শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের দুনিয়াবিমুখতা

 দুনিয়ার চার অংশ
৮. আমের ইবনু আব্দে কায়েস বলেছেন: "চারটি বিষয়ের সমন্বয়েই মানুষের জীবন। পোশাক, খাবার, ঘুম ও নারী। এখন শোনো, একজন নারী দেখা আর কোনো দেয়াল দেখা-উভয়টাই আমার কাছে সমান। আর পোশাকের ক্ষেত্রে কথা হচ্ছে, লজ্জাস্থান ঢাকতে পারলেই হলো। কী দিয়ে ঢাকলাম, তার কোনো পরোয়া করি না। তবে খাবার ও ঘুম-এ দুটি আমার ওপর প্রবল হয়ে যায়। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ দুটির ক্ষতি করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।” বর্ণনাকারী হাসান বলেন, “আল্লাহর শপথ! তিনি উভয়টারই ক্ষতি করে ছেড়েছেন (অর্থাৎ, খাওয়া ও ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনেছেন)।”

৯. আমের ইবনু আব্দে কায়েস বলেছেন, "দুনিয়ার চারটি অংশ রয়েছে: অর্থ-সম্পদ, নারী, ঘুম ও খাবার। অর্থ-সম্পদ আর নারীর আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই বাকি দুটির ক্ষতি করে ছাড়ব। এবং আমার চিন্তা-ভাবনাকে অবশ্যই একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।”
.
দুনিয়া-আখিরাত উভয়টি অর্জনের পন্থা
১২. হাসান বাসরি প্রায় সময়ই বলতেন: “যুবকেরা! আখিরাত অন্বেষণ করো। এমন অনেককে দেখেছি, যারা আখিরাত তালাশ করতে গিয়ে দুনিয়াও পেয়ে গেছে। কিন্তু এমন কাউকে দেখিনি, যে দুনিয়া অন্বেষণ করতে গিয়ে আখিরাতও পেয়ে গেছে।”
.
সুস্থ, পবিত্র, চক্ষুষ্মান, বুদ্ধিমানের পরিচয়
২৫. হাসান বাসরি আলোচনার মধ্যে প্রায়সময়ই বলতেন: হে আদম সন্তান! তুমি তো গতকাল এক ফোঁটা বীর্য ছিলে আর আগামীকাল লাশ হয়ে যাবে। এর মধ্যবর্তী সময়টাতে কেবল ময়লা মুছতে হয় তোমাকে। সুস্থ তো ঐ ব্যক্তি, গুনাহ যাকে অসুস্থ করে তোলেনি। পবিত্র হলো ঐ ব্যক্তি, পাপাচার যাকে অপবিত্র করে দেয়নি। যারা দুনিয়াকে সবচেয়ে বেশি ভুলে থাকতে পারে, তারাই আখিরাতকে অধিক স্মরণ করতে পারে। আর যারা বেশি বেশি দুনিয়ার আলোচনা করে, তারাই আখিরাতকে বেশি ভুলে যায়। যে নিজেকে অনিষ্ট থেকে বিরত রাখে, সে-ই আবিদ। যে হারাম কিছু দেখতে পেয়েও তার কাছে যায় না, সে-ই চক্ষুষ্মান। যে কিয়ামাত দিবসের কথা স্মরণ করে এবং সেদিনের হিসাব নিকাশের কথা ভুলে যায় না, সে-ই কেবল বুদ্ধিমান।”
.
যাহিদের বিস্তারিত পরিচয়
৭৫. ইয়াহিয়া ইবনু মুয়াযকে জিজ্ঞেস করা হলো, "যাহিদের লক্ষণ কী?” তিনি বলেন, “যা জুটে যাবে, সে তা-ই গ্রহণ করবে। যেখানেই সুযোগ হবে, সেখানেই থাকবে। যা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে যায়, সেটাকেই পোশাক হিসেবে গ্রহণ করে নিবে। দুনিয়া হবে তার কারাগার। দারিদ্র্য হবে তার সদা সঙ্গী। নিঃসঙ্গতা হবে তার বৈঠকের সাথি। শয়তান হবে তার শত্রু। কুরআন হবে তার বন্ধু। আল্লাহ তাআলা হবেন তার উদ্দেশ্য। যিকর হবে তার সাথি। দুনিয়াবিমুখতা হবে তার একান্ত বন্ধু। প্রজ্ঞা হবে তার প্রিয় খাবার। নীরবতা হবে তার কথা। শিক্ষা হবে তার চিন্তার বিষয়। জ্ঞান হবে তার পরিচালক। ধৈর্য হবে তার বালিশ। তাওবা হবে তার বিছানা। ইয়াকীন হবে তার সঙ্গী। নসীহত হবে তার ক্ষুধা। সিদ্দিকগণ হবেন তার ভাই। বিবেক হবে তার পথপ্রদর্শক। তাওয়াক্কুল হবে তার রিযক। আমল হবে তার ব্যস্ততা। ইবাদাত হবে তার পেশা। তাকওয়া হবে তার পাথেয়। কল্যাণকর কাজ হবে তার বাহন। প্রজ্ঞা হবে তার উযির। তাওফিক হবে তার সঙ্গী। জীবন হবে তার সফর। দিনগুলো হবে তার সফরের একেকটি স্টেশন। জান্নাত হবে তার ঠিকানা। আল্লাহ তাআলা হবেন তার আশ্রয়স্থল।"
.
প্রয়োজনের অধিক উপার্জনের অসম্ভাব্যতা
৮৯. আবুস সাহবা সিলাহ ইবনুল আশইয়াম বলেছেন, "যত জায়গায় রিযক থাকতে পারে, আমি তার সব জায়গায় তা খুঁজে দেখেছি। কিন্তু দিনের রিযক দিনে অর্জন ছাড়া আমাকে কেবল ক্লান্তিই দেখতে হয়েছে। আমি তখন বুঝতে পেরেছি, দিনেরটা দিনে অর্জন করাটাই আমার জন্য কল্যাণকর। অনেকেই এমন আছে, যাদের দিনের রিযক দিনে প্রদান করা হয়। কিন্তু সে আপন বিবেক বুদ্ধির স্বল্পতার কারণে বুঝতে পারে না যে, এটাই তার জন্য কল্যাণকর।”
৯০. আবূস সাহবা সিলাহ ইবনুল আশইয়াম বলেছেন : "দুনিয়ার যত জায়গায় হালাল রিযক ছিল, আমি তার সব জায়গা সন্ধান করেছি। কিন্তু সব জায়গা থেকেই কেবল জীবনধারণ পরিমাণ সামান্য খাবারই অর্জন করতে পারছিলাম। এই সামান্য সম্পদের মাধ্যমে জীবনধারণ করতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু ওইদিকে সামান্য সম্পদও পিছু ছাড়ছিল না আমার। এ অবস্থা দেখে আমি বলে উঠি, 'হে নফস! যতটুকু না হলেই নয় তোমাকে ততটুকু রিযক-ই প্রদান করা হয়েছে, তুমি এতেই তুষ্ট হয়ে যাও।' আমি তখন তাতেই তুষ্ট হয়ে গেছি, আমাকে আর কষ্ট সহ্য করতে হয়নি।”
.
যুহদের মধ্যমপন্থা
৯১. লুকমান তার ছেলেকে বলেন : "বাবা! আলিমদের সংস্পর্শে থেকো, তাদের সাথে তর্ক কোরো না। অন্যথায় তাদের ক্রোধে নিপতিত হয়ে যাবে। যতটুকু আহার যথেষ্ট, দুনিয়ার ঠিক ততটুকু সম্পদই গ্রহণ করবে। দুনিয়ায় এমনভাবে মত্ত হয়ে যেয়ো না, যা তোমার পরকালের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়। আবার তা একেবারে প্রত্যাখ্যান করে দিয়ো না, অন্যথায় তুমি লোকজনের দয়ার পাত্র বনে যাবে। এমনভাবে সাওম থাকো, যাতে তোমার প্রবৃত্তির চাহিদা দমে যায়। আবার এমনভাবে সাওম শুরু করে দিয়ো না, যাতে দুর্বলতার কারণে তুমি সালাত-ই আদায় করতে পারো না। কেননা, (নফল) সাওমের চেয়ে (ফরয) সালাত আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।"
.
৯৬. ইবরাহীম ইবনু আদহামকে বলতে শুনেছি: 'অল্প লোভ-লালসা মানুষের মধ্যে সততা এবং তাকওয়া নিয়ে আসে। আর অধিক লোভ-লালসা অধিক দুশ্চিন্তা এবং দুঃখ-কষ্টের জন্ম দেয়।”
৯৭. একবার জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ আস সুফিকে জিজ্ঞেস করা হলো, "কোন জিনিস অন্তরকে বিনষ্ট করে দেয়?” তিনি বলেন, "লোভ।” এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, "কীভাবে তা সংশোধিত হয়ে যায়?” তিনি বলেন, “তাকওয়া।”
৯৮. জুবাইর ইবনু আবদিল ওয়াহিদ বলেন, "আমি বুনান আল হাম্মালকে বলতে শুনেছি, 'যে কোনো লোভ-লালসা রাখে না, সে-ই স্বাধীন। মানুষ ততদিন পর্যন্ত স্বাধীন থাকতে পারে, যতদিন সে অল্পতেই তুষ্ট থাকে।”
৯৯. আলি ইবনু আবদিল আযীযকে বলতে শুনেছি: 'যে ব্যক্তির মধ্যে অল্পে তুষ্টি নাই, কস্মিনকালে কোনো কিছুই তার প্রয়োজন মেটাতে পারবে না।”
.
অপরের সম্পদের প্রতি নিরাসক্তি
১০০. সাদ আল খাইর আপন ছেলেকে বলতেন: “সব সময় নিরাসক্তি বজায় রাখবে, কারণ এটাই ধনাঢ্যতা। কখনো মানুষের কাছে থাকা অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে লোভ রেখো না, কেননা এটাই সাক্ষাৎ দারিদ্র। উত্তমরূপে ওযু করবে। এমনভাবে সালাত আদায় করবে, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ সালাত। যদি আজকের দিনটাকে গতকালের চেয়ে উত্তম বানাতে চাও, আর আগামীকালটাকে আজকের চেয়ে উত্তম করে তুলতে চাও, তাহলে এমনটাই করো।”
.
১০৪. জাবির থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "অল্পে তুষ্টি এমন রত্নভাণ্ডার, যা কখনো শেষ হয় না।”
১০৫. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তির দিনের শুরুটা এভাবে হয় যে, তার পালিত পশু নিরাপদ, সে নিজেও সুস্থ আর তার কাছে রয়েছে সেদিনের খাবার, তাহলে গোটা দুনিয়াই যেন তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”[তিরমিযি]
.
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি তৈরির উপায়
২৪৬. আহমাদ ইবনু আবীল হাওয়ারি বলেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে তার প্রতি বিমুখ হয়ে গেছে। আর যে পরকালকে চিনতে পেরেছে, সে তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে, সে তাঁর সন্তুষ্টিকেই প্রাধান্য দেয়।"
২৪৭. আবূ সাহাল হারিসি আস সুফি বলেন, "পরকাল ও তার নিয়ামাতরাজির জন্য জাগ্রত থাকতে চাইলে দুনিয়া ও তার চাকচিক্য থেকে বিমুখ হয়ে ঘুমিয়ে থাক।"
২৪৮. ইবরাহীম ইবনু আহমাদ আল খাওয়াসকে বলতে শুনেছি: 'দুনিয়া যার জন্য কাঁদে না, আখিরাত তার জন্য হাসতে পারে না। মানুষকে তার নিজের পুরাতন জিনিসেই ভালো দেখায়। অন্যের নতুন জিনিসে না। যে গন্তব্যের কাছে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পথ হারিয়ে ফেলে, সে-ই তো আসল ক্ষতিগ্রস্ত।”
.
দুনিয়ায় থেকেও আখিরাতমুখী হওয়ার উপায়
২৪৯. আল কাত্তানি বলেছেন: "শারীরিকভাবে দুনিয়াতে থাকবে বটে, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে তোমার অবস্থান যেন হয় আখিরাতে।"
.
দুনিয়ার কদর্যতার উপমা
২৫৯. শিবলিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "দুনিয়া কী জিনিস?” তিনি উত্তরে বলেন, "তা হলো একটি ফুটন্ত ডেগ এবং এমন টয়লেট, যেখানে মানুষ ময়লা দিয়ে ভরে রাখে।”
.
পাদ্রীর নসিহত
২৬২. মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকুব ফারজি বলেছেন, "আমি এক গির্জার পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'যুহদ কী?' তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে, সেগুলোকে দুনিয়ার ওপরে থাকা মানুষদের জন্য ছেড়ে দেওয়া।”
.
দুনিয়ার পরোয়া
২৬৩. আবূ আবদিল্লাহ ইবনু শিয়ারক-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, 'ফুতুওয়াহ' কাকে বলে। তিনি উত্তরে বলেন, 'দুনিয়ার ব্যাপারে কোনোরূপ পরোয়া না করা।”
.
ভালো কাজের জন্য প্রসিদ্ধি লাভও বিপদের সম্ভাব্য কারণ
২৬৭. আবুল হাসান আস সায়িগ বলেন, "যারা আল্লাহকে পেতে চায়, তাদের দুই বার দুনিয়া পরিত্যাগ করা উচিত। প্রথমবার দুনিয়ার চাকচিক্য, ভোগবিলাস, রং-বেরঙের খাবার ও পানীয়, মোটকথা ভোগবিলাসের সকল উপকরণ পরিত্যাগ করতে হবে। এর ফলে দেখবেন মানুষের কাছে প্রসিদ্ধ হয়ে যাবে সে। লোকজন তাকে সম্মান করা শুরু করবে। তখন তার উচিত নিজেকে আড়াল করে ফেলা। অন্যথায় মানুষজন তার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকবে। তাই দুনিয়া পরিত্যাগ করাটা যেন দুনিয়ার লোভের চেয়েও বড় কোনো গুনাহ ও ফিতনার কারণ না হয়ে উঠে, সে জন্যই আড়ালে চলে যেতে হবে তাকে। (আর এটা হলো দ্বিতীয় বারের মতো দুনিয়া পরিত্যাগ।)”
২৬৮. আবূ উমামা বলেন, "নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  একদিন আমাদের যুহরের সালাত পড়িয়ে বাকি' নামক স্থানে যাওয়ার জন্য বের হন। মাসজিদের সকলেই তার পিছু পিছু চলতে থাকে। তিনি চলছিলেন সবার সামনে। বাকি'তে প্রবেশ করেন তিনি। এসময় তার হাতে ছিল খেজুর গাছের একটি কাঁচা ডাল। পেছনের লোকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'সামনে যাও, সামনে যাও।' সকলে তা-ই করে। একজন জিজ্ঞেস করে, 'আমরা আপনার পেছনে ছিলাম। সামনে যেতে বললেন যে?' তিনি বলেন, 'পেছনে তোমাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আশঙ্কা হলো, এতে আমার মনে অহংকার চলে আসতে পারে।'”
২৬৯. আবূ উমামা বলেন, "এক প্রচণ্ড গরমের দিন বাকিউল গারকাদ অভিমুখে চলতে থাকেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । সাহাবায়ে কেরামও তাঁর পিছু পিছু চলছিলেন। তাদের জুতার আওয়াজ তার কাঁনে আসে। জিনিসটা ভীষণ কষ্টকর মনে হয় তাঁর কাছে। তিনি তখনই বসে যান। তাদের সামনে অগ্রসর করে দেন। অন্তরে যেন কোনো ধরনের অহংকার তৈরি না হয়, সেজন্যই এমন করেছিলেন তিনি।" [ইবনু মাজাহ, আস সুনান]
.
২৭১. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, "নবি কোথাও বের হলে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর সামনে চলতেন আর তাঁর পেছনের পথটা ছেড়ে দিতেন ফেরেশতাদের জন্য।[আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৩/৩৩২]
২৭২. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন, "নবি-এর পেছনে কেউ হাঁটলে তিনি এটা অপছন্দ করেন, না অনুমতি দেন-এটা দেখার জন্য একদিন তাঁর পেছনে হাঁটতে শুরু করি আমি। তিনি আমার হাত ধরে পাশে নিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ তাঁর পাশাপাশি হেঁটে পুনরায় চলে আসি পেছনে। আবারও আমার হাত ধরে তিনি নিজের পাশে নিয়ে আসেন। এবার তাঁর পাশাপাশিই হাঁটা শুরু করি। বুঝতে পারলাম যে, তাঁর পেছনে কেউ হাঁটুক-তিনি তা পছন্দ করেন না।"
.
দুনিয়ার সঠিক ব্যবহার
২৭৯. ইউসূফ ইবনু আসবাতের কাছে একবার একটি অপরিপক্ক ফল নিয়ে আসা হয়। তিনি তা উলটেপালটে দেখে সামনে রেখে বলেন, "নিছক দেখার জন্য এ দুনিয়া সৃষ্টি করা হয়নি; বরং তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে যেন আমরা তার মধ্য দিয়ে পরকালকে দেখতে পারি।"
.
দুনিয়া-ত্যাগের প্রকারভেদ
২৮০. বিশর ইবনু হারিসকে বলতে শুনেছি : 'আমি এ জনপদে এমন কাউকে চিনি না, যে নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে পার্থিব কিছু দিয়ে থাকে। বরং হয়তো তার থেকে নেওয়ার জন্য কিংবা যা দিয়েছে তারচেয়ে অধিক অর্জনের জন্যই দেয়।"
২৮১. হারিস আল মুহাসিবি বলেছেন: "দুনিয়াকে চেনা সত্ত্বেও তাকে পরিত্যাগ করাটা যাহিদ তথা দুনিয়া-বিরাগীদের বৈশিষ্ট্য। আর দুনিয়াকে ভুলে গিয়ে তা পরিত্যাগ করাটা আরিফদের (আল্লাহকে প্রকৃতভাবে যারা চিনেছেন তাদের) বৈশিষ্ট্য।”
.
দুনিয়ার সংজ্ঞা
২৮৬. জুনাইদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, দুনিয়া আসলে কী। তিনি উত্তরে বলেন, “দুনিয়া বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন ধরনের। আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী এই উন্মুক্ত স্থানটাই কারও কাছে দুনিয়া। আরেক দলের মতে, পার্থিব ভোগবিলাস এবং গান-বাদ্যই হলো দুনিয়া। যেসব বিষয় প্রবৃত্তির নিকটবর্তী, আমার কাছে তা-ই দুনিয়া।”
২৮৭. মাশাইখদের বলতে শুনেছি: 'যদি দুটি বিষয়ের মধ্যে সঠিক-বেঠিক চিনতে না পারো, তাহলে লক্ষ করে দেখবে যে, কোনটা তোমার মনের চাহিদার অধিক নিকটবর্তী। যা মনের চাহিদার অধিক নিকটবর্তী, সেটা বাদ দিয়ে দেবে। কেননা, মনের বিরোধী বিষয়টাই অধিক সঠিক।
.
যৌনক্ষুধা দমন কঠিনতর
৩৫২. আহমাদ ইবনু আবীল হাওয়ারি বলেন, "জর্দানের এক সন্ন্যাসীকে বলি, 'যদি কারও ঘুমানোর ইচ্ছা হয় আর সে মনের ইচ্ছা পূরণ করতে চায়, তাহলে কি সে যাহিদ (দুনিয়াবিমুখ) হতে পারবে? তিনি বলেন, 'না। যে ব্যক্তি মনের চাহিদা অনুযায়ী ঘুমায় এবং খায়-দায়, সে যাহিদ হতে পারে না। নারীসঙ্গ- লাভের প্রতি প্রবৃত্তির যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেওয়া বেশ কঠিন। এর চাইতে কঠিন কিছু আমাদের শাস্ত্রে রয়েছে বলে আমরা জানি না। কেননা, আল্লাহ তাআলা মানুষের রগ, রেশা ও রক্তে নারীর চাহিদা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাই এ চাহিদা দমন করা অত্যন্ত কঠিন। পক্ষান্তরে খাবারের চাহিদা দমন করা অত্যন্ত সহজ।”
.
অপ্রাপ্তির মাঝেই কল্যাণ
৩৯৫.আমি সালিহ বিন মিসমারকে বলতে শুনেছি, "মানুষের কাজকর্ম আশ্চর্যকর!” জিজ্ঞেস করি, "কেন?” তিনি তখন বলেন, "তারা নিজেদের অর্থভাণ্ডার রেখে নিঃস্ব হাতে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।”
৩৯৬. সালিহ ইবনু মিসমারকে আরও বলতে শুনেছি: "আল্লাহ তাআলা আমাদের যেটুকু দুনিয়া প্রদান করেছেন, তার চেয়ে বড় নিয়ামাত হলো যেটুকু দেননি।”
.
জীবিত আত্মীয়দের আল্লাহর দায়িত্বে রেখে যাওয়া
৩৯৭. মৃত্যুকালে সালিহ ইবনু মিসমারের সম্পদ ছিল মাত্র এক দিরহাম এবং চার দানিকা [এক দিরহামের ছয় ভাগের এক ভাগকে এক দানিক বলা হয়]। মৃত্যুর সময় তাকে বলা হয়েছিল, "আপনার মা-বোনের দেখাশোনার ব্যাপারে কাউকে ওসীয়ত করে যেতে পারতেন।” তিনি এর উত্তরে বলেন, "আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে এ বিষয়ে ওসীয়ত করতে আমার লজ্জা হয়।”
৩৯৮. মুহাম্মাদ ইবনু কাব আল কুরাযি কিছু অর্থ-সম্পদ লাভ করলে কেউ একজন তাকে বলে, "সন্তানদের জন্য কিছু সম্পদ সঞ্চয় করে রাখুন।" তিনি উত্তরে বলেন, "না, আমি বরং নিজের জন্য আমার প্রতিপালকের কাছে তা সঞ্চিত রাখব। আর আমার সন্তানদের জন্য সঞ্চয় করব স্বয়ং আমার রবকে।"
.
অভাবও ফিতনা, সচ্ছলতাও ফিতনা
৩৯৯. আবু উসমান আন নাহদি থেকে বর্ণিত, মুয়ায ইবনু জাবাল একদিন বলেন: "আপনারা এখন কষ্ট আর বিপদের ফিতনায় পড়ে রয়েছেন। এর ওপর ধৈর্য ধারণ করার পর অচিরেই আপনাদের আনন্দ ও সচ্ছলতার ফিতনায় ফেলা হবে।” মানুষ জিজ্ঞেস করল, "স্বচ্ছলতার ফিতনা আবার কী?” তিনি বলেন, "নারীরা ইয়ামানের শাড়ি ও শামের মোলায়েম পোশাক পরিধান করা শুরু করবে।”[ ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ, ১৫/৬৫।]
.
মৃত্যুর প্রথম ঘাঁটির ভয়াবহতা
৫০৯. হাসান বাসরি একবার এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন দেয়ার দৃশ্য দেখে বলেন, "আল্লাহর কসম! প্রথম ঘাঁটিই যখন এমন, তখন তো শেষ ঘাঁটির ব্যাপারে অবশ্যই ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া উচিত। আর যে বিষয়ের বিদায়ের অবস্থা এমন, তবে তো তার শুরু থেকেই বিমুখতা অবলম্বন করা উচিত।”
.
জান্নাত-জাহান্নামের তৃতীয় কোনো বিকল্প নেই
৫১১. ইয়াযিদ আর রাক্কাশি একবার উমার ইবনু আবদিল আযীযের কাছে গেলে তিনি বলেন, "আমাকে কিছু নসীহত করুন।” তিনি তখন বলেন, "আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে এক সময় মৃত্যুবরণ করতে হবে।” উমার ইবনু আবদিল আযীয তখন বলেন, "আরও কিছু নসীহত করুন।” তিনি বলেন, "আদম থেকে নিয়ে আপনার পর্যন্ত যত পূর্বপুরুষ গত হয়েছে, তাদের সকলেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করেছেন।” উমার ইবনু আবদিল আযীয তখন বলেন, "আরও কিছু নসীহত করুন।” তিনি তখন বলেন, জেনে রাখুন, "জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝে তৃতীয় কোনো স্থান নেই। আল্লাহর শপথ! সৎকর্মশীলরা জান্নাতে প্রবেশ করবে আর পাপাচারীরা জাহান্নামে। আপনার সৎকাজ এবং অন্যায় কাজের ব্যাপারে আপনিই ভালো জানেন।" "উমার ইবনু আবদিল আযীয এ কথা শুনে সিংহাসন থেকে পড়ে যান।”
.
৫৩৫. উতবি থেকে বর্ণিত, আবূ তামিমা আল হুজাইমিকে জিজ্ঞেস করা হয়, "দিন কেমন কাটল?” তিনি বলেন, "দুটি নিয়ামাতের মধ্য দিয়ে। প্রথমত, আমার গুনাহ আল্লাহ তাআলা গোপন রেখেছেন। দ্বিতীয়ত, আমার আমলের কথা যারা জেনেছে, তারা আমার প্রশংসা করেছে।"
৫৩৬. বকর ইবনু আবদিল্লাহ এসে আবূ তামিমা আল হুজাইমিকে জিজ্ঞেস করে, 'দিন কেমন কাটল, আবূ তামিমা?' তিনি বলেন, দুটি নিয়ামাতের মধ্যে। আমি জানি না, সে দুটির কোনটি বেশি উত্তম। একটা হলো, আল্লাহ তাআলা আমার গুনাহ ঢেকে রেখেছেন। ফলে এখন কেউ আমাকে সে গুনাহের কারণে অপবাদ দিতে পারবে না। অপরটি হলো, যাদের কাছে আমার আমলের সংবাদ পৌঁছেছে, তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মান তৈরি করে দিয়েছেন।"
.
গুনাহ গোপন রাখাও আল্লাহর অনুগ্রহ
৫৪৩. আহমাদ ইবনু ইবরাহীম আবী দুজানা বলেন, "আমি যুননুন ইবনু ইবরাহীমকে বলতে শুনেছি তার এক সাথি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'সকাল কেমন গেল?' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহ তাআলার অসংখ্য-অগণিত নিয়ামাতের মধ্যে। কিন্তু এর পাশাপাশি বহু অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছি। তাই বুঝতে পারছি না, আসলে কীসের কারণে কৃতজ্ঞতা আদায় করব। আল্লাহ তাআলার দেওয়া এসব উত্তম নিয়ামাতের কারণে, না কি তিনি আমার গুনাহ ঢেকে রাখার কারণে।"
.
মানুষের তিনটি কঠিন অবস্থা
৫৫৫. সাদাকা ইবনু ফযল বলেন, "ইবনু উয়াইনাকে বলতে শুনেছি: 'বনী আদমের তিনটি অবস্থা সবচেয়ে কঠিন। এক. যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এই দুনিয়ায় আসে। দুই. যেদিন সে মৃত্যুবরণ করে, সেদিন একেবারেই অচেনা-অজানা কিছু লোকের সাথে তাকে থাকতে হয়। তিন. যেদিন তাকে কবর থেকে উঠানো হবে, সেদিন সে এমন এক অবস্থার সম্মুখীন হবে, যা আগে কখনও দেখেনি। ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া -এর এই তিন অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: তার প্রতি সালাম যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।”[সূরা মারইয়াম ১৯:১৫]
.
পার্থিব সম্পদের আধিক্য ও পরকালীন পাথেয়র স্বল্পতা
৫৫৬. ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলতে শুনেছি: মৃত্যুর দিন পরিত্যক্ত সম্পত্তি আর হাশরের দিন মিযানের পাল্লা যাকে অপমান করে, তার মতো হয়ো না।
.
৫৭৪. তালহা ইবনু উবায়দিল্লাহ বলেন, "কুযাআ গোত্রের বিলা এলাকার এক ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করে। এর এক বছর পর আরেক ব্যক্তি মারা যায়। একদিন স্বপ্ন দেখি জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। ওই দুজনেরর মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির আগেই জান্নাতে ঢুকছে। এ অবস্থা দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাই। বিষয়টি সকালে অন্যদের বলি আমি। এক সময় তা নবি-এর কানেও যায়। তিনি আমাকে বলেন, 'দ্বিতীয় লোকটা প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর পরও রমাদানের সাওম রেখেছে না? ছয় হাজার রাকাআত এবং আরও সুন্নাত সালাত আদায় করেছে না?'” [আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ. ২/৩৩৩]
.
বার্ধক্যের কল্যাণ
৫৭৮. ওয়াহহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন: “তাওরাতে পড়েছি, প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি ঘোষণা দিয়ে থাকে, 'হে চল্লিশোর্ধ্বরা, ফসল কাটার সময় হয়ে গেছে। হে পঞ্চাশোর্ধ্বরা, হিসাবের জন্য প্রস্তুত হও। তোমরা আখিরাতের জন্য কী পাঠিয়েছ আর দুনিয়াতে কী রেখে গেছ? হে ষাটোর্ধ্বরা, তোমাদের আর কোনো অজুহাত বাকি নেই। হে সত্তরোর্ধ্বরা, নিজেদের মৃত মনে করো।” [আবু নুআইম. হিলইয়াতুল আউলিয়া ৪/৩৩]
.
মনের সচ্ছলতা
৫৮৬. আসমায়ি থেকে বর্ণিত, এক বেদুঈন এক লোককে নসীহত করে বলে: "অর্থ-সম্পদের সচ্ছলতার চেয়ে মনের স্বচ্ছলতাই উত্তম। তাই যাকে সম্পদ দেওয়া হয়নি, সে যেন তাকওয়া থেকেও বঞ্চিত না হয়ে যায়। বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের মাধ্যমে উদরপূর্তি করা বহু মানুষ এমন রয়েছে, যারা দ্বীন এবং মহানুভবতার ক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষুধার্ত। মুমিন সবসময় কল্যাণের মধ্যেই থাকে। এরইমধ্যে ভূপৃষ্ঠ একসময় তাকে অভিবাদন জানায়। আকাশ থেকে সুসংবাদ দেওয়া হয় তাকে। সে যদি ভূপৃষ্ঠে উত্তম কাজ করে যায়, তাহলে ভূগর্ভে কখনোই তার প্রতি মন্দ আচরণ করা হয় না। বার্ধক্য যেমনভাবে যুবকদের ওপর চেপে বসে, মৃত্যুও তেমনিভাবে বৃদ্ধদের গ্রাস করে নেয়। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে দুনিয়ার স্বচ্ছলতা দ্বারা আনন্দিত হয় না। এর বিপদাপদে হা-হুতাশ করে না।"
.
আল্লাহর প্রতি ভয়, আগ্রহ ও আশা
৫৯১. আহমাদ ইবনু আসিম আল আন্তাকিকে বলতে শুনেছেন, "এক আবিদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার প্রমাণ কী, বলুন।' তিনি বলেন, 'সর্বদা সতর্ক থাকা।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'তাহলে আল্লাহর প্রতি আগ্রহের দলিল কী?' তিনি বলেন, 'সবসময় তাঁর তালাশে থাকা।' জিজ্ঞেস করি, 'আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা আকাঙ্ক্ষার দলিল কী?' তিনি বলেন, 'আমল করে যাওয়া।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। বলুন তো, এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে দুর্বলতা চলে আসে কীভাবে?' তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহ তাআলা যে সহনশীলতা দেখান এবং গুনাহ গোপন রাখেন, তোমরা এর ওপর আস্থাশীল হয়ে পড়েছ।"
.
মানুষের দায়িত্ব ইবাদাত, আল্লাহর দায়িত্ব রিযক দেওয়া
৫৯২. সিররি সাকতিকে বলতে শুনেছেন: "একদিন আমি কবরস্থানে গিয়ে দেখতে পাই, বাহলুল এক কবরের ভেতর উভয় পা ঝুলিয়ে বসে মাটি নিয়ে খেলাধুলা করছে। আমি বলি, 'আপনি এখানে!' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ। আমি এমন সম্প্রদায়ের কাছে আছি, যারা আমার উপস্থিতিতেও আমাকে কোনো কষ্ট দেয় না। আর আমি চলে গেলেও তারা আমার দোষচর্চা করে না।' আমি তাকে বলি, 'বাহলুল! কিছু গরম রুটি নিয়ে এসেছি।' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি সামান্য গমের দানার দিকেও তাকাই না। আল্লাহ তাআলা আমাদের যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবে ইবাদাত করে যাওয়াই আমাদের কর্তব্য। আর আল্লাহর কর্তব্য হলো, তিনি যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেভাবে আমাদের রিযক প্রদান করে যাবেন।”
.
ঘুমন্ত-জাগ্রত উভয় অবস্থায় মৃত্যুর স্মরণ
৫৯৩. আব্বাস ইবনু হামযা একদিন বলেন, “আমি একবার যুননুন মিসরির কাছে গিয়েছিলাম। তখন এক মুরিদ বসে ছিল তার কাছে। তিনি তাদের বলেছিলেন, 'ঘুমের সময় মৃত্যুকে বালিশ আর জাগ্রত অবস্থায় মৃত্যুকে লক্ষ্য বানিয়ে নাও। এমন হয়ে যাও, যেন দুনিয়ার প্রতি তোমাদের কোনো প্রয়োজন নেই আর আখিরাত তোমাদের না হলেই নয়।”
.
৬১৩. আবূ হুরায়রা বলেন, "নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছেন: 'যে ব্যক্তি পূণ্যের একটি কাজ করে, তার আমলনামায় এক লক্ষ সাওয়াব লিখে দেওয়া হয়।' তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন, 'এবং নিজের পক্ষ থেকে তাকে মহাপ্রতিদান দান করেন। [নিসা ৪:৪০] এই মহাপ্রতিদান হলো জান্নাত।'” [ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ ১৩/৩৪৯, ৩৫০]
৬১৪. উসমান আন নাহদি বলেন, "জানতে পেরেছি যে, আবূ হুরায়রা বলেছেন, 'আমি নবি-কে বলতে শুনেছি আল্লাহ তাআলা মুমিনের পূণ্যময় কাজ দ্বিগুণ করে দেন।' একদিন পথ চলতে চলতে আবূ হুরায়রা -এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, 'আপনি নাকি নবি-কে বলতে শুনেছেন, আল্লাহ তাআলা মুমিনের পুণ্যময় কাজকে এক লক্ষ গুণ বৃদ্ধি করে দেন?' আবূ হুরায়রা বলেন, 'না। বরং আমি তাকে বলতে শুনেছি, একটি পুণ্য কাজকে তিনি দুই লক্ষ গুণ বৃদ্ধি করে দেন।' এরপর তিনি তিলাওয়াত করেন: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ কারও প্রতি অণু-পরিমাণ যুলুম করেন না। আর যদি তা সৎকর্ম হয়, তবে তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বিরাট সাওয়াব দান করেন। [নিসা ৪:৪০] 
আবূ হুরায়রা এরপর বলেন, 'আল্লাহ তাআলা যে বিষয়কে বিরাট বলেছেন, তার পরিমাণ তো তুমি জানো না।'” [আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ ২৫২১, ৫২২]
..
৬৪৯. একজন যাহিদ বলেছেন: "আল্লাহর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হলো: দরিদ্রতা তাদের জন্য মর্যাদার বিষয়। আল্লাহর আনুগত্য তাদের জন্য মিষ্টতা স্বরূপ। আল্লাহর ভালোবাসা হলো তাদের স্বাদ। আল্লাহর কাছেই তারা নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলে। তাকওয়া তাদের পাথেয়। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর সাথেই। আল্লাহর ওপরই তারা নির্ভর করে। তাঁর সাথেই তাদের বন্ধুত্ব। তারা তাঁরই ওপর ভরসা করে। ক্ষুধা হলো তাদের খাবার। দুনিয়াবিমুখতা তাদের ফল। উত্তম চরিত্র তাদের পোশাক। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা তাদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। বদান্যতা তাদের পেশা। উত্তম আচরণ তাদের সংশ্রব। জ্ঞান তাদের পরিচালক। ধৈর্য তাদের চালনাকারী। হিদায়াত তাদের বাহন। কুরআন তাদের আলোচনা। কৃতজ্ঞতা তাদের ভূষণ। যিকর তাদের কাছে লোভনীয় বিষয়। (আল্লাহর) সন্তুষ্টি তাদের প্রশান্তি। অল্পে তুষ্টতা তাদের সম্পদ। ইবাদাত-বন্দেগী তাদের উপার্জন। শয়তান তাদের শত্রু। দুনিয়া তাদের ডাস্টবিন। লজ্জা তাদের জামা। আল্লাহভীতি তাদের স্বভাব। দিনগুলো তাদের জন্য শিক্ষা। রাত তাদের চিন্তার কারণ। প্রজ্ঞা তাদের তরবারি। সত্য তাদের পাহারাদার। জীবন তাদের সফরের স্তর। মৃত্যু তাদের গন্তব্য। কবর তাদের দুর্গ। জান্নাত তাদের বাড়ি। রব্বুল আলামীনের প্রতি দৃষ্টিপাত তাদের পরম আকাঙ্ক্ষা। তারাই হলো আল্লাহ তাআলার সেই বিশেষ বান্দা, যাদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন:'রহমানের বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।'”[ফুরকান ২৫:৬৩]
.
৬৫২. আবূ আমরকে বলতে শুনেছি: "যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রকৃত পরিচয় লাভ করতে চায়, সে যেন ইবাদাতের সময় আল্লাহর গাম্ভীর্যের প্রতি লক্ষ রাখে। নির্দেশদাতার পরিচয় জানা না থাকার কারণেই নির্দেশ পালনে শৈথিল্য দেখা দেয়।”
.
৬৫৭. এক ব্যক্তি হাতিম আল আসামকে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার কি কোনো কিছুর ইচ্ছা আছে?' তিনি বলেন, 'আমি রাত পর্যন্ত পূর্ণ একদিনের সুস্থতা চাই।' শুনে তাকে বলি, 'আপনি তো প্রতিদিন সুস্থই আছেন!' তিনি উত্তর বলেন, 'কোনো দিন তো তখনই সুস্থ ও নিরাপদ হিসেবে কাটবে, যখন আমি তাতে আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা করব না। 
.
৬৫৮. জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি: সকল পূণ্যের সমষ্টি রয়েছে তিন বিষয়ে। প্রথমত, দিনকে নিজের উপকারে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলে সেটা নিজের ক্ষতির কাজে ব্যয় কোরো না। দ্বিতীয়ত, ভালো মানুষের সাথে মিশতে না পারলে অন্তত মন্দ মানুষকে বন্ধু বানিয়ো না। তৃতীয়ত, আল্লাহর সন্তুষ্টিতে নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে না পারহলে কমপক্ষে তাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে ব্যয় কোরো না।
.
৬৬১. আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি নিজ ভাইয়ের পার্থিব কোনো বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাত দিবসে তার বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুসলিমের দুস্থতা দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুস্থতা দূর করবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতা করে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো রাস্তা দিয়ে চলে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোনো সম্প্রদায় মাসজিদে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়ন করে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তাআলা নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে তার আমল পেছনে ফেলে দিবে, তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করতে পারবে না।[মুসলিম, আস সহীহ, ২৬৯৯]
.
৬৮৪. ঈসা আল বিস্তামি বলেছেন: "দিন আর রাত হলো মুমিনের মূলধন। এর মুনাফা জান্নাত এবং লোকসান জাহান্নাম।”
.
৭০১. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায ইবনু জাবাল এবং আবূ মূসা আশআরি -কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বলেন, "মিলেমিশে কাজ কোরো। একে অপরের কথা মেনে চলবে। মানুষের জন্য সহজ করবে। কঠিন করবে না।" তারা উভয়ে ইয়ামানে আসেন। মুয়ায ইবনু জাবাল মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ইসলামের ওপর থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন তাদের। দ্বীনের গভীর জ্ঞান এবং কুরআন কারীমের শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “এসব জ্ঞান অর্জনের পর আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনাদের কারা জান্নাতি এবং কারা জাহান্নামি।” এরপর বেশ কিছুদিন কেটে যায়, আল্লাহ তাআলাই যার সঠিক পরিমাণ জানেন। এরপর একদিন তারা বলে, "আবূ আবদির রহমান, আপনি বলেছিলেন আমরা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন এবং কুরআন কারীম শিক্ষা লাভের পর যেন আপনাকে জিজ্ঞেস করি, আমাদের মধ্যে কারা জান্নাতি এবং কারা জাহান্নামি।” তিনি বলেন, "হ্যাঁ। যদি ব্যাপকভাবে কারও প্রশংসা হতে থাকে, তাহলে সে জান্নাতি। আর যদি কারও দোষত্রুটির ব্যাপক চর্চা হতে থাকে, তাহলে সে জাহান্নামি।"
.
৭০৮. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তার আমলকে সাতগুণ বৃদ্ধি করে দেন, যা সে করেনি। আর যখন কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তখন তার মন্দ কাজকে সাতগুণ বৃদ্ধি করে দেন, যা সে করেনি। "[আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ ৩/৩৮]
.
৭৩৮. মুতাররিফ বলেছেন: "কিয়ামাতের দিন আল্লাহর কাছে 'এটা কেন করেছ?' এর বদলে 'এটা কেন করলে না?' প্রশ্নের জবাব দেওয়াই আমার কাছে বেশি আকাঙ্ক্ষিত।”
.
৭৭৬. উমার ইবনু আবদিল আযীযেকে জিজ্ঞেস করি, সালিহের নিকট কি আপনার কোনো প্রয়োজন আছে? তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাকে বলবে, আল্লাহর নিকট আপনার জন্য যা অবশিষ্ট রয়েছে, আপনি সেটা আঁকড়ে থাকুন। কেননা, আল্লাহর নিকট যা অবশিষ্ট রয়েছে সেটা মানুষের নিকটও অবশিষ্ট থাকবে। আর আল্লাহর নিকট যা অবশিষ্ট নেই মানুষের নিকটও সেটা অবশিষ্ট থাকবে না।
.
৮০১. একবার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সুগন্ধি বের করে উমার ইবনু আবদিল আযীয এ-এর সামনে রাখা হয়। নাকে ঘ্রাণ যাওয়ার আশঙ্কায় উমার সাথে সাথে নাকে হাত চেপে ধরেন। তখন তার এক সাথি বলেন, "আমিরুল মুমিনীন! গন্ধ নাকে গেলে সমস্যা কী? (ব্যবহার তো আর করছেন না)” তিনি বলেন, "আরে, সুগন্ধীর গন্ধই তো মানুষ উপভোগ করে।”
.
৮০২. মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল জাওহারিকে বলেন: "এক গ্রীষ্মের দিনে জুমুআর সালাত আদায় করে বিশর ইবনুল হারিসের সাথে হাঁটছিলাম। পথিমধ্যে ইসহাক ইবনু ইবরাহীমের বাড়ির পাশ দিয়ে যাই। রাস্তায় এসে পড়ছিল বাড়ির ছায়া। আমি বিশরকে ছায়াতে আনার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তিনি রোদেই হাঁটছিলেন। মনে মনে বলি, 'আল্লাহর কসম! আমি তাকে জিজ্ঞেস করেই ছাড়ব যে, রোদে হেঁটে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার মধ্যে আল্লাহভীরুতার কী আছে।' পরে তাকে জিজ্ঞেস করি, 'আবুল হুসাইন! আমি আপনাকে ছায়ার দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনি রোদেই হেঁটে গিয়েছেন। এর কারণ কী?' তিনি উত্তরে আমাকে বলেন, 'ছায়াটা ছিল এক পাপিষ্ঠের বাড়ির।”
.
৮০৩. মাহফুজকে বলতে শুনেছি 'তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে প্রথমে হারাম বিষয়ে, এরপর সন্দেহজনক বিষয়ে, এরপর অনর্থক বিষয়ে।”
.
৮০৯. সিররি সাকতিকে বলতে শুনেছি: 'বিদআত-মিশ্রিত আধিক্যের চেয়ে সুন্নাত-সম্মত সামান্য অর্জনই উত্তম। তাকওয়ার সাথে কৃত আমল যত কমই হোক, ফেলনা নয়।''