হারিয়ে যাওয়া মুক্তো

এক শিক্ষকের গল্প বলি। তিনি সহ আরও বেশ কয়েকজন ইয়ামেনের এক শায়খের দারসে বসে ছিলেন। দারসটি সে শায়খের বাসাতেই হচ্ছিল। হঠাৎ করে একজন দরজায় কড়া নাড়ল। শব্দ শুনে সে শিক্ষক দরজা খুলতে গেলেন। কিন্তু শায়খ তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কী করতে চাচ্ছ?"

শিক্ষক তখন বললেন, "আমি দরজা খুলতে যাচ্ছি।"

শায়খ আবার জিজ্ঞেস করলেন, "শুধু দরজাই খুলতে যাচ্ছ?"

তিনি জবাব দিলেন, "হাঁ।”

এটা শুনে শায়খ বললেন, "তাহলে আমাকেই দরজা খুলতে দাও।”

শায়খ দরজা খুললেন। আবার দারসে এলেন। তারপর সেই শিক্ষকের উদ্দেশে বললেন, "তুমি তো শুধু দরজাই খুলতে চেয়েছিলে। তাই আমি তোমাকে থামিয়ে দিয়েছি।

আর আমি চেয়েছি:

> আমার ভাইকে সাহায্য করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কেউ যদি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে দেয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৮০)]

> তার দিকে মুচকি হেসে সুন্নাহ পালন করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমার ভাইয়ের সামনে তোমার হাসি হচ্ছে সদকাস্বরূপ।" (সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ১৯৫৬)]

> তাকে সালাম দিয়ে অভিবাদনের সুন্নাহ পালন করতে।

[একব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করল, "ইসলামের সর্বোত্তম দিক কোনটি?” তিনি বললেন, "অপরকে খাওয়ানো আর চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেয়া।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ১২)]

> তার সাথে মুসাফাহা করে আরেকটি সুন্নাহ পালন করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যখন দুইজন মুসলিম একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে আর হাত মেলায়, তারা আলাদা হবার আগেই তাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।" (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৫২১২)]

> আমার পাশে তাকে বসার জায়গা করে দিতে।

> অতিথিকে সম্মান করার সুন্নাহ পালন করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে আল্লাহ ও কিয়ামতের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।” (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১৩৮)]

সুবহানাল্লাহ! সামান্য একটি কাজকে কীভাবে তিনি পরতে পরতে সুন্নাহ দিয়ে সাজিয়ে ইবাদতে পরিণত করেছেন, তা চিন্তা করলেও অবাক হয়ে যেতে হয়। যারা সত্যিই আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করেন, তারা এভাবেই নিজের জীবনের প্রতিটা কাজকে ইবাদতে পরিণত করেন। দুনিয়ার সকল কাজের পেছনে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি। আর যদি কখনো আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ছাড়া শুধু পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো কাজ করে ফেলেন, তবে তারা অনুতপ্ত হন। তখন তাদের দেখলে মনে হয় যেন তারা মস্ত বড় গুনাহ করে ফেলেছেন।

তবে নিজের পুরো জীবনকে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দেয়া একেবারে সহজ কথা নয়। জীবন মানে তো কিছু দিনেরই সমষ্টি। তাই দিন থেকেই শুরু করা যাক।

একটা কাগজ নিয়ে ঝটপট তিনটি কলাম করে ফেলুন:

* সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা।

* বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা।

* রাত ১১টা থেকে সকাল ৯টা।

এবার প্রতিটি কলাম নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করুন। এই সময়ে আপনি কী কী করেছেন তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন। কোনোকিছুই বাদ দেবেন না। খাওয়া- দাওয়া থেকে শুরু করে এমনকি বাথরুমে যাওয়ার ব্যাপারটাও না। এবার চিন্তা করে দেখুন, এর মধ্যে কোন কোন কাজগুলো আপনি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য করেছেন। কাজটা হয়তো দুনিয়াকেন্দ্রিক হতে পারে, কোনো সমস্যা নেই। তবে লক্ষ্য রাখুন আপনি সেখানেও আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াব আশা করেছেন কি না! যেমনটা করতেন মু'আয ইবনে জাবাল। এবার দেখুন প্রতিটা কলামে আপনি কয়টি কাজ রাখতে পারছেন! এভাবে আমরা নিজেই নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারি।

নিজের নিয়তকে ঠিক করতে দরকার কঠোর অধ্যবসায়। তাই চেষ্টা চালিয়ে যান। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, "আচ্ছা! আমি যে কাজটা করছি, সেটা কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নাকি মানুষের সন্তুষ্টির জন্য? সেটা কি চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য না ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জন্য?" একসময় দেখবেন কলামগুলো আস্তে আস্তে ফাঁকা থেকে ভরাট হচ্ছে। আপনার জীবনের প্রতিটা কাজই উত্তম নিয়ত দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

এভাবে যে নিজের জীবনে করা প্রতিটা সাধারণ কাজকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে তার চেয়ে সফল আর কে হতে পারে? আর তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে, যে নিজের ইবাদতকে দিনের পর দিন আরও সাধারণ করে ফেলে? হয়তো এতক্ষণে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে কেন ইমাম বুখারি তার বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থটি এই হাদিস দিয়ে শুরু করেছিলেন, "প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।"[সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ১]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ১৮-২০

.

শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে উসাইমিন-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "একজন মুমিন কি মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে পারে?" উনি জবাবে বলেছিলেন,

"অবশ্যই সে বিভিন্ন মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে পারে। সে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। অতীতের ব্যাপারে তার মনে আফসোস সৃষ্টি হতে পারে।" [ফতওয়া ইসলামিয়া: ৪/৪৬৫]

হুট করেই আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। খুব বিষণ্ণ লাগে। এ বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে খুব একা একা লাগে। তবে সে একা সময়েও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একটি নসীহা আমাদের সাথে আছে। তিনি আমাদের বিষণ্ণতা দূর করার জন্য একটি ওষুধের কথা বলে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ বিষণ্ণ হওয়ার পর বলে,

اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ ابْنُ عَبْدِكَ ابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضٍ فِي حُكْمُكَ، عَدْلٌ فِي قَضَاؤُكَ، أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ، سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ، أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجَلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي

'আল্লাহ গো, আমি তো তোমারই দাস। তোমার দাসের পুত্র আমি। আমি পুত্র তোমারই এক দাসীর। আমার কপাল তোমার হাতে। আমার ওপর তোমার নির্দেশ অবশ্যই কার্যকর হবে। আর আমার ব্যাপারে তুমি যে ফয়সালাই দাও না কেন, সেটাই সঠিক। আমি তোমার কাছে চাচ্ছি, তোমার প্রতিটা নামের উসীলায়। যে নাম তুমি নিজের জন্য রেখেছ। কোনো কিতাবে নাযিল করেছ। কাউকে শিখিয়েছ অথবা নিজের জন্যেই রেখে দিয়েছ। (আল্লাহ গো,) তুমি কুরআনকে বানিয়ে দাও আমার হৃদয়ের প্রশান্তি। আমার বক্ষের জ্যোতি। দুঃখের অপসারণকারী। আমার দুঃশ্চিন্তা দূরকারী।'

তবে আল্লাহ তার বিষণ্ণতা ও দুঃখ দূর করে দেবেন আর (অন্তরটা) আনন্দ দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন,

“হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কি এই কথাগুলো শেখা উচিত না?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হাঁ, অবশ্যই। যে কেউ এই কথাগুলো শুনবে, তার এটি শেখা উচিত। "[ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ৩২৯]

যারা সত্যিই মন দিয়ে বুঝে বুঝে এই দু'আ পড়েছে, তারা অবশ্যই এই দু'আর উপকারিতার কথা স্বীকার করবেন। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে উসাইমিন বলেছেন, "মানুষের ঈমান আজ দুর্বল হয়ে গেছে। আজ তারা শরিয়াহতে যে আরোগ্যের কথা বলা হয়েছে, তা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়। শরিয়াহতে যে আরোগ্যের কথা বলা হয়েছে তার চেয়ে তারা ওষুধের ওপরেই বেশি ভরসা করে। কিন্তু যখন কারও ঈমান দৃঢ় থাকে, শরিয়াহর এই আরোগ্যগুলো সম্পূর্ণ কার্যকর হয়। এমনকি ওষুধের চেয়েও এটি ভালো কাজ করে।”[ফতওয়া ইসলামিয়া: ৪/৪৬৫]

আমরা আল্লাহর কাছে চাই যেন উনি সে দিনটা আমাদের দুই জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন বানিয়ে দেন যেদিন আমরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করব। জান্নাতে তাঁর দেখা পাব।

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ২৮-২৯

.

ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, "কখনো কখনো কাউকে যদি বাধ্য হয়ে মাত্রাতিরিক্ত 'মুবাহাত[এটি বলতে এমন কিছু বিষয়কে বোঝানো হয় যা সওয়াব কিংবা গুনাহ কোনোটিই নিয়ে আসে না। কিন্তু এ ব্যাপারগুলোতে খুব বেশি লিপ্ত থাকা প্রশংসনীয় নয়।]-এর বৈঠকে থাকতে হয়, তবে সে যেন এ ধরনের আসরকে তার সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহর আনুগত্যের মজলিসে রূপান্তরের চেষ্টা করে। সে যেন নিজের মধ্যে সাহস রাখে। নিজের অন্তরকে দৃঢ় করে। শয়তানের কথায় কান না দেয়। শয়তান তো ফিসফিস করে বলবেই, 'তুমি তো লোক দেখানোর জন্য এমন করছ। তুমি আসলে চাচ্ছ সবাই যাতে তোমাকে আলাদা নজরে দেখে।' শয়তানের এই ধোঁকাকে একটুও পাত্তা দেয়া যাবে না। আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। আর নিজের সাধ্য অনুযায়ী সবাইকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সত্যিই যদি কেউ তা না করতে পারে, তবে সে যেন ওই মজলিস থেকে নিজের অন্তরকে এমনভাবে সরিয়ে নেয় যেভাবে সে ময়দার তাল থেকে আঁশ ছড়িয়ে নেয়। সে যাতে সেখানে থেকেও না থাকে। তাদের কাছে থেকেও দূরে থাকে। জেগেও ঘুমিয়ে থাকে। সে তাদের দেখেও দেখছে না। শুনেও শুনছে না। কারণ, সে তার মনকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলেছে। নিয়ে গেছে সবচেয়ে ওপরে। আরশের পাশে সব পবিত্র রুহের সাথে। সে মন আল্লাহর প্রশংসা করছে। তাঁর মহিমার কথা বলছে। যে কারোর অন্তরের জন্য এটা কতই-না দুঃসাধ্য! তবে তার জন্য নয়, যার জন্য আল্লাহ তা সহজ করে দেন।"[মাদারিজুস সালেকীন: ১/ ৪৫৩-৪৫৪]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ৫০-৫১

.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন আহার করে, তখন সে যেন ডান হাতে খায়। আর যখন পান করে সে যেন ডান হাতে পান করে। কারণ, শয়তান বাম হাতে আহার করে এবং বাম হাতে পান করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২০২০)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক বালককে বলেছিলেন, "ছেলে! বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে আহার করো এবং তোমার কাছ থেকে খাও।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৭৬)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন "হেলান দেয়া অবস্থায় আমি আহার করি না।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৯৯)

আনাস থেকে বর্ণিত, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো খাবার খেতেন তখন তাঁর আঙুল তিনটি চেটে নিতেন এবং তিনি বলতেন, 'যদি তোমাদের কারও লোকমা পড়ে যায় তবে সে যেন তা থেকে ময়লা দূর করে এর খাদ্যটুকু খেয়ে ফেলে। শয়তানের জন্য যেন তা রেখে না দেয়।' আর তিনি আনাদের বাসন মুছে খেতে আদেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, 'তোমরা তো জানো না, খাবারের কোন অংশে বরকত আছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২০৩৪)]

যখন আবু বকর-এর কন্যা আসমা সারিদ (মাংসের ঝোলে ভিজিয়ে বানানো রুটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খাবারটি খুব পছন্দ করতেন।) তৈরি করতেন, তিনি তা ঢেকে দিতেন যেন খাবারের ধোঁয়া প্রশমিত হয়ে যায়। তিনি বলতেন, "আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, 'এমনটা করলে বারাকাহ বেড়ে যায়'। "[ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫২০৭]

আবু হুরাইরা বলতেন, "ধোঁয়া না প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত খাবার খাওয়া উচিত না। "[বায়হাকি, হাদিস নং: ৪২৮]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ৭১-৭২

.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আজ যাদের পেট পূর্ণ থাকবে, কিয়ামতের দিন তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে।" [তিরমিযী, হাদিস নং: ২৪৭৮]

এ হাদিসটি শোনার পর সাহাবি আবু জুহাইফা আর কখনোই পেটভরে খাননি। [উমদাতুল কারি: ২১/৫৩]

ইমাম আহমাদ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: "যার পেট পূর্ণ সে কি অন্তরে কোমলতা অনুভব করতে পারে?" তিনি বললেন, "আমি মনে করি না।" [জামি'উল উলুম: ২/৪৬৯]

লোকমান হাকিম তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, "ছেলে! যার পেট পূর্ণ থাকে, তার চিন্তা করার ক্ষমতা ঘুমিয়ে যায়। তার প্রজ্ঞা চুপ হয়ে যায়। আর তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করার স্পৃহা মরে যায়। "[তফসীরুল মওদু'ঈ: ১/২২২]

উমার লোকদের উদ্দেশ্যে একদিন বলেছিলেন, "আল্লাহর কসম! আমি চাইলে তোমাদের সবার চেয়ে ভালো পোশাক পরতে পরতাম। সবচেয়ে ভালো খাবার খেতে পারতাম। আর সবচেয়ে বিলাসবহুলভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি শুনেছি আল্লাহ তা'আলা কিছু লোককে এই বলে তিরস্কার করবেন: 'তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই তোমাদের অংশের নিয়ামতগুলো নিঃশেষ করে করে ভোগ করেছ। তাই আজ তোমাদের অপমানজনক শাস্তি দ্বারা প্রতিফল দেয়া হবে। কারণ, তোমরা দুনিয়াতে অহংকার করেছিলে। [সূরা আহকাফ ৪৬:২০, হিলিয়াতুল আওলিয়া ১/৪৯]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মানুষ এমন কোনো পাত্রই পূর্ণ করেনি, যা পেটের চাইতে মন্দ। সামান্য খাবারই যথেষ্ট আদমসন্তানের জন্য যা তার পিঠকে সোজা রাখবে। কিন্তু তারপরেও যদি তোমারা বেশি খেতেই চাও; তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য আর এক-তৃতীয়াংশ নিশ্বাসের জন্য রাখবে। [তিরমিযী হাদিস নং: ২৩৮০]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ৯৮-১০০

.

তখন উমার-এর খিলাফতের সময়। একদিন উমার এক লোককে তার ছেলেসহ দেখলেন। তিনি তাদের মধ্যকার সাদৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন। লোকটি তখন বলল, "হে আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহর কসম! ও যখন জন্ম নেয়, তখন ওর মা মৃত ছিল।" এ কথা শুনে উমার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাকে বলো তো আসলে কী হয়েছিল?"

লোকটি তখন বলা শুরু করল, "ওর মা যখন গর্ভবতী তখন আমি সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সে আমাকে বলল, 'আমার এ অবস্থায় তুমি কেমন করে আমায় একা ফেলে যাচ্ছ?' আমি তাকে বললাম, 'তোমার গর্ভে যা আছে তার ব্যাপারে আমি আল্লাহকে ভরসা করছি।'

সফর শেষে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। বাসায় এসে ওর নাম ধরে ডাকলাম কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। আমি জানতে পারলাম, ও আর বেঁচে নেই। কাঁদতে কাঁদতে ওর কবরের কাছে গেলাম।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি আমার এক ভাইয়ের সাথে বসে ছিলাম। ওর কবরটা আমাদের সামনেই ছিল। হঠাৎ করে ওর কবরের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো সেখানে আগুন জ্বলছে। আমি আমার ভাইকে এটা দেখালে ও বলল, 'আমরা তো এটা সে মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি।'

আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! সে খুবই ধার্মিক নারী ছিল। সব সময় নিজের পবিত্রতা বজায় রাখত। সালাত পড়ত, সিয়াম পালন করত।' তখনি বাসায় ফিরে গিয়ে আমার কুঠারটি নিয়ে তার কবরের কাছে এলাম। এসে দেখি, কবর আগে থেকেই খোলা। তাকিয়ে দেখলাম, আমার স্ত্রীর লাশ বসা অবস্থায় রয়েছে। আর আমার ছেলেটা ওর সামনে হামাগুড়ি দিচ্ছে। আর আমি শুনলাম আকাশ থেকে একটি কণ্ঠস্বর বলছে

'হে ভরসাকারী! তুমি তোমার রবের ওপর ভরসা করেছিলে। তোমার সম্পদ নিয়ে নাও।'

তাই আমি ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলাম। আর সে সন্তানকেই আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন, হে আমিরুল মুমিনীন।" [তাবারানী, হাদিস নং: ৮২৪]

শায়খ আবদুর রহমান আস-সা'দি বলেছেন, "আল-হাফিয তো তিনি যিনি তাঁর সকল সৃষ্টির হিফাযত করেন। তাঁর জ্ঞানে যা কিছু আছে, তিনি যা কিছু অস্তিত্বে এনেছেন, সবকিছুর হিফাযত তিনি করেন। তিনি তাঁর বান্দাকে গুনাহ থেকে রক্ষা করেন। বিপদ থেকে মুক্ত করেন। তিনি সকল অবস্থায় তাদের খেয়াল রাখেন।" [তাফসীরে সাদি: ১/৯৪৭]

"যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোনো না-কোনো পথ বের করে দেবেন। এবং তিনি তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেন-ই।"[সূরা আত-ত্বলাক, ৬৫: ২-৩]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ১২৬-১২৭

.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মানুষ তার গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়।” (ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৮৭২)

ইবনুল কায়্যিম বলেন, "গুনাহ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। গুনাহ করার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয়। কমিয়ে দেয় তওবা করার ইচ্ছাকে। একসময় তার আর তওবা করার কোনো ইচ্ছাই থাকে না। (আর তওবা করলেও দায়সারাগোছের তওবা করে) সে ক্ষমা চায়, অনুশোচনা প্রকাশ করে। কিন্তু সেটা মুখের ঠোঁট নাড়ানো ছাড়া আর কিছুই না। তার তওবা তো মিথ্যুকদের তওবার মতো। (যে মুখে তওবা করলেও) ভেতরে ভেতরে ঠিকই গুনাহ করার ধান্দায় থাকে। তার ইচ্ছা থাকে সে গুনাহের ওপরই অটল থাকার। (আল-জাওয়াবুল কাফি: ১/৫৬)]

একজন সালাফ বলতেন, "কোনো গুনাহ করলে আমার বাহন এমনকি আমার স্ত্রীর মধ্যেও আমি এর প্রভাব দেখতে পেতাম।" (আল-জাওয়াবুল কাফি: ১/৫৪)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কিছু উপায় বলে দিয়েছেন। এগুলো অনুসরণ করলে আমাদের জানা- অজানা অনেক গুনাহই পরম দয়াময় ক্ষমা করে দেবেন। আমাদের মৃত অন্তরকে আবার জীবিত করবেন। এমন পাঁচটি উপায় হচ্ছে:

(১) খাবারের পর গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ খাবার খাওয়ার পর বলে, 'সকল প্রশংসা তাঁর যিনি আমাকে এই খাবার খাইয়েছেন। আমার নিজের এ ব্যাপারে কোনো শক্তি বা ক্ষমতা ছিল না।' তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।" [আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪০২৩]

২) কাপড় পরিধানের পর গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ জামা গায়ে দিয়ে বলে, 'সকল প্রশংসা তাঁর যিনি আমাকে এই জামা পরিয়েছেন আর এটিকে আমার জন্য বরকতময় করেছেন। আমার নিজের এ ব্যাপারে কোনো শক্তি বা ক্ষমতা ছিল না।' তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।" [আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪০২৩]

৩) সালাত শেষ করে গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রত্যেক সালাতের পর ৩৩ বার করে বলবে, سبحان الله 'আল্লাহ কতই-না পবিত্র-মহান।' الحمدُ لله 'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।' 'আল্লাহ সবচেয়ে বড়।' এভাবে মোট ৯৯ বার। এরপর ১০০ বার করার জন্য নিচের দু'আ বলবে, لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।' তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হয়।" [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৫৯৭]

৪) অবসর সময়ে গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে বলে, لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি সবার চাইতে বড়। তাঁর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় ও শক্তি নেই।' আর তার গুনাহসমূহ মাফ করা হয় না, এমনকি তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হলেও।"[তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৪৬০]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, "যে প্রতিদিন ১০০ বার বলবে, سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ 'প্রশংসাসহ আমি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি।' তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হয়। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৯১]

(৫) ঘুমোতে যাবার আগে গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ ঘুমোতে যাবার আগে বলে, لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা। তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় ও শক্তি নেই। আল্লাহ কতই-না পবিত্র- মহান। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা। আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই। আর তিনি সবার চাইতে বড়।' তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হয়।" [ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৫২৮]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ১: ১৩৪-১৩৭