উম্মুহাতুল মু'মিনীন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীগণ (رضى الله عنهن)
মুহাম্মাদ ﷺ ৩
সপ্তম হিজরীতে খাইবারের মাত্র ৩ দিন পূর্বে রাসুলুল্লাহ (সা.) গা-বা যুদ্ধ বা যূ ক্বারাদ যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন মিক্বদাদ বিন আমরের উপর এবং মদিনায় তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ইবনু উম্মু মাকতূম। এ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে রাসুলুল্লাহ বলেন, "আজকের আমাদের সব চেয়ে উত্তম ঘোড়সওয়ার আবূ ক্বাতাদাহ এবং উত্তম পদাতিক সালমাহ বিন আকওয়া।"
মদিনার উত্তরে ৮০ কিংবা ৬০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত খাইবার শহর। মুহাররম মাসের
শেষ ভাগে হুদায়বিয়াহর বৃক্ষের নীচে বাইয়াতে রিযওয়ানে শরীক হওয়া ১৪০০ সাহাবী নিয়ে
রাসুলুল্লাহ (সা.) খাইবার ও ওয়াদিল কুর যুদ্ধ পরিচালনা করেন। সমস্ত ক্ষেত-খামার ও বাগ
বাগিচার উৎপাদনের অর্ধাংশ মুসলিমদের প্রদানের শর্তে ইহুদিদেরকে খায়বারের ভূমি দেখাশোনার
দায়িত্ব দেয়া হয়। এ যুদ্ধে ১৬ জন মুসলিম শহীদ হন। অন্যদিকে ঈহুদীগণের মৃত্যুর সংখ্যা
ছিল ৯৩। রাসুলুল্লাহ (সা.) হুয়াই বিন আখতাবের কন্যা এবং নিহত কিনানাহ বিন আবিল হুক্বাইক্বের
নববধূ সাফিয়্যাহকে বন্দী করেন। ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফিয়্যাহকে বিবাহ
করেন। খাইবার বিজয়ের পর সালাম বিন মুশরিকের স্ত্রী যয়নাব বিনতে হারিসের উপঢৌকন হিসেবে
পাঠানো বিষ মিশ্রিত বকরির ভূনা গোশত খাওয়ার ফলে বিশর বিন বারা বিন মারূর (রা.) মৃত্যুবরণ
করেন।
এই যুদ্ধের পূর্বে আবু হুরায়রা ইসলাম গ্রহণ করে প্রথমে মদিনায় আসেন এবং সেখান
থেকে খাইবারে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে মিলিত হন। সেই যুদ্ধের মধ্যেই জাফর বিন
আবূ ত্বালিব, আবূ মুসা এবং তার বন্ধুগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে মিলিত হন। রাসূলুল্লাহ
(সা.) জাফর (রা.) কে চুম্বন করে বলেন, "আল্লাহর কসম! আমি জানি না আমার অধিক আনন্দ
কিসের, খায়বার বিজয়ের না জাফরের আগমনের?"
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রেরিত মুহায়্যিসা বিন মাসউদ (রা.) ফাদাকের ইহুদীদের
নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদান করলে খাইবারের শস্য বন্টনের নীতির অনুরূপে শস্য প্রদানের
শর্তে ফাদাক অঞ্চলের ইহুদীরা বিনা আক্রমণে রাজি হয়।
খাইবার বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ওয়াদিল কুরা বা কুরা উপত্যকার অভিযান চালান।
এ যুদ্ধে সমগ্র বাহিনীর পতাকা ছিলো সাদ বিন উবাইদার হাতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো তিনটি
পতাকার একটি হুবাব বিন মুনযিরকে, আরেকটি সাহল বিন হুসাইফাকে এবং আরেটি উবাইদা বিন বিশরকে
দেন। যুদ্ধে জয়ের পর তাদের সাথে খায়বারবাসীগণের অনুরূপ চুক্তি সম্পাদন করেন।
তাইমার ঈহুদীগণ সন্ধির জন্য রাসূলুল্লাহ এর কাছে দূত পাঠালে তাদের সঙ্গে কর
প্রদানের শর্তে চুক্তি করা হয়।
মদিনায় ফেরার পথে এক রাত্রে বিলালকে প্রত্যুষে জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া
হলে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। তাই সকলে সূর্যোদয়ের পর ফজরের সালাত আদায় করেন।
বেদুইনদের ভীতিপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সফর মাসে নজদের দিকে প্রেরিত সারিয়্যায়ে
আবান বিন সাঈদ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে খাইবারে মিলিত হয়।
রবিউল আওয়াল মাসে ৪০০ অথবা ৭০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) যাতুর রিকা
(ছিন্ন বস্ত্রের যিদ্ধ) পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময় মদিনার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত
হন আবূ যর অথবা উসমান ইবনু আফফান। এ যুদ্ধের সফরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে একাকী ঘুমন্ত
পেয়ে এক বেদুঈন মুশরিক গাছে ঝুলন্ত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অস্ত্র নিয়ে তার দিকে তাক
করেছিলো। মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার শর্তে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ সফরেই রাতের
পাহাড়ায় সালাতরত আব্বাদ (রা.) কে এক মুশরিক তীর নিক্ষেপ করেছিলো।
সফর কিংবা রবিউল আউয়াল মাসে গালিব বিন আব্দুল্লাহ লায়সীর নেতৃত্বে কুদাইদ অভিযান
পরিচালিত হয়।
শাবান মাসে উমার বিন খাত্তাব (রা.) এর নেতৃত্বে ত্রিশ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত
হয় তুরবাহ অভিযান।
শাবান মাসেই বাশীর বিন সাদ আনসারী (রা.) নেতৃত্বে ত্রিশ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত
হয় ফাদাক অঞ্চল অভিমুখে অভিযান। এ অভিযানে বাশীর ব্যতীত সকলেই শহীদ হন।
রমাযান মাসে গালিব বিন আব্দুল্লাহ লায়সীর নেতৃত্বে একশ ত্রিশ জন সৈন্য নিয়ে
পরিচালিত হয় মাইফাআহ অভিযান। এ অভিযানে উসামা বিন যায়দ নাহিক বিন মের্দাসকে লা ইলাহা
ইল্লাল্লাহ বলা সত্বেও হত্যা করেছিলেন।
শাওয়াল মাসে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার (রা.) এর নেতৃত্বে ত্রিশ জন ঘোড়সওয়ার
নিয়ে পরিচালিত হয় খায়বার অভিযান।
শাওয়াল মাসে বাশীর বিন কা'ব আনসারী (রা.) এর নেতৃত্বে তিনশ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত
হয় ইয়ামান ওজাবার অভিযান।
আবূ হাদরাদ (রা.) এর নেতৃত্বে ২ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় গাবা অভিযান।
যুলক্বাদাহ মাসে দুই হাজার মুসলিম ও ৬০ টি উট নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্বাযা
উমরাহ সম্পাদন করেন। এ সময় মদিনার তত্তাবধানে ছিলেন নাজিয়া বিন জুন্দুব আসলামী (রা.)।
উমরা পালন কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) মায়মুনাহ বিনতে হারিস আমিরিয়াহ (রা.) কে বিবাহ করেন।
যুল হিজ্জাহ মাসে ৫০ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় ইবনে আবুল আওজা অভিযান।
সফর মাসে দুশ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় গালিব বিন আব্দুল্লাহ অভিযান।
রবিউল আওয়াল মাসে কাব বিন উমাইরের নেতৃত্বে ১৫ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয়
যাত-ই-আত্বলাহ অভিযান। এ যুদ্ধে একজন ব্যতীত সকলেই শহীদ হন।
রবিউল আওয়াল মাসে শুজা বিন অহাব আসদীর নেতৃত্বে ৫০ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত
হয় যাত-ই-ইরক অভিযান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হারিস বিন উমায়ের আযদী (রা.) কে একটি পত্রসহ বুসরার শাসকের
নিকট প্রেরণ করলে বালক্বে নিযুক্ত তদানীন্তন রোম সম্রাটের গভর্ণর শুরাহবিল বিন আমর
গাসসানী তাকে হত্যা করে। এ প্রেক্ষাপটে ৮ম হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে সংঘটিত হয় রাসুলুল্লাহ
(সা.)-এর জীবদ্দশায় মুসলিমগণের সামনে সব চেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ মুতাহ যুদ্ধ। রাসুলুল্লাহ
(সা.) এ বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন জায়েদ বিন হারিসাহকে; যায়েদ শহীদ হলে যুল জানাহাইন
জাফার ত্বাইয়ার, জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহ। এ যুদ্ধে এই তিন জন সেনাপতিই
শহীদ হন। অতঃপর খালিদ বিন ওয়ালীদের নেতৃত্বে মুসলিমরা যুদ্ধ করে মদিনায় ফিরে আসে। এ
যুদ্ধে রোমান সম্রাট হিরাক্বলের পক্ষে সৈন্য সংখ্যা ছিলো দুই লক্ষ, অপরদিকে মুসলিমের
সৈন্য সংখ্যা ছিলো তিন হাজার। যুদ্ধে ১২ জন মুসলিম শহীদ হন। এ যুদ্ধের ফলে আরব জাহানের
নিকট এ সত্যটি উদঘাটিত হয়ে যায় যে মুসলিমরা হচ্ছেন আল্লাহর তরফ থেকে সাহায্য ও সহানুভূতি
প্রাপ্ত এবং তাদের পরিচালক প্রকৃতই আল্লাহর রাসূল।
জুমাদাল আখের মাসে আমর বিন আস এর নেতৃত্বে ত্রিশটি ঘোড়া সহ তিনশ জন সৈন্য নিয়ে
পরিচালিত হয় যাতুল সালাসিল অভিযান। এ বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য পরবর্তীতে আবূ উবাইদাহ
বিন জাররাহ এর নেতৃত্বে দুইশ সৈন্য প্রেরিত হয়।
শাবান মাসে আবূ ক্বাতাদাহ এর নেতৃত্বে ১৫ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় খাযিরাহ
অভিযান।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আশ্রিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ কারী বনু খুযাআহ গোত্রের উপর
করাইশদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কুরাইশদের আশ্রিত বনু বাকর গোত্র আক্রমণ করে। এতে হুদায়বিয়াহর
সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ হয়। এ প্রেক্ষিতে ৮ম হিজরী ১০ই রমাযান মুহাম্মাদ (সা.) দশ হাজার
সাহাবী নিয়ে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ সময় মদীনার প্রশাসনিক দায়িত্বে
ছিলেন আবূ রুহম গিফারী (রা.)। জুহফাহ কিংবা তার কিছু আগে মুসলিম হয়ে পরিবারসহ মদিনায়
হিজরতরত চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষাত হয়।
মুসলিমরা ১৭ রমাযান মক্কায় প্রবেশ করে। ডান পাশে নিযুক্ত খালিদ বিন ওয়ালিদের বাহিনী
নিচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশের সময় যে সকল মুশরিক প্রতিরোধ করতে এসেছিল তাদের সকলকেই
হত্যা করে সাফা পাহাড়ের উপর অবস্থান নেয়। ভিন্ন পথ ধরে গমণ করার কারনে ২ জন মুসলিম
শহীদ হয়। বাম পাশে নিযুক্ত যুবাইর বিন আউয়ামের বাহিনী মক্কার উপরিভাগের কাদা নামক স্থান
দিয়ে প্রবেশ করে হাজূনে গিয়ে পতাকা উত্তোলন করে। পদাতিক সৈন্যদের নিয়ে আবূ উবাইদাহ
(রা.) বাতনে ওয়াদীর পথ দিয়ে মক্কায় অবতরণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদুল হারামে প্রবেশ
করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন ও আল্লাহর ঘর ত্বাওয়াফ করেন। উসমান বিন ত্বালহাহ এর কাছ থেকে
কাবাহ ঘরের চাবি নিয়ে কাবা ঘর খোলে তাতে প্রবেশ করেন। সকল মূর্তি ভাঙ্গা হয় এবং সকল
প্রাণীর চিত্র মুছে ফেলা হয়। কাবার বাইরে খালিদ বিন ওয়ালিদের মাধ্যমে নাখালাহতে থাকা
উযযা নামক দেবমূর্তি, আমর ইবনুল আসের মাধ্যমে রিহাতে থাকা বনু হুযাইলের সুওয়া নামক
দেবমূর্তি, সাদ বিন যায়দ আশহালীর নেতৃত্ব ২০ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে মানাত দেবমূর্তি ধ্বংস
করা হয়। রাসুলুল্লাহ মক্কায় উনিশ দিন অবস্থান করেন।
শাওয়াল মাসে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে ৩০০ সৈন্য সহ বনু জাযীমাহ গোত্রের
নিকট ইসলামের দাওয়াত পাঠানো হয়।
৬ই শাওয়াল শনিবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বার হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কা থেকে হুনাইন
যুদ্ধের উদ্দেশ্য রওনা হলেন। এ সময় মক্কার গভর্ণর ছিলেন আত্তাব বিন উসাইদ। এ যুদ্ধে
সাক্বীফের সত্তর জন লোক নিহত হয়। মুসলিমরা ছয় হাজার যুদ্ধ বন্দী, চব্বিশ হাজার উট,
চল্লিশ হাজারেরও বেশি বকরি এবং চার হাজার উকিয়া রৌপ্য লাভ করে। হুনাইনের মুশরিক যুদ্ধাদের
অধিকাংশ ত্বায়িফে পলায়ন করায় খালিদের নেতৃত্বে এক হাজার যোদ্ধা ত্বায়িফে পাঠানো হয়।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই ত্বায়িফ অভিমুখে রওনা হন। ত্বায়িফ অভিযান শেষে রাসুলুল্লাহ
(সা.) উমরাহ পালন করেন। ২৪ শে যুলক্বাদাহ তে রাসুলুল্লাহ (সা.) মদীনায় ফিরে আসেন।
৯ম হিজরীর মুহাররম মাস থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন গোত্রের মুসলিমগণের নিকট
থেকে সদকা ও যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে কর্মচারী প্রেরণ করেন।
মুহাররম মাসে ৬০ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে উয়ায়না বিন হিসন ফাযারীর অভিযান পরিচালিত
হয়।
সফর মাসে ১০টি উট ও বিশ জন সৈন্য নিয়ে কুত্ববাহ বিন আমিরের অভিযান পরিচালিত
হয়।
রবিউল আওয়াল মাসে যাহহাক বিন সুফইয়ান কিলাবীর অভিযান পরিচালিত হয়।
রবিউল আওয়াল মাসে তিনশ জন সৈন্য নিয়ে আলক্বামাহ বিন মুজাযযির মুদলিজীর অভিযান
পরিচালিত হয়।
রবিউল আওয়াল মাসে আলী বিন আবূ ত্বালিব দেড়শ জন সৈন্য, একশ উট এবং পঞ্চাশটি ঘোড়া
সহযোগে অভিযান চালিয়ে ত্বাই গোত্রের ফুলস নামক একটি মূর্তি ভেঙে ফেলেন।
৯ম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ নিজ বিবিগণের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে এক মাস ইলা করেন।
রজব মাসে সম্রাট আসাহামা নাজাশীর মৃত্যুতে রাসুলুল্লাহ গায়েবানা জানাযা পড়েন।
রজব মাসের বৃহস্পতিবারে ত্রিশ হাজার সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবূক পথে
রওয়ানা করেন। এ অভিযানের সময় মদিনার গভর্ণর ছিলেন মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ আনসারী অথবা
সেবা বিন আরফাত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন আলী ইবনু আবী
ত্বালিব। এ অভিযানে প্রতি আঠার জনের জন্য বাহন ছিলো একটি উট। প্রায়ই গাছের পাতা খেতে
হতো। এ বাহিনীকে জায়শে উসরাত (অভাব অনটনের বাহিনী) নামও রাখা হয়েছিলো।
খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে চারশ বিশ জন সৈন্য অভিযান চালিয়ে দূমাতুল জান্দালের
শাসক উকায়দরকে গ্রেফতার করে। দু হাজার উট, আটশ দাস, চারশ লৌহ বর্ম এবং চারশ বর্শা দেওয়ার
শর্তে তাকে ক্ষমা করা হয়।
বিশ দিন তাবূকে এবং ত্রিশ দিন পথে ব্যায়ের পর রমযান মাসে রাসুলুল্লাহ মদিনায়
ফিরে আসেন। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ যুদ্ধাভিযান যাতে স্বশরীরে অংশ গ্রহণ
করেছিলেন। যুদ্ধে অংশ না নেওয়ায় কাব বিন মালিক, মুরারাহ বিন রাবী এবং হেলাল বিন উমাইয়া
কে তওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত ৫০ দিন বয়কট করা হয়।
তাবূক হতে প্রত্যাবর্তনের পর মুনাফিক্ব নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই মৃত্যুবরণ
করে।
৯ম হিজরিতে আবূ বাকর সিদ্দীক (রা.) এর নেতৃত্বে মুসলিমগণ হজ্জ সম্পাদন করেন।
আগামীতে আর কখনও মুশরিকরা খানায়ে কাবার হজ্জ করতে পারবে না বলে ঘোষণা করা হয়। এ সময়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে আলী বিন আবূ ত্বালিব মুশরিকদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিনামা
সমতার ভিত্তিতে শেষ করার ঘোষণা দেন এবং চার মাসের মধ্যে এ সকল বিষয় চুড়ান্ত করার কথা
বলেন।
৯ম হিজরীকে বলা হয় প্রতিনিধিদলের বৎসর। সত্তরের অধিক প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে।
আব্দুল কাইসের প্রতিনিধিদল প্রথমবার ৫ম হিজরী বা তারও পূর্বে মদিনায় আসে। ২য়
বার চল্লিশ জন লোক নিয়ে ৯ম হিজরীতে আসে।
৭ম হিজরীর প্রথমভাগে ৭০ কিংবা ৮০ টি পরিবার নিয়ে দাউস গেত্রের প্রতিনিধিদল মদিনায়
আসে।
রোমক সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী আরব অঞ্চলসমূহের গভর্ণর ফারওয়াহ বিন আমর জুযামী
৮ম হিজরীর পর মুসলিম হয়ে সেই সংবাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট পত্র পাঠান। মুসলিম
হওয়ায় রুমীগণ তাকে সূলীকাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে হত্যা করে।
৮ম হিজরীতে সুদা প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে।
কাব বিন যুহাইর বিন আবী সালামা মদিনায় আগমন করে।
৯ম হিজরীতে ১২ জন সদস্য নিয়ে উযরাহ প্রতিনিধিদল মদিনায় আগমন করে।
রবিউল আওয়াল মাসে বালী প্রতিনিধিদল মদিনায় আগমন করে।
রমাযান মাসে সাক্বীক প্রতিনিধিদল মদিনায় আগমন করে। দলনেতা মুসলিম হয়ে যাওয়ায়
সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে হত্যা করে। পরবর্তীতে তারাও মুসলিম হয়ে যায়।
ইয়ামান সম্রাট মুসলিম হয়ে মদিনায় প্রতিনিধি পাঠায়।
কিছু তথ্য জানতে চেয়ে হামদান প্রতিনিধি দল মদিনায় আসে। পরবর্তীতে তারা মুসলিম
হয়ে যায়।
১০ জনের অধিক সদস্যের বনু ফাযারাহর প্রতিনিধি দল মদিনায় আসে।
নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধি দল মদিনায় আসলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুবাহালার জন্য
দাওয়াত দেন। তারা ভীত হয়ে দু হাজার জোড়া কাপড় ও প্রতি জোড়া কাপড়ের সঙ্গে এক উকিয়া
রৌপ্য প্রদানের শর্তে সন্ধিচুক্তি করে।
মুসাইলামাহ কাযযাবসহ ১৭ সদস্যের বনু হানীফার প্রতিনিধি দল মদিনায় আসে। মুহাম্মাদ
(সা.) এর পর সে নেতৃত্ব লাভের প্রস্তাব করলে রাসুলুল্লাহ তা প্রত্যাক্ষান করেন। ১০
হিজরীতে সে নবী দাবী করে। দ্বাদশ হিজরীতে তাকে হত্যা করা হয়।
ইয়ামানের আসওয়াদ আনসীও নবী দাবী করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের ২৪ ঘন্টা
পূর্বে সে নিহত হয়। ওহীর মাধ্যমে জ্ঞাত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীগণকে তা অবহিত
করেন।
বনু আমির বিন সাসাআহর প্রতিনিধি দল রাসুলুল্লাহ (সা.) কে হত্যার চেষ্টা করে
ব্যার্থ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বদ দুআতে তারা প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই ধ্বংস হয়ে
যায়।
১৩ জন লোকের তুজাইব প্রতিনিধি দল মদিনায় আসে।
ত্বাই প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে মুসলিম হয়ে যায়।
এমনি ভাবে ৯ম ও ১০ম হিজরীতে বিভিন্ন প্রতিনিধিদল মদীনায় আগমন করতে থাকেন। চরিতকারগণ
ইয়ামান, আযদ, কুযা’আহর বনু সা‘দ, হুযাইম, বুন ‘আমির বিন ক্বায়স, বনু আসাদ, বাহরা, খাওলান,
মুহারিব, বনু হারিস বিন কা‘ব, গামিদ, বনু মুনতাফিক্ব ও সালামান, বনু আবস, মুযাইনা,
মুরাদ, যুবাইদ, কিন্দাহ, যূ মুররাহ, গাসসান, বুন ‘ঈশ এবং নাখ’ এর প্রতিনিধি দল সম্পর্কে
আলোচনা করেছেন।
রাসুলুল্লাহ এমনিভাবে একের পর এক যুদ্ধ পরিচালনায় বিশ বছরের অধিক সময় অতিবাহিত
করেন।
১০ম হিজরীর যুল ক্বাদাহ মাসের ৪ দিন অবশিষ্ট থাকতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজ্জের
উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। ৮ রাত পর ৪ঠা যুল হিজ্জাহ
রবিবার সকালে মক্কায় প্রবেশ করেন। ৮ তারিখে তারবিয়ার দিন মিনায় গমন করেন এবং তথায়
৯ তারিখ সকাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। সেখানে যোহর আসর মাগরিব এশা এবং ফজর এ পাঁচ ওয়াক্তের
সালাত আদায় করেন। অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। অতঃপর আরাফার দিকে রওনা
হয়ে গেলেন। সূর্য যখন পশ্চিম দিকে ঢলে গেল তিনি বাত্বনে ওয়াদীতে গমন করলেন। তার সঙ্গে
থাকা এক লক্ষ ৪০ কিংবা ৪৪ হাজার সাহাবীর উদ্দেশ্যে ভাষণের পর রাসূলুল্লাহ যোহর ও আসরের
সালাতে ইমামত করলেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে অতঃপর মুজদালেফায় গিয়ে
মাগরিব এবং এশার সালাত এক বৈঠকে দুই একামতে আদায় করলেন। এরপর মাশআরে হারামে আগমন করে
কেবলামুখী হয়ে দোয়া, তাকবীর, তাহলীল, তাওহীদের বাণী সমূহ উচ্চারণ করতে থাকলেন। অন্ধকার
দূরীভূত হয়ে ফর্সা হওয়ার পর সূর্যোদয়ের পূর্বেই মিনা অভিমুখে রওনা হয়ে গেলেন। জামরায়ে
কুবরায় সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ
করেছিলেন। অতঃপর কোরবানি স্থানে গিয়ে নিজ হাতে ৬৩টি উট যবেহ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ
এর নির্দেশক্রমে আলী ৩৭ টি উট যবেহ করেন। ১১, ১২, ১৩ তারিখ মিনায় অবস্থান করেন।
১১ হিজরীর সফর মাসে উসামা বিন যায়দ বিন হারিসাহ এর নেতৃত্বে রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত
বালক্বা ও দারুমের ফিলিস্তিনী আবাসভূমির উদ্দেশ্যে এক বিশাল সেনা বাহিনী প্রেরণ করা
হয়। এটিই রাসূলুল্লাহ এর প্রেরিত সর্বশেষ বাহিনী।
সাধারণভাবে রমজান মাসে রাসুলুল্লাহ শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু দশম হিজরীতে
তিনি ইতিকাফ করেন ২০ দিন। সাধারণত রমজান মাসে জিবরীল রাসুলুল্লাহ কে একবার কুরআন পুনর্পাঠ
করাতেন। কিন্তু দশম হিজরীতে দুইবার পুনর্পাঠ করান।
মুহাম্মাদ ﷺ ২
আক্বাবার দ্বিতীয় অঙ্গীকারের আড়াইমাস পর চতুর্দশ নবুওয়াত বর্ষের সফর মাসে মক্কার সংসদ ভবন দারুন নদওয়াতে কুরাইশ মুশরিকগণ মোহাম্মদ (সা.) কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের দুরভিসন্ধিকে চরমভাবে ব্যর্থ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) আবূ বকর (রা.) কে সাথে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। প্রথম হিজরী রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ জুমাআর দিন মোহাম্মদ (সা.) বনী নাজ্জার গোত্রের আবূ আইউব আনসারী (রা.) বাড়িতে অবতরণ করেন। ন্যায্য মূল্যে জমি ক্রয় করে তাতে মসজিদে নববী ও এর পাশে উম্মাহাতুল মুমিনীন নবী পত্নীগণ (রা.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আবাস কক্ষ নির্মাণ করা হয়। মুহাজির ও আনসার গণের মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করা হয়। অতঃপর নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ থেকে কুরায়শ ও ইয়াসরিবের মু’মিন ও মুসলমানদের মধ্যে এবং যারা তাদের অধীনে, তাদের সাথে শামিল হবে বা তাদের সাথে জিহাদে মিলেমিশে কাজ করবে তাদের জন্য এবং সেইসাথে ইহুদিদের জন্য মদিনার সনদ তৈরি করা হয়। হিজরতের পরও মক্কার কুরাইশরা যেমন মদীনায় মুসলিমদের ধ্বংস করার চেষ্টা করছিল, তেমনি মদিনার অমুসলিমদের কিছু অংশ মুসলিমদের ধ্বংস করতে চাচ্ছিল। মদিনায় মোহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে শত্রুতায় অন্যতম ব্যক্তি আনসারদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই বিন সলূল। এ অবস্থায় মোহাম্মদ (স.) কিছু গোত্রের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন এবং যুদ্ধ না করার চুক্তি সম্পাদন করেন। সেই সাথে মুসলিমদের সামরিক তৎপরতা কাজ শুরু হয়ে যায়। এরপর বিরতি দিয়ে দিয়ে পরিচালিত হতে থাকে বিভিন্ন সারিয়্যাহ ও গাযওয়াহসমূহ।
হিজরী প্রথম বর্ষ রমজান মাসে হামযাহ বিন আবুল মুত্তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৩০
জন মুহাজির সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় প্রথম সারিয়্যা; সারিয়্যাতু সীফিল বাহর বা সমুদ্রোপকূলের
প্রেরিত বাহিনী।
শাওয়াল মাসে উবাইদাহ ইবনু হারিস ইবনু মুত্তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৬০ জন মুহাজির
সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় সারিয়্যাতু রাগিব।
যুলক্বাদাহ মাসে সাদ ইবনু আবী আক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে ২০ জন যোদ্ধা নিয়ে
পরিচালিত হয় সারিয়্যায়ে খার্রার।
হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের সফর মাসে ৭০ জন মুহাজির যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে রাসুলুল্লাহ
(সা.) গাযওয়ায়ে আবওয়া অথবা অদ্দান পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন হামযাহ
(রা.) এবং মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন সাদ ইবনু উবাদাহ (রা.)। এটি স্বয়ং মোহাম্মদ
(সা.) এর দ্বারা পরিচালিত প্রথম অভিযান।
রবিউল আউয়াল মাসে ২০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে বুওয়াত্ব
পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন সাদ ইবনু আবী অক্কাস (রা.) এবং মদিনার তত্ত্বাবধায়ক
ছিলেন সাদ ইবনু মুআয (রা.)।
রবিউল আউয়াল মাসে ৭০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে সাফওয়ান বা
গাযওয়ায়ে বদরে উলা বা বদরের প্রথম যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন
আলী (রা.) এবং মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন যায়দ ইবনু হারিসাহ (রা.)।
জামাদিউল উলা ও জামাদিউল উখরা মাসে ১৫০-২০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)
গাযওয়ায়ে যুল পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন হামযাহ (রা.) এবং মদিনার তত্ত্বাবধায়ক
ছিলেন আবূ সালামাহ ইবনু আব্দুল আসাদ মাখযূমী (রা.)।
রজব মাসে আব্দুল্লাহ ইবনু জাহশ (রা.)-এর নেতৃত্বে ১২ জন মুহাজির সৈন্য নিয়ে
পরিচালিত হয় নাখলাহ অভিযান।
দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে আল্লাহ তাআলা বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা
গৃহকে কিবলা বলে ঘোষণা করলেন। রমজান মাসেই রমজানের রোজা ও সদকায়ে ফিতর ফরজ করা হয়
এবং যাকাতের নিসাব নির্দিষ্ট করা হয়। ১৮ই রমজান শুক্রবার সংঘটিত হয় বদর যুদ্ধ। এ
যুদ্ধে মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। যাদের মধ্যে ৮২ জন মুহাজির, ৬১ জন আউস গোত্রের
ও ১৭০ জন খাযরাজ গোত্রের। সাথে দুইটি ঘোড়া ও ৭০ টি উট । অপরদিকে মক্কা বাহিনীর সৈন্য
সংখ্যা তেরশত। সাথে একশত ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম এবং অগণিত উট। তাদের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক
ছিল এ উম্মতের ফিরাউন আবূ জাহল ইবনু হিশাম। এ যুদ্ধে ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন; যাদের মধ্যে
৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার। অপরদিকে মুশরিকদের মধ্যে ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়।
বদর যুদ্ধের মাত্র ৭ দিন পর শাওয়াল মাসে ২০০ জন উষ্ট্রারোহীকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)
গাযওয়ায়ে বনী সুলাইম পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময়ে সিবা ইবনু উরফুত্বাহ (রা.) মতান্তরে
ইবনু উম্মু মাকতুম (রা.) কে মদিনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।
বদর যুদ্ধের পর ওহাব ইবনু উমায়ের জুমহী তার সন্তানকে মুক্ত করার অজুহাতে মদিনায়
গিয়ে মোহাম্মদ (স.) কে হত্যার সংকল্প করে। কিন্তু মদিনায় গিয়ে মোহাম্মদ (সা.) এর
মোজেজা দেখে মুসলমান হয়ে যায়।
ইয়াহুদীরা মুসলিমদের প্রতি শত্রুতা ও হিংসা পোষণ করতো। বদর যুদ্ধে মুসলিমদের
জয়ী হওয়ার ফলে তারা প্রকাশ্যভাবে শত্রুতার ভাব প্রদর্শন করতে লাগলো, বিদ্রোহ ঘোষণা
করলো ও দুঃখ কষ্ট দেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। সর্বাধিক হিংসুটে বনু ক্বাইনুক্বা গোত্রের
কিছু লোক একজন মহিলাকে অপমানিত ও একজন মুসলিমকে হত্যা করে ফেলে। তাদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ
আচরণের প্রেক্ষিতে ১৫ দিন অবরোধ করে রাখার পর যুলকাদ মাসের ১ তারিখে তাদেরকে মদিনা
থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারা সিরিয়ায় চলে যায়।
বদর যুদ্ধের মাত্র দু'মাস পর যুলহিজ্জাহ মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে সাভীক
(ছাতু) পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময় মদিনায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন আবূ লুবাবাহ
ইবনু আব্দুল মুনযির।
হিজরী তৃতীয় বর্ষের মুহররম মাসে ৪০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে
যূ আমর পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময় মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন উসমান ইবনু আফফান।
রবিউল আউয়াল মাসের ১৪ তারিখে মুহাম্মদ ইবনু মাসলামাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে কিছু
সাহাবি ইহুদী কবি কাব ইবনু আশরাফকে হত্যা করে।
রাবিউল আউয়াল মাসে ৩০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে বুহরান পরিচালনা
করেন।
জুমাদিউল আখের মাসে যায়দ ইবনু হারিসার নেতৃত্বে ১০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে পরিচালিত
হয় সারিয়্যাতু যায়দ ইবনু হারিস।
শাওয়াল মাসের ৭ তারিখ শনিবার সংঘটিত হয় উহুদ যুদ্ধ। মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা
ছিল ৭০০। যাদের মধ্যে ১০০ জন ছিলেন বর্ম পরিহিত ও ৫০ জন ছিলেন ঘোরসওয়ার। অপরদিকে কুরাইশ,
তাদের মিত্র এবং দুর্বৃত্ত শ্রেনী মিলে সৈন্য সংখ্যা ৩০০০; যার সঙ্গে ১৫ জন মহিলা।
তাদের সাথে ছিলো ৭০০ টি লৌহবর্ম, ২০০টি ঘোড়া ও ৩০০০ টি উট। যুদ্ধে মুসলিম শহীদদের সংখ্যা
ছিল ৭০ জন। যাদের মধ্যে ৪১ জন খাযরাজ, ২৪ জন আউস গোত্রের, ৪ জন মুহাজির ও ১ জন ইহুদী।
অপরদিকে কুরাইশদের নিহতের সংখ্যা ২২ মতান্তরে ৩৭ জন।
হিজরী চতুর্থ বর্ষের মুহাররম মাসে ১৫০ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় আবূ সালামাহ
(রা.)-এর অভিযান। উহুদ যুদ্ধের পর এটি সর্বপ্রথম অভিযান। মুহাররম মাসে পরিচালিত হয়
আব্দুল্লাহ বিন উনাইস (রা.)-এর অভিযান।
সফর মাসে রাযীর ঘটনায় আসিম বিন সাবিত ও খুবাইব (রা.) সহ ১০ জন সাহাবী শহীদ হন।
সফর মাসেই বিরে মাউনাহর ঘটনায় ৭০ জন বিজ্ঞ, ক্বারী এবং শীর্ষ স্থানীয় সাহাবী শহীদ
হয়। রাযী এবং মাউনাহর এর বেদনাদায়ক ঘটনাবলীর কারনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বাসঘাতক
গোত্র ও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একমাস যাবত আল্লাহর সমীপে বদ দোয়া করতে থাকেন।
বিরে মাউনাহর ঘটনার পরপরই রবিউল আওয়াল মাসে মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র
করার অপরাধে ইহুদি গোত্র বনু নাযীরকে অবরোধ ও বহিষ্কার করা হয়। এ অভিযানের পতাকাবাহী
ছিলেন আলী বিন আবূ ত্বালিব এবং মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন উম্মু মাকতূম।
বনু নাযীরের ইয়াহুদীরা ৬০০ উট বোঝাই মালামাল নিয়ে খাইবার ও সিরিয়ার দিকে চলে যায়।
এ অভিযান থেকে মুসলিমরা ৫০টি লৌহবর্ম, ৫০টি হেলমেট এবং ৩৪০ টি তরবারী লাভ করে।
রবিউল আখের বা জুমাদাল উলা মাসে নাজদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
শাবান মাসে ১০টি ঘোড়া সহ ১৫০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে
বদরে সানিয়াহ (দ্বিতীয় বদর যুদ্ধ) পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন আলী
(রা.) এবং মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রা.)। অপরদিকে আবু
সুফিয়ানের নেতৃত্বে ছিল ৫০ জন ঘোড়সওয়ারসহ ২০০০ জন মুশরিক সৈন্য। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে
না এসেই মাজান্নাহ থেকে মুশরিকরা মক্কায় ফিরে যায়। এ যুদ্ধ গাযওয়ায়ে বদরে মাওঊদ
(ওয়াদাকৃত বদর যুদ্ধ), বদরে আখির (শেষ বদর যুদ্ধ) এবং বদরে সুগরা (ছোট বদর যুদ্ধ)
নামে পরিচিত।
হিজরী ৫ম বর্ষের রবিউল আওয়াল মাসে ১০০০ জন সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) গাযওয়ায়ে
দূমাতুল জানদাল পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময় মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন সেবা বিন
উরফুতাহ গিফারী (রা.)।
শাওয়াল মাসে গাযওয়ায়ে আহযাব (খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ) সংঘটিত হয়। আবূ সুফিয়ানের
নেতৃত্বে চার হাজার কুরাইশ বাহিনী সহ মদিনার আশপাশে দশ হাজার সৈন্যের এক দুর্ধর্ষ বাহিনী
মদিনা অবরোধ করে। একমাস যাবৎ মদিনা অবরোধ করে রেখে জুলকাদা মাসে খালি হাতে ফিরে যায়।
এ যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্য হতে ৬ জন শহীদ হন এবং মুশরিকদের মধ্য হতে ১০ জন নিহত হয়।
খন্দকের যুদ্ধ চলাকালীন মুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে মুশরিকদের সহযোগিতার
অপরাধে যুলকাদাহ বনু কুরাইযাহ গোত্রকে ৩০ টি ঘোড়া সহ তিন হাজার সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ
(সা.) দুর্গের মধ্যে অবরোধ করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন আলী (রা.) এবং মদিনায়
তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ইবনু উম্মু মাকতূম। ২৫ দিন পর বনু কুরাইযা বিনা যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ
(স.) এর নিকট আত্মসমর্পণ করে। বিচারক সাদ বিন মুয়ায যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিস্বরূপ বনু
কুরাইযাহের পুরুষদের হত্যা, নারী ও শিশুদের বন্দি করা এবং তাদের সম্পদসমূহ বন্টন করে
দেয়ার রায় দেন। মুসলিমরা দেড় হাজার তরবারী, দু হাজার বর্শা, তিন শত লৌহবর্ম, পাঁচ
শত প্রতিরক্ষা ঢাল লাভ করে। এ যুদ্ধে একজন মুসলিম শহীদ হন এবং বনু কুরাইযার ছয় থেকে
সাত শত সাবালক পুরুষ ও এক মহিলাকে হত্যা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু কুরাইযাহের
মহিলাদের মধ্য হতে রায়হানাহ বিনতে আমর বিন খুনাফাহকে নিজের জন্য মনোনীত করেন। অভিযানের
কিছুদিন পর খন্দক যুদ্ধে আহত সাদ বিন মুয়ায (রা.) মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুতে আল্লাহ
তাআলার আরশ কেঁপে উঠেছিল।
যুলক্বাদাহ অথবা যুল হবজ্জাহ মাসে আব্দুল্লাহ বিন আতীক (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫
সদস্য বিশিষ্ট একটি দল মুসলিমদের বিরুদ্ধাচরণে এবং মুশরিকদের সহযোগিতায় অগ্রগামী সাল্লাম
বিন আবিল হুক্বাইক্ব (আবূ রাফি) কে হত্যা করেন।
হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষের মুহাররম মাসে ৩০ জন সৈন্য নিয়ে পরিচালিত হয় মুহাম্মদ বিন
মাসলামাহ'র অভিযান।
রবিউল আউয়াল অথবা জুমাদালউলা মাসে ২০০ সাহাবী নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু
লাহইয়ানের যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময় মদিনার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ইবনু উম্মু
মাকতুম (রা.)।
আখের মাসে উক্কাশাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে ৪০ জন সাহাবী নিয়ে গামরের অভিযান পরিচালনা
করে ২০০ উট নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন।
রবিউল আউয়াল কিংবা রবিউল আখের মাসে ১০ সদস্য বিশিষ্ট সৈন্যদল ১০০ সৈন্য বিশিষ্ট
শত্রুদলের বিরুদ্ধে যুল ক্বাসসাহর প্রথম অভিযানে যান। ঘুমের মধ্যে অতর্কিত আক্রমণে
গুরুতর আহত মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ (রা.) ব্যতীত সকলেই মারা যান।
রবিউল আখের মাসে আবূ উবায়দাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে ৪০ জন সৈন্য নিয়ে যুল ক্বাসসাহর
দ্বিতীয় অভিযান পরিচালিত হয়।
রবিউল আখের মাসেই যায়দ বিন হারিসাহর নেতৃত্বে জামূম অভিযান পরিচালিত হয়।
জুমাদাল উলা মাসে যায়দ বিন হারিসাহর নেতৃত্বে একশত সত্তর জন ঘোড়সওয়ার সৈন্য
নিয়ে ঈস অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানের পর নবী তনয়া যায়নাবের স্বামী আবুল আস মুসলিস
হয়ে যান।
জুমাদাল আখের মাসে যায়দ বিন হারিসাহর নেতৃত্বে ১২ জন সাহাবী ত্বারিফ বা ত্বারিক্ব
অভিযান পরিচালনা করেন।
রজব মাসে যায়দ বিন হারিসাহর নেতৃত্বে ১২ জন সাহাবী ওয়াদিল কুরা অভিযানে যান।
অতর্কিত আক্রমণে নয় জন সাহাবী শহীদ হন।
রজব মাসেই আবূ উবায়দাহ বিন জাররাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে তিনশত ঘোড়সওয়ার খাবাত্বে
অভিযান করেন। এ অভিযানে খাবারের অভাবে সাহাবীরা গাছের পাতা ভক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তীতে
সমুদ্রের আম্বার নামক এক জাতীয় বিশাল আকার মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
হিজরী ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ বর্ষের শাবান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু মুসত্বালাক্ব বা
গাযওয়ায়ে মুরাইসী পরিচালনা করেন। এ অভিযানের পতাকাবাহী ছিলেন আবূ বাকর (রা.) এবং আনসারদের
বিশেষ পতাকাবাহী ছিলেন সাদ বিন উবায়দাহ। এ অভিযানের সময় মদিনার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত
হন যায়দ বিন হারিসাহ। যুদ্ধে মুসত্বালাক্ব গোত্রের নেতা হারিস বিন আবী যিরারের কন্যা
জুওয়াইরিয়াহ বন্দি হন। মোহাম্মদ (সা.) তাঁকে মুক্ত করে বিবাহ করেন।
এ অভিযানের সময়ে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই মোহাম্মদ (সা.) এর বিরুদ্ধে
ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলে এবং আয়েশা (রা.)-এর প্রতি অপবাদ আরোপ করা হয়।
শাবান মাসেই আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা.)-এর নেতৃত্বে দিয়ার বনু কালব অভিযান
দূমাতুল জানদাল ক্ষেত্রে পরিচালিত হয়।
শাবান মাসেই আলী (রা.)-এর নেতৃত্বে ফাদাক অঞ্চলে দুইশত জন সৈন্য নিয়ে দিয়ারে
বনু সাদ অভিযান পরিচালিক হয়। এ অভিযানে পাঁচ শত উট ও দুই হাজার ছাগল হস্তগত হয়।
রমজান মাসে আবূ বকর সিদ্দীক (রা.)-এর নেতৃত্বে ওয়াদিল কুরা অভিযান পরিচালিত
হয়।
মুসলিম রাখালদের হত্যা ও ডাকাতির কারনে শাওয়াল মাসে কুরয বিন জাবির ফিহরী (রা.)-এর
নেতৃত্বে ২০ জন সৈন্য নিয়ে উরানিয়্যীন অভিযান পরিচালিত হয়।
১লা যুল ক্বাদাহ তে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামাহ (রা.) ও
চৌদ্দশত বা পনেরশত সাহাবী নিয়ে উমরাহ করার জন্য ক্বাসওয়া নামক উটের পিঠে চড়ে মক্কার
উদ্দেশ্যে রওনা হন। সফররত অবস্থায় অস্ত্র গ্রহণের নিয়মে কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া পৃথক
কোন খোলা অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নেননি। এ সময় মদিনার তত্ত্বাবধানে ছিলো ইবনু উম্মু মাকতূম
অথবা নুমাইলাহ লাইসী। ওমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কার নিকটবর্তী হলেও মুসলিমদের ওমরা না
করেই ফিরে আসতে হয়। তবে প্রথমবারের মতো মুশরিক কুরাইশদের সঙ্গে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত
হয় যা হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি একটি অপমানজনক চুক্তি
হলেও প্রকৃত বিচারে এটি ছিল একটি সুস্পষ্ট বিজয়। মুশরিকরা প্রথমবার মত মুসলিমদেরকে
সন্ধি করার মত একটি শক্তি হিসেবে স্বীকার করে নেয়। যে ক্ষেত্রে মুসলিমগণের সৈন্যসংখ্যা
কখনোই তিন হাজারের অধিক হয়নি সে ক্ষেত্রে সন্ধির পর মাত্র দু বছরের ব্যবধানে দশ হাজারে
পৌঁছে যায়।
আবূ বাসীর, আবূ জান্দাল বিন সুহাইল ও আরো কিছু মুসলমানের চেষ্টায় মক্কা থেকে
মদিনায় পলায়ন করে আসা মুসলিমদের মক্কায় ফেরত পাঠানোর শর্ত বাতিল হয়। সপ্তম হিজরী
সালের প্রথম ভাগে মক্কার কলিজার টুকরো আমর বিন আস, খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং উসমান বিন
তালহাহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মদিনায় চলে আসেন।
ষষ্ঠ হিজরীর শেষ দিকে হুদায়বিয়া হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)
পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের বাদশা ও সমাজপতিদের কে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাদের
নিকট পত্র প্রেরণ করেন।
ষষ্ঠ হিজরীর শেষ কিংবা সপ্তম হিজরীর প্রথমভাগে আমর বিন উমাইয়া যামরীর মাধ্যমে
হাবশের সম্রাট নাজাশী অসহামা বিন আবযার নিকট পত্র প্রেরণ করেন। নাজাশী জাফর বিন আবী
ত্বালিবের নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন।
হাতিব বিন আবী বালতাহ এর মাধ্যমে মিশর ও ইসকান্দারিয়ার সম্রাট মুক্বাওক্বিস
জুরাইজ বিন মাত্তার নিকট পত্র প্রেরণ করেন। মুসলিম না হলেও তিনি মোহাম্মদ (সা.)-কে
উপহার স্বরূপ ২জন কিবতী দাসী, একটি খচ্চর ও কিছু পরিধানের পরিচ্ছদ উপহার দেন। দাসী
মারিয়াকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহ করেন।
আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ সাহমীর মাধ্যমে পারস্য সম্রাট কিসরা খসরু পারভেজের নিকট
পত্র প্রেরণ করেন। পত্রটি বাহরাইনের প্রধানের নিকট সমর্পিত হয়েছিল। কিসরা পত্রটি ছিড়ে
ফেলে ও রসুলুল্লাহ (সা.) কে তার দরবারে হাজির করার জন্য ইয়ামানের গভর্নর বাজানকে নির্দেশ
দেয়। ক্বায়সারের সৈন্য দলের হাতে পারস্য সৈন্যদের পর পর পরাজয়ের পর ৭ম হিজরীর ১০ জুমাদাল
উলা মঙ্গলবার রাতে খসরুর ছেলে শিরওয়াইহ পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহন করে ও রাসুলুল্লাহ
(সা.) কে গ্রেফতারের নির্দেশনা বাতিল করে। বাজান ও তার পারসীয়ান বন্ধুগণ মুসলিম হয়ে
যায়।
দাহয়াহ বিন খলীফা কালবীর মাধ্যমে রোমের সম্রাট ক্বায়সার হিরাক্বল (হিরাক্লিয়াস)
এর নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। ক্বায়সার কালবীকে অর্থ সম্পদ ও মূল্যবান পোশাক দ্বারা
পুরস্কৃত করেছিলেন। মদিনায় প্রত্যাবর্তনের সময় হাসমা নামক স্থানে জুযাম গোত্রের কিছু
লোক কালবীর কাছ থেকে সব কিছু লুট করে। এর প্রেক্ষিতে ৭ম হিজরীর জুমাদাস সানীয়াহ মাসে
যায়দ বিন হারিসাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে পাঁচশত সাহাবা নিয়ে হিসামা অভিযান পরিচালিত হয়।
আলী ইবনুল হাযরামী (রা.) এর মাধ্যমে বাহরাইনের গভর্ণর মুনযির বিন সাভীরের নিকট
পত্র প্রেরণ করা হয়। মুনযির রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশনা মেনে নিতে সম্মত হয়।
সালীত্ব বিন আমর আমেরীর মাধ্যমে ইয়ামামার গভর্ণর হাওযাহ বিন আলীর নিকট পত্র
প্রেরণ করা হয়। তিনি সালীত্বকে অনেক উপঢৌকন ও হিজরের তৈরি কাপড় চোপড় প্রদান করেন এবং
রাসূল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য মেনে নিতে রাজি হয়।
শুজা বিন অহাব (রা.) এর মাধ্যমে দামিশক্বের গভর্ণর হারিস বিন আবী শামির গাসসানীর
নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। হারিস শুজা বিন আহবকে উর্দী কাপড় ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে উত্তমপন্থায়
বিদায় করেন। কিন্তু বাদশাহ ক্বায়সারের কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ
পরিচালনার অনুমতি নেয়।
আমর বিন আসের মাধ্যমে আম্মানের সম্রাট জাইফার এবং তাঁর ভাই আবদের নিকট পত্র
প্রেরিত হয়। তারা উভয়েই মুসলিম হয়ে যায়।