মুসাফির

শরীয়তে মুসাফির ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে ৪৮ মাইল তথা (প্রায় ৭৮ কিলোমিটার) বা তার বেশি দূরত্বে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজ এলাকা ত্যাগ করে।
আর যে নিজ এলাকায় অবস্থান করছে বা ৭৮ কিলোমিটারের কম দূরত্বে সফর করেছে সে মুকীম। তেমনিভবে ৭৮ কিলোমিটার কিংবা তারচেয়ে বেশি দূরত্বে সফর করলে পথিমধ্যে মুসাফির হলেও কোনো এক গ্রাম বা এক শহরে ১৫ দিন বা তার চেয়ে বেশি সময় অবস্থানের নিয়ত করলে ঐ স্থানে সে মুকীম হবে।
alkawsar.com/bn/qa/answers/detail/2165
সফরসম দূরত্বের উদ্দেশে নিজ এলাকার বসতি ত্যাগ করলে অর্থাৎ গ্রামের অধিবাসী নিজ গ্রাম ছাড়লে, শহরের অধিবাসী শহর ত্যাগ করলে এবং সিটি শহরে বসবাসকারী সিটি শহর থেকে বের হওয়ার পর থেকে মুসাফির গণ্য হবে।
মুকীম হওয়ার জন্য একটি এলাকা অর্থাৎ একটি গ্রাম বা একটি শহরে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত করতে হবে। এক ইউনিয়নের একাধিক গ্রামে ১৫ দিনের নিয়ত করলে মুকীম হবে না।
alkawsar.com/bn/qa/answers/detail/1135

বিপদ যখন নিয়ামত ২

দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার
একজন বন্দির মাথায় সব সময় কয়েকটি শব্দ ঘুরপাক খায়-মুক্তি, রায়, বিচারক, অপবাদ, প্রমাণ, নির্দোষ, শাস্তি, মেয়াদ ইত্যাদি।
ওঠাবসায়, শয়নে-স্বপনে, পানাহার ও সালাতের মধ্যেও এই শব্দগুলো নিয়ে সে চিন্তা করতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো পত্রিকা যদি সে হাতে নেয়, তা হলে মুক্তি ও বন্দি-বিষয়ক সংবাদের প্রতি তার গুরুত্ব থাকে অনেক বেশি। যে বিষয়গুলো তার মুক্তির রায় ও শাস্তি থেকে বাঁচার সাথে সম্পর্কিত ওই সংবাদগুলোর ব্যাপারে তার আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা বা অস্ত্রের মূল্য-সংক্রান্ত সংবাদ সম্পর্কে তার কোনো বাড়তি আগ্রহ থাকে না। এসব অনর্থক সংবাদ মনে হয় তার কাছে।
আমাদের অবস্থাও এমন। আমরা আমাদের স্বদেশ জান্নাত থেকে দুনিয়ায় বন্দি হয়ে এসেছি। আমাদের অপরাধ নিজেদের গুনাহ। ফলে আমরা শাস্তির উপযুক্ত। আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য আমাদের শক্তিশালী প্রমাণ হলো, আমরা তাওহীদে বিশ্বাসী। যদি এর মধ্যে ত্রুটি থাকে তা হলে শাস্তির মেয়াদের কোন সীমা থাকবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় খাঁটি তাওবার মাধ্যমে। আর যিনি মুক্তির রায় দেবেন তিনি নির্ভুল বিচারক মহান আল্লাহ তাআলা। সুতরাং আমরা নির্ভুল বিচারক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করব এবং এমন আমলের প্রতি আগ্রহী হবো, যা আমাদেরকে দুনিয়ার কারাগার থেকে মুক্ত করে সুবিশাল আখিরাতের দিকে নিয়ে যাবে। দুনিয়ার নগণ্য বস্তু ও এর আমোদ-প্রমোদে আমরা লিপ্ত হব না। তা হলে নিঃসন্দেহে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি এবং তাঁর প্রতিদান ও সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা আমাদের মাথায় চেপে বসবে। তা থেকে আমরা কখনও উদাসীন হব না।
[১৪৫-১৪৬]
.

মুমিনের কোনোকিছুই বৃথা যায় না
মানুষ একের-পর-এক মুসিবতে লিপ্ত হয়। ফলে তাদের মনে হয়, সবকিছু নষ্ট হয়ে গেল। সময়, সম্পদ, পরিশ্রম, মন-মেজাজ ও স্বাস্থ্য সবই নষ্ট হলো। কিন্তু একজন মুমিন মনে করে আল্লাহর কাছে কিছুই নষ্ট হয় না। সবকিছুই লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি সবর কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ইহসানকারীদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। -হূদ ১১:১১৫
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এ সবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। -বুখারী ৫৬৪২
সুতরাং হে বিপদগ্রস্ত ভাই ও বোনেরা, নিরাশ হবেন না। ধৈর্য ধরুন। কারণ ধন-সম্পদ, সময় ও স্বাস্থ্য সবকিছুর জন্য সর্বোত্তম ওষুধ ধৈর্য। এগুলো হাতছাড়া হলে চিন্তিত হবেন না। বরং যেদিন কোনো দিরহাম-দীনার থাকবে না; থাকবে কেবল ভালো ও মন্দ আমল, সেদিন এগুলো আপনার জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
[২:১৪৬]

বিপদ যখন নিয়ামত ১

সবর: ইসলামি পরিভাষায় আরবি শব্দ 'সবর' এর অর্থ হচ্ছে, 'হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকা, অভিযোগ করা থেকে জিহ্বাকে নিবৃত্ত রাখা এবং দুঃখ-দুর্দশার সময় মুখে আঘাত করা কিংবা শরীরের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা থেকে নিজের হাতকে সংযত রাখা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সবরের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোন নি‘আমত কাউকে দেয়া হয়নি। -বুখারী ১৪৬৯

কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। -আয-যুমার ৩৯:১০

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করতে হয়। -বুখারী ৬৬৬৯
.

ইহতিসাব: প্রত্যেক দুঃখ-দুর্দশার সময় আল্লাহর নিকট হতে সওয়াবের প্রত্যাশা করাকে ইহতিসাব বলে। যত বেশি কষ্ট-যাতনা হোক না কেন, আল্লাহর নিকট হতে এর বিনিময়ে ক্ষমা ও মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে ইহতিসাব।
মহান আল্লাহ্ বলেছেনঃ হে বনী আদম! যদি তুমি সওয়াবের আশায় প্রথম আঘাতেই ধৈর্য ধারণ করো তাহলে আমি তোমাকে সওয়াবের বিনিময় হিসাবে জান্নাত দান না করে সন্তুষ্ট হবো না। -ইবনে মাজাহ ১৫৯৭

আল্লাহ তাআলা বলেন, আর যারা ঈমান আনে তাদের জন্য আল্লাহ ফির’আউনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করেন, যখন সে বলেছিল, ‘হে আমার রব, আপনার কাছে আমার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফির’আউন ও তার কর্ম হতে নাজাত দিন, আর আমাকে নাজাত দিন যালিম সম্প্রদায় হতে।' -আত-তাহরীম ৬৬:১১
.

ইসতিরজা ইহতিসাব: বিপদের সম্মুখীন হয়েও আল্লাহর প্রভুত্বের ঘোষণা দেওয়া ও আল্লাহর নিকট নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়াকে ইস্তিরজা বলে। ইস্তিরজা হচ্ছে বিপদসংকুল অবস্থায় 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন' বলা; অর্থাৎ 'নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।'
আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। -আল-বাকারা ২:১৫৫
যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। -আল-বাকারা ২:১৫৬

উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি: কোন মুসলিমের ওপর মুসীবাত আসলে যদি সে বলেঃ আল্লাহ যা হুকুম করেছেন- "ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলায়হি র-জিউন” বলে এবং এ দু’আ পাঠ করে- “আল্ল-হুম্মা’ জুৱনী ফী মুসীবাতী ওয়া আখলিফ লী খয়রাম মিনহা- ইল্লা- আখলাফাল্ল-হু লাহ খয়রাম মিনহা-” [হে আল্লাহ! আমাকে আমার মুসীবাতে সাওয়াব দান কর এবং এর বিনিময়ে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান কর, তবে মহান আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান করে থাকেন।]।
উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এরপর যখন আবূ সালামাহ ইনতিকাল করেন, আমি মনে মনে ভাবলাম, কোন মুসলিম আবূ সালামাহ থেকে উত্তম? তিনি সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি হিজরত করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌছে গেছেন। এতদসত্ত্বেও আমি এ দু’আগুলো পাঠ করলাম। এরপর মহান আল্লাহ আবূ সালামার স্থলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মতো স্বামী দান করেছেন। উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার নিকট রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের পয়গাম পৌছাবার উদ্দেশে হাতিব ইবনু আবূ বালতা’আহ-কে পাঠালেন। আমি বললাম, আমার একটা কন্যা আছে আর আমার জিদ বেশী। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার কন্যা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করব যাতে তিনি তাকে তার কন্যার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন। আর (তার সম্পর্কে) দু’আ করব যেন আল্লাহ তার জিদ দূর করে দেন।
-মুসলিম ২০১১
.
শাকওয়াহ: শাকওয়াহ অর্থ অভিযোগ করা, নালিশ জানানো। শাকওয়াহ দুই ধরনের-

১. প্রথম ধরনের শাকওয়াহ হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুঃখ-কষ্ট পেশ করা। এটি সবরের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের শাকওয়াহ-র অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়।
ইয়াকূব আ. বলেছিলেন, আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। -ইউসুফ ১২:৮৬

২. আরেক ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে মানুষের নিকট নালিশ করা। এটি হতে পারে প্রত্যক্ষভাবে কথার দ্বারা অথবা পরোক্ষভাবে আচার-আচরণ বা কাজের দ্বারা, যেমন : বিবর্ণ পোশাক পরিধান করা, মাথা মুণ্ডানো, হতাশা প্রকাশ করা ইত্যাদি কাজের দ্বারা। এ-ধরনের শাকওয়াহ হচ্ছে সবরের সাথে সাংঘর্ষিক। এ-ধরনের শাকওয়াহ আল্লাহর ফায়সালার ওপর অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা প্রকাশ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমানের দৃঢ়তার অভাব প্রমাণ করে।
তবে নিজের আপনজনকে নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানো দোষের কিছু নয়।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তাঁর গায়ে আমার হাত বুলালাম এবং বললাম ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ! আমি এমন কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হই, যা তোমাদের দু’জনের হয়ে থাকে। আমি বললাম এটা এ জন্য যে, আপনার জন্য প্রতিদানও হল দ্বিগুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ! এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যে কোন মুসলিম ব্যাক্তির উপর কোন যন্ত্রণা, রোগ ব্যাধি বা এ ধরনের অন্য কিছু আপতিত হলে তাতে আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঝরিয়ে দেন, যে ভাবে গাছ তার পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে। -বুখারী ৫২৫৮
[৩৭-৪২]
.

আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না
একদা আলি ইবনু আবী তালিব মাসজিদে গেলেন। তাঁর সাথে একটি ঘোড়া ছিল। তিনি মাসজিদের ভেতরে প্রবেশের পূর্বে এক লোককে ঘোড়াটি দিলেন এবং বললেন, ঘোড়াটি যেন সে দেখে রাখে। লোকটি ঘোড়ার লাগাম চুরি করে নিয়ে গেল।
মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় আলি ভাবলেন, লোকটিকে ঘোড়া দেখে রাখার জন্যে চার দিনার মজুরি দিবেন। তিনি বাইরে বের হয়ে দেখলেন ঘোড়ার লাগাম হারিয়ে গেছে। তিনি তাঁর সেবককে বললেন, "এই চার দিনার দিয়ে আমার জন্যে বাজার থেকে একটি লাগাম নিয়ে এসো।"
সেবক বাজারে গিয়ে দেখল যে এক ব্যক্তি লাগাম বিক্রি করছে। এ ছিল সেই ব্যক্তি যে লাগামটি চুরি করেছিল। সেবকটি ওই ব্যক্তির কাছে থেকেই দামাদামি করে চার দিনারে লাগাম কিনে নিয়ে এল।
একবার ভাবুন তো, লোকটি একটু অপেক্ষা করলেই বৈধভাবে চার দিনারই পেত। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল। হারাম পন্থায় চুরির মাধ্যমে একই টাকা হাতিয়ে নিল। বোঝার ব্যাপার হচ্ছে, যা আপনার ভাগ্যে আছে তা আপনারই হবে। এই চার দিনার লোকটির তাকদীরে ছিল। কিন্তু সে চুরির মাধ্যমে তা নিল। তাই আমি আপনাদের ধৈর্যধারণ করার উপদেশ দেবো। যা আপনার ভাগ্যে আছে, তা আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার কাছে আসবে। সবর করুন, আর বেশি বেশি দুআ করুন।
[৫২-৫৩]
.

দুআর শক্তি
একদা ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন।
রাত্রিযাপনের জন্যে তিনি একটি মাসজিদে প্রবেশ করলেন। মাসজিদের পাহারাদার বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে, এখন মাসজিদ ছাড়তে হবে। মাসজিদ বন্ধ করার সময় হয়ে গিয়েছিল। ইমাম আহমাদ পাহারাদারকে জানালেন যে, তাঁর আর রাত কাটানোর জায়গা নেই, তবুও পাহারাদার তাঁকে উঠে যাবার জন্য জোর করছিল। তিনি তার জিনিসিপত্র নিয়ে বেরিয়ে এসে মাসজিদের সিঁড়িতে শুয়ে পড়লেন। পাহারাদার বাইরে বেরিয়ে ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে সিঁড়ি থেকে উঠে যেতে বলল। অতঃপর পাহারাদার ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে রাস্তার মাঝখানে ফেলে রেখে চলে গেল।
রাস্তার পাশেই এক ধার্মিক রুটিওয়ালার দোকান ছিল। সে ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে দেখে নিজের সাথে রাতে থেকে যেতে বলল। সে রাতভর রুটি বানায় তাই ইমাম আহমাদ (রহঃ) তার স্থানে ঘুমোতে পারবেন।
রাতে ইমাম আহমাদ (রহঃ) একটি অভাবনীয় দৃশ্য দেখলেন। রুটিওয়ালা রাতভর কাজ করছিল। সে ময়দা গোলে রুটির খামির বানাচ্ছিল আবার কখনও-বা রুটি সেকছিল। কিন্তু এসব কাজের মধ্যেও সে রাতভর আল্লাহর যিকর করে যাচ্ছিল, তাসবিহ জপছিল। ইমাম আহমাদ (রহঃ) তা দেখে বিস্মিত হলেন।
এই লোকটি রাতভর আল্লাহর যিকর করছিল। অথচ, আজকাল মানুষ কত তাড়াতাড়ি যিকর করে ক্লান্ত হয়ে যায়। ইমাম আহমাদ (রহঃ) রুটিওয়ালার কাছে জানতে চাইলেন যে, কদিন ধরে সে এই আমল করে যাচ্ছে। রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে জীবনভর এই আমল করে আসছে।
ইমাম আহমাদ (রহঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আমলের কোনো ফল সে পেয়েছে কি না। লোকটি তখন যে জবাব দিলো, তা শুনে ইমাম আহমাদ (রহঃ) হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। রুটিওয়ালা জবাব দিলো, "আমি আল্লাহর কাছে কোনো দুআ করেছি আর আল্লাহ তা কবুল করেননি, এমন কখনও হয়নি, শুধুমাত্র একটি দুআ বাদে।" ইমাম আহমাদ (রহঃ) তখন জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কোন দুআটি কবুল হয়নি?"
রুটিওয়ালা জবাব দিলো যে, সে আল্লাহর কাছে দুআ করত যেন ইমাম আহমাদের সাথে তার দেখা হয়। কিন্তু সেই দুআটি এখনও কবুল হয়নি।
এ কথা শুনে ইমাম আহমাদ কেঁদে ফেললেন। তিনি রুটিওয়ালাকে বললেন, "সুবহানাল্লাহ! তিনিই তো হচ্ছেন আল্লাহ... তিনি আমাকে টেনে-হিঁচড়ে তোমার দোকানে এনে ফেলেছেন, যেন আল্লাহ আমাকে দিয়ে তোমার দুআ কবুল করাতে পারেন।"
[৬০-৬১]
.

বিষন্নাতার ১৫টি প্রতিষেধক
আল্লাহ তাআলা হয়তো আপনাকে বিপদ দিয়েছেন তার চেয়েও বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। আপনার ব্যাপারে যা পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেটা অনুমান করাও আপনার পক্ষে অসম্ভব।
আলেমরা এক রাজা আর তার মন্ত্রীর কথা প্রায়শই বর্ণনা করে থাকেন। মন্ত্রী হিলেন একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, যিনি বিপদ এলেই এই কথাটির পুনরাবৃত্তি
"আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।"
একদিন একসাথে খাওয়ার সময় রাজা তার হাত খুব বাজেভাবে কেটে ফেললেন। সব সময়কার মতোই মন্ত্রী বলে উঠলেন, "আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।"
রাজা মশায় মন্ত্রীর কথায় খুব অপমানিত বোধ করলেন। তিনি ভাবলেন, মন্ত্রী তার এমন দুর্দশায় মজা নিচ্ছে। তাই তিনি রাগে-ক্ষোভে মন্ত্রীকে বন্দি করলেন। মন্ত্রী তার বন্দিত্বের ব্যাপারেও 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন'-বলে প্রতিক্রিয়া দেখালেন।
রাজা তার বিনোদনের বেশিরভাগ সময়ই মন্ত্রীর সাথে শিকারে কাটাতেন। কিন্তু মন্ত্রী জেলে বন্দি হবার পর তিনি একাই শিকারে গেলেন। তিনি শিকারের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে কখন যে নিজের সীমানা পেরিয়ে মূর্তিপূজারিদের সীমানায় গিয়ে পৌঁছলেন, সেটা টেরও পেলেন না। তারা তাকে ধরে ফেলল, এরপর বন্দি করল।
তার পর তাদের সবচেয়ে বড় দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেবার জন্য নিয়ে গেল। তাকে মাটিতে শুইয়ে যেই ছুরি দিয়ে গলাটা কাটতে গেল, তখনই রাজার হাতের জখম ভাদের দৃষ্টিগোচর হলো। আর এই খুঁতের কারণে তারা তাকে বলি দেওয়ার অযোগ্য মনে করে ছেড়ে দিলো।
রাজা তার প্রাসাদে ফিরলেন। তিনি অনুধাবন করতে পারলেন-'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।' তাই রাজা তৎক্ষণাৎ মন্ত্রীকে মুক্ত করে দিলেন এবং সম্পূর্ণ ঘটনা তাকে খুলে বললেন। তিনি মন্ত্রীকে বললেন, "জখমের মাধ্যমে আমার কী কল্যাণ হয়েছিল, এখন আমি তা বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমাকে বন্দি করার সময় ও তুমি বলেছিলে 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন', এই বন্দিত্বের মধ্যে কী কল্যাণ ছিল তোমার জন্য?"
জবাবে মন্ত্রী জানতে চাইলেন, "শিকারের সময় সচরাচর কে আপনার সাথে থাকত?" রাজা বললেন, "তুমি।" মন্ত্রী তখন বললেন, "আমাকে যদি বন্দি না করতেন তবে আজকেও আপনার সাথে আমি থাকতাম, আর তখন আপনার বদলে আমাকেই বলি দেওয়া হতো।"
যখনই আপনি কোনো দুর্বিপাকে পতিত হন, 'আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন'-বাক্যটিকে আপনার স্লোগানে পরিণত করুন। যেহেতু আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন:২:২১৬
[১:৮০-৮১]

বহুল-ব্যবহৃত আরবি বাক্যাংশের অর্থ ও প্রয়োগ

সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আল্লাহ তাঁর উপর করুণা ও শান্তি বর্ষণ করুন!
মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহিস সালাম।
তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
সাধারণত নবিদের নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহাস সালাম।
তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
মহীয়সী নারীর নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহিমাস সালাম
উভয়ের উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
দুজন নবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

আলাইহিমুস সালাম।
তাঁদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক!
দুয়ের অধিক নবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহু।
আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন!
সাহাবির নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহা
আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন!
মহিলা সাহাবির নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহুমা
আল্লাহ উভয়ের উপর সন্তুষ্ট হোন!
দুজন সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহুম
আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোন!
দুয়ের অধিক সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রদিয়াল্লাহু আনহুন্না
আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোন!
দুয়ের অধিক মহিলা সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।

রহিমাহুল্লাহ।
আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন!
যে কোনো সৎ ব্যক্তির নামের পর ব্যবহৃত হয়।

সংজ্ঞা পরিভাষা

কোনো বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছুর মালিক বানিয়ে দেওয়া কে হাদিয়া বলে।
.

হাদীস
যে কথা, কর্ম, অনুমোদন বা বিবরণকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলে প্রচার করা হয়েছে বা দাবী করা হয়েছে তাই হাদীস বলে পরিচিত।

সাহাবীগণ ও তাবিয়ীগণের কথা, কর্ম ও অনুমোদনকেও হাদীস বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম, কথা, অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে মারফূ হাদীস বলা হয।

সাহাবীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে মাউকূফ হাদীস বলা হয়।

তাবিয়ীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে মাকতূ হাদীস বলা হয়।
.

সুন্নাত
ইসলামী শরীয়তে ব্যবহারের দিক থেকে 'সুন্নাত' শব্দের দুই ধরনের প্রয়োগ রয়েছে:

১. সুন্নাতের প্রথম ও পুরাতন প্রয়োগ হলো রাসূলে আকরাম-এর সকল প্রকারের নির্দেশ, কথা, কর্ম, অনুমোদন বা এক কথায় তাঁর সামগ্রিক জীবনাদর্শ। মূলত হাদীস শরীফে ও সাহাবী-তাবেয়ীদের যুগে 'সুন্নাত' বলতে এই অর্থই বোঝানো হতো। এছাড়া পরবর্তী যুগেও হাদীস চর্চার ক্ষেত্রে ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও 'সুন্নাত' এই অর্থে ব্যবহৃত হয়।

২. সুন্নাতের দ্বিতীয় ও প্রচলিত অর্থ ইসলামী শরীয়তে অত্যাবশ্যকীয় নয়- এরূপ নেক কর্ম। অর্থাৎ, ফরয ও ওয়াজিব এর পরবর্তী, আবশ্যকীয় নয় এরূপ কর্ম, যা করা প্রয়োজন, বা করা উত্তম। সাধারণত এই অর্থটিই আমাদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত।

তিনি যা করেছেন তা করা এবং তিনি যা বর্জন করেছেন তা বর্জন করা সুন্নাত। তাঁর শিক্ষা ও কর্মপদ্ধতির আলোকে ফরযকে ফরয, নফলকে নফল, মুবাহকে মুবাহ, মাকরুহকে মাকরুহ ও হারামকে হারাম হিসাবে গ্রহণ করা সুন্নাত। এর বাইরে কোনো রীতি প্রচলন করাই বিদ'আত।
.

বিদআত হল এমন কাজ, যার ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহ ও খাইরুল কুরুনে' নেই, সে কাজকে দীনের কাজ ভেবে করা। -শিব্বির আহমাদ উসমানি

হিজরীবর্ষ

১. মুহাররম (সম্মানিত মাস) (আল্লাহর মাস)

মুহাররমের রোজা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমযানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সাওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সাওম। -মুসলিম ২৬২৬
আশুরার রোজা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আশূরার সাওম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তাতে বিগত বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। -মুসলিম ২৬১৮
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (হিজরত করে) মদিনায় এলেন এবং তিনি ইয়াহুদীদেরকে আশূরার দিন সিয়াম পালন করতে দেখতে পেলেন। এরপর তাদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর তারা বলল, এ সে দিন, যে দিন আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) ও বনী ইসরাঈলকে ফির'আউনের উপর বিজয়ী করেছেন। তাই এর সম্মানার্থে আমরা সাওম পালন করে থাকি। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমরা তোমাদের চেয়েও মূসা (আলাইহিস সালাম) এর অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি এ দিনে সাওম পালন করার নির্দেশ দিলেন। -মুসলিম ২৫২৭
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আশূরার দিন সিয়াম পালন করেন এবং লোকদেরকে সিয়াম পাননের নির্দেশ দেন তখন সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইয়াহূদী এবং নাসারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও সিয়াম পালন করব। বর্ণনাকারী বলেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইনতেকাল হয়ে যায়। -মুসলিম ২৫৩৭


২. সফর

আখেরি চাহার শোম্বা অর্থ বুধবার। অর্থাৎ সফর মাসের শেষ বুধবার। ১১ হিজরির সফর মাসের শেষভাগে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত অসুস্থ ও পীড়িত হয়ে পড়েন এবং এই মাসের শেষ বুধবার দিন তিনি শরীরে একটু সুস্থতা বোধ করায় গোসল করে কিছুটা প্রশান্তি লাভ করেন। এ দিবস উদযাপন করা বিদআত।


৩. রবিউল আউয়াল

ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী


৪. রবিউল আখির

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: 'ইয়াজদহম' অর্থ ১১। রবিউস সানির ১১ তারিখে বড়পির আবদুল কাদির জিলানি রাহ. এর মৃত্যুদিবস উপলক্ষে কৃত ফাতিহা বা ইসালে সাওয়াব মাহফিল। এ দিবস উদযাপন করা বিদআত।


৫. জুমাদাল উলা


৬. জুমাদাল আখিরাহ


৭. রজব (সম্মানিত মাস)

শবে মিরাজ: (২৭ রজব) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে এ উপলক্ষে বিশেষ কোন আমলের নির্দেশ দেননি। এ উপলক্ষে ইবাদত করা বিদাত।


৮. শাবান

শাবানের রোযা: আয়িশা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাওম সম্পর্কে বলেন, আমি তাঁকে শাবান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে এত অধিক (নফল) সাওম পালন করতে দেখিনি। তিনি যেন গোটা শাবান মাসই সাওম পালন করতেন। তিনি সামান্য (কয়টি দিন) ব্যতীত গোটা শাবান মাস সাওম পালন করতেন। -মুসলিম ২৫৯৩
শবে বরাত: (১৫ শাবান) লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান বা মধ্য শা'বানের রজনীর তাৎপর্য বিবেচনায় আলিমরা একে শবে বারাআহ বা মুক্তির রজনী বলে নামকরন করেছেন।


৯. রমযান (১২ মাসের শ্রেষ্ঠ মাস)

রমযানের রোযা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতি মাসে তিন দিন এবং গোটা রমযান মাস সাওম পালন করাই হল সারা বছর সাওম পালনের সমতুল্য। -মুসলিম ২৬১৮
তারাবীহ: তারাবির সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তারাবির সালাতে অন্তত একবার কুরআন খতম করা সুন্নাত। তারাবির ইমামকে প্রদেয় অর্থ ইবাদতের বিনিময় বা উজরত।
লাইলাতুল কদর
যাকাত ও উশর
ঈদুল ফিতর ও সাদাকাতুল ফিতর


১০. শাওয়াল

শাওয়ালের রোজা: যে ব্যাক্তি রমযান মাসের সিয়াম পালন করল, তারপর শাওয়াল মাসে ছয় দিনকে তার অনুগামী করল (৬টি রোযা পালন করল), সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। -মুসলিম ২৬২৯


১১. যিলকদ (সম্মানিত মাস)


১২. যিলহজ্ব (সম্মানিত মাস)

জিলহজের প্রথম দশক: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ মাসের নয় তারিখ পর্যন্ত সওম রাখতেন। -আবূ দাউদ ২৪৩৭
আরাফার রোযা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আরাফাত দিবসের সাওম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। -মুসলিম ২৬১৮
তাকবিরে তাশরিক
ঈদুল আযহা ও কুরবানী
হজ ওমরা
.

জুমুআ

চাঁদ

আহমদ রহ.-এর চিঠি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকল প্রশংসা ঐ মহান সত্তার জন্য যিনি প্রত্যেক যুগেই এমন কতিপয় আলিম পাঠিয়েছেন যারা পথভ্রষ্টদের সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে ধ্বংসের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন। যারা আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে মৃতকে জীবন্ত করেছেন, নবীর সুন্নাহের মাধ্যমে মূর্খদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে রক্ষা করেছেন। বহু ইনসানকে ইবলীসের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করেছেন। বহু পথভ্রষ্টকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। তাদের এই জীবন্ত কর্ম এতটাই ফলপ্রসু হয়েছে যে, পরবর্তীতে এ সকল লোক-ই আল্লাহর দীনকে বাতিল ও সীমালজ্জনকারীদের বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছেন। অথচ এরাই বেদআতে বিপর্যস্ত হয়ে ফিতনা উস্কে দিয়েছিল। কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে শতধা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহর উপর অপবাদ ও বিভিন্ন মন্তব্য জুড়ে দিয়েছিল। তারা আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যা করতো। আমরা ভ্রষ্টকারী সকল বিশৃঙ্খলা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক মুহাম্মদ সা. ও তার পরিবার বর্গের উপর।
পর কথা
আল্লাহ আমাদের সকলকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন। অসন্তুষ্টির পথ থেকে দূরে রাখুন এবং তার প্রিয় বান্দাদের পথে আমাদের সকলকে পরিচালিত করুন।
আমি আপনাকে এবং বিশেষভাবে নিজেকে তাকওয়া, সুন্নাহ এবং জামাতের সাথে মিলিত থাকার অসিয়ত করছি। আপনি জানেন, যারা এপথের পথিক তাদের পরিণাম কত শুভ এবং এর উল্টো পথের পথিকদের পরিণাম কত ভয়াবহ। রসূলের সেই বাণী এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ মাত্র একটি সুন্নত শক্তভাবে ধারণকারী বান্দাকেও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন'।
আপনাদের প্রতি আমার নির্দেশ হলো, আপনারা কুরআনের উপর কোন কিছুকেই প্রাধান্য দেবেন না। কুরআন আল্লাহর কালাম বা কথা। যার মাধ্যমে আল্লাহ কথা বলেছেন সেটাও মাখলুক নয়। যে শব্দের মাধ্যমে কুরআন অতীতের সংবাদ উপস্থাপন করেছে সেটাও মাখলুক নয়, লওহে মাহফুজে যা কিছু আছে তাও মাখলুক নয়, যে ব্যক্তি এগুলোকে মাখলুক বলবে, সে কাফের হয়ে যাবে। এমনকি যে তাকে কাফের বলে স্বীকৃতি না দেবে সেও কাফের বলে গণ্য হবে।
কুরআনের পর রসূলের সুন্নাহ ও সাহাবাদের বক্তব্য ও মন্তব্যের অবস্থান। নবী-রসূলদের বক্তব্যের সত্যায়ন এবং সুন্নতের অনুসরণের মধ্যেই মুক্তি নিহিত। একথাগুলো উঁচু স্তরের আলিমদের মাধ্যমে ফুা ফুগ ধরে (বিশ্বস্ত সূত্রে) বর্ণিত হয়ে আসছে।
জাহাম বিন সফওয়ানের ভ্রান্ত মতাদর্শ থেকে দূরে থাকুন, কারণ তারা ধর্মের মধ্যে ফাঁক ফোকর খুঁজে বেড়ায়। উলামায়ে কেরামের ভাষ্যমতে ফেরকায়ে জাহমিয়া তিন দলে বিভক্ত। তাদের এক দলের অভিমত হলো, কুরআন আল্লাহর কালাম তবে মাখলুক, দ্বিতীয় দলের বক্তব্য হলো, কুরআন আল্লাহর কালাম তবে তা মাখলুক না হওয়ার ব্যাপারে তারা নিরব। এদেরকে 'ওয়াকিফিয়্যাহ' বলে। তৃতীয় দলের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা কুরআনের যে শব্দ পড়ি সেটা মাখলুক। এরা সবাই জাহমিয়াহ। সকল উলামা এ বিষয়ে একমত যে তারা যদি তওবা করে তাদের বক্তব্য থেকে ফিরে না আসে তাহলে তাদের জবাইকৃত প্রাণী ভক্ষণ করা বৈধ হবে না এবং তাদের কোন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য হবে না।
কথা ও কাজ উভয়ের সমষ্টির নামই হচ্ছে ঈমান। এই ঈমান বৃদ্ধি পায় আবার হ্রাস পায়। যদি নেক কাজ করেন তাহলে ঈমান বৃদ্ধি পাবে আর যদি মন্দ কাজ করেন তাহলে ঈমান হ্রাস পাবে। এমনকি এক পর্যায়ে মানুষ ঈমানের গণ্ডি থেকেই বেরিয়ে যায়। যদি তওবা করে নেয় তাহলে আবার ঈমানের আলোতে ফিরে আসে। একমাত্র শিরকের কারণেই মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়, অথবা যদি আল্লাহ প্রদত্ত কোন আবশ্যকীয় বিধানকে অস্বীকার করে তাহলেও কাফের হয়ে যায়। কেউ যদি কোন ফরজ বিধান অবহেলা বা দুর্বলতাবশত ছেড়ে দেয় তাহলে তার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে শাস্তি দেবেন, চাইলে ক্ষমা করে দেবেন। মু'তাযিলাদের বিষয়ে উলামায়ে কেরামের অভিমত হচ্ছে তারা গুনাহকারীকে কাফের বলে আখ্যায়িত করে। সুতরাং যারা মু'তাযিলাদের এই মতে বিশ্বাসী হবে তারা নিশ্চিত ভাববে যে, হযরত আদম আ. গোনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে কাফের হয়ে গেছে (নাউজুবিল্লাহ)। এটাও ভাববে, হযরত ইউসুফ আ.এর ভায়েরা পিতার সামনে মিথ্যা বলে কুফুরী করেছে। মু'তাযিলাদের সর্বসম্মত বিশ্বাস হচ্ছে যদি কেউ কণা পারিমাণ বস্তুও চুরি করে তাহলে সে জাহান্নামী হয়ে যাবে। তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে। হজ করে থাকলে পুনরায় হজ করতে হবে। তাদের ব্যাপারে নির্দেশ হচ্ছে তারা এ মত ও পথ থেকে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাদের সাথে সালাম কালাম করা যাবে না। তাদের জবাইকৃত প্রাণীও ভক্ষণ করা যাবে না।
রাফেজীদের বিষয়ে আমাদের উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তারা হযরত আলী রা. কে হযরত আবু বকর ও উমর রা. থেকে উত্তম মনে করে এবং আলী রা.কে আবু বকর রা. এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী বলে বিশ্বাস করে। যারা এমতে বিশ্বাসী তারা কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধিতাকারী। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছে'। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নবী সা. এর পর আবু বকর রা. এর স্থান দিয়েছেন, আলী রা. এর নয়। নবী করিম সা. বলেন, 'আমি যদি কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই বেছে নিতাম। কিন্তু আল্লাহ আমাকে নিজের অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ে নিয়েছেন। যে বিশ্বাস করে, আলী রা. আবু বকর রা. এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, সে ভুলের মধ্যে আছে। কারণ, হযরত আবু বকর রা. এর ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বছর। অথচ হযরত আলী রা. তখন মাত্র সাত বছরের বালক, যার উপরে ইসলামের কোন বিধান, শরীয়তের দণ্ডবিধি এবং দীনের ফারায়েজই তখনও প্রযোজ্য হয় নি।
মুসলমানদের কর্তব্য হলো তাকদীরের ভালো মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এ- কথার উপর আস্থা রাখা। আল্লাহ তা'আলা মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। জান্নাতবাসী কারা হবে তাও নির্ধারণ করে রেখেছেন। জান্নাতের নেয়ামতসমূহ চিরস্থায়ী। যারা মনে করে জান্নাতের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যাবে তারা কাফের বৈ কিছু নয়। তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন তাতে যারা থাকবে তাদেরকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন। জাহান্নামের আজাবও চিরস্থায়ী। নবীর শাফায়াতের উসিলায় বহু লোক জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। এ-কথার উপরও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার দিদার লাভ হবে। হযরত মুসা আ. এর সাথে আল্লাহ কথোপকথন করেছেন। হযরত ইবরাহীম আ.কে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এটাও বিশ্বাস করতে হবে।
হিসাব-নিকাশ সত্য, পুলসিরাত সত্য, নবিগণ সত্য, হযরত ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা এবং রসূল, হাউজে (কাউসার), শাফায়াত, আরস, কুরসী ইত্যাদির উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। মালাকুল মাউতের প্রাণ হরণ এবং পুনরায় তা দেহে ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ঈমান রাখতে হবে। মৃত্যুর পর তাওহীদ রিসালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে। সিঙ্গায় ফুৎকারের উপরও বিশ্বাস রাখতে হবে, যাতে ইসরাফিল আ. ফুঁক দেবেন। মদীনায় যে কবর আছে তা রসূল সা. এর কবর আর দুই পাশে আছেন আবু বকর ও উমর রা.। বান্দার অন্তর আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মাঝে অবস্থিত। উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝেই দাজ্জাল বের হবে এবং হযরত ঈসা আ. এসে 'বাবেলুদ' নামক স্থানে তাকে হত্যা করবেন। হক্কানী উলামায়ে কেরাম যেটা অপছন্দ করেন সেটা প্রকৃতই নিন্দনীয়। সকল প্রকার বেদআত থেকে দূরে থাকুন।
রসূলের পর উম্মতের মধ্যে আবু বকরই সর্বশ্রেষ্ঠ, এরপর উমর এরপর হযরত উসমান রা. এর শ্রেষ্ঠত্বের স্থান। খেলাফতের ধারাবাহিকতার ব্যাপারে আমাদের এই একই বক্তব্য। আর আলী রা. এর ব্যাপারে আমরা নিরবতা অবলম্বন করে থাকি। শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে আমাদের কাছে আব্দুল্লাহ বিন উমরের বিশুদ্ধ হাদীস বিদ্যমান। এই চার খলীফা সবাই সঠিকপথ প্রাপ্ত। আশারায়ে মুবাশশারার ব্যাপারে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তারা সবাই জান্নাতি। এরা হলেন, আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা, জুবায়ের, সা'দ, সাইদ, আব্দুর রহমান বিন আউফ, আবু উবাইদা বিন জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুম। রসূল সা. যাদের জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন আমরাও তাদের জান্নাতি হওয়ার প্রবক্তা।
আমাদের মতে নামাযে রফয়ে ইয়াদাইন করা এবং আমীন বলা উত্তম। শাসকদের জন্য সততা ও কল্যাণের দোয়া করা বাঞ্চনীয়। তাদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করা কিংবা পারস্পরিক বিশৃঙ্খলা ও ঝগড়ার সূত্র ধরে তাদের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া উচিত নয়। কোন মুসলমানকে একথা বলতে বাধ্য করা যাবে না যে, অমুক অমুক ব্যক্তি জান্নাতি। তবে রসূলের পক্ষ থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবীকে জান্নাতি বলা যাবে।
আল্লাহ তা'আলার ঐ সকল গুণই বর্ণনা করুন যেগুলো তিনি নিজের ব্যাপারে বলেছেন। তিনি নিজের ব্যাপারে যা বলতে নিষেধ করেছেন সেগুলো পরিহার করুন। প্রবৃত্তির অনুসারী এবং পথভ্রষ্টদের সাথে তর্ক- বিতর্ক থেকে বেঁচে থাকুন। সাহাবাদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা থেকে দূরে থাকুন। শুধু তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করুন। তাদের পারস্পরিক বিতর্কের বিষয়ে নিরবতা অবলম্বন করুন। ধর্মীয় বিষয়ে বিদআতীদের থেকে পরামর্শ নিবেন না, এবং তাদের সাথে সফরও করবেন না। বিয়ের জন্য ওলী নির্ধারণ, খুতবা পাঠ এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রয়োজন। নেকাহে মুতা বা সাময়িক বিবাহ কেয়ামত পর্যন্ত হারাম। প্রত্যেক ভালো ও মন্দ কাজের পর নামায পড়ুন। মুসলমানদের যেই মৃত্যুবরণ করুক তার জানাজা পড়ে নিবেন। তার সব বিষয় আল্লাহই ফায়সালা করবেন। প্রত্যেক ইমাম ও বাদশার আনুগত্য করতে থাকুন। জিহাদ ও হজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া চাই। জানাজার নামাযে মোট চার তাকবীর। তবে যদি ইমাম পাঁচ তাকবীর বলে ফেলে তাহলে আপনারাও আলী রা. এর মত পাঁচ তাকবীর বলবেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেছেন, 'জানাজার নামাজে ইমাম যতগুলো তাকবীর বলবে আপনারাও বলবেন'। কিন্তু ইমাম শাফিঈ রহ, এ মাসআলায় ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, যদি চার তাকবীরের বেশি হয় তাহলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। তিনি বিশুদ্ধ সূত্রে রসূল সা. থেকে একটি হাদীস আমার সামনে উপস্থাপন করেছেন যাতে উল্লেখ আছে নবী সা. জানাজার নামাজে চার তাকবীর বলেছেন।
মুসাফিরের জন্য মুজার উপর তিন দিন তিন রাত মাসেহ করার সুযোগ আছে আর মুকিমের জন্য একদিন একরাত। রাত-দিনের নফল নামাজ দু রাকাত করে পড়া উত্তম। ঈদের নামাজের পূর্বে কোন নফল নামাজ নেই। মসজিদে প্রবেশের পর বসার পূর্বে দু'রাকাত তাহিয়‍্যাতুল মসজিদ পড়ে নিবেন। বিতিরের নামাজ এক রাকাত। নামাজের একামত দেয়া জরুরি। আমি প্রবৃত্তির অনুসারীদের বিপরীতে আহলে সুন্নতকে ভালো মনে করি। যদিও তাদের মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি থাকে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাকে ইসলাম ও সুন্নতের উপর অবিচল থেকে মৃত্যু বরণ করার তাওফীক দান করুন। আপন প্রজ্ঞা দিয়ে আমাদেরকে তার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।
-চার ইমাম -আতহার মুবারকপুরী ২৬৯-২৭৫

মুসয়াব ইবন 'উমাইর (রা)

মুসয়াব, কুনিয়াত আবু মুহাম্মদ। ইসলাম গ্রহণের পর লকব হয় মুসয়াব আল- খায়ের। পিতা 'উমাইর এবং মাতা খুনাস বিনতু মালিক। পিতা-মাতার পরম আদরে ঐশ্বর্যের মধ্যে লালিত মক্কার অন্যতম সুদর্শন যুবক ছিলেন তিনি। মা সম্পদশালী হওয়ার কারণে অত্যন্ত ভোগ বিলাসের মধ্যে তাঁকে প্রতিপালন করেন। তখনকার যুগে মক্কার যত রকমের চমৎকার পোশাক ও উৎকৃষ্ট খুশবু পাওয়া যেত সবই তিনি ব্যবহার করতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে কোনভাবে তাঁর প্রসংগ উঠলে বলতেন: 'মক্কায় মুসয়াবের চেয়ে সুদর্শন এবং উৎকৃষ্ট পোশাকধারী আর কেউ ছিল না।' ঐতিহাসিকরা বলেছেন: 'তিনি ছিলেন মক্কার সর্বোৎকৃষ্ট সুগন্ধি ব্যবহারকারী।'
সৌন্দর্য্য, সুরুচি ও সৎ স্বভাবের সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অন্তরটি দারুণ স্বচ্ছ করে তৈরী করেছিলেন। তাওহীদের একটি মাত্র ঝলকেই তিনি শিরকের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন এবং হযরত রাসূলে পাকের দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ সেই সময়ের কথা যখন রাসূল (সা) হযরত আরকামের বাড়ীতে অবস্থান করে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছিলেন এবং মুসলমানদের সামনে মক্কার মাটি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিলো।
মক্কার অলিতে-গলিতে, কুরাইশদের আড্ডায়, পরামর্শ সভায় তখন একই আলোচনা- মুহাম্মদ আল আমীন ও তাঁর নতুন দ্বীন আল ইসলাম। কুরাইশদের এই আদুরে দুলাল এসব আলোচনা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনতেন। অল্প বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও তিনি হতেন কুরাইশদের সকল বৈঠক ও মজলিসের শোভা ও মধ্যমণি। তাদের প্রতিটি বৈঠকে সবার কাম্য হতো তাঁর উপস্থিতি। তীক্ষ্ণ মেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এ বৈশিষ্ট্য তাঁর হৃদয়ের সকল দ্বার, সকল অর্গল উন্মুক্ত করে দেয়।
তিনি শুনতে পেলেন, রাসূল (সা) ও তাঁর প্রতি বিশ্বাসীরা কুরাইশদের সকল অর্থহীন কাজ ও তাদের যুলুম অত্যাচার থেকে দূরে থেকে সেই সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়ীতে সমবেত হন। সব দ্বিধা সব দ্বন্দু ঝেড়ে ফেলে একদিন সন্ধ্যায় তিনি হাজির হলেন দারুল আরকামে। রাসূল (সা) সেই দিনগুলিতে সেখানে তাঁর সাথীদের সংগে মিলিত হতেন, তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতেন এবং তাদের সাথে নামায আদায় করতেন।
মুসয়াব ইবন উমাইর দারুল আরকামে বসতে না বসতেই কুরআনের আয়াত নাযিল হলো। রাসূলের (সা) যবান থেকে সে আয়াত বের হয়ে তা যেন সকল শ্রোতার কর্ণকুহরে ও হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে লাগলো। সেই বরকতময় সন্ধ্যায় ইবন 'উমাইরও হয়ে গেলেন এক বিশ্বাসী অন্তঃকরণের অধিকারী। খুশী ও আনন্দে তিনি হয়ে পড়েন আত্মহারা। রাসূল (সা) তাঁর একটি পবিত্র হাত বাড়িয়ে দিলেন মুসয়াবের বুকের ওপর। দারুণ এক প্রশান্তিতে বিভোর হয়ে পড়েন মুসয়াব। মুহূর্তে তিনি তাঁর বয়সের তুলনায় বহুগুণ বেশী হিকমত ও জ্ঞান লাভ করলেন এবং এমন দৃঢ়তা অর্জন করলেন যে হাজারো বিপদ মুসীবাত তাঁকে আর কোনদিন বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি।
মুসয়াবের মা খুনাস বিনতু মালিক ছিলেন এক প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। মুসয়াব তাকে যমের মত ভয় করতেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ধরাপৃষ্ঠে একমাত্র তাঁর মা ছাড়া আর কারো ভয় পেতেন না। কুরাইশ ও তাদের দেব-দেবীসহ সকল শক্তি তাঁর কাছে তুচ্ছ মনে হলো। কিন্তু মায়ের ভয় তিনি দূর করতে পারলেন না। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণের সংবাদটি চেপে যাওয়ার। দারুল আরকামে যাতায়াত চলতে লাগলো। রাসূলুল্লাহর (সা) মজলিসে বসতে লাগলেন। কিন্তু তার মা কিছুই জানতে পেলেন না।
একদিন গোপনে তিনি দারুল আরকামে প্রবেশ করছেন, উসমান ইবন তালহা তা দেখে ফেললো। আরেক দিন তিনি মুহাম্মাদের (সা) মত নামায পড়ছেন, সেদিনও তা উসমানের চোখে পড়ে যায়। বাতাসের আগে খবরটি মক্কার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়লো। তাঁর মায়ের কানেও খবরটি পৌঁছে গেল।
মুসয়াবকে তাঁর মা, গোত্রের লোকজন ও মক্কার নেতৃবৃন্দের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। তিনি অত্যন্ত স্থির বিশ্বাস ও প্রশান্ত চিত্তে তাদেরকে পাঠ করে শুনাতে লাগলেন কুরআনের সেই মহাবাণী যার ওপর তিনি ঈমান এনেছেন। মা তাঁর গালে থাপ্পড় মেরে চুপ করিয়ে দিতে চাইলেন। বকাঝকা, মারপিট চললো। তারপর তাঁকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হলো।
তিনি বন্দী অবস্থায় কাটাতে লাগলেন। রাত্রিদিন চব্বিশ ঘন্টা তাঁকে পাহারা দেয়া হয়। এর মধ্যে তিনি খবর পেলেন, তাঁরই মত কিছু মুমিন মুসলমান হাবশায় হিজরাত করছেন। তিনি মায়ের চোখে ধুলো দিয়ে সেই দলটির সাথে হাবশায় চলে গেলেন।
একদিন মুসলমানদের একটি দল রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে আছেন। এমন সময় পাশ দিয়ে তারা মুসয়াবকে যেতে দেখলেন। তাঁকে দেখেই বৈঠকে উপস্থিত সকলের মধ্যে ভাবান্তর সৃষ্টি হলো। তাঁদের দৃষ্টি নত হয়ে গেল। কারো কারো চোখে পানি এসে গেল। কারণ, মুসয়াবের গায়ে তখন শত তালি দেওয়া জীর্ণ শীর্ণ একটি চামড়ার টুকরো। তাতে মারাত্মক দারিদ্রের ছাপ সুস্পষ্ট। তাঁদের সকলের মনে তখন তাঁর ইসলাম পূর্ব জীবনের ছবি ভেসে উঠলো। তখনকার পরিচ্ছদ হতো বাগিচার ফুলের মত কোমল চিত্তাকর্ষক ও সুগন্ধিময়। এ দৃশ্য দেখে একটু মুচকি হেসে রাসূল (সা) বললেন : 'মক্কায় আমি এ মুসয়াবকে দেখেছি। তার চেয়ে পিতামাতার বেশী আদরের আর কোন যুবক মক্কায় ছিল না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মুহাব্বতে সবকিছু সে ত্যাগ করেছে।'
কিছুদিন হাবশায় থাকার পর তিনি মক্কায় ফিরে এলেন। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশে আরেকটি দলকে সংগে করে হাবশায় চলে যান। কিন্তু মুসয়াব উপলব্ধি করেছিলেন, তিনি মক্কায়, হাবশায় যেখানেই থাকুন না কেন, জীবন তাঁর নতুন-রূপ ধারণ করেছে। তাঁর একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সা) এবং একমাত্র কাম্য মহাপ্রভু আল্লাহর সন্তুষ্টি।

তাঁর মা নতুন দ্বীন থেকে ফিরাতে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে সবকিছু দেওয়া বন্ধ করে দিল। যে ব্যক্তি তাঁদের দেব-দেবীকে ছেড়ে দিয়েছে, তাদের গালাগাল করে, তা সে নিজের পেটের ছেলেই হোকনা কেন, তাকে সে কোন মতেই খেতে পরতে দিতে পারে না।
মুসয়াব হাবশা থেকে ফিরে আসার পর তার মা আবারো তাকে বন্দী করতে চাইলো। তিনি মায়ের মুখের ওপর কসম খেয়ে বললেন: যদি তুমি এমনটি কর এবং যারা তোমার এ কাজে সাহায্য করবে তোমাদের সবাইকে আমি হত্যা করবো। মা তার এই বেয়াড়া ছেলেকে জানতো। তাই কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বিদায় দিল, আর তিনিও মাকে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় দিলেন।
বিদায় মুহূর্তে মা যেমন কুফরীর ওপর ছেলেও তেমনি ঈমানের ওপর অটল। প্রাণ- প্রিয় ছেলেকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে বের করে দিতে দিতে মা বলছে: 'তোমার যেখানে খুশী যাও। আমাকে আর মা বলে ডেক না।' ছেলে একটু মায়ের দিকে এগিয়ে বললেন: 'মা আমি আপনাকে ভালো কথা বলছি, আপনার প্রতি আমার দারুণ মমতা রয়েছে। আপনি একবার একটু বলুন, আশহাদু আন্-লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।' মা উত্তেজিত হয়ে নক্ষত্ররাজির নামে কসম খেয়ে বললেন: 'আমি তোমার দ্বীন গ্রহণ করবো না। তোমার দ্বীন গ্রহণ করলে আমার মতামত ও বুদ্ধি বিবেক দুর্বল বলে মনে করা হবে।' এভাবে কুরাইশদের সেই চরম আদুরে ও বিলাসী যুবক মুসয়াব বাড়ী থেকে বিতাড়িত হয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন। এখন তিনি মোটা শতচ্ছিন্ন তালিযুক্ত পোশাক পরেন। একদিন খাবার জুটলে অন্যদিন অভুক্ত কাটান। কিন্তু বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত তাঁর অন্তরটি।
হজ্জের সময় মদীনা থেকে কতিপয় লোক মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে গোপনে আকাবায় সাক্ষাৎ করলো এবং তাঁর ওপর ঈমান এনে বাইয়াত করলো। তারা মদীনায় ফিরে গেল। তাদেরকে দ্বীনের তালীম দেওয়ার এবং অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে, এবং মদীনাকে হিজরাতের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যে রাসূল (সা) মুসয়াবকে দূত হিসাবে মদীনা পাঠালেন। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দূত।
মক্কায় তখন মুসয়াবের চেয়েও বয়সে ও মর্যাদায় বড় অনেক সাহাবী ছিলেন। তা সত্ত্বেও এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রাসূল তাঁকেই নির্বাচন করেন। মুসয়াব তাঁর খোদাপ্রদত্ত বুদ্ধি, মেধা ও মহৎ চরিত্রের সাহায্যে অত্যন্ত আমানতদারীর সাথে এ কঠিন দায়িত্ব পালন করেন। কঠোর সাধনা, নিষ্ঠা ও মহত্বের সাহায্যে তিনি মদীনাবাসীদের হৃদয়ের সাথে সংলাপ করেন। ফলে দলে দলে তারা আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করে।
মুসয়াব মদীনায় এলেন। এর আগে মদীনার মাত্র বারো জন লোক আকাবায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি মদীনায় আসার পর কয়েক মাস যেতে না যেতেই বহু মানুষ তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী হজ্জ মওসুমে মদীনাবাসী মুসলমানদের বাহাত্তর জনের একটি প্রতিনিধিদল তাদের ধর্মীয় শিক্ষক ও নবীর দূত মুসয়াবের সাথে মক্কায় এলো এবং আকাবায় আবার রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হলো।
মুসয়াব তাঁর দায়িত্ব এবং সে দায়িত্বের সীমা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী এবং আল্লাহর এমন এক দ্বীনের সুসংবাদ দানকারী যা মানবসমাজকে হিদায়াত ও সরল সোজা পথের দিকে আহ্বান জানায়। তাঁর ওপর এ দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন দায়িত্ব নেই।
মুসয়াব মদীনায় পৌঁছে আসয়াদ ইবন যারারার অতিথি হলেন। তাঁরা দু'জন মদীনার বিভিন্ন গোত্রে, বিভিন্ন বাড়ীতে এবং সমাবেশে এক আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতে লাগলেন। নানারকম বাধারও সম্মুখীন হলেন। কিন্তু বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সাথে সব বাধা তাঁরা অতিক্রম করলেন।
একদিন তিনি কিছু লোককে দাওয়াত দিচ্ছেন। হঠাৎ বনী আবদিল আশহালের নেতা উসাইদ ইবন হুদাইর সশস্ত্র অবস্থায় দারুণ উত্তেজিতভাবে উপস্থিত হল। তার ভীষণ রাগ সেই ব্যক্তিটির ওপর যে কিনা মুহাম্মাদের দূত হিসাবে এখানে এসেছে এবং মানুষকে তাদের পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করতে উৎসাহিত করছে। সে তাদের উপাস্য দেব-দেবীকে গালাগালও করছে। উসাইদের এ রণমূর্তি দেখে মুসয়াবের পাশে বসা মুসলমানরা ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু না, মুসয়াব ভয় পেলেন না, সহাস্যে উসাইদকে স্বাগতম জানালেন। হাসতে হাসতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। উসাইদ তখন তাঁকে ও আসয়াদ ইবন যারারাকে লক্ষ্য করে বলছেঃ তোমরা আমাদের গোত্রীয় এলাকায় এসে এভাবে আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাচ্ছো কেন? যদি তোমাদের মরার সখ না থাকে তাহলে আমাদের এলাকা থেকে বেরিয়ে যাও।
হাসতে হাসতে মুসয়াব তাকে বললেন: আপনি কি একটু বসে আমার কথা শুনবেন না? আমার কথা শুনুন। ভালো লাগে মানবেন, ভালো না লাগলে আমরা চলে যাব।
উসাইদ ছিল একজন বুদ্ধিমান লোক। মুসয়াবের কথা তার মনে লাগলো। এ তো বুদ্ধিমানের কথা। শুনতে আপত্তি কিসের! সে অস্ত্র ফেলে মাটিতে বসে কান লাগিয়ে মুসয়াবের কথা শুনতে লাগলো।
মুসয়াব পবিত্র কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে নবী মুহাম্মাদ (সা) যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তার ব্যাখ্যা করছেন, আর এদিকে উসাইদের মুখমণ্ডল একটু একটু করে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মুসয়াব তাঁর বক্তব্য এখনও শেষ করতে পারেননি, এর মধ্যে উসাইদ ও তাঁর সংগী লোকটি বলে বসলো এ তো খুব চমৎকার ও সত্য কথা। তোমাদের দ্বীনে প্রবেশ করতে গেলে কি করতে হয়? মুসয়াব বললেন: শরীর ও পোশাক পবিত্র করে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এই সাক্ষ্য দিতে হয়।
উসাইদ উঠে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন ফিরে এল তখন তার মাথার চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, 'আশহাদু আন্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ।' এ খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো, সাদ ইবন মুয়াজ ও সাদ ইবন উবাদা ছুটে এলেন মুসয়াবের নিকট। তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন। এসব নেতৃবৃন্দের ইসলাম গ্রহণের পর সাধারণ মদীনাবাসী বলাবলি করতে লাগলো, আমরা পেছনে পড়ে থাকবো কেন। চল যাই মুসয়াবের কাছে ইসলাম গ্রহণ করি।
এভাবে আল্লাহর রাসূলের প্রথম দূত এমনভাবে সফল হলেন যে, তার কোন তুলনা ইতিহাসে নেই। সময় দ্রুত গতিতে বয়ে চললো। রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সংগী সাথীরা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে এসেছেন। হিংসায় কুরাইশরা জ্বলতে লাগলো। মদীনা থেকেও তাদেরকে সমূলে উৎপাটিত করার ষড়যন্ত্র করলো। বদরে তারা এমন শিক্ষাই পেল যে, তাদের হিংসা প্রতিশোধস্পৃহায় রূপান্তরিত হলো। তারা আবার উহুদে মুসলমানদের মুখোমুখি হলো। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে রাসূল (সা) মুসলিম বাহিনীর মাঝখানে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। চিন্তা করছেন কার হাতে আজ ইসলামের ঝাণ্ডাটি দেওয়া যায়। গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলেন। তারপর মুসয়াবকে ডাকলেন তাঁরই হাতে ঝাণ্ডাটি তুলে দিলেন।
তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। কুরাইশ বাহিনী পরাজয়ের মুখোমুখি। এমন সময় মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ ভুলে গিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে কুরাইশদের পিছু ধাওয়া করলো। কিন্তু তাদের এ কাজ মুসলিম বাহিনীর সুনিশ্চিত বিজয় নস্যাৎ করে দিয়ে পরাজয় বয়ে নিয়ে এলো। মুসলিম তীরন্দায বাহিনীর ছেড়ে যাওয়া গিরিপথ দিয়ে কুরাইশ বাহিনী অকস্মাৎ ঢুকে পড়ে পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করে বসলো। মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লো। এই সুযোগে কুরাইশ বাহিনী তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে রাসূলুল্লাহকে (সা) ঘিরে ফেললো।
মুসয়াব ইবন উমাইর বিপদের ভয়াবহতা উপলব্ধি করলেন। যতটুকু সম্ভব তিনি ঝাণ্ডা উঁচু করে ধরলেন, গলা ফাটিয়ে নেকড়ের মত হুঙ্কার ছাড়তে এবং জোরে জোরে তাকবীর দিতে লাগলেন। আর সেইসাথে লক্ষ ঝক্ষ মেরে আস্ফালন দেখাতে লাগলেন। তাঁর উদ্দেশ্য হলো শত্রুদের দৃষ্টি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে ফিরিয়ে নিজের প্রতি নিবদ্ধ করা। এভাবে সেদিন তিনি নিজের একটি মাত্র সত্তাকে একটি বাহিনীতে পরিণত করেন। অত্যন্ত আমানতদারীর সাথে একহাতে ঝাণ্ডা উঁচু করে ধরেন এবং অন্য হাতে প্রচণ্ড বেগে তরবারি চালাতে থাকেন। শত্রুবাহিনী তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং তাঁর দেহের ওপর দিয়ে তারা রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে পৌঁছার চেষ্টা করে। হযরত মুসয়াবের অন্তিম অবস্থা সম্পর্কে ইবন সাদ বর্ণনা করে, "উহুদের দিনে মুসয়াব ইবন উমাইর ঝাণ্ডা বহন করেন। মুসলমানরা যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে মুসয়াব তখন অটল হয়ে রুখে দাঁড়ান। অশ্বারোহী ইবন কামীয়া তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তরবারির এক আঘাতে তাঁর ডান হাতটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মুসয়াব তখন বলে ওঠেন: 'ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল, কাদ খালাত মিন কাবলিহির রুসূল মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন।' মুসয়াব বাম হাতে ঝাণ্ডাটি তুলে ধরেন। তরবারির অন্য একটি আঘাতে তাঁর বাম হাতটিও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। আবারো তিনি 'ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল' এ কথাটি বলতে বলতে ঝাণ্ডার ওপর ঝুঁকে পড়ে দুই বাহু দ্বারা সেটি তুলে ধরেন। তারপর তাঁর প্রতি বর্শা নিক্ষেপ করা হয়। পতাকাসহ তিনি মাটিতে ঢলে পড়েন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হযরত মুসয়াব শাহাদাতের পূর্বে যে বাক্যটি বার বার উচ্চারণ করছিলেন তখনও কিন্তু সেটি কুরআনের আয়াত হিসেবে নাযিল হয়নি। উহুদের এ ঘটনার পরই 'ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল....' এ আয়াতটি নিয়ে হযরত জিবরীল (আ) উপস্থিত হন।"
যুদ্ধ শেষে হযরত মুসয়াবের লাশটি খুঁজে পাওয়া গেল। রক্ত ও ধুলোবালিতে একাকার তাঁর চেহারা। লাশের কাছে দাঁড়িয়ে রাসূল (সা) অঝোরে কেঁদে ফেললেন।। হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত বলেন: 'আমরা আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে হিজরাত করেছিলাম। আমাদের এ কাজের প্রতিদান দেওয়া আল্লাহর দায়িত্ব। আমাদের মধ্যে যাঁরা তাঁদের এ কাজের প্রতিদান মোটেও না নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে তাঁদের একজন মুসয়াব ইবন উমাইর।
উহুদে তিনি শাহাদাত বরণ করলেন। তাঁকে কাফন দেওয়ার জন্য একপ্রস্থ চাদর ছাড়া আর কোন কাপড় পাওয়া গেল না। তা দিয়ে তাঁর মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। শেষমেষ রাসূল (সা) আমাদের বললেন: চাদর দিয়ে মাথার দিক দিয়ে যতটুকু ঢাকা যায় ঢেকে দাও, বাকী পায়ের দিকে 'ইযখীর' ঘাস দাও। রাসূল (সা) মুসয়াবের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে পাঠ করলেন: মিনাল মু'মিনীনা রিজানুল সাদাকু আহাদুল্লাহ আলাইহি.... মুমিনদের এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তারপর তাঁর কাফনের চাদরটির প্রতি তাকিয়ে বলেন: আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি। সেখানে তোমার চেয়ে কোমল চাদর এবং সুন্দর ফুলফী আর কারো ছিল না। আর আজ তুমি এখানে এই চাদরে ধুলি মলিন অবস্থায় পড়ে আছ। তিনি আরো বলেন: 'আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দিচ্ছে, কিয়ামতের দিন তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে সাক্ষ্যদানকারী হবে।' তারপর সংগীদের দিকে ফিরে তিনি বলেন: 'ওহে জনমণ্ডলী, তোমরা তাদের যিআরত কর, তাদের কাছে এস, তাদের ওপর সালাম পেশ কর। যাঁর হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ, কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ তাঁদের ওপর সালাম পেশ করবে তারা সেই সালামের জওয়াব দেবে।'
হযরত মুসয়াবের ভাই আবুর রাওম ইবন উমাইর, আমের ইবন রাবীয়া এবং সুয়াইত ইবন সাদ তাঁকে কবরে নামিয়ে দাফন কাজ সম্পন্ন করেন।
হযরত মুসয়াব ছিলেন প্রখর মেধাবী, উদার ও প্রাঞ্জলভাষী বাগ্মী। যে দ্রুততার সাথে ইয়াসরিবে (মদীনা) ইসলাম প্রসার লাভ করেছিল তাতেই তাঁর এসব গুণের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর শাহাদাত পর্যন্ত যতটুকু কুরআন নাযিল হয়েছিল, তিনি মুখস্থ করেছিলেন। মদীনায় সর্বপ্রথম তিনিই জুময়ার নামায কায়েম করেন। মদীনায় মুসলমানদের সংখ্যা যখন একটু বেড়ে গেল তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি নিয়ে হযরত সাদ ইবন খুসাইমার (রা) বাড়ীতে জুময়ার নামাযের সূচনা করেন। তিনিই ইমামতি করেন। নামাযের পর একটি ছাগল যবেহ করে মুসল্লীদের আপ্যায়ন করা হয়।
-আসহাবে রাসূলের জীবনকথা ১: ২১৪-২১৯
.


মাওলানা মুহাম্মদ সাদ কান্ধলভি

তিনি তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভীর প্রপৌত্র।


৬-১২-২০১৬ তারিখে মাওলানা মুহাম্মাদ সাদ সাহেবের কিছু ভুল দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা প্রসঙ্গে দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থান, জরুরি ওয়াজাহাত প্রকাশ করে। তার কিছু অংশ-


বিগত কয়েক বছর ধরে অনেকগুলো ইসতিফ্তা ও চিঠি-পত্র থেকে মাওলানা মুহাম্মদ সাদ কান্ধলভি সাহেব সম্পর্কে যেই দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা দারুল উলুমের কাছে পৌঁছেছে, অনুসন্ধানের পর এখন এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, তার বিভিন্ন বয়ানের মাঝে কুরআন ও হাদিসের ভুল ও অপ্রণিধানযোগ্য ব্যাখ্যা, বিভ্রান্তিকর দলিল ও মনগড়া তাফসির পাওয়া যায়। তার অনেকগুলো কথার মাঝে আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের সম্মানিত মর্যাদার প্রতি অবমাননা প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি তার অনেকগুলো কথা এমন যে, সেগুলোতে তিনি উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ও মহান পূর্বসূরিদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের সীমারেখার বাইরে বেরিয়ে গেছেন। কিছু কিছু ফিকহি মাসআলাতেও তিনি নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতাগুলোর সম্মিলিত ফতোয়ার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন নতুন অভিমত দাঁড় করিয়ে জনগণের সামনে কঠোর ভাষায় বয়ান করে চলেছেন। উপরন্তু তাবলীগ জামাতের মেহনতের গুরুত্ব তিনি এমন ভাষায় ব্যক্ত করছেন যে, এর মাধ্যমে দ্বীনের অপরাপর শাখার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ও সেগুলো সম্পর্কে অবমাননা হচ্ছে। মহান পূর্বসূরিগণের দ্বীনপ্রচারের পুরাতন পদ্ধতিগুলোকে তিনি প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করছেন। তার এহেন কার্যকলাপের ফলে আকাবির-আসলাফের সম্মানহানী হচ্ছে। তাদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। তার এই আচরণ তাবলীগ জামাতের ইতোপূর্বকার দায়িত্বশীল হযরত মাওলানা ইলয়াস সাহেব রহ. হযরত মাওলানা ইউসুফ সাহেব রহ. ও হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহের রহ. এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবের বিভিন্ন বয়ান থেকে যেই নির্বাচিত অংশগুলো আমাদের কাছে পৌঁছেছে; কথাগুলো যে তারই বক্তব্য, এ কথাও ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। সেখান থেকে কয়েকটি নিম্নে তুলে ধরা হল-


১. হযরত মুসা আলাইহিস সালাম জাতি ও জামাত ছেড়ে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সংগোপনে কথা বলার উদ্দেশ্যে নীরব-নিভৃত স্থানে চলে যান। যার ফলে বনি ইসরাঈলের ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার সদস্য গুমরাহ হয়ে যায়। প্রধান ছিলেন মুসা আলাইহিস সালাম। তিনিই মূল যিম্মাদার ছিলেন। প্রধানের অবস্থান করা উচিত ছিল। হারুন আলাইহিস সালাম তো সহকারী ও সম্পৃক্ত ছিলেন।'


২. পরিপূর্ণ তাওবা ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনেই নকল-হরকত। মানুষ তাওবার তিন শর্তের কথা জানে, চতুর্থ শর্ত জানে না। ভুলে গেছে। সেই শর্তটি কী? খুরুজ। মানুষ এই শর্তের কথা ভুলে গেছে। ৯৯ জন হত্যাকারী খুনীর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল সন্ন্যাসীর সঙ্গে। সন্ন্যাসী তাকে নিরাশ করে। এরপর তার সাক্ষাৎ হয় জনৈক আলেমের সঙ্গে। আলেম তাকে বলেন, তুমি অমুক বসতির উদ্দেশে বের হও। ওই খুনী যখন বের হয় তখন আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। এথেকে বুঝে আসে যে, তাওবার জন্যে খুরুজ শর্ত। এটি ব্যতীত তাওবা কবুল হয় না। মানুষ এই শর্ত ভুলে গেছে। তাওবার তিনটি শর্ত বয়ান করে বেড়ায়। অথচ চতুর্থ শর্ত খুরুজের কথা ভুলে গেছে।


৩. মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও হিদায়াত পাওয়া যায় না। দ্বীনের এমন শাখা, যেখানে শুধু দ্বীনই পড়ানো হয়, যদি তার সম্পর্ক মসজিদের সঙ্গে না থাকে তাহলে খোদার কসম! সেখানেও দ্বীন থাকবে না। হয়তো সেখানে দ্বীনের তালিম হবে; কিন্তু দ্বীন হবে না।


৪. বেতন নিয়ে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার অর্থ, দ্বীন বিক্রি করা। ব্যভিচারী লোকেরা ওই সকল লোকের আগে জান্নাতে যাবে, যারা কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়।


৫. আমার মতে ক্যামেরাবিশিষ্ট মোবাইল পকেটে রেখে নামায হয় না। তোমরা আলেমদের কাছে যত জিজ্ঞেস করো, যতো ফতোয়া নাও, ক্যামেরাবিশিষ্ট মোবাইল দিয়ে কুরআন শোনা ও পড়া কুরআনের অবমাননা। এতে গুনাহ হবে। কোনো সাওয়াব হবে না। এমন কাজ করলে আল্লাহ তাআলা কুরআনের ওপর আমল করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন। যেসব আলেম এগুলো জায়েয হওয়ার ফতোয়া দেন আমার মতে তারা উলামায়ে সু। তারা উলামায়ে সু। তাদের মন-মস্তিষ্ক ইহুদ-নাসারা কর্তৃক প্রভাবিত। তারা বিলকুল জাহেল আলেম। আমার মতে, যেসব আলেম তা জায়েয হওয়ার ফতোয়া দেন আল্লাহর কসম, তার অন্তর আল্লাহর কালামের শ্রেষ্ঠত্ব থেকে শূন্য। এ কথা আমি এজন্যে বলছি যে, আমাকে এক বড় আলেম বলেছেন, এতে কী সমস্যা। আমি বললাম, আসলে ওই আলেমের অন্তর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব থেকে শূন্য। চাই তার বুখারি মুখস্থ থাকুক। বুখারি তো অমুসলিমদেরও মুখস্থ থাকে।


৬. কুরআন বুঝে পড়া প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। ওয়াজিব, ওয়াজিব। যে ব্যক্তি তা পরিত্যাগ করবে তার ওয়াজিব ত্যাগ করার গুনাহ হবে।


৭. আমার অবাক লাগে যখন কেউ প্রশ্ন করে যে, তোমার ইসলাহি সম্পর্ক কার সঙ্গে? কেন এর উত্তরে বলো না যে, আমার ইসলাহি সম্পর্ক এই কাজের সঙ্গে। আমার আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক দাওয়াতের সঙ্গে। এ কথার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখো যে, দাওয়াতের এই আমল ব্যক্তির দীক্ষার জন্যে শুধু যথেষ্টই নয়; বরং নিশ্চয়তা বহন করে।
আমি খুব গভীরভাবে ভেবে দেখেছি যে, এটাই মেহনতকারীদের পদস্খলনের মূল কারণ। ওই সমস্ত লোককে দেখলে আমার খুব আফসোস হয়, যারা এখানে বসে বলে, ছয় নম্বরের মাঝে পুরো দ্বীন নেই। যেই ব্যবসায়ী নিজেই নিজের দই টক বলে, সে ব্যবসা করতে পারবে না।
আমি খুব অবাক হই যখন আমার কোনো সাথী এসে আমার কাছে বলে যে, আমার এক মাসের ছুটি প্রয়োজন। অমুখ শায়খের খেদমতে আমাকে ইতিকাফ করতে যেতে হবে। তাকে আমি বলি, এখন পর্যন্ত তুমি দাওয়াত ও ইবাদতকে একত্র করতে পারোনি।
তুমি তো নিদেনপক্ষে চল্লিশ বছর দাওয়াতি কাজে ব্যয় করে ফেলেছো। চল্লিশ বছর তাবলীগে সময় ব্যয় করার পর একজন মানুষ কীভাবে বলতে পারে যে, আমার ছুটি দরকার। কারণ, আমি এক মাস ইতিকাফে বসার জন্যে যেতে চাচ্ছি। আমি বলি, যে মানুষ দাওয়াতের কাজ থেকে ছুটি চায় ইবাদত করার উদ্দেশ্যে, সে ব্যক্তি দাওয়াত ব্যতিরেকে কীভাবে ইবাদতে উন্নতি করবে!? আমি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছি যে, নবুওয়াতের আমল আর বিলায়াতের মাঝে ফারাক আছে। এই ফারাক তৈরি হয়েছে স্রেফ নকল-হরকত না করার কারণে। আমি পরিষ্কার বলে দিচ্ছি যে, আমরা স্রেফ দ্বীন শেখার তাশকিল করতেই বের করছি না। কারণ, দ্বীন শেখার জন্যে তো আরো অনেক পথ আছে। শুধু এর জন্যে তাবলীগে বের হওয়া কেন আবশ্যক হবে। দ্বীন যদি শিখতেই হয় তাহলে মাদরাসা থেকে শেখো, খানকাহ থেকে শেখো।


মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবের বয়ান থেকে এমন কিছু চয়নিকাও আমাদের হাতে এসেছে, যেখানে এ কথা প্রকাশ পেয়েছে যে, তার মতে শুধু তাবলীগ জামাতের বর্তমান পদ্ধতিই দাওয়াতের বিস্তৃত অর্থ ধারণ করে। তিনি স্রেফ এটাকেই নবি-রাসূল-সাহাবিদের মুজাহাদার পদ্ধতি অভিহিত করে থাকেন। এই বিশেষ পদ্ধতিকেই তিনি সুন্নত ও অবিকল আম্বিয়ায়ে কেরামের মেহনত সাব্যস্ত করে থাকেন। অথচ উম্মাহর জমহুর মনীষীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, দাওয়াত ও তাবলীগ হলো একটি সামগ্রিক বিষয়। শরিয়ত এর জন্যে এমন কোনো বিশেষ পদ্ধতি আবশ্যক করে দেয়নি, যা ত্যাগ করলে সুন্নাত ত্যাগ করার অপরাধ হবে। যুগে-যুগে দাওয়াত ও তাবলীগের অজস্র পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। ইতিহাসের কোনো যুগেই দাওয়াতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলা করা হয়নি। সাহাবায়ে কেরামের পর তাবেঈন, তাবয়ে তাবেঈন, আইম্মাহ, মুজতাহিদিন, ফুকাহা, মুহাদ্দিসিন, মাশায়েখ, আল্লাহওয়ালা অলিগণ ও নিকট অতীতের আমাদের আকাবির রহ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বীন পুনরুজ্জীবিত করার জন্যে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন।
তার এই বয়ানগুলো ছাড়াও এমন এমন কথা আমাদের কাছে পৌঁছেছে, যা জমহুর উলামার অবস্থান থেকে সরে এসে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর কথাগুলো যে বিভ্রান্তিকর, তা পরিষ্কার স্পষ্ট।
মৌলভি মুহাম্মদ সাদ সাহেব তার জ্ঞানস্বল্পতার কারণে নিজ মতাদর্শ ও চিন্তাধারার মাঝে, কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যাকালে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মূল স্রোত থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছেন। যা নিঃসন্দেহে গুমরাহির পথ।
.
.
.
৯-১-২০১৭ তারিখে মাওলানা সাদ সাহেব তার পূর্ববর্তী মত থেকে রুজু করা বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দকে একটি চিঠি লিখেন। ২৮-১-২০১৭ তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ সেই চিঠির জবাবি ফতোয়া প্রদান করে লিখে-


মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবের পক্ষ থেকে ১০ রবিউস সানি ১৪৩৮ তারিখে রুজু (মতপ্রত্যাহার) শিরোনামে একটি নতুন লেখা আমাদের কাছে পৌঁছে। লেখার সবগুলো কথা ও বিবরণের সঙ্গে যদিও আমরা একমত হতে পারছি না; কিন্তু ওই লেখার মাঝে মাওলানা মোটামুটি তার ওই সকল বয়ান থেকে রুজু করেছেন, যার কথা দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থানে বলা হয়েছিল। তিনি আগামীতে কথাগুলো পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার করেছেন।
এখন এ পর্যায়ে এসে এ কথা স্পষ্ট করা আবশ্যক যে, দারুল উলুম দেওবন্দ জনাব মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবের যেসব আপত্তিকর কথার ব্যাপারে নিজের সর্বসম্মত অবস্থান স্পষ্ট করেছিল, সেই অবস্থান নিজ স্থলে এখনো বলবৎ। দারুল উলুম দেওবন্দ নিজ সর্বস্মত অবস্থান থেকে সরে আসেনি। সাদ সাহেবের যেসব দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারার কথা 'সর্বসম্মত অবস্থান'-এ উল্লেখ করা হয়েছে, দারুদ উলুম দেওবন্দ সর্ববাস্থায় সেগুলোকে ভুল ও অগ্রহণযোগ্য মনে করে। 'সর্বসম্মত অবস্থান'-এ যেসকল বিভ্রান্তিকর বক্তব্য চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর ওপর তাবলীগ জামাতের সর্বস্তরে বিধি-নিষেধ আরোপ করা আবশ্যক মনে করে।
এর পাশাপাশি মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবকে বিশেষ করে এ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে যে, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তিনি তার বয়ানে শুধু মারজুহ (প্রত্যাখ্যাত) তাফসিরই আনেননি; বরং তিনি সন্দেহাতীতভাবে এখনো ভুলের ওপর আছেন। যা পরম সম্মানিত নবি হযরত মুসা আলাইহিস সালামের পবিত্র মর্যাদার পরিপন্থী। কাজেই এ মাসআলায় মাওলানাকে অবশ্যই তার পূর্বের বয়ানগুলো থেকে বিনা ব্যাখ্যায় সরে আসতে হবে। চাই সেই বয়ান মুসা আলাইহিস সালামের ত্বরা প্রবণতাকে বনি ইসরাঈলের গুমরাহির কারণ অভিহিত করা প্রসঙ্গে হোক বা চল্লিশ রজনী দাওয়াত ত্যাগ করে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার অপবাদ প্রসঙ্গে।
.
.
.
০৭-০৫-২০১৮ তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ আরেক ফতোয়ায় লিখে,


এদিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচারমাধ্যমে এ সংবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে যে, 'মাওলানা মুহাম্মদ সাদ কান্ধলভি সাহেবের কিছু বয়ানের ব্যাপারে দারুণ উলুম দেওবন্দ নিজের যেই অবস্থান ব্যক্ত করেছিল এবং যার ওপর দারুল উলুম দেওবন্দ অদ্যাবধি অনঢ় রয়েছে, খোদ দারুল উলুম দেওবন্দের কয়েকজন সম্মানিত উসতায তার সঙ্গে দ্বিমত ব্যক্ত করেছেন।
সুস্পষ্টত এই অবাস্তব সংবাদের কারণে এমন একটি বিশাল শ্রেণি দ্বিধা ও সংশয়ের শিকার হতে পারে, যারা প্রকৃত সুরতহাল সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে অর্থহীন আলোচনা শুরু হয়ে যেতে পারে। এজন্য দারুল উলুম দেওবন্দের খাদিমের অবস্থান থেকে আমরা আরেকবার এ কথা স্পষ্ট করা আবশ্যক মনে করছি যে, আমরা দারুল উলুম দেওবন্দের সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী ও মুফতিয়ানে কেরাম আমাদের পূর্বের অবস্থানের ওপর অবিচল রয়েছি। এই অবস্থানের সঙ্গে কারো কোনো ধরনের দ্বিমত বা মতভেদ নেই।
.
.
.
মাওলানা সাদ সাহেব সম্পর্কিত একটি ইস্তিফতার উত্তরে দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারতের ফতোয়া বিভাগ থেকে জুন ২০২৩ এ একটি ফতোয়া প্রকাশ করে। ফতোয়ার লিংক-
মূল ফতোয়া
মাসিক আল কাউসার কর্তৃক অনুবাদ
আব্দুল্লাহ আল ফারুক কর্তৃক অনুবাদ

জ্ঞান অর্জন

পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন- সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে ‘আলাক’ হইতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্নিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়াছেন- শিক্ষা দিয়াছেন মানুষকে, যাহা সে জানিত না। বস্তুত মানুষ তো সীমালংঘন করিয়াই থাকে, কারণ সে নিজকে অভাবমুক্ত মনে করে। তোমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন সুনিশ্চিত।
-আল কুরআন: আল আলাক ৯৬:১-৮
.
তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা নিজেরা কুরআন শিখে এবং অন্যকেও শিক্ষা দেয়।
-সহীহ বুখারী ৪৬৫৮
.
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ একজন আবদের উপর একজন আলিমের ফযীলত। তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তির তুলনায় আমার ফযীলতের ন্যায়।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বললেনঃ আল্লাহ্ তা‘আলা নিজে এবং তাঁর ফিরিশতাগণ, আসমান ও যমীনের সব অধিবাসী এমনকি গর্তের পিপীলিকা ও (পানির) মাছ পর্যন্ত মানুষকে কল্যাণপ্রসূ শিক্ষকের (আলিমের) জন্য অবশ্যই দু’আ করে থাকেন।
-সূনান তিরমিজী ২৬৮৫