যাদুল মাআদ

পুণ্যময়ী বিবিগণ
হযরত খাদীজা (রা:):হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথমা স্ত্রী হযরত খাদীজার (রা:) সাথে নবুওতের আগেই বিয়ে হয়েছিল। তখন হযরত খাদীজার (রা:) বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর জীবদ্দশায় হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কোন বিয়ে করেন নি। ইবরাহীম ভিন্ন সব সন্তান-সন্ততিই তাঁর গর্ভে' হয়েছিল। হযরতের এ স্ত্রীই তাঁর সাথে অশেষ নির্যাতন ও কষ্ট সয়েছেন এবং তাঁর প্রচার কার্যে' সাহায্য করতে গিয়ে ধনে ও প্রাণে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাই তাঁকে হযরত জিব্রাঈলের (আ:) মাধ্যমে সালাম পৌঁছিয়েছিলেন। এ মর্যাদা কেবল তাঁরই লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। হিজরতের তিন বছর আগে তিনি ইন্তিকাল করেন।
-যাদুল মাআদ ১:৬৫
.
হযরত সওদা (রা:):হযরত খাদীজার (রা:) ইন্তিকালের কিছুকাল পরে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সওদা বিন্তে যুমআ কর্শিয়াকে বিয়ে করেন। হযরত সওদা (রা:) পরে স্বামীর ওপরে নিজ অধিকার হযরত আয়েশাকে (রা:) দান করেছিলেন।
হযরত আয়েশা (রা:):তারপর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে আবদুল্লাহ হযরত আয়েশাকে (রা:) বিয়ে করলেন। তিনি হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব চাইতে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। তাঁর পবিত্রতা সম্পর্কে' আরশ থেকে আল্লাহ তা'আলা ওহী নাযিল করেছিলেন। আর বিয়ের আগেই রেশমের এক টুকরা কাপড়ে তাঁর ছবি অবতীর্ণ হয়েছিল। জানানো হয়েছিল:এ হচ্ছে আপনারই পুণ্যময়ী স্ত্রী। শওয়াল মাসে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর বয়স তখন ছ'বছর। হিজরতের পরে তাঁর রূখসতী হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল নয় বছর। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র তাঁকেই কুমারী অবস্থায় বিয়ে করেন। তিনি ছাড়া আর কারুর বিছানায় ওহী নাযিল হয়নি। যারা তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ তুলেছিল, তাঁরা যে কুফরী করেছিল এ ব্যাপারে সবাই একমত। হযরত আয়েশা (রা:) পবিত্র বিবিগণের ভেতরে সব চাইতে শিক্ষিতা ও ফিকাহ শাস্ত্রবিদ ছিলেন। দুনিয়ার মুসলিম নারীকুলের ভেতরে ফিকাহ শাস্ত্রে তিনি ছিলেন-অদ্বিতীয়া। যার ফলে বড় বড় সাহাবাগণ জটিল মাসআ'লা-মাসায়েলের ব্যাপারে তাঁর শরণাপন্ন হতেন। এক রিওয়ায়েতে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুদিনের জন্যে তাঁর সাথে সম্পর্ক' ছিন্ন করেছিলেন। কিন্তু, রিওয়ায়েতটিকে প্রামাণ্য দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
হযরত হাফসা (রা:):তারপর তিনি হযরত হাফসাকে (রা:) বিয়ে করেন। তিনি হযরত উমরের (রা:) কন্যা ছিলেন। আবু দাউদে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তালাক দিয়েছিলিন। কিন্তু, আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন।
হযরত যয়নব বিন্তে খুযায়মা (রা:):তার পরে বণু হিলাল বিন আমরের হযরত যয়নব বিন্তে খুযায়মা বিন হারিছ কায়সিয়াকে বিয়ে করেন। হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এসে তিনি মাত্র দু'মাস জীবিত ছিলেন।
হযরত উম্মে সালমা (রা:):তাঁর পরে তিনি হযরত উম্মে সালমা হিন্দ বিন্তে আবি উমাইয়া করশিয়াকে বিয়ে করেন। আবি উমাইয়ার আসল নাম হজায়ফা ইবনে মুগীরা। হযরত উম্মে সালমা (রা:) সবার শেষে ইন্তিকাল করেন। একদল বলেন:হযরত সফিয়াই (রা:) সবার শেষে মারা যান।
-যাদুল মাআদ ১:৬৬
.
যয়নব বিন্তে জাহাশ:তারপর হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসাদ ইবনে খুযায়মার বংশের যয়নব বিন্তে জাহাশকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন হযরতের চাচী উমায়মার কন্যা। তাঁর সম্পর্কে' এ আয়াত নাযিল হল:"তার সাথে যায়েদের যখন পাট চুকে গেল, আমি তাকে আপনার সাথে বিয়ে দিলাম।” এ কারণেই হযরত যয়নব (রা:) অন্যান্য উম্মাহাতুল মু'মেনীনের কাছে অহংকার করে ফিরতেন যে, তোমাদের পরিবারের লোকজন তোমাদের বিয়ে পড়িয়েছে। আর আমার বিয়ে আল্লাহ তা'আলা সপ্ত আকাশের ওপরে থেকে পড়িয়েছেন। এটা অবশ্যই তাঁর বৈশিষ্ট্য যে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা উধ'লোকে থেকে তাঁর বিয়ে পড়িয়েছেন। আমীরুল মুমেনীন হযরত উমরের (রা:) খিলাফতের গোড়ার দিকেই তিনি পরলোক গমন করেন। প্রথমে তাঁর বিয়ে হয়েছিল হযরত যায়েদ ইবনে হারিছার সাথে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পালক পুত্র করেছিলেন। তিনি যখন তালাক দিলেন, তখন আল্লাহ তা'লা নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথেই যয়নবের (র:) বিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য হল, মুখ বোলা পুত্রের বধুকে বিয়ে করা বৈধ প্রমাণ করা।
-যাদুল মাআদ ১:৬৮
.
হযরত জুবায়রিয়া বিন্তে হারিছ:তা ছাড়া হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জুবায়রিয়া বিন্তে হারিছ ইবনে আবি যিরার মুস্তালাকিয়াকেও বিয়ে করেন। তিনি বর্ণী মুস্তালিকের বন্দীদের সাথে এসেছিলেন। হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে মুক্তি লাভের বিনিময় আদায়ে সাহায্য প্রার্থনার জন্যে তাঁর খিদমতে হাজির হয়েছিলেন। তিনি তাঁর দাসত্বের বন্ধন মুক্তির টাকা আদায় করে তাঁকে বিয়ে করে নিলেন।
হযরত উম্মে হাবীবা:তারপর তিনি উম্মে হাবীবাকে (রা:) বিয়ে করেন। তাঁর আসল নাম ছিল রিমলা বিন্তে আবি সুফিয়ান বিন সখর বিন হরব করশিয়া উমুবিয়া। এক রিওয়ায়েতে তাঁর হিন্দা নামেরও উল্লেখ রয়েছে। হিজরতের সময়ে যখন তিনি আবিসিনিয়ায় ছিলেন, তখনই তাঁর সাথে হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে হয়। সম্রাট নাজ্জাশী হযরতের পক্ষ থেকে চারশ দীনার দেন মহর আদায় করেন। সেখান থেকে তিনি মদীনায় চলে এলেন। তাঁর ভাই মু'আবিয়ার শাসনকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
-যাদুল মাআদ ১:৬৯
.
হযরত সফিয়া (রা:):তা ছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুসার (আ:) ভাই হারুনের (আ:) বংশধর বণী নজীরের অধিপতি হাই ইবনে আখতাবের কন্যা হযরত সফিয়াকে (রা:) বিয়ে করেন। এ মহিলা এক নবীর বংশধর ছিলেন এবং অন্য নবীর স্ত্রী হলেন। সমসাময়িক দুনিয়ায় তিনি আদ্বতীয়। সুন্দরী ছিলেন। দাসী, হয়ে তিনি এসেছিলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিনিময় দিয়ে মুক্ত করলেন এবং এই মুক্তির বিনিময়টুকুই মহর নির্ধারিত হল। এ ভাবে নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজটি উম্মতের জন্যে সুন্নাত হয়ে দাঁড়াল। যদি কেউ নিজ ক্রীতদাসী আযাদ করে দিয়ে পরে বিয়ে করতে চায়, তা হলে আযাদ করাটাই মহর হরে যায়। আযাদ করাতেই তার বিয়ে সিদ্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার বিয়ে পড়ার দরকার হয় না। ইমাম আহমাদ (রঃ) ও বিরাট একদল মুছান্দিছের এটাই মত যে, যদি কেউ বলে 'আমি আমার দাসীকে আযাদ করলাম এবং সেটাকেই তার মহর ঠিক করলাম' কিংবা 'আমি আমার দাসীর আযাদ করাটাকে তার বিয়ের মহর মনে করলাম' তা হলে আযাদ করা ও বিয়ে করা দুটোই সিদ্ধ হয়ে গেল। কোন ওলিরও প্রয়োজন হয় না। অবশ্য একদল আলিম বলেন, বিয়ের এ পদ্ধতিটি শুধু, রসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্যেই সিদ্ধ ছিল। অবশিষ্ট ইমামত্রয়ের মত এটাই। কিন্তু, পয়লা মতটিই বেশী সঠিক। কারণ, মাস'আলার ধরন দেখলে তাতে বিশেষত্ব খাঁজে পাওয়া যায় না।
-যাদুল মাআদ ১:৭১
.
হযরত মায়মুনা (রা:):হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়মুনা বিন্তে হারিছ হিলালীকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন তাঁর শেষ স্ত্রী। সবার শেষে তিনি মক্কায় উমরা আদায় করা ও ইহরাম খুলে ফেলার পরে এ বিয়েটি করেন। এ নিকার মূল ঘটক আবু রাফে' (রা:)। হযরত আবু রাফে' বলেন:আমি তাঁদের দু'জনার মধ্যকার বাণী বাহক ছিলাম। হযরত মায়মুনা (রা:) হযরত মু'আবিয়ার শাসনকালে মারা যান। সরফ নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
হযরত রায়হানা বিন্তে যায়েদ নযরিয়া (রা:):এক বর্ণনা মতে তিনি হযরতের পবিত্র বিবিগণের অন্তভুক্ত ছিলেন। একটি মর্ত হল এই, তিনি করজী মহিলা ছিলেন। বণী কুরায়জার পরাজয়ের দিন তিনি বন্দী হয়ে আসেন এবং হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অংশে পড়েন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আযাদ করে নিকা করেন। তারপর এক তালাক দেন। পরে আবার তিনি ফিরিয়ে আনেন। মুহাদ্দিছদের একটি দল তাঁকে দাসী বলেছেন। তিনি হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযাদ করা ও 'মাওতুআ' (সহবাসকৃত) দাসী ছিলেন। তাই তাঁকে পবিত্র স্ত্রীদের দলে শামিল না করে দাসী ধরা হয়।
এ সব মহিলার সাথেই হযরতের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু, এমন কিছু, মহিলার কথাও কিতাবে রয়েছে যাঁদের কাছে তিনি কিংবা তাঁর কাছে তারা বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু, হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকার করায় অথবা তাদের কোন ওজর থাকায় বিয়ে হয়নি। তাদের সংখ্যা চার কিংবা পাঁচ হবে। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জওনিয়ার কাছে বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। তার বাড়ীতে তিনি তাশরীফও নিয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি ওজর পেশ করলেন। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওজর কবুল করলেন। তেমনি ঘটেছিল কালবিয়ার ও যে মহিলার দেহে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্বেত রোগ দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর ঘটনাটি। তা ছাড়া এক মহিলা হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে বিয়ে বসার প্রস্তাব নিয়ে এলে তিনি তাকে এক সাহাবীর সাথে বিয়ে দেন এবং কুরআনের কয়েকটি সূরা শেখানোকে তার মহর নির্ধারিত করে দেন। এই হল আসল ঘটনা। আল্লাহই সব জানেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের সময়ে তাঁর ন'জন স্ত্রী বেঁচে ছিলেন। তাঁদের আটজনের দিনও বন্টিত ছিল। তাঁদের নাম এখানে দেয়। হল:হযরত আয়েশা (রা:), হযরত হাফসা (রা:), হযরত যয়নব বিন্তে জাহাশ (রা:), হযরত উম্মে সালমা (রা:), হযরত সফিয়া (রা:), হযরত উম্মে হাবীবা (রা:), হযরত মায়মুনা (রা:), হযরত সওদা (রা:) ও হযরত জুরায়রিয়া (রা:)। ৬২ হিজরীতে ইয়াযীদের রাজত্বকালে হযরত উম্মে সালমা (রা:) ইন্তিকাল করেন।
-যাদুল মাআদ ১:৭২-৭৩
.
হযরতের দাসীবৃন্দ:
হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন দাসী ছিলেন।
হযরত মারিয়া:ইনি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তনয় ইবরাহীমের (আ:) জননী ছিলেন।
হযরত রায়হানা ও হযরত জামীলা:এ'রাও দাসী ছিলেন। যুদ্ধ বন্দী হয়ে এসে হযরতের অংশে পড়েছিলেন।
হযরত যয়নব বিন্তে জাহাশও হযরতকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন দাসী দিয়েছিলেন।
-যাদুল মাআদ ১:৭৩.৩
.
হুযরতের দাসগণ
তাঁদের অন্যতম ছিলেন হযরত যায়েদ ইবনে হারছা ইবনে শুরাহবীল:নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তাঁকে তিনি আযাদ করে দিয়েছিলেন। তারপর উল্মে আয়মনের সাথে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঘরে উসামা (রা:) জন্ম নেন। তা ছাড়া হযরত আসলাম, আবু রাফে, ছওবান, আবু কাবশা সেলীম, সালেহ, রিবাহ নওবী, ইয়াছার নওবী (উরনায়েনের যুদ্ধে মারা যায়), মুদুআম ও নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরকালীন প্রহরী কিকারা নওবী। খায়বর যুদ্ধে সে হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের রশ ধারণ করেছিল।
বুখারীর রিওয়ায়েত অনুসারে নওবী সেই গোলাম, যে এক জিহাদের সময়ে একটি চাদর লুকিয়ে নিয়েছিল। ষখন সে নিহত হল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেই চাদর তার ওপরে আগুন হয়ে জুলছে। কিন্তু, মুআস্তার রিওয়ায়েতে চাদর লুকানো গোলামের নাম ছিল মুদুআম। আর এ দু'জনই খায়বার যুদ্ধে মারা যায়।
তা ছাড়া আঞ্জাশাহ, হাভী অন্যতম গোলাম ছিল। সফীনাহ ইবনে ফারুখ নামক অন্য এক গোলাম ছিল। তার আসল নাম মোহরান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সফীনা নাম এ জন্যে দিয়েছিলেন যে, সফরের সব জ্ঞিনিসপত্তর সে জাহাজের মতই বয়ে বেড়াত। তাই একবার তিনি বললেনঃ তুমি সফীনা।
আবু হাতিম রিওয়ায়েত করেন যে, হুম্বরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আযাদ করেছিলেন। অন্যান্যের মতে হযরত উস্মে সালমা (রা:) তাকে আয়াদ করেছিলেন।
তা ছাড়া ছিলেন উনায়সা ( যাঁর কুনিয়াত ছিল আব, মাশরুহ ), আফলাহ, উবায়দা, তুহমান, জাকোয়ান, মোহরান ও মারওয়ান। তুহমানের নাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তারপর হুনায়েন, সুন্দর, ফুযালা ইয়ামানী, মাবুরখসী, ওয়াকিদ, কাসসাম, আবু ওসায়িব এবং আব, মুওয়হিবাও তাঁর গোলাম ছিলেন। দাসীদের ভেতরে সালমা, উম্মে রাফে', মায়মনুনা বিন্তে সাদ, খুয়ায়রাহ, রিজবী, রীশাহ, উম্মে যুমায়ের, মায়মনুনা বিন্তে আবু উসায়িব, মারিয়া ও রায়হানার উল্লেখ রয়েছে।
.
হযরতের খাদেম:
তাঁদের ভেতরে হযরত আনাস ইবনে মালিকের ওপরে সাধারণ ব্যাপার সমূহের দায়িত্ব ছিল।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে রসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুতা ও মিসওয়াক থাকত।
উকবা ইবনে আমের জহনী সফরে হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খচ্চরের লাগাম ধরে থাকতেন।
আসলা' ইবনে শরীক হয়তের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের সহচর ছিলেন।
হযরত বিলাল ইবনে রিবাহ মুআজ্জিন ছিলেন।
হযরত সা'দ (রা:) অন্যতম খাদেম ছিলেন।
এ দু'জনই হযরত আবু বকরের গোলাম ছিলেন।
তা ছাড়া হযরত আবু জর গিফারী (রা:), আয়মন ইবনে আবীদ এবং তাঁর জননী হযরত উম্মে আয়মন প্রমুখও হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেবক-সেবিকা ছিলেন। হযরত আয়মন ইবনে আবীদ ও তাঁর জননী উম্মে আয়মন হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওজু ও ইস্তিঞ্জার ব্যবস্থা করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
যাদুল মাআদ ১:৭৪-৭৫
.
.
ওহু লিখকগণ
তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হল:
আব, বকর (রা:), উমর (রা:), উছমান (রা:), আলী (রা:), যুবায়ের (রা:), আমের বিন ফাহীরা (রা:), আমর ইবনুল আস (রা:), উবায় বিন কা’ব (রা:), আব্দুল্লাহ বিন আরকাম (রা:), ছাবিত বিন কায়েস (রা:), হাঞ্জালা বিন রবী’ আয়দী (রা:), মুগীরা বিন শোবা (রা:), আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা:), খালিদ বিন ওলীদ (রা:) ও খালিদ বিন সাঈদ ইবনুল আস (রা:)।
বর্ণিত আছে, হযরত মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা:) ও হযরত যায়েদ বিন ছাবিত (রা:) প্রথম থেকেই ওহী লিখক নিযুক্ত হন। এ দু’জন বিশেষ করে এ দায়িত্বেই নিয়োজিত ছিলেন।
যাদুল মাআদ ১:৭৫
.
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:"যে ব্যক্তি কোন মুসলমান পুরুষকে মুক্তি দিবে, এর বিনিময়ে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। মুক্ত ব্যক্তির প্রতিটি অংগ মুক্তিদাতার প্রত্যেক অংগের মুক্তিলাভের জিম্মাদার হবে।” [তিরমিজী]
পাঁচটি স্থানে নারীকে নরের অর্ধেক বলা হয়েছে।
১. একটি ক্রীতদাস দুটি ক্রীতদাসীর সমান।
২. আকীকা:মেয়ের আকীকায় একটি ছাগল ও ছেলের আকীকায় দুটি ছাগল দরকার হবে।
৩. সাক্ষ্য দান:দুটি নারীর সাক্ষ্যদান একটি পুরুষের সাক্ষ্যদানের সমান।
৪. উত্তরাধিকার প্রশ্ন।
৫. দিয়াত (ক্ষতিপুরণ-ব্যবস্থা)।
-যাদুল মাআদ ১:১০৩
.
হযরতের চলাফেরা:
যখন তিনি হাটতেন, বিনয়ের সাথে চলতেন। সবার চেয়ে দ্রুত চলতেন। তাঁর চলার ভংগিও ছিল সব চাইতে সুন্দর। শান্ত ও দৃঢ় ছিল তাঁর চলার গতি। আবু হুরায়রা (রা:) বলেন-আমি হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইতে সুন্দর পুরুষ আর দেখিনি। তাঁর চেহারায় যেন সূর্যের দ্যুতি জলত। তেমনি আমি তাঁর চাইতে দ্রুত চলার আর কাউকে দেখিনি। মাটি যেন তাঁর জন্যে বিছিয়ে যাচ্ছিল। আমি শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর নাগাল পেতামনা। হযরত আলী (রা:) বলেন:হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চলতেন, বিনয়ের সাথে চলতেন। যেন তিনি উঁচু স্থান থেকে নামছেন। আর 'তাকাল্লু,' করে চলতেন অর্থাৎ যেন উ'চু জমি থেকে নীচু জমীতে নেমে আসতেন। এ ধরনের চলায় ব্যক্তিত্ব, সাহস ও বীরত্ব প্রকাশ পায়। এ ধরনের চলা উপযোগী দেহের জন্যে বেশ আরামপ্রদ হয় এরং হয়রান হবার সম্ভাবনা থাকেনা। কারণ, হয়রান হবার চলা হয় থপ থপ করে চলা। যেন মাথায় একখন্ড গাছ নিয়ে চলছে। এ ধরনের চলা হাস্যকর ও নিন্দনীয়। কিংবা আহম্মক উটের চলা। তাই নিন্দনীয়। তা থেকে বুঝা যাবে, লোকটা নির্বোধ। বিশেষ করে চলতে চলতে যারা ডানে বামে দেখতে থাকে এবং আরামে স্থির শান্ত ভাবে চলে, সেটাই খোদার বান্দার চাল চলন হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন:“খোদার বান্দারা যখন যমীনের ওপরে চলে, নম্র ও শান্তভাবে চলে।” আগেকার এক বুযুর্গ বলেছেন:এর মানে হচ্ছে, তাঁরা নিরহংকার চালে স্থির ও শান্তভাবে চলতেন, দাপটে চলতেন না। এ ধরনের ব্যক্তিত্বপূর্ণ' চলাই চলতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর চলা দেখলে মনে হত যেন তিনি কোন উচু জায়গা থেকে নামছেন এবং মাটি যেন তার জন্যে ছুটে আসছে। কেউ আপ্রাণ চেষ্টা করেও হেটে তাঁর নাগাল পেতেন না। এ থেকে দুটো ব্যাপার জানা যায়। একটা 'হল এই, তাঁর চলার ধরণ নিরহংকার, সঠিক ও আরামদায়ক ছিল। চলা দশ প্রকারের হতে পারে। তিন প্রকার চলার কথা বলা হয়েছে।
-যাদুল মাআদ ১:১০৯
.
চতুর্থ, দৌড়ান।
পঞ্চম, ঊর্ধশ্বাসে দৌড়ান। এটাকে 'খাবাব' ও বলে। সহীহ হাদীছে হযরত ইবনে উমর থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফের সময়ে তিনবার ঊর্ধশ্বাসে দৌড়াতেন এবং চারবার আস্তে দৌড়াতেন।
ষষ্ঠ কুকুরে দৌড়। এ ধরনের দৌড়ে সহজে হয়রান হয় না আর তেমন কষ্টও হয়না। কোন কোন হাদীছ সংকলনে আছে, বিদায় হজ্জে কিছু লোক হযরতের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে ছুটতে গিয়ে কষ্ট অনুভব করছে বলে তাঁর কাছে জানালেন। তিনি বললেনঃ আরেকটু জোরে ছুটতে চেষ্টা কর।
সপ্তম, মেয়েদের মত ঝু'কে ঝুঁ'কে চলা। তাতে বিনয় নেই, আছে নারীসুলভ গতি।
অষ্টম, দৌড় ও হাটার মাঝামাঝি চলন।
নবম, কুদে কুদে চলা।
দশম, দাম্ভিকতার চলন। অহংকারী ও দাম্ভিকরা এভাবে চলে থাকে। আর এ ধরণের চলার জন্যেই এক বিরাট দাম্ভিককে আল্লাহ তা'আলা মাটিতে সোধিয়ে দিয়ে- ছেন। কিয়ামত পর্যন্ত সে এ ভাবেই সেধিয়ে যেতে থাকবে। সবচাইতে সঠিক চলন হল স্থির ও শান্তভাবে চলা।
-যাদুল মাআদ ১:১১০
.
হযরতের ওঠা বসা:তিনি মাটিতে, চাটাইয়ে, বিনাছায় যখন যেখানে স্থান পেতেন অবাধে বসে যেতেন। কাইলা বিন্তে মাখযামা বলেন:আমি একবার হযরতের খিদমতে হাজির হলাম। হযরত পায়ের ওপরে বসা ছিলেন। তাঁকে এরূপ অসহায় অবস্থায় বসা দেখে আমি ভয়ে কে'পে গেলাম। আদী বিন হাতিম যখন এল, হযরত তাকে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। তখন এক বাঁদী তাঁর কাছে একটা বিছানা দিয়ে গেলেন। এটিতে তিনি সাধারণত বসতেন। তিনি সেটাকে আদীর সামনে দিয়ে নিজে মাটিতেই বসে গেলেন। আদী বলেন:আমি বুঝে গেলাম যে, ইনি বাদশাহ নন।
কখনও তিনি চিত হয়ে আরাম নিতেন। কখনও তিনি একটি পা আরেকটি পায়ের ওপরে তুলে রাখতেন। কখনও ডান পাঁজরে ও কখনও বাম পাঁজরে ভর করে থাকতেন। যখন তিনি বাইরে বেরোবার প্রয়োজন বোধ করতেন, দুর্বলতার সময়ে সাহাবাদের কাউকে ভর করে বেরোতেন।
-যাদুল মাআদ ১:১১১
.
হযরত আয়েশা (রা:) বলেন:হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মত এত তাড়াতাড়ি একের পর এক করে বেশী কথা বলতেন না। ববং তিনি পৃথক পৃথকভাবে এরূপ সুস্পষ্ট ভাবে কথা বলতেন যেন শ্রোতা মনে গেথে নিতে পারে। এ জন্যে অধিকাংশ সময়ে তিনি একেকটি কথা তিন তিন বারও বলতেন। সালামও তিনবার উচ্চারণ করতেন। অধিকাংশ সময়ে তিনি চুপ থাকতেন। নিষ্প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথার শুরু ও শেষ সামঞ্জস্যপূর্ণ হত। তাঁর অল্প কথায় অনেক ভাবের প্রকাশ ঘটত। কল্যাণকর কথা ছাড়া বলতেন না। কোন কথা অপছন্দ হলে চেহারায় তা প্রকাশ পেত। অর্থহীন ও অশোভন কথা কখনও বলতেন না। দ্রুত কথা বলতেন না। তাঁর হাসি ছিল মুচকি হাসি। তাঁর হাসির শেষ সীমা ছিল দাড়ী নড়া। বিস্ময়কর দুর্লভ ঘটনা শুনলেই তিনি হাসতেন।
হাসির উদ্রেক কয়েকটি কারণে হয়। একটি তো বলা হল।
দ্বিতীয়, খুশীর দোলায় মনে যখন হিল্লোল সৃষ্টি হয়।
তৃতীয়, ক্রোধের হাসি। এটা কয়েক কারণে হয়।
বক্র বা বিষাক্ত হাসি:এটা প্রকাশ পায় যখন ক্রুদ্ধ ব্যক্তি ক্রোধের কারণ দেখে বিস্ময় বোধ করে অথবা বুঝতে পারে যে, শত্র, হাতের মুঠোয় এসে গেছে।
কৃত্রিম হাসি:মনের রাগটাকে চাপা দিয়ে ঘটনার স্রোত ঘুরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে এ হাসি দেখা দেয়।
হাসির মত তাঁর কান্নাও সংযত ছিল। তাতে জোরে চীৎকার তো দূরের কথা, কোন শব্দই হতনা। হাসির মতই নিঃশব্দ ছিল তাঁর কান্না। কান্নার ক্ষেত্রে এতটুকু হত যে, চোখ বাষ্পাকুল হত ও অশ্রু ঝরে পড়ত। বুকের ভেতর থেকে ক্ষীণ কান্নার রোল ভেসে আসত। কখনও মৃতের ওপরে করুণাসিক্ত হয়ে, কখনও উম্মতের বিপদ ভেবে দয়াদ্র হয়ে, কখনও খোদার ভয়ে ও কখনও কুরআন শুনে তিনি কাঁদতেন। এ শেষোক্ত কান্না খোদার প্রেমে ও ভয়ে কাঁদতেন। যখন তাঁর সন্তান ইব্রাহীম (আ:) মারা গেলেন, তখন চোখে পানি এল এবং কোমল প্রাণের আবেগোচ্ছাসে কেদে ফেললেন। আর বললেন:চোখ কাঁদছে। অন্তর বিষাদে ভরে গেছে। অবশ্য আমি খোদা যাতে রাজী থাকেন তাই করি। হে ইব্রাহীম! তোমার জন্যে প্রাণে আমার অবশ্যই দুঃখ রয়েছে। তা ছাড়া একদিন এক বিলাপকারীর বিলাপ দেখেও তিনি কোঁদে ফেলেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) একদিন তাঁর সামনে সূরা নিসা পড়ছিলেন। যখন এ আয়াত পড়লেন:সেদিন এক অবস্থা দাঁড়াবে যখন উম্মতদের থেকে লোক ডেকে তোমাদের কার্যের স্বাক্ষ্য নেব এবং তোমাকে ডেকে তাদের সবার কার্যের সাক্ষ্য নেব।”
যখন উছমান বিন মাজউন মারা গেল, তখনও তিনি কেঁদেছিলেন। একবার সূর্য গ্রহণ হল। তিনি 'কসুফ' নামায পড়তে গিয়ে কোঁদে ফেললেন এবং বললেনঃ প্রভু আমার! তুমি কি আমার সাথে এ ওয়াদা করনি যে, যতদিন আমি এদের ভেতরে থাকব ও যতদিন এরা সবাই ও আমি তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করে চলব, ততদিন কোন আজাব নাযিল করবে না। একবার তিনি তাঁর এক কন্যার কবরের কাছে গিয়ে কেদেছিলেন। কখনও তিনি তাহাজ্জুদের নামাযে কান্না কাটা করতেন। কান্না কয়েক কারণে হতে পারে। দয়ায় বিগলিত হয়ে কোমল প্রাণের কাঁদা। ভয়ে কাঁদা। ভালবাসায় কাঁদা। আনন্দদাতিশয্যে কাঁদা। অসহ্য আঘাতে কাঁদা ও মনোকষ্টে কাঁদা। কাঁদার পঞ্চম ও ষষ্ঠ কারণ দুটোর ভেতরে পার্থক্য এতটুকু যে, শেষটি কোন হারানো প্রিয় বস্তু বা অতীতের কোন দুঃখ-বিপদ মনে পড়ে দেখা দেয়।পঞ্চমটি অসহনীয় বিপদ ও যাতনা থেকে দেখা দেয়। আসন্ন বিপদ চিন্তা করে ভয়ের কান্না সৃষ্টি হয়। অনন্দাতিশয্যে কান্না হয় ঠান্ডা ও তাতে মন তৃপ্তিতে ভরে যায়। আর বিরহ-বেদনায় উতপ্ত কান্নার সৃষ্টি হয়। মন তাতে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তাই খুশীর কান্নাকে চোখ শীতলকারী বলা হয়। তার জন্যে প্রার্থনা করা হয়, খোদা যেন তার চোখ ঠান্ডা করে। এবং দুঃখের তপ্ত কান্নায় চোখ জ্বালা পোড়া করে বলে বলা হয়, খোদা তার চোখ উত্তপ্ত করুন। সপ্তম প্রকারের কান্না হল দুর্বলতা ও অক্ষমতার কান্না। অষ্টম, কুম্ভিরাশ্র, বা কপট কান্না। তাতে চোখে জল থাকে আর মন থাকে পাথরের মতই শক্ত। বাহ্যত তাকে দেখলে খুবই কোমল প্রাণের মনে হয়। নবম, পেশাগত বা মজুরী নিয়ে কাঁদা। ক্রন্দনকারী পারিশ্রমিক নিয়ে অভ্যাসগতভাবে কেদে থাকে। হযরত উমর ইবনে খাত্তাবের (রা:) মতে তারা কান্নার ব্যবসারী। পুরুষের দুখ নিয়ে নারীরা এ ব্যবসায়ের দ্বারা উপার্জ'ন করে থাকে। দশম, সহানুভূতির কান্না। কাউকে কাঁদতে দেখে কিংবা কারুর দুঃখ দেখে সহানুভূতিতে কেদে ফেলা। এরূপ ক্রন্দনকারী নিজেও বুঝতে পারেন। যে, কেন সে কাঁদছে। শুধু, একজনের করুন কান্না দেখে সেও কাঁদছে। আর যে কান্নায় শুধ, অশ্রু, দেখা দেয়, আওয়াজ শোনা যায় না তাকে বলে রুদ্ধ কান্না। আর যে কান্নায় আওয়াজও হয় তাকে বলে উচ্চৈস্বরে কান্না। যেমন কবি বলেন, "আমার চোখ কান্নায় ভেংগে পড়েছে। তার কান্নার অধিকারও আছে বটে। কাঁদা আর বিলাপ করা ছাড়া কোন উপায় যে নেই।” আর যা নেহাৎ কষ্ট করে সৃষ্টি করতে হয়, তাকে কষ্টে-সৃষ্ট কান্না বলে। এটা হয় দু'ধরনের। একটি প্রসংসনীয় ও দ্বিতীয়টি নিন্দনীয়। লোক দেখানোর জন্যে না হয়ে যদি খোদার ভয়ে মনকে নরম করার প্রয়াসে এরূপ কান্নার চেষ্টা করা হয়, তা প্রশংসনীয়। অবশ্য লোক দেখানো কান্নাটি নিন্দনীয়। হযরত উমর (রা:) যখন হযরতকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকরকে (রা:) বদর যুদ্ধে বন্দীদের ব্যাপারে কাঁদতে দেখলেন, তখন প্রশ্ন করলেন- "হে খোদার রসুল। কাঁদছেন কেন তা আমাকে বলুন। যদি তাতে আমারও কান্না-এসে যায় তো ভাল কথা। নইলে অন্তত কান্নার ভাব সৃষ্টি করে নেব।” এ কথা শুনে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে খারাপ বলেন নি। আগেকার বুযুর্গ'রা বলতেন, খোদার ভয়ে কাঁদ। কান্না যদি একান্তই না আসে তো কাঁদার মত অবস্থা সৃষ্টি করে নাও।
যাদুল মাআদ ১:১১৭-১১৯
.
নামাযের বিধিবিধান
হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে প্রথমেই "আল্লাহ, আকবর" বলতেন। এর আগে কিছুই পড়- তেন না। এমনকি নিয়তও পড়তেন না। এও বলতেন না যে, আমি কা'বামুখী হয়ে ইমাম বা মুক্তাদী হিসেবে চার রাকাআত নামায আদায় করছি। কোন ধরনের নামায আর কোন, ওয়াক্তের নামায তাও বলতেন না। এ সবই বিদআত। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরূপ কোন রিওয়ায়েত নেই। সহীহ, যঈফ, মুসনাদ, মুরছাল, মারফ' কোন রিওয়ায়েতই নেই। সাহাবা কিংবা তাবেঈনদের কোন বক্তব্য পর্যন্ত নেই। চার ইমামের কেউই তা বলেন না।
-যাদুল মাআদ ১:১২৯
.
আল্লাহর দুষমনদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রনাংগনে জিহাদ করাটা হল বান্দার আত্মিক ও আভ্যন্তরিন জিহাদের একটি শাখা মাত্র। যেমন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:“যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির সাথে আল্লাহর পথে চলার জন্য অহরহ সংগ্রাম চালায়, সেই হল প্রকৃত মুজাহিদ এবং আল্লাহর অপসন্দনীয় কাজ ছেড়ে যে ব্যক্তি তাঁর পসন্দনীয় কাজ অনুসরণ করল, সেই হল প্রকৃত মুহাজির (বাস্তুত্যাগী)।
-যাদুল মাআদ ২:৭৪
.
জিহাদ চার শ্রেণীর।
(১) নিজের বিরুদ্ধে জিহাদ
(২) শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ
(৩) কাফিরের বিরুদ্ধে জিহাদ
(৪) মুনাফিকের বিরুদ্ধে জিহাদ।
নিজের বিরুদ্ধে জিহাদ চার প্রকারের:
(১) নিজের বিরুদ্ধে জিহাদের একটি দিক হচ্ছে, সত্য ধর্মের শিক্ষালাভের জন্যে সব প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অগ্রসর হওয়া। কারণ ইহ ও পারলৌকিক জ্ঞান অর্জ'ন ছাড়া কল্যাণ বা সৌভাগ্যের কোন পথ নেই। সুতরাং সেটা অর্জন করতে না পারলে উভয় লোকেই জীবন দুর্ভোগময় হয়ে উঠবে।
(২) দ্বিতীয় দিক হল, শিক্ষার পরে সেটা বাস্তবে রূপ দিবার জন্যে সংগ্রাম কর।। কারণ, শিক্ষা অনুসারে কাজ না হলে সে শিক্ষা ক্ষতিকর না হলেও কল্যাণকর তো হচ্ছেনা।
(৩) যারা শিক্ষা পায়নি, তাদের শেখানো। তা না হলে এ বাণীর আওতায় পড়ে যাবে-'আল্লাহর অবতীর্ণ সত্য ধর্মে'র শিক্ষা যারা গোপন করে, তাদের কল্যাণ তো কিছ, হবেই না, এমনকি জাহান্নাম থেকেও তারা রেহাই পাবেনা।'
(৪) আল্লাহ তা'আলার সত্য ধর্ম' প্রচারের পথে ধৈর্য সহকারে মানব সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিবন্ধক ও নির্যাতন অতিক্রম করে চলার সংগ্রাম বা সাধনা। শুধু, আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যেই সব নির্যাতন সয়ে যাওয়া।
যখন এ চারটি স্তর পার হবে, তখনই হবে সত্য ধর্মের সার্থক আলিম। কারণ, পূর্বসূরীরা বলে গেছেন, যতক্ষন সত্যকে জানবেনা, জেনে তা কার্যকরী করবেন। এবং অপরকে তা শিখিয়ে কার্যকরী করাতে চেষ্টা করবেনা, ততক্ষন 'আলিমে রব্বানী' হতে পারবেনা। এ কারণেই যে ব্যক্তি বিদ্যা অর্জ'ন করল, অপরকে তা শিখাল এবং নিজে তা কাজে পরিণত করল, ঊর্ধ্বতন রাজ্যে তাকে মহান ব্যক্তি বলে গণ্য করা হয়।
শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ দু'ধরনের।
এক, বান্দার অন্তরে সে যে সব কুমন্ত্রণা দেয় ও যে সব সংশয় সৃষ্টি করে, সেগুলো দূর করা। তা না হলে ঈমান বিপন্ন হয়।
দুই, যে সব অবৈধ আশংকা ও কামনা সে অন্তরে জাগিয়ে তোলে, সেগুলো লোপ করা। সত্যধর্ম' সম্পর্কিত সংশয়জনিত কুমন্ত্রনা দূর করার জিহাদ বান্দার ঈমানকে সুদৃঢ় করে। দ্বিতীয়টি দান বরে ধৈর্য'। অল্লাহতা'আলা বলেন:আমি তাদের থেকে পথিকৃৎ সৃষ্টি করেছি। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ দেখায়। তারা ছিল ধৈর্যশীল এবং আমার নিদর্শনে ছিল পরম বিশ্বাসী।" তেমনি তিনি বলেছেন, কেবল ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে সত্যধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। ধৈর্য'ই দূর করে দেয় কামলিপ্স। ও অসদিচ্ছাগুলো। দৃঢ় বিশ্বাস দূর করে সন্দেহ ও জটিলতা। * অত্যাচারী, বিদআতী ও পাপীদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর হল তিনটি। প্রথম, শক্তি থাকলে বল প্রয়োগ করা। তা না হলে মুখে প্রতিবাদ করা। তাও সম্ভব না হলে অন্তরে ঘৃণা পোষন করা। যে ব্যক্তি জিহাদ না করে, এমন কি অন্তরে জিহাদের আকাংখাও পোষণ না করে মারা গেল, সে মুনাফিকের লক্ষণ নিয়ে মরল। কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের স্তর হল চারটি। অন্তর দিয়ে, মুখ দিয়ে, ধন দিয়ে ও প্রাণ দিয়ে। কাফিরের জন্যে নির্দিষ্ট হল শক্তি প্রয়োগ আর মুনাফিকদের জন্যে হল যুক্তি প্রয়োগ। হিজরত ছাড়া জিহাদ এবং জিহাদ ও ঈমান ছাড়া হিজরত পূর্ণ হয় না। এ তিনটি পূর্ণ করল যারা তারাই আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশী হতে পারে। আল্লাহ বলেন:"নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী হবে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।" ঈমান আনা যেহেতু প্রতিটি মানুষের জন্যে ফরয, তাই তার জন্যে দু'টি হিজরত অপরিহার্য'। আল্লাহর তাওহীদ, ইখলাস, ইবাদত, তাওয়াক্কুল, খাওফ, উম্মিদ, তাওবা এবং রসূলের আনুগত্যের দিকে পূর্ব জীবন থেকে হিজরত করা। আর তাঁকে সতর্ক'কারী হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর সংবাদ পৌঁছানোকে সত্য বলে স্বীকার করে সবার ওপরে তাঁকে স্থান দেয়া। হাদীছে আছে, "আল্লাহ ও রসুলের জন্যে যারা হিজরত করে, তাদের হিজরত সেদিকেই তাদের নিয়ে যাবে আর যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থে' যেমন, বাগিচা কিংবা স্ত্রী লাভের উদ্দেশ্যে হিজরত করে, তার হিজরত সে পরিণতিই ডেকে আনবে।" এ কারণেই বান্দার জন্যে আত্মার সাথে ও শয়তানের সাথে লড়াই করার বিধান রাখা হয়েছে। এ দু'ধরণের জিহাদ ফরযে আইন। এ ব্যাপারে অন্য কারর প্রতিনিধিত্ব চলেনা।
-যাদুল মাআদ ২:৭৬-৭৭
.
ইমাম শাফেঈকে কেউ প্রশ্ন করেছিল, মানুষের জন্যে দুনিয়ায় শান্তিতে কাটানো ভাল, না পরীক্ষায় লিপ্ত থাকা ভাল? তিনি জবাব দিলেন-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ' না হওয়া পর্যন্ত মানুষের শান্তি আসতে পারেনা।
-যাদুল মাআদ ২:৮১
.
ইয়াহুদীদের সেখানে তিনটি গোত্র ছিল। বনু কায়নুকা, বনু নজীর ও বনু কুরায়জা। তিনটি গোত্রই রসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরুদ্ধে লড়েছে। বনু কায়নুকাকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষমা করে দিয়েছেন। বনু নজীরকে নির্বাসন দিয়েছেন। আর বনু কুরায়জা যুদ্ধে নির্মূল হয়েছে। তাদের বংশধরদের ভৃত্যে পরিণত করা হয়েছে। বনু নজীর সম্পর্কে সুরা হাশর ও বনু কুরায়জা সম্পর্কে সুরা আহযাব নাষিল হয়েছে।
-যাদুল মাআদ ২:১১১
.
তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্যে ডাকা হত। নামাযের সময় এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের নিয়ে নামাজ পড়তেন। নামায শেষ করে আবার তাদের ইসলাম তথা আল্লাহ রাসূলের পথে ডাকা হত এবং পরে লড়াই শরু হত। অবশেষে সন্ধ্যা নেমে এল। সকালে সূর্য কিছুমাত্র উদয় হওয়া মাত্রই মুসলমানরা এলাকাটি জয় করে নিল। শক্তির মাধ্যমেই এ বিজয় এসেছে। আল্লাহ তা'আলা নিজ রাসুলকে গণীমত দান করলেন। এখানে মুসলমানরা প্রচুর ধন-সম্পদ লাভ করল। তারপর চারদিন তিনি ওয়াদিউল কুরায় অবস্থান করেন। ধন-সম্পদ যা কিছুছ, পেলেন, সাহাবাদের ভেতরে বণ্টন করলেন এবং জমা-জমি ও খেজুর বাগান সেখানকার ইয়াহুদীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে তাদের চাষী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তীমার ইয়াহুদীরা এ খবর পেয়ে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে এসে অনুরূপ চুক্তিতে জমা-জমির দায়িত্ব বুঝে নিয়ে সন্ধি করল। তারপর হযরত উমরের যুগে তিনি খায়বর ও ফিদাকের ইয়াহুদীদের দেশান্তর করেন। তবে ওয়াদিউল কুরা ও তীমার ইয়াহুদীদের থাকতে দেন। কারণ, এ দুটি এলাকা সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তার নিম্নভূমি মদীনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে এলেন। প্রত্যাবর্তনের সময়ে এক রাতে এক স্থানে নেমে তিনি হযরত বিলালকে বললেন-রাতের বেলায় পাহারায় থেক। কিন্তু, হযরত বিলাল ঘুমিয়ে পড়লেন। কারণ, তিনি তার বাহনে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। ফল এই দাঁড়াল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের কেউ সে রাতে জাগ্রত ছিল না। এমনকি সূর্য উঠে গেলেও সবাই ঘুমুচ্ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পয়লা জেগে উঠলেন। তিনি (নামায ক্বাযা হওয়ায়) ঘাবড়ে গেলেন। বললেন-হে বিলাল! এ কি হল?
যাদুল মাআদ ২:২৬৭
.
আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা সাহমীর অভিযান সহীদ্বয়ে হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের হযরত ইবনে আব্দাস থেকে বর্ণনা করেন:ياايها الذين امنوا أطيعوا الله و المعوا لرسول و اولی امر منکم -আয়াতটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হযাফার অভিযান উপলক্ষে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এক অভিযানে পাঠিয়েছিলেন। সহীদ্বয়ে আহমাদের বর্ণিত এক হাদীছেও তার প্রমাণ মিলে। তিনি সাঈদ ইবনে উবায়দা, তিনি আবু আব্দুর রহমান সলমী ও তিনি হযরত আলী (ক:) থেকে এ বর্ণনা শুনেছেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারের নেতৃত্বে একটি অভিযান পাঠিয়েছিলেন। তারপর তার দলকে এ নির্দেশ দিলেন-দলপতির নির্দেশ শুনবে ও মান্য করবে। বর্ণনাকারী বলেন যে, তিনি কোন কারণে দলপতিকে অসন্তুষ্ট করায় দলপতি কতগুলো কাঠ জমা করিয়ে আগুন জ্বালা-নোর ব্যবস্থা করলেন। তারপর তাকে প্রশ্ন করলেন-রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আমার নির্দেশ শুন্তে ও মানতে বলেন নি? বর্ণনাকারী জবাব দিলেন-হাঁ, তিনি তা বলেছেন। জবাব শুনে তিনি নির্দেশ দিলেন-তা হলে এ অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দাও। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি অন্যান্যের মুখের দিকে তাকালেন এবং সেখান থেকে ছুটে এসে রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরবারে হাযির হলেন। ইত্যবসরে দলপতির রাগও থেমে গেল। আগুনও নিভে গেল। তিনি রাসূলের কাছে পৌঁছে সব ঘটনা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিলে তুমি আর ফিরে আসতে না। দলপতির আনুগত্য রক্ষা শুধু, ন্যায় সংগত নির্দেশের বেলায় চলে। এ দলপতিটি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা সাহমী। প্রশ্ন হতে পারে, তারা যদি তাকে দলপতির নির্দেশ মান্য করা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ বলে আগুনে ফেলে দিত, তাহলে হয়ত সেটা তাদের ধারনায় ন্যায় কাজই হত। সেক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় প্রবেশকারী জবাবে বলা যায়, নিজে আগুনে ঝাঁপিয়ে প্রাণ দেয়। যেহেতু পাপ, ভেবে সেরূপ কাজে ছুটে যাওয়া কি পুণ্যের হত, না পাপের হত? সে আগুনে চিরতরে জ্বলবে কেন? তা হল আত্মহত্যা মাত্র। তাই না সেটাকে নেতার নির্দেশ বলে অপরিহার্য' ভাবা চলে না। কারণ, 'আল্লাহর নির্দেশ ভুলে বান্দার আনুগত্য পালন মাখলুকের জন্য চলে না।' যদি তিনি আল্লাহর বিধান অমান্য করে আগুনে ঝাঁপ দিতেন, তাহলে সেরূপ নেতার আনুগত্য আল্লাহর গজবের কারণ হত। কারণ, নিজেকে আগুনে সমর্পন মহাপাপ। আল্লাহ ও রাসুলকে অমান্য করে নেতার নির্দেশ মানা পাপ। আত্মহত্যা তো আল্লাহ ও রাসুলের কাছে জঘন্য পাপের কাজ। নেতাকে মানতে হবে শুধু, ন্যায় সংগত নির্দেশের ক্ষেত্রে।
-যাদুল মাআদ ২:২৭৫

শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের দুনিয়াবিমুখতা

 দুনিয়ার চার অংশ
৮. আমের ইবনু আব্দে কায়েস বলেছেন: "চারটি বিষয়ের সমন্বয়েই মানুষের জীবন। পোশাক, খাবার, ঘুম ও নারী। এখন শোনো, একজন নারী দেখা আর কোনো দেয়াল দেখা-উভয়টাই আমার কাছে সমান। আর পোশাকের ক্ষেত্রে কথা হচ্ছে, লজ্জাস্থান ঢাকতে পারলেই হলো। কী দিয়ে ঢাকলাম, তার কোনো পরোয়া করি না। তবে খাবার ও ঘুম-এ দুটি আমার ওপর প্রবল হয়ে যায়। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ দুটির ক্ষতি করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।” বর্ণনাকারী হাসান বলেন, “আল্লাহর শপথ! তিনি উভয়টারই ক্ষতি করে ছেড়েছেন (অর্থাৎ, খাওয়া ও ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনেছেন)।”

৯. আমের ইবনু আব্দে কায়েস বলেছেন, "দুনিয়ার চারটি অংশ রয়েছে: অর্থ-সম্পদ, নারী, ঘুম ও খাবার। অর্থ-সম্পদ আর নারীর আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই বাকি দুটির ক্ষতি করে ছাড়ব। এবং আমার চিন্তা-ভাবনাকে অবশ্যই একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলব।”
.
দুনিয়া-আখিরাত উভয়টি অর্জনের পন্থা
১২. হাসান বাসরি প্রায় সময়ই বলতেন: “যুবকেরা! আখিরাত অন্বেষণ করো। এমন অনেককে দেখেছি, যারা আখিরাত তালাশ করতে গিয়ে দুনিয়াও পেয়ে গেছে। কিন্তু এমন কাউকে দেখিনি, যে দুনিয়া অন্বেষণ করতে গিয়ে আখিরাতও পেয়ে গেছে।”
.
সুস্থ, পবিত্র, চক্ষুষ্মান, বুদ্ধিমানের পরিচয়
২৫. হাসান বাসরি আলোচনার মধ্যে প্রায়সময়ই বলতেন: হে আদম সন্তান! তুমি তো গতকাল এক ফোঁটা বীর্য ছিলে আর আগামীকাল লাশ হয়ে যাবে। এর মধ্যবর্তী সময়টাতে কেবল ময়লা মুছতে হয় তোমাকে। সুস্থ তো ঐ ব্যক্তি, গুনাহ যাকে অসুস্থ করে তোলেনি। পবিত্র হলো ঐ ব্যক্তি, পাপাচার যাকে অপবিত্র করে দেয়নি। যারা দুনিয়াকে সবচেয়ে বেশি ভুলে থাকতে পারে, তারাই আখিরাতকে অধিক স্মরণ করতে পারে। আর যারা বেশি বেশি দুনিয়ার আলোচনা করে, তারাই আখিরাতকে বেশি ভুলে যায়। যে নিজেকে অনিষ্ট থেকে বিরত রাখে, সে-ই আবিদ। যে হারাম কিছু দেখতে পেয়েও তার কাছে যায় না, সে-ই চক্ষুষ্মান। যে কিয়ামাত দিবসের কথা স্মরণ করে এবং সেদিনের হিসাব নিকাশের কথা ভুলে যায় না, সে-ই কেবল বুদ্ধিমান।”
.
যাহিদের বিস্তারিত পরিচয়
৭৫. ইয়াহিয়া ইবনু মুয়াযকে জিজ্ঞেস করা হলো, "যাহিদের লক্ষণ কী?” তিনি বলেন, “যা জুটে যাবে, সে তা-ই গ্রহণ করবে। যেখানেই সুযোগ হবে, সেখানেই থাকবে। যা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে যায়, সেটাকেই পোশাক হিসেবে গ্রহণ করে নিবে। দুনিয়া হবে তার কারাগার। দারিদ্র্য হবে তার সদা সঙ্গী। নিঃসঙ্গতা হবে তার বৈঠকের সাথি। শয়তান হবে তার শত্রু। কুরআন হবে তার বন্ধু। আল্লাহ তাআলা হবেন তার উদ্দেশ্য। যিকর হবে তার সাথি। দুনিয়াবিমুখতা হবে তার একান্ত বন্ধু। প্রজ্ঞা হবে তার প্রিয় খাবার। নীরবতা হবে তার কথা। শিক্ষা হবে তার চিন্তার বিষয়। জ্ঞান হবে তার পরিচালক। ধৈর্য হবে তার বালিশ। তাওবা হবে তার বিছানা। ইয়াকীন হবে তার সঙ্গী। নসীহত হবে তার ক্ষুধা। সিদ্দিকগণ হবেন তার ভাই। বিবেক হবে তার পথপ্রদর্শক। তাওয়াক্কুল হবে তার রিযক। আমল হবে তার ব্যস্ততা। ইবাদাত হবে তার পেশা। তাকওয়া হবে তার পাথেয়। কল্যাণকর কাজ হবে তার বাহন। প্রজ্ঞা হবে তার উযির। তাওফিক হবে তার সঙ্গী। জীবন হবে তার সফর। দিনগুলো হবে তার সফরের একেকটি স্টেশন। জান্নাত হবে তার ঠিকানা। আল্লাহ তাআলা হবেন তার আশ্রয়স্থল।"
.
প্রয়োজনের অধিক উপার্জনের অসম্ভাব্যতা
৮৯. আবুস সাহবা সিলাহ ইবনুল আশইয়াম বলেছেন, "যত জায়গায় রিযক থাকতে পারে, আমি তার সব জায়গায় তা খুঁজে দেখেছি। কিন্তু দিনের রিযক দিনে অর্জন ছাড়া আমাকে কেবল ক্লান্তিই দেখতে হয়েছে। আমি তখন বুঝতে পেরেছি, দিনেরটা দিনে অর্জন করাটাই আমার জন্য কল্যাণকর। অনেকেই এমন আছে, যাদের দিনের রিযক দিনে প্রদান করা হয়। কিন্তু সে আপন বিবেক বুদ্ধির স্বল্পতার কারণে বুঝতে পারে না যে, এটাই তার জন্য কল্যাণকর।”
৯০. আবূস সাহবা সিলাহ ইবনুল আশইয়াম বলেছেন : "দুনিয়ার যত জায়গায় হালাল রিযক ছিল, আমি তার সব জায়গা সন্ধান করেছি। কিন্তু সব জায়গা থেকেই কেবল জীবনধারণ পরিমাণ সামান্য খাবারই অর্জন করতে পারছিলাম। এই সামান্য সম্পদের মাধ্যমে জীবনধারণ করতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু ওইদিকে সামান্য সম্পদও পিছু ছাড়ছিল না আমার। এ অবস্থা দেখে আমি বলে উঠি, 'হে নফস! যতটুকু না হলেই নয় তোমাকে ততটুকু রিযক-ই প্রদান করা হয়েছে, তুমি এতেই তুষ্ট হয়ে যাও।' আমি তখন তাতেই তুষ্ট হয়ে গেছি, আমাকে আর কষ্ট সহ্য করতে হয়নি।”
.
যুহদের মধ্যমপন্থা
৯১. লুকমান তার ছেলেকে বলেন : "বাবা! আলিমদের সংস্পর্শে থেকো, তাদের সাথে তর্ক কোরো না। অন্যথায় তাদের ক্রোধে নিপতিত হয়ে যাবে। যতটুকু আহার যথেষ্ট, দুনিয়ার ঠিক ততটুকু সম্পদই গ্রহণ করবে। দুনিয়ায় এমনভাবে মত্ত হয়ে যেয়ো না, যা তোমার পরকালের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়। আবার তা একেবারে প্রত্যাখ্যান করে দিয়ো না, অন্যথায় তুমি লোকজনের দয়ার পাত্র বনে যাবে। এমনভাবে সাওম থাকো, যাতে তোমার প্রবৃত্তির চাহিদা দমে যায়। আবার এমনভাবে সাওম শুরু করে দিয়ো না, যাতে দুর্বলতার কারণে তুমি সালাত-ই আদায় করতে পারো না। কেননা, (নফল) সাওমের চেয়ে (ফরয) সালাত আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।"
.
৯৬. ইবরাহীম ইবনু আদহামকে বলতে শুনেছি: 'অল্প লোভ-লালসা মানুষের মধ্যে সততা এবং তাকওয়া নিয়ে আসে। আর অধিক লোভ-লালসা অধিক দুশ্চিন্তা এবং দুঃখ-কষ্টের জন্ম দেয়।”
৯৭. একবার জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ আস সুফিকে জিজ্ঞেস করা হলো, "কোন জিনিস অন্তরকে বিনষ্ট করে দেয়?” তিনি বলেন, "লোভ।” এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, "কীভাবে তা সংশোধিত হয়ে যায়?” তিনি বলেন, “তাকওয়া।”
৯৮. জুবাইর ইবনু আবদিল ওয়াহিদ বলেন, "আমি বুনান আল হাম্মালকে বলতে শুনেছি, 'যে কোনো লোভ-লালসা রাখে না, সে-ই স্বাধীন। মানুষ ততদিন পর্যন্ত স্বাধীন থাকতে পারে, যতদিন সে অল্পতেই তুষ্ট থাকে।”
৯৯. আলি ইবনু আবদিল আযীযকে বলতে শুনেছি: 'যে ব্যক্তির মধ্যে অল্পে তুষ্টি নাই, কস্মিনকালে কোনো কিছুই তার প্রয়োজন মেটাতে পারবে না।”
.
অপরের সম্পদের প্রতি নিরাসক্তি
১০০. সাদ আল খাইর আপন ছেলেকে বলতেন: “সব সময় নিরাসক্তি বজায় রাখবে, কারণ এটাই ধনাঢ্যতা। কখনো মানুষের কাছে থাকা অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে লোভ রেখো না, কেননা এটাই সাক্ষাৎ দারিদ্র। উত্তমরূপে ওযু করবে। এমনভাবে সালাত আদায় করবে, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ সালাত। যদি আজকের দিনটাকে গতকালের চেয়ে উত্তম বানাতে চাও, আর আগামীকালটাকে আজকের চেয়ে উত্তম করে তুলতে চাও, তাহলে এমনটাই করো।”
.
১০৪. জাবির থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "অল্পে তুষ্টি এমন রত্নভাণ্ডার, যা কখনো শেষ হয় না।”
১০৫. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তির দিনের শুরুটা এভাবে হয় যে, তার পালিত পশু নিরাপদ, সে নিজেও সুস্থ আর তার কাছে রয়েছে সেদিনের খাবার, তাহলে গোটা দুনিয়াই যেন তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”[তিরমিযি]
.
দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি তৈরির উপায়
২৪৬. আহমাদ ইবনু আবীল হাওয়ারি বলেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে তার প্রতি বিমুখ হয়ে গেছে। আর যে পরকালকে চিনতে পেরেছে, সে তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে, সে তাঁর সন্তুষ্টিকেই প্রাধান্য দেয়।"
২৪৭. আবূ সাহাল হারিসি আস সুফি বলেন, "পরকাল ও তার নিয়ামাতরাজির জন্য জাগ্রত থাকতে চাইলে দুনিয়া ও তার চাকচিক্য থেকে বিমুখ হয়ে ঘুমিয়ে থাক।"
২৪৮. ইবরাহীম ইবনু আহমাদ আল খাওয়াসকে বলতে শুনেছি: 'দুনিয়া যার জন্য কাঁদে না, আখিরাত তার জন্য হাসতে পারে না। মানুষকে তার নিজের পুরাতন জিনিসেই ভালো দেখায়। অন্যের নতুন জিনিসে না। যে গন্তব্যের কাছে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পথ হারিয়ে ফেলে, সে-ই তো আসল ক্ষতিগ্রস্ত।”
.
দুনিয়ায় থেকেও আখিরাতমুখী হওয়ার উপায়
২৪৯. আল কাত্তানি বলেছেন: "শারীরিকভাবে দুনিয়াতে থাকবে বটে, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে তোমার অবস্থান যেন হয় আখিরাতে।"
.
দুনিয়ার কদর্যতার উপমা
২৫৯. শিবলিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "দুনিয়া কী জিনিস?” তিনি উত্তরে বলেন, "তা হলো একটি ফুটন্ত ডেগ এবং এমন টয়লেট, যেখানে মানুষ ময়লা দিয়ে ভরে রাখে।”
.
পাদ্রীর নসিহত
২৬২. মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকুব ফারজি বলেছেন, "আমি এক গির্জার পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'যুহদ কী?' তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে, সেগুলোকে দুনিয়ার ওপরে থাকা মানুষদের জন্য ছেড়ে দেওয়া।”
.
দুনিয়ার পরোয়া
২৬৩. আবূ আবদিল্লাহ ইবনু শিয়ারক-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, 'ফুতুওয়াহ' কাকে বলে। তিনি উত্তরে বলেন, 'দুনিয়ার ব্যাপারে কোনোরূপ পরোয়া না করা।”
.
ভালো কাজের জন্য প্রসিদ্ধি লাভও বিপদের সম্ভাব্য কারণ
২৬৭. আবুল হাসান আস সায়িগ বলেন, "যারা আল্লাহকে পেতে চায়, তাদের দুই বার দুনিয়া পরিত্যাগ করা উচিত। প্রথমবার দুনিয়ার চাকচিক্য, ভোগবিলাস, রং-বেরঙের খাবার ও পানীয়, মোটকথা ভোগবিলাসের সকল উপকরণ পরিত্যাগ করতে হবে। এর ফলে দেখবেন মানুষের কাছে প্রসিদ্ধ হয়ে যাবে সে। লোকজন তাকে সম্মান করা শুরু করবে। তখন তার উচিত নিজেকে আড়াল করে ফেলা। অন্যথায় মানুষজন তার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকবে। তাই দুনিয়া পরিত্যাগ করাটা যেন দুনিয়ার লোভের চেয়েও বড় কোনো গুনাহ ও ফিতনার কারণ না হয়ে উঠে, সে জন্যই আড়ালে চলে যেতে হবে তাকে। (আর এটা হলো দ্বিতীয় বারের মতো দুনিয়া পরিত্যাগ।)”
২৬৮. আবূ উমামা বলেন, "নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  একদিন আমাদের যুহরের সালাত পড়িয়ে বাকি' নামক স্থানে যাওয়ার জন্য বের হন। মাসজিদের সকলেই তার পিছু পিছু চলতে থাকে। তিনি চলছিলেন সবার সামনে। বাকি'তে প্রবেশ করেন তিনি। এসময় তার হাতে ছিল খেজুর গাছের একটি কাঁচা ডাল। পেছনের লোকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'সামনে যাও, সামনে যাও।' সকলে তা-ই করে। একজন জিজ্ঞেস করে, 'আমরা আপনার পেছনে ছিলাম। সামনে যেতে বললেন যে?' তিনি বলেন, 'পেছনে তোমাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আশঙ্কা হলো, এতে আমার মনে অহংকার চলে আসতে পারে।'”
২৬৯. আবূ উমামা বলেন, "এক প্রচণ্ড গরমের দিন বাকিউল গারকাদ অভিমুখে চলতে থাকেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । সাহাবায়ে কেরামও তাঁর পিছু পিছু চলছিলেন। তাদের জুতার আওয়াজ তার কাঁনে আসে। জিনিসটা ভীষণ কষ্টকর মনে হয় তাঁর কাছে। তিনি তখনই বসে যান। তাদের সামনে অগ্রসর করে দেন। অন্তরে যেন কোনো ধরনের অহংকার তৈরি না হয়, সেজন্যই এমন করেছিলেন তিনি।" [ইবনু মাজাহ, আস সুনান]
.
২৭১. জাবির ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, "নবি কোথাও বের হলে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর সামনে চলতেন আর তাঁর পেছনের পথটা ছেড়ে দিতেন ফেরেশতাদের জন্য।[আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ, ৩/৩৩২]
২৭২. আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন, "নবি-এর পেছনে কেউ হাঁটলে তিনি এটা অপছন্দ করেন, না অনুমতি দেন-এটা দেখার জন্য একদিন তাঁর পেছনে হাঁটতে শুরু করি আমি। তিনি আমার হাত ধরে পাশে নিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ তাঁর পাশাপাশি হেঁটে পুনরায় চলে আসি পেছনে। আবারও আমার হাত ধরে তিনি নিজের পাশে নিয়ে আসেন। এবার তাঁর পাশাপাশিই হাঁটা শুরু করি। বুঝতে পারলাম যে, তাঁর পেছনে কেউ হাঁটুক-তিনি তা পছন্দ করেন না।"
.
দুনিয়ার সঠিক ব্যবহার
২৭৯. ইউসূফ ইবনু আসবাতের কাছে একবার একটি অপরিপক্ক ফল নিয়ে আসা হয়। তিনি তা উলটেপালটে দেখে সামনে রেখে বলেন, "নিছক দেখার জন্য এ দুনিয়া সৃষ্টি করা হয়নি; বরং তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে যেন আমরা তার মধ্য দিয়ে পরকালকে দেখতে পারি।"
.
দুনিয়া-ত্যাগের প্রকারভেদ
২৮০. বিশর ইবনু হারিসকে বলতে শুনেছি : 'আমি এ জনপদে এমন কাউকে চিনি না, যে নিঃস্বার্থভাবে অন্যকে পার্থিব কিছু দিয়ে থাকে। বরং হয়তো তার থেকে নেওয়ার জন্য কিংবা যা দিয়েছে তারচেয়ে অধিক অর্জনের জন্যই দেয়।"
২৮১. হারিস আল মুহাসিবি বলেছেন: "দুনিয়াকে চেনা সত্ত্বেও তাকে পরিত্যাগ করাটা যাহিদ তথা দুনিয়া-বিরাগীদের বৈশিষ্ট্য। আর দুনিয়াকে ভুলে গিয়ে তা পরিত্যাগ করাটা আরিফদের (আল্লাহকে প্রকৃতভাবে যারা চিনেছেন তাদের) বৈশিষ্ট্য।”
.
দুনিয়ার সংজ্ঞা
২৮৬. জুনাইদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, দুনিয়া আসলে কী। তিনি উত্তরে বলেন, “দুনিয়া বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন ধরনের। আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী এই উন্মুক্ত স্থানটাই কারও কাছে দুনিয়া। আরেক দলের মতে, পার্থিব ভোগবিলাস এবং গান-বাদ্যই হলো দুনিয়া। যেসব বিষয় প্রবৃত্তির নিকটবর্তী, আমার কাছে তা-ই দুনিয়া।”
২৮৭. মাশাইখদের বলতে শুনেছি: 'যদি দুটি বিষয়ের মধ্যে সঠিক-বেঠিক চিনতে না পারো, তাহলে লক্ষ করে দেখবে যে, কোনটা তোমার মনের চাহিদার অধিক নিকটবর্তী। যা মনের চাহিদার অধিক নিকটবর্তী, সেটা বাদ দিয়ে দেবে। কেননা, মনের বিরোধী বিষয়টাই অধিক সঠিক।
.
যৌনক্ষুধা দমন কঠিনতর
৩৫২. আহমাদ ইবনু আবীল হাওয়ারি বলেন, "জর্দানের এক সন্ন্যাসীকে বলি, 'যদি কারও ঘুমানোর ইচ্ছা হয় আর সে মনের ইচ্ছা পূরণ করতে চায়, তাহলে কি সে যাহিদ (দুনিয়াবিমুখ) হতে পারবে? তিনি বলেন, 'না। যে ব্যক্তি মনের চাহিদা অনুযায়ী ঘুমায় এবং খায়-দায়, সে যাহিদ হতে পারে না। নারীসঙ্গ- লাভের প্রতি প্রবৃত্তির যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেওয়া বেশ কঠিন। এর চাইতে কঠিন কিছু আমাদের শাস্ত্রে রয়েছে বলে আমরা জানি না। কেননা, আল্লাহ তাআলা মানুষের রগ, রেশা ও রক্তে নারীর চাহিদা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাই এ চাহিদা দমন করা অত্যন্ত কঠিন। পক্ষান্তরে খাবারের চাহিদা দমন করা অত্যন্ত সহজ।”
.
অপ্রাপ্তির মাঝেই কল্যাণ
৩৯৫.আমি সালিহ বিন মিসমারকে বলতে শুনেছি, "মানুষের কাজকর্ম আশ্চর্যকর!” জিজ্ঞেস করি, "কেন?” তিনি তখন বলেন, "তারা নিজেদের অর্থভাণ্ডার রেখে নিঃস্ব হাতে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।”
৩৯৬. সালিহ ইবনু মিসমারকে আরও বলতে শুনেছি: "আল্লাহ তাআলা আমাদের যেটুকু দুনিয়া প্রদান করেছেন, তার চেয়ে বড় নিয়ামাত হলো যেটুকু দেননি।”
.
জীবিত আত্মীয়দের আল্লাহর দায়িত্বে রেখে যাওয়া
৩৯৭. মৃত্যুকালে সালিহ ইবনু মিসমারের সম্পদ ছিল মাত্র এক দিরহাম এবং চার দানিকা [এক দিরহামের ছয় ভাগের এক ভাগকে এক দানিক বলা হয়]। মৃত্যুর সময় তাকে বলা হয়েছিল, "আপনার মা-বোনের দেখাশোনার ব্যাপারে কাউকে ওসীয়ত করে যেতে পারতেন।” তিনি এর উত্তরে বলেন, "আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে এ বিষয়ে ওসীয়ত করতে আমার লজ্জা হয়।”
৩৯৮. মুহাম্মাদ ইবনু কাব আল কুরাযি কিছু অর্থ-সম্পদ লাভ করলে কেউ একজন তাকে বলে, "সন্তানদের জন্য কিছু সম্পদ সঞ্চয় করে রাখুন।" তিনি উত্তরে বলেন, "না, আমি বরং নিজের জন্য আমার প্রতিপালকের কাছে তা সঞ্চিত রাখব। আর আমার সন্তানদের জন্য সঞ্চয় করব স্বয়ং আমার রবকে।"
.
অভাবও ফিতনা, সচ্ছলতাও ফিতনা
৩৯৯. আবু উসমান আন নাহদি থেকে বর্ণিত, মুয়ায ইবনু জাবাল একদিন বলেন: "আপনারা এখন কষ্ট আর বিপদের ফিতনায় পড়ে রয়েছেন। এর ওপর ধৈর্য ধারণ করার পর অচিরেই আপনাদের আনন্দ ও সচ্ছলতার ফিতনায় ফেলা হবে।” মানুষ জিজ্ঞেস করল, "স্বচ্ছলতার ফিতনা আবার কী?” তিনি বলেন, "নারীরা ইয়ামানের শাড়ি ও শামের মোলায়েম পোশাক পরিধান করা শুরু করবে।”[ ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ, ১৫/৬৫।]
.
মৃত্যুর প্রথম ঘাঁটির ভয়াবহতা
৫০৯. হাসান বাসরি একবার এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন দেয়ার দৃশ্য দেখে বলেন, "আল্লাহর কসম! প্রথম ঘাঁটিই যখন এমন, তখন তো শেষ ঘাঁটির ব্যাপারে অবশ্যই ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া উচিত। আর যে বিষয়ের বিদায়ের অবস্থা এমন, তবে তো তার শুরু থেকেই বিমুখতা অবলম্বন করা উচিত।”
.
জান্নাত-জাহান্নামের তৃতীয় কোনো বিকল্প নেই
৫১১. ইয়াযিদ আর রাক্কাশি একবার উমার ইবনু আবদিল আযীযের কাছে গেলে তিনি বলেন, "আমাকে কিছু নসীহত করুন।” তিনি তখন বলেন, "আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে এক সময় মৃত্যুবরণ করতে হবে।” উমার ইবনু আবদিল আযীয তখন বলেন, "আরও কিছু নসীহত করুন।” তিনি বলেন, "আদম থেকে নিয়ে আপনার পর্যন্ত যত পূর্বপুরুষ গত হয়েছে, তাদের সকলেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করেছেন।” উমার ইবনু আবদিল আযীয তখন বলেন, "আরও কিছু নসীহত করুন।” তিনি তখন বলেন, জেনে রাখুন, "জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝে তৃতীয় কোনো স্থান নেই। আল্লাহর শপথ! সৎকর্মশীলরা জান্নাতে প্রবেশ করবে আর পাপাচারীরা জাহান্নামে। আপনার সৎকাজ এবং অন্যায় কাজের ব্যাপারে আপনিই ভালো জানেন।" "উমার ইবনু আবদিল আযীয এ কথা শুনে সিংহাসন থেকে পড়ে যান।”
.
৫৩৫. উতবি থেকে বর্ণিত, আবূ তামিমা আল হুজাইমিকে জিজ্ঞেস করা হয়, "দিন কেমন কাটল?” তিনি বলেন, "দুটি নিয়ামাতের মধ্য দিয়ে। প্রথমত, আমার গুনাহ আল্লাহ তাআলা গোপন রেখেছেন। দ্বিতীয়ত, আমার আমলের কথা যারা জেনেছে, তারা আমার প্রশংসা করেছে।"
৫৩৬. বকর ইবনু আবদিল্লাহ এসে আবূ তামিমা আল হুজাইমিকে জিজ্ঞেস করে, 'দিন কেমন কাটল, আবূ তামিমা?' তিনি বলেন, দুটি নিয়ামাতের মধ্যে। আমি জানি না, সে দুটির কোনটি বেশি উত্তম। একটা হলো, আল্লাহ তাআলা আমার গুনাহ ঢেকে রেখেছেন। ফলে এখন কেউ আমাকে সে গুনাহের কারণে অপবাদ দিতে পারবে না। অপরটি হলো, যাদের কাছে আমার আমলের সংবাদ পৌঁছেছে, তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মান তৈরি করে দিয়েছেন।"
.
গুনাহ গোপন রাখাও আল্লাহর অনুগ্রহ
৫৪৩. আহমাদ ইবনু ইবরাহীম আবী দুজানা বলেন, "আমি যুননুন ইবনু ইবরাহীমকে বলতে শুনেছি তার এক সাথি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'সকাল কেমন গেল?' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহ তাআলার অসংখ্য-অগণিত নিয়ামাতের মধ্যে। কিন্তু এর পাশাপাশি বহু অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছি। তাই বুঝতে পারছি না, আসলে কীসের কারণে কৃতজ্ঞতা আদায় করব। আল্লাহ তাআলার দেওয়া এসব উত্তম নিয়ামাতের কারণে, না কি তিনি আমার গুনাহ ঢেকে রাখার কারণে।"
.
মানুষের তিনটি কঠিন অবস্থা
৫৫৫. সাদাকা ইবনু ফযল বলেন, "ইবনু উয়াইনাকে বলতে শুনেছি: 'বনী আদমের তিনটি অবস্থা সবচেয়ে কঠিন। এক. যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এই দুনিয়ায় আসে। দুই. যেদিন সে মৃত্যুবরণ করে, সেদিন একেবারেই অচেনা-অজানা কিছু লোকের সাথে তাকে থাকতে হয়। তিন. যেদিন তাকে কবর থেকে উঠানো হবে, সেদিন সে এমন এক অবস্থার সম্মুখীন হবে, যা আগে কখনও দেখেনি। ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া -এর এই তিন অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: তার প্রতি সালাম যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।”[সূরা মারইয়াম ১৯:১৫]
.
পার্থিব সম্পদের আধিক্য ও পরকালীন পাথেয়র স্বল্পতা
৫৫৬. ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলতে শুনেছি: মৃত্যুর দিন পরিত্যক্ত সম্পত্তি আর হাশরের দিন মিযানের পাল্লা যাকে অপমান করে, তার মতো হয়ো না।
.
৫৭৪. তালহা ইবনু উবায়দিল্লাহ বলেন, "কুযাআ গোত্রের বিলা এলাকার এক ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করে। এর এক বছর পর আরেক ব্যক্তি মারা যায়। একদিন স্বপ্ন দেখি জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। ওই দুজনেরর মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির আগেই জান্নাতে ঢুকছে। এ অবস্থা দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাই। বিষয়টি সকালে অন্যদের বলি আমি। এক সময় তা নবি-এর কানেও যায়। তিনি আমাকে বলেন, 'দ্বিতীয় লোকটা প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর পরও রমাদানের সাওম রেখেছে না? ছয় হাজার রাকাআত এবং আরও সুন্নাত সালাত আদায় করেছে না?'” [আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ. ২/৩৩৩]
.
বার্ধক্যের কল্যাণ
৫৭৮. ওয়াহহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন: “তাওরাতে পড়েছি, প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি ঘোষণা দিয়ে থাকে, 'হে চল্লিশোর্ধ্বরা, ফসল কাটার সময় হয়ে গেছে। হে পঞ্চাশোর্ধ্বরা, হিসাবের জন্য প্রস্তুত হও। তোমরা আখিরাতের জন্য কী পাঠিয়েছ আর দুনিয়াতে কী রেখে গেছ? হে ষাটোর্ধ্বরা, তোমাদের আর কোনো অজুহাত বাকি নেই। হে সত্তরোর্ধ্বরা, নিজেদের মৃত মনে করো।” [আবু নুআইম. হিলইয়াতুল আউলিয়া ৪/৩৩]
.
মনের সচ্ছলতা
৫৮৬. আসমায়ি থেকে বর্ণিত, এক বেদুঈন এক লোককে নসীহত করে বলে: "অর্থ-সম্পদের সচ্ছলতার চেয়ে মনের স্বচ্ছলতাই উত্তম। তাই যাকে সম্পদ দেওয়া হয়নি, সে যেন তাকওয়া থেকেও বঞ্চিত না হয়ে যায়। বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের মাধ্যমে উদরপূর্তি করা বহু মানুষ এমন রয়েছে, যারা দ্বীন এবং মহানুভবতার ক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষুধার্ত। মুমিন সবসময় কল্যাণের মধ্যেই থাকে। এরইমধ্যে ভূপৃষ্ঠ একসময় তাকে অভিবাদন জানায়। আকাশ থেকে সুসংবাদ দেওয়া হয় তাকে। সে যদি ভূপৃষ্ঠে উত্তম কাজ করে যায়, তাহলে ভূগর্ভে কখনোই তার প্রতি মন্দ আচরণ করা হয় না। বার্ধক্য যেমনভাবে যুবকদের ওপর চেপে বসে, মৃত্যুও তেমনিভাবে বৃদ্ধদের গ্রাস করে নেয়। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে চিনতে পেরেছে, সে দুনিয়ার স্বচ্ছলতা দ্বারা আনন্দিত হয় না। এর বিপদাপদে হা-হুতাশ করে না।"
.
আল্লাহর প্রতি ভয়, আগ্রহ ও আশা
৫৯১. আহমাদ ইবনু আসিম আল আন্তাকিকে বলতে শুনেছেন, "এক আবিদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার প্রমাণ কী, বলুন।' তিনি বলেন, 'সর্বদা সতর্ক থাকা।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'তাহলে আল্লাহর প্রতি আগ্রহের দলিল কী?' তিনি বলেন, 'সবসময় তাঁর তালাশে থাকা।' জিজ্ঞেস করি, 'আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা আকাঙ্ক্ষার দলিল কী?' তিনি বলেন, 'আমল করে যাওয়া।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। বলুন তো, এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে দুর্বলতা চলে আসে কীভাবে?' তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহ তাআলা যে সহনশীলতা দেখান এবং গুনাহ গোপন রাখেন, তোমরা এর ওপর আস্থাশীল হয়ে পড়েছ।"
.
মানুষের দায়িত্ব ইবাদাত, আল্লাহর দায়িত্ব রিযক দেওয়া
৫৯২. সিররি সাকতিকে বলতে শুনেছেন: "একদিন আমি কবরস্থানে গিয়ে দেখতে পাই, বাহলুল এক কবরের ভেতর উভয় পা ঝুলিয়ে বসে মাটি নিয়ে খেলাধুলা করছে। আমি বলি, 'আপনি এখানে!' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ। আমি এমন সম্প্রদায়ের কাছে আছি, যারা আমার উপস্থিতিতেও আমাকে কোনো কষ্ট দেয় না। আর আমি চলে গেলেও তারা আমার দোষচর্চা করে না।' আমি তাকে বলি, 'বাহলুল! কিছু গরম রুটি নিয়ে এসেছি।' তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি সামান্য গমের দানার দিকেও তাকাই না। আল্লাহ তাআলা আমাদের যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবে ইবাদাত করে যাওয়াই আমাদের কর্তব্য। আর আল্লাহর কর্তব্য হলো, তিনি যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেভাবে আমাদের রিযক প্রদান করে যাবেন।”
.
ঘুমন্ত-জাগ্রত উভয় অবস্থায় মৃত্যুর স্মরণ
৫৯৩. আব্বাস ইবনু হামযা একদিন বলেন, “আমি একবার যুননুন মিসরির কাছে গিয়েছিলাম। তখন এক মুরিদ বসে ছিল তার কাছে। তিনি তাদের বলেছিলেন, 'ঘুমের সময় মৃত্যুকে বালিশ আর জাগ্রত অবস্থায় মৃত্যুকে লক্ষ্য বানিয়ে নাও। এমন হয়ে যাও, যেন দুনিয়ার প্রতি তোমাদের কোনো প্রয়োজন নেই আর আখিরাত তোমাদের না হলেই নয়।”
.
৬১৩. আবূ হুরায়রা বলেন, "নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছেন: 'যে ব্যক্তি পূণ্যের একটি কাজ করে, তার আমলনামায় এক লক্ষ সাওয়াব লিখে দেওয়া হয়।' তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন, 'এবং নিজের পক্ষ থেকে তাকে মহাপ্রতিদান দান করেন। [নিসা ৪:৪০] এই মহাপ্রতিদান হলো জান্নাত।'” [ইবনু আবী শাইবা, আল কিতাবুল মুসান্নাফ ১৩/৩৪৯, ৩৫০]
৬১৪. উসমান আন নাহদি বলেন, "জানতে পেরেছি যে, আবূ হুরায়রা বলেছেন, 'আমি নবি-কে বলতে শুনেছি আল্লাহ তাআলা মুমিনের পূণ্যময় কাজ দ্বিগুণ করে দেন।' একদিন পথ চলতে চলতে আবূ হুরায়রা -এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, 'আপনি নাকি নবি-কে বলতে শুনেছেন, আল্লাহ তাআলা মুমিনের পুণ্যময় কাজকে এক লক্ষ গুণ বৃদ্ধি করে দেন?' আবূ হুরায়রা বলেন, 'না। বরং আমি তাকে বলতে শুনেছি, একটি পুণ্য কাজকে তিনি দুই লক্ষ গুণ বৃদ্ধি করে দেন।' এরপর তিনি তিলাওয়াত করেন: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ কারও প্রতি অণু-পরিমাণ যুলুম করেন না। আর যদি তা সৎকর্ম হয়, তবে তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বিরাট সাওয়াব দান করেন। [নিসা ৪:৪০] 
আবূ হুরায়রা এরপর বলেন, 'আল্লাহ তাআলা যে বিষয়কে বিরাট বলেছেন, তার পরিমাণ তো তুমি জানো না।'” [আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ ২৫২১, ৫২২]
..
৬৪৯. একজন যাহিদ বলেছেন: "আল্লাহর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হলো: দরিদ্রতা তাদের জন্য মর্যাদার বিষয়। আল্লাহর আনুগত্য তাদের জন্য মিষ্টতা স্বরূপ। আল্লাহর ভালোবাসা হলো তাদের স্বাদ। আল্লাহর কাছেই তারা নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলে। তাকওয়া তাদের পাথেয়। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর সাথেই। আল্লাহর ওপরই তারা নির্ভর করে। তাঁর সাথেই তাদের বন্ধুত্ব। তারা তাঁরই ওপর ভরসা করে। ক্ষুধা হলো তাদের খাবার। দুনিয়াবিমুখতা তাদের ফল। উত্তম চরিত্র তাদের পোশাক। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা তাদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। বদান্যতা তাদের পেশা। উত্তম আচরণ তাদের সংশ্রব। জ্ঞান তাদের পরিচালক। ধৈর্য তাদের চালনাকারী। হিদায়াত তাদের বাহন। কুরআন তাদের আলোচনা। কৃতজ্ঞতা তাদের ভূষণ। যিকর তাদের কাছে লোভনীয় বিষয়। (আল্লাহর) সন্তুষ্টি তাদের প্রশান্তি। অল্পে তুষ্টতা তাদের সম্পদ। ইবাদাত-বন্দেগী তাদের উপার্জন। শয়তান তাদের শত্রু। দুনিয়া তাদের ডাস্টবিন। লজ্জা তাদের জামা। আল্লাহভীতি তাদের স্বভাব। দিনগুলো তাদের জন্য শিক্ষা। রাত তাদের চিন্তার কারণ। প্রজ্ঞা তাদের তরবারি। সত্য তাদের পাহারাদার। জীবন তাদের সফরের স্তর। মৃত্যু তাদের গন্তব্য। কবর তাদের দুর্গ। জান্নাত তাদের বাড়ি। রব্বুল আলামীনের প্রতি দৃষ্টিপাত তাদের পরম আকাঙ্ক্ষা। তারাই হলো আল্লাহ তাআলার সেই বিশেষ বান্দা, যাদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন:'রহমানের বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।'”[ফুরকান ২৫:৬৩]
.
৬৫২. আবূ আমরকে বলতে শুনেছি: "যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার প্রকৃত পরিচয় লাভ করতে চায়, সে যেন ইবাদাতের সময় আল্লাহর গাম্ভীর্যের প্রতি লক্ষ রাখে। নির্দেশদাতার পরিচয় জানা না থাকার কারণেই নির্দেশ পালনে শৈথিল্য দেখা দেয়।”
.
৬৫৭. এক ব্যক্তি হাতিম আল আসামকে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার কি কোনো কিছুর ইচ্ছা আছে?' তিনি বলেন, 'আমি রাত পর্যন্ত পূর্ণ একদিনের সুস্থতা চাই।' শুনে তাকে বলি, 'আপনি তো প্রতিদিন সুস্থই আছেন!' তিনি উত্তর বলেন, 'কোনো দিন তো তখনই সুস্থ ও নিরাপদ হিসেবে কাটবে, যখন আমি তাতে আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা করব না। 
.
৬৫৮. জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি: সকল পূণ্যের সমষ্টি রয়েছে তিন বিষয়ে। প্রথমত, দিনকে নিজের উপকারে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলে সেটা নিজের ক্ষতির কাজে ব্যয় কোরো না। দ্বিতীয়ত, ভালো মানুষের সাথে মিশতে না পারলে অন্তত মন্দ মানুষকে বন্ধু বানিয়ো না। তৃতীয়ত, আল্লাহর সন্তুষ্টিতে নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে না পারহলে কমপক্ষে তাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে ব্যয় কোরো না।
.
৬৬১. আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি নিজ ভাইয়ের পার্থিব কোনো বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাত দিবসে তার বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুসলিমের দুস্থতা দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুস্থতা দূর করবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতা করে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো রাস্তা দিয়ে চলে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোনো সম্প্রদায় মাসজিদে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়ন করে, তখন তাদের ওপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তাআলা নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে তার আমল পেছনে ফেলে দিবে, তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করতে পারবে না।[মুসলিম, আস সহীহ, ২৬৯৯]
.
৬৮৪. ঈসা আল বিস্তামি বলেছেন: "দিন আর রাত হলো মুমিনের মূলধন। এর মুনাফা জান্নাত এবং লোকসান জাহান্নাম।”
.
৭০১. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায ইবনু জাবাল এবং আবূ মূসা আশআরি -কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বলেন, "মিলেমিশে কাজ কোরো। একে অপরের কথা মেনে চলবে। মানুষের জন্য সহজ করবে। কঠিন করবে না।" তারা উভয়ে ইয়ামানে আসেন। মুয়ায ইবনু জাবাল মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ইসলামের ওপর থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন তাদের। দ্বীনের গভীর জ্ঞান এবং কুরআন কারীমের শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “এসব জ্ঞান অর্জনের পর আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনাদের কারা জান্নাতি এবং কারা জাহান্নামি।” এরপর বেশ কিছুদিন কেটে যায়, আল্লাহ তাআলাই যার সঠিক পরিমাণ জানেন। এরপর একদিন তারা বলে, "আবূ আবদির রহমান, আপনি বলেছিলেন আমরা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন এবং কুরআন কারীম শিক্ষা লাভের পর যেন আপনাকে জিজ্ঞেস করি, আমাদের মধ্যে কারা জান্নাতি এবং কারা জাহান্নামি।” তিনি বলেন, "হ্যাঁ। যদি ব্যাপকভাবে কারও প্রশংসা হতে থাকে, তাহলে সে জান্নাতি। আর যদি কারও দোষত্রুটির ব্যাপক চর্চা হতে থাকে, তাহলে সে জাহান্নামি।"
.
৭০৮. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তার আমলকে সাতগুণ বৃদ্ধি করে দেন, যা সে করেনি। আর যখন কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তখন তার মন্দ কাজকে সাতগুণ বৃদ্ধি করে দেন, যা সে করেনি। "[আহমদ ইবনু হাম্বল, আল মুসনাদ ৩/৩৮]
.
৭৩৮. মুতাররিফ বলেছেন: "কিয়ামাতের দিন আল্লাহর কাছে 'এটা কেন করেছ?' এর বদলে 'এটা কেন করলে না?' প্রশ্নের জবাব দেওয়াই আমার কাছে বেশি আকাঙ্ক্ষিত।”
.
৭৭৬. উমার ইবনু আবদিল আযীযেকে জিজ্ঞেস করি, সালিহের নিকট কি আপনার কোনো প্রয়োজন আছে? তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাকে বলবে, আল্লাহর নিকট আপনার জন্য যা অবশিষ্ট রয়েছে, আপনি সেটা আঁকড়ে থাকুন। কেননা, আল্লাহর নিকট যা অবশিষ্ট রয়েছে সেটা মানুষের নিকটও অবশিষ্ট থাকবে। আর আল্লাহর নিকট যা অবশিষ্ট নেই মানুষের নিকটও সেটা অবশিষ্ট থাকবে না।
.
৮০১. একবার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সুগন্ধি বের করে উমার ইবনু আবদিল আযীয এ-এর সামনে রাখা হয়। নাকে ঘ্রাণ যাওয়ার আশঙ্কায় উমার সাথে সাথে নাকে হাত চেপে ধরেন। তখন তার এক সাথি বলেন, "আমিরুল মুমিনীন! গন্ধ নাকে গেলে সমস্যা কী? (ব্যবহার তো আর করছেন না)” তিনি বলেন, "আরে, সুগন্ধীর গন্ধই তো মানুষ উপভোগ করে।”
.
৮০২. মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল জাওহারিকে বলেন: "এক গ্রীষ্মের দিনে জুমুআর সালাত আদায় করে বিশর ইবনুল হারিসের সাথে হাঁটছিলাম। পথিমধ্যে ইসহাক ইবনু ইবরাহীমের বাড়ির পাশ দিয়ে যাই। রাস্তায় এসে পড়ছিল বাড়ির ছায়া। আমি বিশরকে ছায়াতে আনার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তিনি রোদেই হাঁটছিলেন। মনে মনে বলি, 'আল্লাহর কসম! আমি তাকে জিজ্ঞেস করেই ছাড়ব যে, রোদে হেঁটে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার মধ্যে আল্লাহভীরুতার কী আছে।' পরে তাকে জিজ্ঞেস করি, 'আবুল হুসাইন! আমি আপনাকে ছায়ার দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনি রোদেই হেঁটে গিয়েছেন। এর কারণ কী?' তিনি উত্তরে আমাকে বলেন, 'ছায়াটা ছিল এক পাপিষ্ঠের বাড়ির।”
.
৮০৩. মাহফুজকে বলতে শুনেছি 'তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে প্রথমে হারাম বিষয়ে, এরপর সন্দেহজনক বিষয়ে, এরপর অনর্থক বিষয়ে।”
.
৮০৯. সিররি সাকতিকে বলতে শুনেছি: 'বিদআত-মিশ্রিত আধিক্যের চেয়ে সুন্নাত-সম্মত সামান্য অর্জনই উত্তম। তাকওয়ার সাথে কৃত আমল যত কমই হোক, ফেলনা নয়।''

হারিয়ে যাওয়া মুক্তো

এক শিক্ষকের গল্প বলি। তিনি সহ আরও বেশ কয়েকজন ইয়ামেনের এক শায়খের দারসে বসে ছিলেন। দারসটি সে শায়খের বাসাতেই হচ্ছিল। হঠাৎ করে একজন দরজায় কড়া নাড়ল। শব্দ শুনে সে শিক্ষক দরজা খুলতে গেলেন। কিন্তু শায়খ তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কী করতে চাচ্ছ?"

শিক্ষক তখন বললেন, "আমি দরজা খুলতে যাচ্ছি।"

শায়খ আবার জিজ্ঞেস করলেন, "শুধু দরজাই খুলতে যাচ্ছ?"

তিনি জবাব দিলেন, "হাঁ।”

এটা শুনে শায়খ বললেন, "তাহলে আমাকেই দরজা খুলতে দাও।”

শায়খ দরজা খুললেন। আবার দারসে এলেন। তারপর সেই শিক্ষকের উদ্দেশে বললেন, "তুমি তো শুধু দরজাই খুলতে চেয়েছিলে। তাই আমি তোমাকে থামিয়ে দিয়েছি।

আর আমি চেয়েছি:

> আমার ভাইকে সাহায্য করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কেউ যদি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে দেয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৮০)]

> তার দিকে মুচকি হেসে সুন্নাহ পালন করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমার ভাইয়ের সামনে তোমার হাসি হচ্ছে সদকাস্বরূপ।" (সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ১৯৫৬)]

> তাকে সালাম দিয়ে অভিবাদনের সুন্নাহ পালন করতে।

[একব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করল, "ইসলামের সর্বোত্তম দিক কোনটি?” তিনি বললেন, "অপরকে খাওয়ানো আর চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেয়া।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ১২)]

> তার সাথে মুসাফাহা করে আরেকটি সুন্নাহ পালন করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যখন দুইজন মুসলিম একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে আর হাত মেলায়, তারা আলাদা হবার আগেই তাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।" (আবু দাউদ, হাদিস নং: ৫২১২)]

> আমার পাশে তাকে বসার জায়গা করে দিতে।

> অতিথিকে সম্মান করার সুন্নাহ পালন করতে।

[রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে আল্লাহ ও কিয়ামতের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।” (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১৩৮)]

সুবহানাল্লাহ! সামান্য একটি কাজকে কীভাবে তিনি পরতে পরতে সুন্নাহ দিয়ে সাজিয়ে ইবাদতে পরিণত করেছেন, তা চিন্তা করলেও অবাক হয়ে যেতে হয়। যারা সত্যিই আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করেন, তারা এভাবেই নিজের জীবনের প্রতিটা কাজকে ইবাদতে পরিণত করেন। দুনিয়ার সকল কাজের পেছনে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি। আর যদি কখনো আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ছাড়া শুধু পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো কাজ করে ফেলেন, তবে তারা অনুতপ্ত হন। তখন তাদের দেখলে মনে হয় যেন তারা মস্ত বড় গুনাহ করে ফেলেছেন।

তবে নিজের পুরো জীবনকে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দেয়া একেবারে সহজ কথা নয়। জীবন মানে তো কিছু দিনেরই সমষ্টি। তাই দিন থেকেই শুরু করা যাক।

একটা কাগজ নিয়ে ঝটপট তিনটি কলাম করে ফেলুন:

* সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা।

* বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা।

* রাত ১১টা থেকে সকাল ৯টা।

এবার প্রতিটি কলাম নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করুন। এই সময়ে আপনি কী কী করেছেন তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন। কোনোকিছুই বাদ দেবেন না। খাওয়া- দাওয়া থেকে শুরু করে এমনকি বাথরুমে যাওয়ার ব্যাপারটাও না। এবার চিন্তা করে দেখুন, এর মধ্যে কোন কোন কাজগুলো আপনি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য করেছেন। কাজটা হয়তো দুনিয়াকেন্দ্রিক হতে পারে, কোনো সমস্যা নেই। তবে লক্ষ্য রাখুন আপনি সেখানেও আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াব আশা করেছেন কি না! যেমনটা করতেন মু'আয ইবনে জাবাল। এবার দেখুন প্রতিটা কলামে আপনি কয়টি কাজ রাখতে পারছেন! এভাবে আমরা নিজেই নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারি।

নিজের নিয়তকে ঠিক করতে দরকার কঠোর অধ্যবসায়। তাই চেষ্টা চালিয়ে যান। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, "আচ্ছা! আমি যে কাজটা করছি, সেটা কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নাকি মানুষের সন্তুষ্টির জন্য? সেটা কি চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য না ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জন্য?" একসময় দেখবেন কলামগুলো আস্তে আস্তে ফাঁকা থেকে ভরাট হচ্ছে। আপনার জীবনের প্রতিটা কাজই উত্তম নিয়ত দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

এভাবে যে নিজের জীবনে করা প্রতিটা সাধারণ কাজকে ইবাদতে পরিণত করতে পারে তার চেয়ে সফল আর কে হতে পারে? আর তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে, যে নিজের ইবাদতকে দিনের পর দিন আরও সাধারণ করে ফেলে? হয়তো এতক্ষণে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে কেন ইমাম বুখারি তার বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থটি এই হাদিস দিয়ে শুরু করেছিলেন, "প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।"[সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ১]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ১৮-২০

.

শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে উসাইমিন-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "একজন মুমিন কি মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে পারে?" উনি জবাবে বলেছিলেন,

"অবশ্যই সে বিভিন্ন মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে পারে। সে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। অতীতের ব্যাপারে তার মনে আফসোস সৃষ্টি হতে পারে।" [ফতওয়া ইসলামিয়া: ৪/৪৬৫]

হুট করেই আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। খুব বিষণ্ণ লাগে। এ বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে খুব একা একা লাগে। তবে সে একা সময়েও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একটি নসীহা আমাদের সাথে আছে। তিনি আমাদের বিষণ্ণতা দূর করার জন্য একটি ওষুধের কথা বলে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ বিষণ্ণ হওয়ার পর বলে,

اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ ابْنُ عَبْدِكَ ابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضٍ فِي حُكْمُكَ، عَدْلٌ فِي قَضَاؤُكَ، أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ، سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ، أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وَجَلَاءَ حُزْنِي، وَذَهَابَ هَمِّي

'আল্লাহ গো, আমি তো তোমারই দাস। তোমার দাসের পুত্র আমি। আমি পুত্র তোমারই এক দাসীর। আমার কপাল তোমার হাতে। আমার ওপর তোমার নির্দেশ অবশ্যই কার্যকর হবে। আর আমার ব্যাপারে তুমি যে ফয়সালাই দাও না কেন, সেটাই সঠিক। আমি তোমার কাছে চাচ্ছি, তোমার প্রতিটা নামের উসীলায়। যে নাম তুমি নিজের জন্য রেখেছ। কোনো কিতাবে নাযিল করেছ। কাউকে শিখিয়েছ অথবা নিজের জন্যেই রেখে দিয়েছ। (আল্লাহ গো,) তুমি কুরআনকে বানিয়ে দাও আমার হৃদয়ের প্রশান্তি। আমার বক্ষের জ্যোতি। দুঃখের অপসারণকারী। আমার দুঃশ্চিন্তা দূরকারী।'

তবে আল্লাহ তার বিষণ্ণতা ও দুঃখ দূর করে দেবেন আর (অন্তরটা) আনন্দ দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন,

“হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কি এই কথাগুলো শেখা উচিত না?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হাঁ, অবশ্যই। যে কেউ এই কথাগুলো শুনবে, তার এটি শেখা উচিত। "[ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ৩২৯]

যারা সত্যিই মন দিয়ে বুঝে বুঝে এই দু'আ পড়েছে, তারা অবশ্যই এই দু'আর উপকারিতার কথা স্বীকার করবেন। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ ইবনে উসাইমিন বলেছেন, "মানুষের ঈমান আজ দুর্বল হয়ে গেছে। আজ তারা শরিয়াহতে যে আরোগ্যের কথা বলা হয়েছে, তা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়। শরিয়াহতে যে আরোগ্যের কথা বলা হয়েছে তার চেয়ে তারা ওষুধের ওপরেই বেশি ভরসা করে। কিন্তু যখন কারও ঈমান দৃঢ় থাকে, শরিয়াহর এই আরোগ্যগুলো সম্পূর্ণ কার্যকর হয়। এমনকি ওষুধের চেয়েও এটি ভালো কাজ করে।”[ফতওয়া ইসলামিয়া: ৪/৪৬৫]

আমরা আল্লাহর কাছে চাই যেন উনি সে দিনটা আমাদের দুই জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন বানিয়ে দেন যেদিন আমরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করব। জান্নাতে তাঁর দেখা পাব।

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ২৮-২৯

.

ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, "কখনো কখনো কাউকে যদি বাধ্য হয়ে মাত্রাতিরিক্ত 'মুবাহাত[এটি বলতে এমন কিছু বিষয়কে বোঝানো হয় যা সওয়াব কিংবা গুনাহ কোনোটিই নিয়ে আসে না। কিন্তু এ ব্যাপারগুলোতে খুব বেশি লিপ্ত থাকা প্রশংসনীয় নয়।]-এর বৈঠকে থাকতে হয়, তবে সে যেন এ ধরনের আসরকে তার সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহর আনুগত্যের মজলিসে রূপান্তরের চেষ্টা করে। সে যেন নিজের মধ্যে সাহস রাখে। নিজের অন্তরকে দৃঢ় করে। শয়তানের কথায় কান না দেয়। শয়তান তো ফিসফিস করে বলবেই, 'তুমি তো লোক দেখানোর জন্য এমন করছ। তুমি আসলে চাচ্ছ সবাই যাতে তোমাকে আলাদা নজরে দেখে।' শয়তানের এই ধোঁকাকে একটুও পাত্তা দেয়া যাবে না। আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। আর নিজের সাধ্য অনুযায়ী সবাইকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সত্যিই যদি কেউ তা না করতে পারে, তবে সে যেন ওই মজলিস থেকে নিজের অন্তরকে এমনভাবে সরিয়ে নেয় যেভাবে সে ময়দার তাল থেকে আঁশ ছড়িয়ে নেয়। সে যাতে সেখানে থেকেও না থাকে। তাদের কাছে থেকেও দূরে থাকে। জেগেও ঘুমিয়ে থাকে। সে তাদের দেখেও দেখছে না। শুনেও শুনছে না। কারণ, সে তার মনকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলেছে। নিয়ে গেছে সবচেয়ে ওপরে। আরশের পাশে সব পবিত্র রুহের সাথে। সে মন আল্লাহর প্রশংসা করছে। তাঁর মহিমার কথা বলছে। যে কারোর অন্তরের জন্য এটা কতই-না দুঃসাধ্য! তবে তার জন্য নয়, যার জন্য আল্লাহ তা সহজ করে দেন।"[মাদারিজুস সালেকীন: ১/ ৪৫৩-৪৫৪]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ৫০-৫১

.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন আহার করে, তখন সে যেন ডান হাতে খায়। আর যখন পান করে সে যেন ডান হাতে পান করে। কারণ, শয়তান বাম হাতে আহার করে এবং বাম হাতে পান করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২০২০)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক বালককে বলেছিলেন, "ছেলে! বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে আহার করো এবং তোমার কাছ থেকে খাও।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৭৬)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন "হেলান দেয়া অবস্থায় আমি আহার করি না।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৯৯)

আনাস থেকে বর্ণিত, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো খাবার খেতেন তখন তাঁর আঙুল তিনটি চেটে নিতেন এবং তিনি বলতেন, 'যদি তোমাদের কারও লোকমা পড়ে যায় তবে সে যেন তা থেকে ময়লা দূর করে এর খাদ্যটুকু খেয়ে ফেলে। শয়তানের জন্য যেন তা রেখে না দেয়।' আর তিনি আনাদের বাসন মুছে খেতে আদেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, 'তোমরা তো জানো না, খাবারের কোন অংশে বরকত আছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২০৩৪)]

যখন আবু বকর-এর কন্যা আসমা সারিদ (মাংসের ঝোলে ভিজিয়ে বানানো রুটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খাবারটি খুব পছন্দ করতেন।) তৈরি করতেন, তিনি তা ঢেকে দিতেন যেন খাবারের ধোঁয়া প্রশমিত হয়ে যায়। তিনি বলতেন, "আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, 'এমনটা করলে বারাকাহ বেড়ে যায়'। "[ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫২০৭]

আবু হুরাইরা বলতেন, "ধোঁয়া না প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত খাবার খাওয়া উচিত না। "[বায়হাকি, হাদিস নং: ৪২৮]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ৭১-৭২

.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আজ যাদের পেট পূর্ণ থাকবে, কিয়ামতের দিন তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে।" [তিরমিযী, হাদিস নং: ২৪৭৮]

এ হাদিসটি শোনার পর সাহাবি আবু জুহাইফা আর কখনোই পেটভরে খাননি। [উমদাতুল কারি: ২১/৫৩]

ইমাম আহমাদ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: "যার পেট পূর্ণ সে কি অন্তরে কোমলতা অনুভব করতে পারে?" তিনি বললেন, "আমি মনে করি না।" [জামি'উল উলুম: ২/৪৬৯]

লোকমান হাকিম তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, "ছেলে! যার পেট পূর্ণ থাকে, তার চিন্তা করার ক্ষমতা ঘুমিয়ে যায়। তার প্রজ্ঞা চুপ হয়ে যায়। আর তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করার স্পৃহা মরে যায়। "[তফসীরুল মওদু'ঈ: ১/২২২]

উমার লোকদের উদ্দেশ্যে একদিন বলেছিলেন, "আল্লাহর কসম! আমি চাইলে তোমাদের সবার চেয়ে ভালো পোশাক পরতে পরতাম। সবচেয়ে ভালো খাবার খেতে পারতাম। আর সবচেয়ে বিলাসবহুলভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি শুনেছি আল্লাহ তা'আলা কিছু লোককে এই বলে তিরস্কার করবেন: 'তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই তোমাদের অংশের নিয়ামতগুলো নিঃশেষ করে করে ভোগ করেছ। তাই আজ তোমাদের অপমানজনক শাস্তি দ্বারা প্রতিফল দেয়া হবে। কারণ, তোমরা দুনিয়াতে অহংকার করেছিলে। [সূরা আহকাফ ৪৬:২০, হিলিয়াতুল আওলিয়া ১/৪৯]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মানুষ এমন কোনো পাত্রই পূর্ণ করেনি, যা পেটের চাইতে মন্দ। সামান্য খাবারই যথেষ্ট আদমসন্তানের জন্য যা তার পিঠকে সোজা রাখবে। কিন্তু তারপরেও যদি তোমারা বেশি খেতেই চাও; তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য আর এক-তৃতীয়াংশ নিশ্বাসের জন্য রাখবে। [তিরমিযী হাদিস নং: ২৩৮০]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ৯৮-১০০

.

তখন উমার-এর খিলাফতের সময়। একদিন উমার এক লোককে তার ছেলেসহ দেখলেন। তিনি তাদের মধ্যকার সাদৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন। লোকটি তখন বলল, "হে আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহর কসম! ও যখন জন্ম নেয়, তখন ওর মা মৃত ছিল।" এ কথা শুনে উমার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাকে বলো তো আসলে কী হয়েছিল?"

লোকটি তখন বলা শুরু করল, "ওর মা যখন গর্ভবতী তখন আমি সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সে আমাকে বলল, 'আমার এ অবস্থায় তুমি কেমন করে আমায় একা ফেলে যাচ্ছ?' আমি তাকে বললাম, 'তোমার গর্ভে যা আছে তার ব্যাপারে আমি আল্লাহকে ভরসা করছি।'

সফর শেষে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। বাসায় এসে ওর নাম ধরে ডাকলাম কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। আমি জানতে পারলাম, ও আর বেঁচে নেই। কাঁদতে কাঁদতে ওর কবরের কাছে গেলাম।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি আমার এক ভাইয়ের সাথে বসে ছিলাম। ওর কবরটা আমাদের সামনেই ছিল। হঠাৎ করে ওর কবরের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো সেখানে আগুন জ্বলছে। আমি আমার ভাইকে এটা দেখালে ও বলল, 'আমরা তো এটা সে মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি।'

আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! সে খুবই ধার্মিক নারী ছিল। সব সময় নিজের পবিত্রতা বজায় রাখত। সালাত পড়ত, সিয়াম পালন করত।' তখনি বাসায় ফিরে গিয়ে আমার কুঠারটি নিয়ে তার কবরের কাছে এলাম। এসে দেখি, কবর আগে থেকেই খোলা। তাকিয়ে দেখলাম, আমার স্ত্রীর লাশ বসা অবস্থায় রয়েছে। আর আমার ছেলেটা ওর সামনে হামাগুড়ি দিচ্ছে। আর আমি শুনলাম আকাশ থেকে একটি কণ্ঠস্বর বলছে

'হে ভরসাকারী! তুমি তোমার রবের ওপর ভরসা করেছিলে। তোমার সম্পদ নিয়ে নাও।'

তাই আমি ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলাম। আর সে সন্তানকেই আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন, হে আমিরুল মুমিনীন।" [তাবারানী, হাদিস নং: ৮২৪]

শায়খ আবদুর রহমান আস-সা'দি বলেছেন, "আল-হাফিয তো তিনি যিনি তাঁর সকল সৃষ্টির হিফাযত করেন। তাঁর জ্ঞানে যা কিছু আছে, তিনি যা কিছু অস্তিত্বে এনেছেন, সবকিছুর হিফাযত তিনি করেন। তিনি তাঁর বান্দাকে গুনাহ থেকে রক্ষা করেন। বিপদ থেকে মুক্ত করেন। তিনি সকল অবস্থায় তাদের খেয়াল রাখেন।" [তাফসীরে সাদি: ১/৯৪৭]

"যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোনো না-কোনো পথ বের করে দেবেন। এবং তিনি তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেন-ই।"[সূরা আত-ত্বলাক, ৬৫: ২-৩]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ১২৬-১২৭

.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মানুষ তার গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়।” (ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৮৭২)

ইবনুল কায়্যিম বলেন, "গুনাহ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। গুনাহ করার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয়। কমিয়ে দেয় তওবা করার ইচ্ছাকে। একসময় তার আর তওবা করার কোনো ইচ্ছাই থাকে না। (আর তওবা করলেও দায়সারাগোছের তওবা করে) সে ক্ষমা চায়, অনুশোচনা প্রকাশ করে। কিন্তু সেটা মুখের ঠোঁট নাড়ানো ছাড়া আর কিছুই না। তার তওবা তো মিথ্যুকদের তওবার মতো। (যে মুখে তওবা করলেও) ভেতরে ভেতরে ঠিকই গুনাহ করার ধান্দায় থাকে। তার ইচ্ছা থাকে সে গুনাহের ওপরই অটল থাকার। (আল-জাওয়াবুল কাফি: ১/৫৬)]

একজন সালাফ বলতেন, "কোনো গুনাহ করলে আমার বাহন এমনকি আমার স্ত্রীর মধ্যেও আমি এর প্রভাব দেখতে পেতাম।" (আল-জাওয়াবুল কাফি: ১/৫৪)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কিছু উপায় বলে দিয়েছেন। এগুলো অনুসরণ করলে আমাদের জানা- অজানা অনেক গুনাহই পরম দয়াময় ক্ষমা করে দেবেন। আমাদের মৃত অন্তরকে আবার জীবিত করবেন। এমন পাঁচটি উপায় হচ্ছে:

(১) খাবারের পর গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ খাবার খাওয়ার পর বলে, 'সকল প্রশংসা তাঁর যিনি আমাকে এই খাবার খাইয়েছেন। আমার নিজের এ ব্যাপারে কোনো শক্তি বা ক্ষমতা ছিল না।' তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।" [আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪০২৩]

২) কাপড় পরিধানের পর গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ জামা গায়ে দিয়ে বলে, 'সকল প্রশংসা তাঁর যিনি আমাকে এই জামা পরিয়েছেন আর এটিকে আমার জন্য বরকতময় করেছেন। আমার নিজের এ ব্যাপারে কোনো শক্তি বা ক্ষমতা ছিল না।' তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।" [আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪০২৩]

৩) সালাত শেষ করে গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রত্যেক সালাতের পর ৩৩ বার করে বলবে, سبحان الله 'আল্লাহ কতই-না পবিত্র-মহান।' الحمدُ لله 'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।' 'আল্লাহ সবচেয়ে বড়।' এভাবে মোট ৯৯ বার। এরপর ১০০ বার করার জন্য নিচের দু'আ বলবে, لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।' তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হয়।" [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৫৯৭]

৪) অবসর সময়ে গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে বলে, لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি সবার চাইতে বড়। তাঁর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় ও শক্তি নেই।' আর তার গুনাহসমূহ মাফ করা হয় না, এমনকি তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হলেও।"[তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৪৬০]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, "যে প্রতিদিন ১০০ বার বলবে, سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ 'প্রশংসাসহ আমি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি।' তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হয়। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৯১]

(৫) ঘুমোতে যাবার আগে গুনাহ মাফ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যদি কেউ ঘুমোতে যাবার আগে বলে, لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা। তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় ও শক্তি নেই। আল্লাহ কতই-না পবিত্র- মহান। তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা। আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই। আর তিনি সবার চাইতে বড়।' তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনার পরিমাণ হয়।" [ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৫২৮]

-হারিয়ে যাওয়া মুক্তো ১: ১৩৪-১৩৭