মুসাফির

শরীয়তে মুসাফির ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে ৪৮ মাইল তথা (প্রায় ৭৮ কিলোমিটার) বা তার বেশি দূরত্বে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজ এলাকা ত্যাগ করে।
আর যে নিজ এলাকায় অবস্থান করছে বা ৭৮ কিলোমিটারের কম দূরত্বে সফর করেছে সে মুকীম। তেমনিভবে ৭৮ কিলোমিটার কিংবা তারচেয়ে বেশি দূরত্বে সফর করলে পথিমধ্যে মুসাফির হলেও কোনো এক গ্রাম বা এক শহরে ১৫ দিন বা তার চেয়ে বেশি সময় অবস্থানের নিয়ত করলে ঐ স্থানে সে মুকীম হবে।
alkawsar.com/bn/qa/answers/detail/2165
সফরসম দূরত্বের উদ্দেশে নিজ এলাকার বসতি ত্যাগ করলে অর্থাৎ গ্রামের অধিবাসী নিজ গ্রাম ছাড়লে, শহরের অধিবাসী শহর ত্যাগ করলে এবং সিটি শহরে বসবাসকারী সিটি শহর থেকে বের হওয়ার পর থেকে মুসাফির গণ্য হবে।
মুকীম হওয়ার জন্য একটি এলাকা অর্থাৎ একটি গ্রাম বা একটি শহরে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত করতে হবে। এক ইউনিয়নের একাধিক গ্রামে ১৫ দিনের নিয়ত করলে মুকীম হবে না।
alkawsar.com/bn/qa/answers/detail/1135

বিপদ যখন নিয়ামত ২

দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার
একজন বন্দির মাথায় সব সময় কয়েকটি শব্দ ঘুরপাক খায়-মুক্তি, রায়, বিচারক, অপবাদ, প্রমাণ, নির্দোষ, শাস্তি, মেয়াদ ইত্যাদি।
ওঠাবসায়, শয়নে-স্বপনে, পানাহার ও সালাতের মধ্যেও এই শব্দগুলো নিয়ে সে চিন্তা করতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো পত্রিকা যদি সে হাতে নেয়, তা হলে মুক্তি ও বন্দি-বিষয়ক সংবাদের প্রতি তার গুরুত্ব থাকে অনেক বেশি। যে বিষয়গুলো তার মুক্তির রায় ও শাস্তি থেকে বাঁচার সাথে সম্পর্কিত ওই সংবাদগুলোর ব্যাপারে তার আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা বা অস্ত্রের মূল্য-সংক্রান্ত সংবাদ সম্পর্কে তার কোনো বাড়তি আগ্রহ থাকে না। এসব অনর্থক সংবাদ মনে হয় তার কাছে।
আমাদের অবস্থাও এমন। আমরা আমাদের স্বদেশ জান্নাত থেকে দুনিয়ায় বন্দি হয়ে এসেছি। আমাদের অপরাধ নিজেদের গুনাহ। ফলে আমরা শাস্তির উপযুক্ত। আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য আমাদের শক্তিশালী প্রমাণ হলো, আমরা তাওহীদে বিশ্বাসী। যদি এর মধ্যে ত্রুটি থাকে তা হলে শাস্তির মেয়াদের কোন সীমা থাকবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় খাঁটি তাওবার মাধ্যমে। আর যিনি মুক্তির রায় দেবেন তিনি নির্ভুল বিচারক মহান আল্লাহ তাআলা। সুতরাং আমরা নির্ভুল বিচারক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করব এবং এমন আমলের প্রতি আগ্রহী হবো, যা আমাদেরকে দুনিয়ার কারাগার থেকে মুক্ত করে সুবিশাল আখিরাতের দিকে নিয়ে যাবে। দুনিয়ার নগণ্য বস্তু ও এর আমোদ-প্রমোদে আমরা লিপ্ত হব না। তা হলে নিঃসন্দেহে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি এবং তাঁর প্রতিদান ও সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা আমাদের মাথায় চেপে বসবে। তা থেকে আমরা কখনও উদাসীন হব না।
[১৪৫-১৪৬]
.

মুমিনের কোনোকিছুই বৃথা যায় না
মানুষ একের-পর-এক মুসিবতে লিপ্ত হয়। ফলে তাদের মনে হয়, সবকিছু নষ্ট হয়ে গেল। সময়, সম্পদ, পরিশ্রম, মন-মেজাজ ও স্বাস্থ্য সবই নষ্ট হলো। কিন্তু একজন মুমিন মনে করে আল্লাহর কাছে কিছুই নষ্ট হয় না। সবকিছুই লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি সবর কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ইহসানকারীদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। -হূদ ১১:১১৫
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এ সবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। -বুখারী ৫৬৪২
সুতরাং হে বিপদগ্রস্ত ভাই ও বোনেরা, নিরাশ হবেন না। ধৈর্য ধরুন। কারণ ধন-সম্পদ, সময় ও স্বাস্থ্য সবকিছুর জন্য সর্বোত্তম ওষুধ ধৈর্য। এগুলো হাতছাড়া হলে চিন্তিত হবেন না। বরং যেদিন কোনো দিরহাম-দীনার থাকবে না; থাকবে কেবল ভালো ও মন্দ আমল, সেদিন এগুলো আপনার জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
[২:১৪৬]

বিপদ যখন নিয়ামত ১

সবর: ইসলামি পরিভাষায় আরবি শব্দ 'সবর' এর অর্থ হচ্ছে, 'হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা, অভিযোগ করা থেকে জিহ্বাকে নিবৃত্ত রাখা এবং দুঃখ-দুর্দশার সময় মুখে আঘাত করা কিংবা শরীরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা থেকে নিজের হাতকে সংযত রাখা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সবরের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোন নি‘আমত কাউকে দেয়া হয়নি। -বুখারী ১৪৬৯

কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। -আয-যুমার ৩৯:১০

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করতে হয়। -বুখারী ৬৬৬৯
.

ইহতিসাব: প্রত্যেক দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহর নিকট হতে সওয়াবের প্রত্যাশা করাকে ইহতিসাব বলে। যত বেশি কষ্ট-যাতনা হোক না কেন, আল্লাহর নিকট হতে এর বিনিময়ে ক্ষমা ও মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে ইহতিসাব।
মহান আল্লাহ্ বলেছেনঃ হে বনী আদম! যদি তুমি সওয়াবের আশায় প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করো তাহলে আমি তোমাকে সওয়াবের বিনিময় হিসাবে জান্নাত দান না করে সন্তুষ্ট হবো না। -ইবনে মাজাহ ১৫৯৭

আল্লাহ তাআলা বলেন, আর যারা ঈমান আনে তাদের জন্য আল্লাহ ফির’আউনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করেন, যখন সে বলেছিল, ‘হে আমার রব, আপনার কাছে আমার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফির’আউন ও তার কর্ম হতে নাজাত দিন, আর আমাকে নাজাত দিন যালিম সম্প্রদায় হতে।' -আত-তাহরীম ৬৬:১১
.

ইসতিরজা ইহতিসাব: বিপদের সম্মুখীন হয়েও আল্লাহর প্রভুত্বের ঘোষণা দেওয়া ও আল্লাহর নিকট নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়াকে ইস্তিরজা বলে। ইস্তিরজা হচ্ছে বিপদসংকুল অবস্থায় 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন' বলা; অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।'
আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। -আল-বাকারা ২:১৫৫
যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। -আল-বাকারা ২:১৫৬

উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি: কোন মুসলিমের ওপর মুসীবাত আসলে যদি সে বলেঃ আল্লাহ যা হুকুম করেছেন- "ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলায়হি র-জিউন” বলে এবং এ দু’আ পাঠ করে- “আল্ল-হুম্মা’ জুৱনী ফী মুসীবাতী ওয়া আখলিফ লী খয়রাম মিনহা- ইল্লা- আখলাফাল্ল-হু লাহ খয়রাম মিনহা-” [হে আল্লাহ! আমাকে আমার মুসীবাতে সাওয়াব দান কর এবং এর বিনিময়ে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান কর, তবে মহান আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান করে থাকেন।]।
উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এরপর যখন আবূ সালামাহ ইনতিকাল করেন, আমি মনে মনে ভাবলাম, কোন মুসলিম আবূ সালামাহ থেকে উত্তম? তিনি সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি হিজরত করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌছে গেছেন। এতদসত্ত্বেও আমি এ দু’আগুলো পাঠ করলাম। এরপর মহান আল্লাহ আবূ সালামার স্থলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মতো স্বামী দান করেছেন। উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার নিকট রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের পয়গাম পৌছাবার উদ্দেশে হাতিব ইবনু আবূ বালতা’আহ-কে পাঠালেন। আমি বললাম, আমার একটা কন্যা আছে আর আমার জিদ বেশী। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার কন্যা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করব যাতে তিনি তাকে তার কন্যার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন। আর (তার সম্পর্কে) দু’আ করব যেন আল্লাহ তার জিদ দূর করে দেন।
-মুসলিম ২০১১
.
শাকওয়াহ: শাকওয়াহ অর্থ অভিযোগ করা, নালিশ জানানো। শাকওয়াহ দুই ধরনের-

১. প্রথম ধরনের শাকওয়াহ হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট পেশ করা। এটি সবরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের শাকওয়াহ-র অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়।
ইয়াকূব আ. বলেছিলেন, আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। -ইউসুফ ১২:৮৬

২. আরেক ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে মানুষের নিকট নালিশ করা। এটি হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে কথার দ্বারা অথবা পরোক্ষভাবে আচার-আচরণ বা কাজের দ্বারা, যেমন : বিবর্ণ পোশাক পরিধান করা, মাথা মুণ্ডানো, হতাশা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজের দ্বারা। এ-ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে সবরের সাথে সাংঘর্ষিক। এ-ধরনের শাকওয়াহ আল্লাহর ফায়সালার ওপর অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমানের দৃঢ়তার অভাব প্রমাণ করে।
তবে নিজের আপনজনকে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানো দোষের কিছু নয়।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর গায়ে আমার হাত বুলালাম এবং বললাম ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ! আমি এমন কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হই, যা তোমাদের দু’জনের হয়ে থাকে। আমি বললাম এটা এ জন্য যে, আপনার জন্য প্রতিদানও হল দ্বিগুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ! এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যে কোন মুসলিম ব্যাক্তির উপর কোন যন্ত্রণা, রোগ ব্যাধি বা এ ধরনের অন্য কিছু আপতিত হলে তাতে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যে ভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে। -বুখারী ৫২৫৮
[৩৭-৪২]
.

আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না
একদা আলি ইবনু আবী তালিব মাসজিদে গেলেন। তাঁর সাথে একটি ঘোড়া ছিল। তিনি মাসজিদের ভেতরে প্রবেশের পূর্বে এক লোককে ঘোড়াটি দিলেন এবং বললেন, ঘোড়াটি যেন সে দেখে রাখে। লোকটি ঘোড়ার লাগাম চুরি করে নিয়ে গেল।
মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় আলি ভাবলেন, লোকটিকে ঘোড়া দেখে রাখার জন্যে চার দিনার মজুরি দিবেন। তিনি বাইরে বের হয়ে দেখলেন ঘোড়ার লাগাম হারিয়ে গেছে। তিনি তাঁর সেবককে বললেন, "এই চার দিনার দিয়ে আমার জন্যে বাজার থেকে একটি লাগাম নিয়ে এসো।"
সেবক বাজারে গিয়ে দেখল যে এক ব্যক্তি লাগাম বিক্রি করছে। এ ছিল সেই ব্যক্তি যে লাগামটি চুরি করেছিল। সেবকটি ওই ব্যক্তির কাছে থেকেই দামাদামি করে চার দিনারে লাগাম কিনে নিয়ে এল।
একবার ভাবুন তো, লোকটি একটু অপেক্ষা করলেই বৈধভাবে চার দিনারই পেত। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল। হারাম পন্থায় চুরির মাধ্যমে একই টাকা হাতিয়ে নিল। বোঝার ব্যাপার হচ্ছে, যা আপনার ভাগ্যে আছে তা আপনারই হবে। এই চার দিনার লোকটির তাকদীরে ছিল। কিন্তু সে চুরির মাধ্যমে তা নিল। তাই আমি আপনাদের ধৈর্যধারণ করার উপদেশ দেবো। যা আপনার ভাগ্যে আছে, তা আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার কাছে আসবে। সবর করুন, আর বেশি বেশি দুআ করুন।
[৫২-৫৩]
.

দুআর শক্তি
একদা ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন।
রাত্রিযাপনের জন্যে তিনি একটি মাসজিদে প্রবেশ করলেন। মাসজিদের পাহারাদার বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে, এখন মাসজিদ ছাড়তে হবে। মাসজিদ বন্ধ করার সময় হয়ে গিয়েছিল। ইমাম আহমাদ পাহারাদারকে জানালেন যে, তাঁর আর রাত কাটানোর জায়গা নেই, তবুও পাহারাদার তাঁকে উঠে যাবার জন্য জোর করছিল। তিনি তার জিনিসিপত্র নিয়ে বেরিয়ে এসে মাসজিদের সিঁড়িতে শুয়ে পড়লেন। পাহারাদার বাইরে বেরিয়ে ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে সিঁড়ি থেকে উঠে যেতে বলল। অতঃপর পাহারাদার ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে রাস্তার মাঝখানে ফেলে রেখে চলে গেল।
রাস্তার পাশেই এক ধার্মিক রুটিওয়ালার দোকান ছিল। সে ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে দেখে নিজের সাথে রাতে থেকে যেতে বলল। সে রাতভর রুটি বানায় তাই ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার স্থানে ঘুমোতে পারবেন।
রাতে ইমাম আহমাদ (রহঃ) একটি অভাবনীয় দৃশ্য দেখলেন। রুটিওয়ালা রাতভর কাজ করছিল। সে ময়দা গোলে রুটির খামির বানাচ্ছিল আবার কখনও-বা রুটি সেকছিল। কিন্তু এসব কাজের মধ্যেও সে রাতভর আল্লাহর যিকর করে যাচ্ছিল, তাসবিহ জপছিল। ইমাম আহমাদ (রহঃ) তা দেখে বিস্মিত হলেন।
এই লোকটি রাতভর আল্লাহর যিকর করছিল। অথচ, আজকাল মানুষ কত তাড়াতাড়ি যিকর করে ক্লান্ত হয়ে যায়। ইমাম আহমাদ (রহঃ) রুটিওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন যে, কদিন ধরে সে এই আমল করে যাচ্ছে। রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে জীবনভর এই আমল করে আসছে।
ইমাম আহমাদ (রহঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আমলের কোনো ফল সে পেয়েছে কি না। লোকটি তখন যে জবাব দিলো, তা শুনে ইমাম আহমাদ (রহঃ) হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। রুটিওয়ালা জবাব দিলো, "আমি আল্লাহর কাছে কোনো দুআ করেছি আর আল্লাহ তা কবুল করেননি, এমন কখনও হয়নি, শুধুমাত্র একটি দুআ বাদে।" ইমাম আহমাদ (রহঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কোন দুআটি কবুল হয়নি?"
রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে আল্লাহর কাছে দুআ করত যেন ইমাম আহমাদের সাথে তার দেখা হয়। কিন্তু সেই দুআটি এখনও কবুল হয়নি।
এ কথা শুনে ইমাম আহমাদ কেঁদে ফেললেন। তিনি রুটিওয়ালাকে বললেন, "সুবহানাল্লাহ! তিনিই তো হচ্ছেন আল্লাহ... তিনি আমাকে টেনে-হিঁচড়ে তোমার দোকানে এনে ফেলেছেন, যেন আল্লাহ আমাকে দিয়ে তোমার দুআ কবুল করাতে পারেন।"
[৬০-৬১]
.

বিষন্নাতার ১৫টি প্রতিষেধক
আল্লাহ তাআলা হয়তো আপনাকে বিপদ দিয়েছেন তার চেয়েও বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। আপনার ব্যাপারে যা পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটা অনুমান করাও আপনার পক্ষে অসম্ভব।
আলেমরা এক রাজা আর তার মন্ত্রীর কথা প্রায়শই বর্ণনা করে থাকেন। মন্ত্রী হিলেন একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, যিনি বিপদ এলেই এই কথাটির পুনরাবৃত্তি
"আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।"
একদিন একসাথে খাওয়ার সময় রাজা তার হাত খুব বাজেভাবে কেটে ফেললেন। সব সময়কার মতোই মন্ত্রী বলে উঠলেন, "আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।"
রাজা মশায় মন্ত্রীর কথায় খুব অপমানিত বোধ করলেন। তিনি ভাবলেন, মন্ত্রী তার এমন দুর্দশায় মজা নিচ্ছে। তাই তিনি রাগে-ক্ষোভে মন্ত্রীকে বন্দি করলেন। মন্ত্রী তার বন্দিত্বের ব্যাপারেও 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন'-বলে প্রতিক্রিয়া দেখালেন।
রাজা তার বিনোদনের বেশিরভাগ সময়ই মন্ত্রীর সাথে শিকারে কাটাতেন। কিন্তু মন্ত্রী জেলে বন্দি হবার পর তিনি একাই শিকারে গেলেন। তিনি শিকারের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে কখন যে নিজের সীমানা পেরিয়ে মূর্তিপূজারিদের সীমানায় গিয়ে পৌঁছলেন, সেটা টেরও পেলেন না। তারা তাকে ধরে ফেলল, এরপর বন্দি করল।
তার পর তাদের সবচেয়ে বড় দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেবার জন্য নিয়ে গেল। তাকে মাটিতে শুইয়ে যেই ছুরি দিয়ে গলাটা কাটতে গেল, তখনই রাজার হাতের জখম ভাদের দৃষ্টিগোচর হলো। আর এই খুঁতের কারণে তারা তাকে বলি দেওয়ার অযোগ্য মনে করে ছেড়ে দিলো।
রাজা তার প্রাসাদে ফিরলেন। তিনি অনুধাবন করতে পারলেন-'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।' তাই রাজা তৎক্ষণাৎ মন্ত্রীকে মুক্ত করে দিলেন এবং সম্পূর্ণ ঘটনা তাকে খুলে বললেন। তিনি মন্ত্রীকে বললেন, "জখমের মাধ্যমে আমার কী কল্যাণ হয়েছিল, এখন আমি তা বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমাকে বন্দি করার সময় ও তুমি বলেছিলে 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন', এই বন্দিত্বের মধ্যে কী কল্যাণ ছিল তোমার জন্য?"
জবাবে মন্ত্রী জানতে চাইলেন, "শিকারের সময় সচরাচর কে আপনার সাথে থাকত?" রাজা বললেন, "তুমি।" মন্ত্রী তখন বললেন, "আমাকে যদি বন্দি না করতেন তবে আজকেও আপনার সাথে আমি থাকতাম, আর তখন আপনার বদলে আমাকেই বলি দেওয়া হতো।"
যখনই আপনি কোনো দুর্বিপাকে পতিত হন, 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন'-বাক্যটিকে আপনার স্লোগানে পরিণত করুন। যেহেতু আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন:২:২১৬
[১:৮০-৮১]

বহুল-ব্যবহৃত আরবি বাক্যাংশের অর্থ ও প্রয়োগ

সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আল্লাহ তাঁর উপর করুণা ও শান্তি বর্ষণ করুন!
মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহিস সালাম।
তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
সাধারণত নবিদের নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহাস সালাম।
তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
মহীয়সী নারীর নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহিমাস সালাম
উভয়ের উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
দুজন নবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহিমুস সালাম।
তাঁদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
দুয়ের অধিক নবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহু।
আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন!
সাহাবির নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহা
আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন!
মহিলা সাহাবির নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহুমা
আল্লাহ উভয়ের উপর সন্তুষ্ট হোন!
দুজন সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহুম
আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোন!
দুয়ের অধিক সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহুন্না
আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোন!
দুয়ের অধিক মহিলা সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রহিমাহুল্লাহ।
আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন!
যে কোনো সৎ ব্যক্তির নামের পর ব্যবহৃত হয়।

সংজ্ঞা পরিভাষা

কোনো বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছুর মালিক বানিয়ে দেওয়া কে হাদিয়া বলে।
.

হাদীস
যে কথা, কর্ম, অনুমোদন বা বিবরণকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলে প্রচার করা হয়েছে বা দাবী করা হয়েছে তাই হাদীস বলে পরিচিত।

সাহাবীগণ ও তাবিয়ীগণের কথা, কর্ম ও অনুমোদনকেও হাদীস বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম, কথা, অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে মারফূ হাদীস বলা হয।

সাহাবীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে মাউকূফ হাদীস বলা হয়।

তাবিয়ীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে মাকতূ হাদীস বলা হয়।
.

সুন্নাত
ইসলামী শরীয়তে ব্যবহারের দিক থেকে 'সুন্নাত' শব্দের দুই ধরনের প্রয়োগ রয়েছে:

১. সুন্নাতের প্রথম ও পুরাতন প্রয়োগ হলো রাসূলে আকরাম-এর সকল প্রকারের নির্দেশ, কথা, কর্ম, অনুমোদন বা এক কথায় তাঁর সামগ্রিক জীবনাদর্শ। মূলত হাদীস শরীফে ও সাহাবী-তাবেয়ীদের যুগে 'সুন্নাত' বলতে এই অর্থই বোঝানো হতো। এছাড়া পরবর্তী যুগেও হাদীস চর্চার ক্ষেত্রে ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও 'সুন্নাত' এই অর্থে ব্যবহৃত হয়।

২. সুন্নাতের দ্বিতীয় ও প্রচলিত অর্থ ইসলামী শরীয়তে অত্যাবশ্যকীয় নয়- এরূপ নেক কর্ম। অর্থাৎ, ফরয ও ওয়াজিব এর পরবর্তী, আবশ্যকীয় নয় এরূপ কর্ম, যা করা প্রয়োজন, বা করা উত্তম। সাধারণত এই অর্থটিই আমাদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত।

তিনি যা করেছেন তা করা এবং তিনি যা বর্জন করেছেন তা বর্জন করা সুন্নাত। তাঁর শিক্ষা ও কর্মপদ্ধতির আলোকে ফরযকে ফরয, নফলকে নফল, মুবাহকে মুবাহ, মাকরুহকে মাকরুহ ও হারামকে হারাম হিসাবে গ্রহণ করা সুন্নাত। এর বাইরে কোনো রীতি প্রচলন করাই বিদ'আত।
.

বিদআত হল এমন কাজ, যার ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহ ও খাইরুল কুরুনে' নেই, সে কাজকে দীনের কাজ ভেবে করা। -শিব্বির আহমাদ উসমানি