ইয়েমেনের গভর্ণর আবরাহাহ বিন সাবাহ হাবশী কা'বাগৃহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হন। এ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ৫০ কিংবা ৫৫ দিন পর রবিউল আওয়াল মাসের সোমবারে মক্কার বিখ্যাত হাশিম বংশে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মলাভ করেন। নগরবাসী আরবগণের বিশেষ প্রথা অনুসারে শিশু মোহাম্মদ (স.) কে দুগ্ধ পান করানোর উদ্দেশ্যে ধাত্রী হালীমাহ বিনতে আবূ যুয়াইব আব্দুল্লাহ বিন হারেসের নিকট সমর্পণ করা হয়। ৬ বছর বয়সে দুধমা হালিমাহর ঘর থেকে ফিরে আসার অল্প কিছুদিন পর মা আমিনাহ মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। জন্মের পূর্বেই পিতা আব্দুল্লাহকে হারানো মুহাম্মদ (স.) এর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিলেন বৃদ্ধ দাদা আব্দুল মুত্তালিব। আট বছর বয়সে দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবূ তালিব শিশু মুহাম্মদ (স.) এর দায়িত্ব নেন। ২৫ বৎসর বয়সে মুহাম্মাদ (স.) ৪০ বৎসর বয়সী খাদীজাতুল কুবরা (রা.) বিনতে খুওয়াইলিদ কে বিয়ে করেন। ৪০ বৎসর বয়সে রাসূল (স.) নবুওয়াতের মহান মর্যাদা লাভ করলেন। নবুওয়াত লাভের পরবর্তী তিন বছর তিনি (স.) গোপনে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। এ সময় প্রায় ৩৩০ জন নারী-পুরুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এ সময় তারা গোপন ঘাটিতে সালাত আদায় করতেন। অতঃপর প্রকাশ্য দাওয়াতের আদেশ লাভের পর তিনি (স.) সগোত্রীয় লোকদের নিয়ে ২ দফা ঘরোয়া সম্মেলন করেন। অবশেষে সাফা পর্বতের উপর দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় সমগ্র কুরাইশ গোত্রের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। পরবর্তীতে সমাজের অলি-গলি ঘুরে প্রকাশ্য দাওয়াত দিতেন; কুরাইশ নেতাদের সম্মুখে কা'বাহ প্রাঙ্গণে সালাত আদায় করতেন। আর একইসাথে মুশরিকরাও এ দাওয়াতের বিরুদ্ধাচারণ করতে লাগলো। মক্কায় আগত হাজীদের মাঝে রাসূল (স.) এর বিরুদ্ধে গুজব রটনা করতে লাগলো। রাসূল (স.) এর পিছন পিছন গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে লাগলো। নবুওয়াতের চতুর্থ বছরের পর থেকে শুরু হলো মুসলিমদের উপর অন্যায় অত্যাচার। যদিও দরিদ্র বিশেষত দাস-দাসীদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো; তবে বিত্তবান ও সম্ভ্রান্ত মুসলিমরাও এ থেকে পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। এই অবস্থায় মুসলিমরা নিজেদের মাঝে গোপনে মিলিত হতো এবং গোপনে এবাদত করত। অপরদিকে কিছু মুসলিম হাবাশায় হিজরত করেন।
নবুওয়াত ৬ষ্ঠ বর্ষের শেষভাগে চাচা হামযাহ (রা.) ও ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলে মুসলিমরা প্রথম প্রকাশ্যে কা'বায় সালাত আদায় করে। এ অবস্থায় মুশরিকরা হতচকিত হয়ে পড়ে। তারা মোহাম্মদ (স.) এর সাথে আপোষ মিমাংসার চেষ্টা করে, হুমকি দেয়, হত্যার ইচ্ছা করে, সামঞ্জস্য বিধানের প্রস্তাব দেয়; এমনকি ইহুদীদের সাথে মিলে পরামর্শ করে। দাওয়াতকে স্তব্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে সর্বপ্রকারের চেষ্টা চালায়। মোহাম্মদ (স.) কে হত্যার জন্য মুশরিকদের কাছে হস্তান্তর না করায় নবুওয়ত সপ্তম বর্ষের মুহাররম মাসের শুরুতে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করা হয়। এর ফলে পরবর্তী ৩ বৎসর শিয়াবে আবূ ত্বালিব গিরিসংকটে অন্তরীণাবস্থায় অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। অবশেষে হিশাম বিন আমর নামক এক ব্যক্তির উদ্যোগে নবুওয়াত ১০ম বর্ষের মুহাররম মাসে এই অবরোধের অবসান হয়। এর ৬ মাস পর রজব মাসে আবূ ত্বালিব এবং তার ২ মাস পর খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ইন্তেকাল করেন। ঈমানহীন অবস্থায় প্রিয় চাচার মৃত্যুতে ও অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিভাবকের অভিভাবকত্ব হারানোর ফলে মুশরিকদের অত্যাচার বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। আবার কাছাকাছি সময়েই একমাত্র স্ত্রীর অনাবিল প্রেম-ভালোবাসা ও সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হলেন। আর তাই এ বছরটির নাম রাখা হয় দুঃখ কষ্টের বছর। শাওয়াল মাসে রাসুলুল্লাহ (স.) সাওদা বিনতে যামআহকে বিবাহ করেন।
মক্কায় ইসলামের দাওয়াত যখন কঠিনতম অবস্থায় পৌঁছাল এমন সময় মোহাম্মদ (স.) মক্কা থেকে ৬০ মাইল দূরে ত্বায়িফ গমন করলেন। সেখানে ১০ দিন অবস্থান করে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। দাওয়াত কবুল এর পরিবর্তে তারা তাকে তায়েফ থেকে বের করে দিল এবং অমানবিক জুলুম নির্যাতন করতে করতে তায়েফ থেকে তিন মাইল দূর পর্যন্ত তাড়া করল। এ দিনটি ছিল রাসূল (সা.) এর জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন।
যুলক্বাদাহ মাসে মুত্বঈম বিন আদীর আশ্রয় নিয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর মোহাম্মদ (সা.) নতুন ভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিদের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। একাদশ নবুওয়াত বর্ষে হজের মৌসুমে মদীনার খাযরাজ গোত্রের ছয়জন যুবক ইসলামের দাওয়াত কবূল করে মুসলিম হয়ে গেলেন। এ বছরই শাওয়াল মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়িশাহ (রা.) এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষের এক রাতে সংগঠিত হয় ইসরা ও মেরাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সশরীরে বুরাকের উপর আরোহন করিয়ে জিবরাঈল (আ.) মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাসে অবতরণ করেন। সেখানে সমাগত নবীগণ (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ইমামত সহকারে জামাতে সালাত আদায় করেন। সালাত আদায়ের পর তাকে সাত আসমান অতিক্রম করিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা ও বায়তুল মামুরে নেয়া হয়। অতঃপর মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাত ও কথোপকথনের পর মোহাম্মদ (সা.) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। দ্বাদশ নবুওয়াত বর্ষের জিলহজ্ব মাসে মদিনার ১২ জন লোকের সাথে সংঘটিত হয় আক্বাবার প্রথম বায়আত। এ লোকদের সঙ্গে মুসআব বিন উমায়ের আবদারিকে মদিনায় প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়। তার চেষ্টায় মদিনায় মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে হজ্বের মৌসুমে মদিনার পঁচাত্তর জন লোক আক্বাবার দ্বিতীয় শপথে অংশ নেয়। আক্বাবার বড় শপথের ফলে মক্কা থেকে মুসলিমরা মদিনায় হিজরত করতে শুরু করে।