আহমদ রহ.-এর চিঠি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা ঐ মহান সত্তার জন্য যিনি প্রত্যেক যুগেই এমন কতিপয় আলিম পাঠিয়েছেন যারা পথভ্রষ্টদের সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে ধ্বংসের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন। যারা আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে মৃতকে জীবন্ত করেছেন, নবীর সুন্নাহের মাধ্যমে মূর্খদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে রক্ষা করেছেন। বহু ইনসানকে ইবলীসের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করেছেন। বহু পথভ্রষ্টকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। তাদের এই জীবন্ত কর্ম এতটাই ফলপ্রসু হয়েছে যে, পরবর্তীতে এ সকল লোক-ই আল্লাহর দীনকে বাতিল ও সীমালজ্জনকারীদের বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছেন। অথচ এরাই বেদআতে বিপর্যস্ত হয়ে ফিতনা উস্কে দিয়েছিল। কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে শতধা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহর উপর অপবাদ ও বিভিন্ন মন্তব্য জুড়ে দিয়েছিল। তারা আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যা করতো। আমরা ভ্রষ্টকারী সকল বিশৃঙ্খলা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক মুহাম্মদ সা. ও তার পরিবার বর্গের উপর।
পর কথা
আল্লাহ আমাদের সকলকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন। অসন্তুষ্টির পথ থেকে দূরে রাখুন এবং তার প্রিয় বান্দাদের পথে আমাদের সকলকে পরিচালিত করুন।
আমি আপনাকে এবং বিশেষভাবে নিজেকে তাকওয়া, সুন্নাহ এবং জামাতের সাথে মিলিত থাকার অসিয়ত করছি। আপনি জানেন, যারা এপথের পথিক তাদের পরিণাম কত শুভ এবং এর উল্টো পথের পথিকদের পরিণাম কত ভয়াবহ। রসূলের সেই বাণী এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ মাত্র একটি সুন্নত শক্তভাবে ধারণকারী বান্দাকেও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন'।
আপনাদের প্রতি আমার নির্দেশ হলো, আপনারা কুরআনের উপর কোন কিছুকেই প্রাধান্য দেবেন না। কুরআন আল্লাহর কালাম বা কথা। যার মাধ্যমে আল্লাহ কথা বলেছেন সেটাও মাখলুক নয়। যে শব্দের মাধ্যমে কুরআন অতীতের সংবাদ উপস্থাপন করেছে সেটাও মাখলুক নয়, লওহে মাহফুজে যা কিছু আছে তাও মাখলুক নয়, যে ব্যক্তি এগুলোকে মাখলুক বলবে, সে কাফের হয়ে যাবে। এমনকি যে তাকে কাফের বলে স্বীকৃতি না দেবে সেও কাফের বলে গণ্য হবে।
কুরআনের পর রসূলের সুন্নাহ ও সাহাবাদের বক্তব্য ও মন্তব্যের অবস্থান। নবী-রসূলদের বক্তব্যের সত্যায়ন এবং সুন্নতের অনুসরণের মধ্যেই মুক্তি নিহিত। একথাগুলো উঁচু স্তরের আলিমদের মাধ্যমে ফুা ফুগ ধরে (বিশ্বস্ত সূত্রে) বর্ণিত হয়ে আসছে।
জাহাম বিন সফওয়ানের ভ্রান্ত মতাদর্শ থেকে দূরে থাকুন, কারণ তারা ধর্মের মধ্যে ফাঁক ফোকর খুঁজে বেড়ায়। উলামায়ে কেরামের ভাষ্যমতে ফেরকায়ে জাহমিয়া তিন দলে বিভক্ত। তাদের এক দলের অভিমত হলো, কুরআন আল্লাহর কালাম তবে মাখলুক, দ্বিতীয় দলের বক্তব্য হলো, কুরআন আল্লাহর কালাম তবে তা মাখলুক না হওয়ার ব্যাপারে তারা নিরব। এদেরকে 'ওয়াকিফিয়্যাহ' বলে। তৃতীয় দলের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা কুরআনের যে শব্দ পড়ি সেটা মাখলুক। এরা সবাই জাহমিয়াহ। সকল উলামা এ বিষয়ে একমত যে তারা যদি তওবা করে তাদের বক্তব্য থেকে ফিরে না আসে তাহলে তাদের জবাইকৃত প্রাণী ভক্ষণ করা বৈধ হবে না এবং তাদের কোন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য হবে না।
কথা ও কাজ উভয়ের সমষ্টির নামই হচ্ছে ঈমান। এই ঈমান বৃদ্ধি পায় আবার হ্রাস পায়। যদি নেক কাজ করেন তাহলে ঈমান বৃদ্ধি পাবে আর যদি মন্দ কাজ করেন তাহলে ঈমান হ্রাস পাবে। এমনকি এক পর্যায়ে মানুষ ঈমানের গণ্ডি থেকেই বেরিয়ে যায়। যদি তওবা করে নেয় তাহলে আবার ঈমানের আলোতে ফিরে আসে। একমাত্র শিরকের কারণেই মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়, অথবা যদি আল্লাহ প্রদত্ত কোন আবশ্যকীয় বিধানকে অস্বীকার করে তাহলেও কাফের হয়ে যায়। কেউ যদি কোন ফরজ বিধান অবহেলা বা দুর্বলতাবশত ছেড়ে দেয় তাহলে তার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করে দেবেন। মু'তাযিলাদের বিষয়ে উলামায়ে কেরামের অভিমত হচ্ছে তারা গুনাহকারীকে কাফের বলে আখ্যায়িত করে। সুতরাং যারা মু'তাযিলাদের এই মতে বিশ্বাসী হবে তারা নিশ্চিত ভাববে যে, হযরত আদম আ. গোনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে কাফের হয়ে গেছে (নাউজুবিল্লাহ)। এটাও ভাববে, হযরত ইউসুফ আ.এর ভায়েরা পিতার সামনে মিথ্যা বলে কুফুরী করেছে। মু'তাযিলাদের সর্বসম্মত বিশ্বাস হচ্ছে যদি কেউ কণা পারিমাণ বস্তুও চুরি করে তাহলে সে জাহান্নামী হয়ে যাবে। তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে। হজ করে থাকলে পুনরায় হজ করতে হবে। তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হচ্ছে তারা এ মত ও পথ থেকে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাদের সাথে সালাম কালাম করা যাবে না। তাদের জবাইকৃত প্রাণীও ভক্ষণ করা যাবে না।
রাফেজীদের বিষয়ে আমাদের উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তারা হযরত আলী রা. কে হযরত আবু বকর ও উমর রা. থেকে উত্তম মনে করে এবং আলী রা.কে আবু বকর রা. এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী বলে বিশ্বাস করে। যারা এমতে বিশ্বাসী তারা কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছে'। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নবী সা. এর পর আবু বকর রা. এর স্থান দিয়েছেন, আলী রা. এর নয়। নবী করিম সা. বলেন, 'আমি যদি কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই বেছে নিতাম। কিন্তু আল্লাহ আমাকে নিজের অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ে নিয়েছেন। যে বিশ্বাস করে, আলী রা. আবু বকর রা. এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, সে ভুলের মধ্যে আছে। কারণ, হযরত আবু বকর রা. এর ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর। অথচ হযরত আলী রা. তখন মাত্র সাত বছরের বালক, যার উপরে ইসলামের কোন বিধান, শরীয়তের দণ্ডবিধি এবং দীনের ফারায়েজই তখনও প্রযোজ্য হয় নি।
মুসলমানদের কর্তব্য হলো তাকদীরের ভালো মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এ- কথার উপর আস্থা রাখা। আল্লাহ তা'আলা মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। জান্নাতবাসী কারা হবে তাও নির্ধারণ করে রেখেছেন। জান্নাতের নেয়ামতসমূহ চিরস্থায়ী। যারা মনে করে জান্নাতের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যাবে তারা কাফের বৈ কিছু নয়। তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন তাতে যারা থাকবে তাদেরকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন। জাহান্নামের আজাবও চিরস্থায়ী। নবীর শাফায়াতের উসিলায় বহু লোক জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। এ-কথার উপরও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার দিদার লাভ হবে। হযরত মুসা আ. এর সাথে আল্লাহ কথোপকথন করেছেন। হযরত ইবরাহীম আ.কে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এটাও বিশ্বাস করতে হবে।
হিসাব-নিকাশ সত্য, পুলসিরাত সত্য, নবিগণ সত্য, হযরত ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা এবং রসূল, হাউজে (কাউসার), শাফায়াত, আরস, কুরসী ইত্যাদির উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। মালাকুল মাউতের প্রাণ হরণ এবং পুনরায় তা দেহে ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ঈমান রাখতে হবে। মৃত্যুর পর তাওহীদ রিসালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে। সিঙ্গায় ফুৎকারের উপরও বিশ্বাস রাখতে হবে, যাতে ইসরাফিল আ. ফুঁক দেবেন। মদীনায় যে কবর আছে তা রসূল সা. এর কবর আর দুই পাশে আছেন আবু বকর ও উমর রা.। বান্দার অন্তর আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মাঝে অবস্থিত। উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝেই দাজ্জাল বের হবে এবং হযরত ঈসা আ. এসে 'বাবেলুদ' নামক স্থানে তাকে হত্যা করবেন। হক্কানী উলামায়ে কেরাম যেটা অপছন্দ করেন সেটা প্রকৃতই নিন্দনীয়। সকল প্রকার বেদআত থেকে দূরে থাকুন।
রসূলের পর উম্মতের মধ্যে আবু বকরই সর্বশ্রেষ্ঠ, এরপর উমর এরপর হযরত উসমান রা. এর শ্রেষ্ঠত্বের স্থান। খেলাফতের ধারাবাহিকতার ব্যাপারে আমাদের এই একই বক্তব্য। আর আলী রা. এর ব্যাপারে আমরা নিরবতা অবলম্বন করে থাকি। শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে আমাদের কাছে আব্দুল্লাহ বিন উমরের বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান। এই চার খলীফা সবাই সঠিকপথ প্রাপ্ত। আশারায়ে মুবাশশারার ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তারা সবাই জান্নাতি। এরা হলেন, আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা, জুবায়ের, সা'দ, সাইদ, আব্দুর রহমান বিন আউফ, আবু উবাইদা বিন জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুম। রসূল সা. যাদের জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন আমরাও তাদের জান্নাতি হওয়ার প্রবক্তা।
আমাদের মতে নামাযে রফয়ে ইয়াদাইন করা এবং আমীন বলা উত্তম। শাসকদের জন্য সততা ও কল্যাণের দোয়া করা বাঞ্চনীয়। তাদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করা কিংবা পারস্পরিক বিশৃঙ্খলা ও ঝগড়ার সূত্র ধরে তাদের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া উচিত নয়। কোন মুসলমানকে একথা বলতে বাধ্য করা যাবে না যে, অমুক অমুক ব্যক্তি জান্নাতি। তবে রসূলের পক্ষ থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবীকে জান্নাতি বলা যাবে।
আল্লাহ তা'আলার ঐ সকল গুণই বর্ণনা করুন যেগুলো তিনি নিজের ব্যাপারে বলেছেন। তিনি নিজের ব্যাপারে যা বলতে নিষেধ করেছেন সেগুলো পরিহার করুন। প্রবৃত্তির অনুসারী এবং পথভ্রষ্টদের সাথে তর্ক- বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকুন। সাহাবাদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা থেকে দূরে থাকুন। শুধু তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করুন। তাদের পারস্পরিক বিতর্কের বিষয়ে নিরবতা অবলম্বন করুন। ধর্মীয় বিষয়ে বিদআতীদের থেকে পরামর্শ নিবেন না, এবং তাদের সাথে সফরও করবেন না। বিয়ের জন্য ওলী নির্ধারণ, খুতবা পাঠ এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রয়োজন। নেকাহে মুতা বা সাময়িক বিবাহ কেয়ামত পর্যন্ত হারাম। প্রত্যেক ভালো ও মন্দ কাজের পর নামায পড়ুন। মুসলমানদের যেই মৃত্যুবরণ করুক তার জানাজা পড়ে নিবেন। তার সব বিষয় আল্লাহই ফায়সালা করবেন। প্রত্যেক ইমাম ও বাদশার আনুগত্য করতে থাকুন। জিহাদ ও হজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া চাই। জানাজার নামাযে মোট চার তাকবীর। তবে যদি ইমাম পাঁচ তাকবীর বলে ফেলে তাহলে আপনারাও আলী রা. এর মত পাঁচ তাকবীর বলবেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেছেন, 'জানাজার নামাজে ইমাম যতগুলো তাকবীর বলবে আপনারাও বলবেন'। কিন্তু ইমাম শাফিঈ রহ, এ মাসআলায় ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, যদি চার তাকবীরের বেশি হয় তাহলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। তিনি বিশুদ্ধ সূত্রে রসূল সা. থেকে একটি হাদীস আমার সামনে উপস্থাপন করেছেন যাতে উল্লেখ আছে নবী সা. জানাজার নামাজে চার তাকবীর বলেছেন।
মুসাফিরের জন্য মুজার উপর তিন দিন তিন রাত মাসেহ করার সুযোগ আছে আর মুকিমের জন্য একদিন একরাত। রাত-দিনের নফল নামাজ দু রাকাত করে পড়া উত্তম। ঈদের নামাজের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই। মসজিদে প্রবেশের পর বসার পূর্বে দু'রাকাত তাহিয়‍্যাতুল মসজিদ পড়ে নিবেন। বিতিরের নামাজ এক রাকাত। নামাজের একামত দেয়া জরুরি। আমি প্রবৃত্তির অনুসারীদের বিপরীতে আহলে সুন্নতকে ভালো মনে করি। যদিও তাদের মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি থাকে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাকে ইসলাম ও সুন্নতের উপর অবিচল থেকে মৃত্যু বরণ করার তাওফীক দান করুন। আপন প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদেরকে তার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।
-চার ইমাম -আতহার মুবারকপুরী ২৬৯-২৭৫