শুধ, অশ্রু, দেখা দেয়, আওয়াজ শোনা যায় না তাকে বলে রুদ্ধ কান্না। আর যে কান্নায় আওয়াজও হয় তাকে বলে উচ্চৈস্বরে কান্না। যেমন কবি বলেন, "আমার চোখ কান্নায় ভেংগে পড়েছে। তার কান্নার অধিকারও আছে বটে। কাঁদা আর বিলাপ করা ছাড়া কোন উপায় যে নেই।” আর যা নেহাৎ কষ্ট করে সৃষ্টি করতে হয়, তাকে কষ্টে-সৃষ্ট কান্না বলে। এটা হয় দু'ধরনের। একটি প্রসংসনীয় ও দ্বিতীয়টি নিন্দনীয়। লোক দেখানোর জন্যে না হয়ে যদি খোদার ভয়ে মনকে নরম করার প্রয়াসে এরূপ কান্নার চেষ্টা করা হয়, তা প্রশংসনীয়। অবশ্য লোক দেখানো কান্নাটি নিন্দনীয়। হযরত উমর (রা:) যখন হযরতকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকরকে (রা:) বদর যুদ্ধে বন্দীদের ব্যাপারে কাঁদতে দেখলেন, তখন প্রশ্ন করলেন- "হে খোদার রসুল। কাঁদছেন কেন তা আমাকে বলুন। যদি তাতে আমারও কান্না-এসে যায় তো ভাল কথা। নইলে অন্তত কান্নার ভাব সৃষ্টি করে নেব।” এ কথা শুনে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে খারাপ বলেন নি। আগেকার বুযুর্গ'রা বলতেন, খোদার ভয়ে কাঁদ। কান্না যদি একান্তই না আসে তো কাঁদার মত অবস্থা সৃষ্টি করে নাও।
যাদুল মাআদ ১:১১৭-১১৯
.
নামাযের বিধিবিধান
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে প্রথমেই "আল্লাহ, আকবর" বলতেন। এর আগে কিছুই পড়- তেন না। এমনকি নিয়তও পড়তেন না। এও বলতেন না যে, আমি কা'বামুখী হয়ে ইমাম বা মুক্তাদী হিসেবে চার রাকাআত নামায আদায় করছি। কোন ধরনের নামায আর কোন, ওয়াক্তের নামায তাও বলতেন না। এ সবই বিদআত। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরূপ কোন রিওয়ায়েত নেই। সহীহ, যঈফ, মুসনাদ, মুরছাল, মারফ' কোন রিওয়ায়েতই নেই। সাহাবা কিংবা তাবেঈনদের কোন বক্তব্য পর্যন্ত নেই। চার ইমামের কেউই তা বলেন না।
-যাদুল মাআদ ১:১২৯
.
আল্লাহর দুষমনদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রনাংগনে জিহাদ করাটা হল বান্দার আত্মিক ও আভ্যন্তরিন জিহাদের একটি শাখা মাত্র। যেমন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:“যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির সাথে আল্লাহর পথে চলার জন্য অহরহ সংগ্রাম চালায়, সেই হল প্রকৃত মুজাহিদ এবং আল্লাহর অপসন্দনীয় কাজ ছেড়ে যে ব্যক্তি তাঁর পসন্দনীয় কাজ অনুসরণ করল, সেই হল প্রকৃত মুহাজির (বাস্তুত্যাগী)।
-যাদুল মাআদ ২:৭৪
.
জিহাদ চার শ্রেণীর।
(১) নিজের বিরুদ্ধে জিহাদ
(২) শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ
(৩) কাফিরের বিরুদ্ধে জিহাদ
(৪) মুনাফিকের বিরুদ্ধে জিহাদ।
নিজের বিরুদ্ধে জিহাদ চার প্রকারের:
(১) নিজের বিরুদ্ধে জিহাদের একটি দিক হচ্ছে, সত্য ধর্মের শিক্ষালাভের জন্যে সব প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অগ্রসর হওয়া। কারণ ইহ ও পারলৌকিক জ্ঞান অর্জ'ন ছাড়া কল্যাণ বা সৌভাগ্যের কোন পথ নেই। সুতরাং সেটা অর্জন করতে না পারলে উভয় লোকেই জীবন দুর্ভোগময় হয়ে উঠবে।
(২) দ্বিতীয় দিক হল, শিক্ষার পরে সেটা বাস্তবে রূপ দিবার জন্যে সংগ্রাম কর।। কারণ, শিক্ষা অনুসারে কাজ না হলে সে শিক্ষা ক্ষতিকর না হলেও কল্যাণকর তো হচ্ছেনা।
(৩) যারা শিক্ষা পায়নি, তাদের শেখানো। তা না হলে এ বাণীর আওতায় পড়ে যাবে-'আল্লাহর অবতীর্ণ সত্য ধর্মে'র শিক্ষা যারা গোপন করে, তাদের কল্যাণ তো কিছ, হবেই না, এমনকি জাহান্নাম থেকেও তারা রেহাই পাবেনা।'
(৪) আল্লাহ তা'আলার সত্য ধর্ম' প্রচারের পথে ধৈর্য সহকারে মানব সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিবন্ধক ও নির্যাতন অতিক্রম করে চলার সংগ্রাম বা সাধনা। শুধু, আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যেই সব নির্যাতন সয়ে যাওয়া।
যখন এ চারটি স্তর পার হবে, তখনই হবে সত্য ধর্মের সার্থক আলিম। কারণ, পূর্বসূরীরা বলে গেছেন, যতক্ষন সত্যকে জানবেনা, জেনে তা কার্যকরী করবেন। এবং অপরকে তা শিখিয়ে কার্যকরী করাতে চেষ্টা করবেনা, ততক্ষন 'আলিমে রব্বানী' হতে পারবেনা। এ কারণেই যে ব্যক্তি বিদ্যা অর্জ'ন করল, অপরকে তা শিখাল এবং নিজে তা কাজে পরিণত করল, ঊর্ধ্বতন রাজ্যে তাকে মহান ব্যক্তি বলে গণ্য করা হয়।
শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ দু'ধরনের।
এক, বান্দার অন্তরে সে যে সব কুমন্ত্রণা দেয় ও যে সব সংশয় সৃষ্টি করে, সেগুলো দূর করা। তা না হলে ঈমান বিপন্ন হয়।
দুই, যে সব অবৈধ আশংকা ও কামনা সে অন্তরে জাগিয়ে তোলে, সেগুলো লোপ করা। সত্যধর্ম' সম্পর্কিত সংশয়জনিত কুমন্ত্রনা দূর করার জিহাদ বান্দার ঈমানকে সুদৃঢ় করে। দ্বিতীয়টি দান বরে ধৈর্য'। অল্লাহতা'আলা বলেন:আমি তাদের থেকে পথিকৃৎ সৃষ্টি করেছি। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ দেখায়। তারা ছিল ধৈর্যশীল এবং আমার নিদর্শনে ছিল পরম বিশ্বাসী।" তেমনি তিনি বলেছেন, কেবল ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে সত্যধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। ধৈর্য'ই দূর করে দেয় কামলিপ্স। ও অসদিচ্ছাগুলো। দৃঢ় বিশ্বাস দূর করে সন্দেহ ও জটিলতা। * অত্যাচারী, বিদআতী ও পাপীদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর হল তিনটি। প্রথম, শক্তি থাকলে বল প্রয়োগ করা। তা না হলে মুখে প্রতিবাদ করা। তাও সম্ভব না হলে অন্তরে ঘৃণা পোষন করা। যে ব্যক্তি জিহাদ না করে, এমন কি অন্তরে জিহাদের আকাংখাও পোষণ না করে মারা গেল, সে মুনাফিকের লক্ষণ নিয়ে মরল। কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর হল চারটি। অন্তর দিয়ে, মুখ দিয়ে, ধন দিয়ে ও প্রাণ দিয়ে। কাফিরের জন্যে নির্দিষ্ট হল শক্তি প্রয়োগ আর মুনাফিকদের জন্যে হল যুক্তি প্রয়োগ। হিজরত ছাড়া জিহাদ এবং জিহাদ ও ঈমান ছাড়া হিজরত পূর্ণ হয় না। এ তিনটি পূর্ণ করল যারা তারাই আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশী হতে পারে। আল্লাহ বলেন:"নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী হবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।" ঈমান আনা যেহেতু প্রতিটি মানুষের জন্যে ফরয, তাই তার জন্যে দু'টি হিজরত অপরিহার্য'। আল্লাহর তাওহীদ, ইখলাস, ইবাদত, তাওয়াক্কুল, খাওফ, উম্মিদ, তাওবা এবং রসূলের আনুগত্যের দিকে পূর্ব জীবন থেকে হিজরত করা। আর তাঁকে সতর্ক'কারী হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর সংবাদ পৌঁছানোকে সত্য বলে স্বীকার করে সবার ওপরে তাঁকে স্থান দেয়া। হাদীছে আছে, "আল্লাহ ও রসুলের জন্যে যারা হিজরত করে, তাদের হিজরত সেদিকেই তাদের নিয়ে যাবে আর যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থে' যেমন, বাগিচা কিংবা স্ত্রী লাভের উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার হিজরত সে পরিণতিই ডেকে আনবে।" এ কারণেই বান্দার জন্যে আত্মার সাথে ও শয়তানের সাথে লড়াই করার বিধান রাখা হয়েছে। এ দু'ধরণের জিহাদ ফরযে আইন। এ ব্যাপারে অন্য কারর প্রতিনিধিত্ব চলেনা।
-যাদুল মাআদ ২:৭৬-৭৭
.
ইমাম শাফেঈকে কেউ প্রশ্ন করেছিল, মানুষের জন্যে দুনিয়ায় শান্তিতে কাটানো ভাল, না পরীক্ষায় লিপ্ত থাকা ভাল? তিনি জবাব দিলেন-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ' না হওয়া পর্যন্ত মানুষের শান্তি আসতে পারেনা।
-যাদুল মাআদ ২:৮১
.
ইয়াহুদীদের সেখানে তিনটি গোত্র ছিল। বনু কায়নুকা, বনু নজীর ও বনু কুরায়জা। তিনটি গোত্রই রসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরুদ্ধে লড়েছে। বনু কায়নুকাকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষমা করে দিয়েছেন। বনু নজীরকে নির্বাসন দিয়েছেন। আর বনু কুরায়জা যুদ্ধে নির্মূল হয়েছে। তাদের বংশধরদের ভৃত্যে পরিণত করা হয়েছে। বনু নজীর সম্পর্কে সুরা হাশর ও বনু কুরায়জা সম্পর্কে সুরা আহযাব নাষিল হয়েছে।
-যাদুল মাআদ ২:১১১
.
তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্যে ডাকা হত। নামাযের সময় এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিয়ে নামাজ পড়তেন। নামায শেষ করে আবার তাদের ইসলাম তথা আল্লাহ রাসূলের পথে ডাকা হত এবং পরে লড়াই শরু হত। অবশেষে সন্ধ্যা নেমে এল। সকালে সূর্য কিছুমাত্র উদয় হওয়া মাত্রই মুসলমানরা এলাকাটি জয় করে নিল। শক্তির মাধ্যমেই এ বিজয় এসেছে। আল্লাহ তা'আলা নিজ রাসুলকে গণীমত দান করলেন। এখানে মুসলমানরা প্রচুর ধন-সম্পদ লাভ করল। তারপর চারদিন তিনি ওয়াদিউল কুরায় অবস্থান করেন। ধন-সম্পদ যা কিছুছ, পেলেন, সাহাবাদের ভেতরে বণ্টন করলেন এবং জমা-জমি ও খেজুর বাগান সেখানকার ইয়াহুদীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে তাদের চাষী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তীমার ইয়াহুদীরা এ খবর পেয়ে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে এসে অনুরূপ চুক্তিতে জমা-জমির দায়িত্ব বুঝে নিয়ে সন্ধি করল। তারপর হযরত উমরের যুগে তিনি খায়বর ও ফিদাকের ইয়াহুদীদের দেশান্তর করেন। তবে ওয়াদিউল কুরা ও তীমার ইয়াহুদীদের থাকতে দেন। কারণ, এ দুটি এলাকা সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তার নিম্নভূমি মদীনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে এলেন। প্রত্যাবর্তনের সময়ে এক রাতে এক স্থানে নেমে তিনি হযরত বিলালকে বললেন-রাতের বেলায় পাহারায় থেক। কিন্তু, হযরত বিলাল ঘুমিয়ে পড়লেন। কারণ, তিনি তার বাহনে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। ফল এই দাঁড়াল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের কেউ সে রাতে জাগ্রত ছিল না। এমনকি সূর্য উঠে গেলেও সবাই ঘুমুচ্ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পয়লা জেগে উঠলেন। তিনি (নামায ক্বাযা হওয়ায়) ঘাবড়ে গেলেন। বললেন-হে বিলাল! এ কি হল?
যাদুল মাআদ ২:২৬৭
.
আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা সাহমীর অভিযান সহীদ্বয়ে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হযরত ইবনে আব্দাস থেকে বর্ণনা করেন:ياايها الذين امنوا أطيعوا الله و المعوا لرسول و اولی امر منکم -আয়াতটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হযাফার অভিযান উপলক্ষে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এক অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। সহীদ্বয়ে আহমাদের বর্ণিত এক হাদীছেও তার প্রমাণ মিলে। তিনি সাঈদ ইবনে উবায়দা, তিনি আবু আব্দুর রহমান সলমী ও তিনি হযরত আলী (ক:) থেকে এ বর্ণনা শুনেছেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারের নেতৃত্বে একটি অভিযান পাঠিয়েছিলেন। তারপর তার দলকে এ নির্দেশ দিলেন-দলপতির নির্দেশ শুনবে ও মান্য করবে। বর্ণনাকারী বলেন যে, তিনি কোন কারণে দলপতিকে অসন্তুষ্ট করায় দলপতি কতগুলো কাঠ জমা করিয়ে আগুন জ্বালা-নোর ব্যবস্থা করলেন। তারপর তাকে প্রশ্ন করলেন-রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আমার নির্দেশ শুন্তে ও মানতে বলেন নি? বর্ণনাকারী জবাব দিলেন-হাঁ, তিনি তা বলেছেন। জবাব শুনে তিনি নির্দেশ দিলেন-তা হলে এ অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দাও। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি অন্যান্যের মুখের দিকে তাকালেন এবং সেখান থেকে ছুটে এসে রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরবারে হাযির হলেন। ইত্যবসরে দলপতির রাগও থেমে গেল। আগুনও নিভে গেল। তিনি রাসূলের কাছে পৌঁছে সব ঘটনা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিলে তুমি আর ফিরে আসতে না। দলপতির আনুগত্য রক্ষা শুধু, ন্যায় সংগত নির্দেশের বেলায় চলে। এ দলপতিটি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা সাহমী। প্রশ্ন হতে পারে, তারা যদি তাকে দলপতির নির্দেশ মান্য করা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ বলে আগুনে ফেলে দিত, তাহলে হয়ত সেটা তাদের ধারনায় ন্যায় কাজই হত। সেক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় প্রবেশকারী জবাবে বলা যায়, নিজে আগুনে ঝাঁপিয়ে প্রাণ দেয়। যেহেতু পাপ, ভেবে সেরূপ কাজে ছুটে যাওয়া কি পুণ্যের হত, না পাপের হত? সে আগুনে চিরতরে জ্বলবে কেন? তা হল আত্মহত্যা মাত্র। তাই না সেটাকে নেতার নির্দেশ বলে অপরিহার্য' ভাবা চলে না। কারণ, 'আল্লাহর নির্দেশ ভুলে বান্দার আনুগত্য পালন মাখলুকের জন্য চলে না।' যদি তিনি আল্লাহর বিধান অমান্য করে আগুনে ঝাঁপ দিতেন, তাহলে সেরূপ নেতার আনুগত্য আল্লাহর গজবের কারণ হত। কারণ, নিজেকে আগুনে সমর্পন মহাপাপ। আল্লাহ ও রাসুলকে অমান্য করে নেতার নির্দেশ মানা পাপ। আত্মহত্যা তো আল্লাহ ও রাসুলের কাছে জঘন্য পাপের কাজ। নেতাকে মানতে হবে শুধু, ন্যায় সংগত নির্দেশের ক্ষেত্রে।
-যাদুল মাআদ ২:২৭৫